Published : 11 Sep 2025, 01:27 AM
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের বড় বিজয় কীভাবে সম্ভব হল?
মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে সমালোচনায় বিদ্ধ, পেশী শক্তি প্রদর্শনের বদনাম এবং ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে জনপরিসরে অনাগ্রহের বাধা অতিক্রম করে ছাত্রশিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জন করতে পারল কী করে?
জুলাই অভ্যুত্থানের সুযোগে নতুন চেহারায় আবির্ভূত হওয়া ছাত্রশিবির প্রগতিশীল রাজনীতি চর্চার পরিচিত এই শিক্ষায়তনে কোন মন্ত্রবলে শিক্ষার্থীদের হৃদয় জয় করল?

জামায়াতে ইসলামীর সহযোগী এ সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন অবিশ্বাস্য জয়, জাতীয় রাজনীতিতেই-বা কী প্রভাব ফেলবে?
এসব প্রশ্নে বেশকিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, ডাকসুর সাবেক দুজন ভিপি-জিএস ও রাজনীতির বিশ্লেষক।
তাদের পর্যবেক্ষণ বলছে, জুলাই অভ্যুত্থানের এক বছর পরেও অভ্যুত্থানের সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রকাশ্য দলীয় পরিচয়ের বাইরে থাকা অনেককেই রেখে শিবির ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ প্যানেল করার চেষ্টা দেখিয়েছে, তা শিক্ষার্থীদের সমর্থন পেয়েছে।
এছাড়া হলগুলোতে শিক্ষার্থীদের সাথে সহযোগিতার মনোভাব দেখানো এবং সংগঠিত শক্তি হিসেবে ‘অহংকার’ প্রকাশ পায় এমন আচরণ থেকে বিরত থাকা শিবির সমর্থন পেয়েছে ‘কাদা ছোড়াছুড়ি’, ‘অন্তর্দ্বন্দ্ব’ ও পুরোনো ‘ট্যাগিং’ এর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে চাওয়া শিক্ষার্থীদের।
কেউ কেউ বলছেন, প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে বিভাজনের রাজনীতি, সংঘবদ্ধভাবে প্রচার চালাতে ব্যর্থতা এই ছাত্র সংগঠনটিকে এগিয়ে দিয়েছে।
রাজনীতির বিশ্লেষকের মতে, তরুণদের মনোজগতে বড় পরিবর্তনের ফলে অতীতকে ধারণ করলেও ‘বর্তমান’ ও ‘ভবিষ্যত’ নিয়ে ‘আত্মকেন্দ্রিক’ চিন্তা শিবিরের দিকে তাদের ঝুঁকে পড়ার মূল কারণ।
তাহলে কী জাতীয় রাজনীতিতে শিবিরের এই ‘মডেল’ প্রভাব ফেলবে? এ প্রশ্নে কেউ কেউ মনে করছেন, জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রটি আলাদা সেখানে সরল সমীকরণের সুযোগ নেই।

মঙ্গলবার দিনভর ভোটগ্রহণের পর রাত পেরিয়ে বুধবার সকালে মিলেছে ডাকসু নির্বাচনের ফল।
পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, প্রবেশপথগুলোতে রাজনৈতিক লোকজনের জড়ো হওয়ার ঘট্না, ‘ভোট চুরির’ অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ কিছুটা উত্তেজনা ছড়ালেও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ৪০ হাজার ভোটারের ৭৮ শতাংশ ভোট দিয়েছেন।
ডাকসুর ২৮টি পদের ভিপি ও জিএসসহ ১২টি সম্পাদকীয় পদের মধ্যে নয়টিতে শিবিরের ‘ঐকবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ বড় জয় পেয়েছে। সব মিলিয়ে ২৩টি পদ পেয়েছে এই প্যানেল।
অথচ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে দেড় দশক এ সংগঠনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে রাজনীতি করতে পারেনি। ছাত্রলীগের ‘অনুপ্রবেশ’ করার ঝুঁকি নেওয়া ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা গণঅভ্যুত্থানের পর প্রকাশ্যে আসেন।
প্রথমে সাদিক কায়েম এবং পরে একেক করে এস এম ফরহাদ ও মুহা. মহিউদ্দীন খানের আবির্ভাব ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবিরের নেতা হিসেবে। এ তিনজনই ডাকসুর তিন শীর্ষ পদে নির্বাচিত হয়েছেন বিপুল ব্যবধানে।
যদিও প্রকাশ্যে আসার পর সমালোচনা শিবিরের পিছু ছাড়েনি। বারবার মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গ এসেছে তাদের সামনে। ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ছবি ঘুরে ফিরে আসতে থাকে সামাজিক মাধ্যমে।
সবশেষ ৫ অগাস্টে জুলাই অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ‘৩৬ জুলাই: আমরা থামবো না’ শীর্ষক কর্মসূচির অংশ হিসেবে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত নেতাদের ছবির প্রদর্শনী করে প্রতিরোধের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয় শিবির। তার এক মাস পরেই ছাত্রশিবির ডাকসু নির্বাচনে জয় পেল।

ছাত্রশিবিরের জয়, যা বলছেন শিক্ষার্থীরা
মঙ্গলবার রাত পৌনে ১টার দিকে কেন্দ্রে কেন্দ্রে ফল ঘোষণা শুরুর পর থেকেই শিবির সমর্থিত প্যানেলের বড় জয়ের আভাস মেলে।
নানা ধরনের গুঞ্জনের মধ্যে ক্যাম্পাসের প্রবেশ পথগুলোতে জড়ো হন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী। উত্তেজনার আভাসে ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা কড়াকড়ি করা হয়।
রাত ৩টার দিকেই ক্যাম্পাসের কয়েক জায়গায় ছাত্রশিবিরের কর্মীদের বিজয় মিছিল শুরু হয়ে যায়। অন্যদিকে কারচুপির অভিযোগ তুলে ভোটের ফল প্রত্যাখ্যান করেন ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান এবং স্বতন্ত্র জোটের ভিপি প্রার্থী উমামা ফাতেমা।
১৮ হলের ফল জড়ো করে সমন্বিত ফল প্রস্তুত করতে রাত পেরিয়ে যায়। বুধবার সকাল ৮টার পর নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণা করেন ডাকসু নির্বাচনের প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক জসীম উদ্দিন। ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের উদযাপনও পূর্ণতা পায়।
এ নির্বাচনে শিবিরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রার্থীরা। তবে জয়ের মুখ দেখেননি তাদের কোন সদস্য। জুলাই অভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা রাখা শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস) নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়তে পারেনি। এছাড়াও জুলাইয়ের প্রগতিশীল ধারার শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন প্যানেলে ভাগ হয়ে গেলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়তে পারেননি।
ছাত্রশিবিরের জয়ের নেপথ্যে কী ছিল, জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলের শিক্ষার্থী মালিহা ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ছাত্রশিবিরের জয়ের কারণে হচ্ছে অন্য সংগঠনগুলোর অহংকার। তারা সবসময় নিজেদের ‘একটা কিছু’ মনে করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তার জবাব ব্যালটে দিয়েছেন।
“সামনে শোডাউন ও কাদা ছোঁড়াছুড়ির রাজনীতি বাদ দিয়ে আসতে পারলে বাকিরা ভালো করবে।”
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ফারদিন রহমান বলেন, “শিবিরের জয়ের অন্যতম প্রধান কারণগুলো হল- প্যানেলে বৈচিত্র্য। হিজাবি, নন-হিজাবি নারী, সর্ব মিত্র চাকমার মতো ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থী ছিল তাদের প্যানেলে। এছাড়াও সাদিক কায়েম আর ফরহাদের নেতৃত্ব ছিল অন্য পর্যায়ের।”
শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ বলছেন, শিবিরের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হয়, এ প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা তা দেখেনি। বরং অভ্যুত্থান পরবর্তী একবছর ‘শৃঙ্খলা কমিটি’ বা এমন বহু নামে, ঘোষিত বা অঘোষিতভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখলেও তাদের বিরুদ্ধে মিছিল মিটিংয়ে যেতে বাধ্য করা, নির্যাতন করার প্রমাণ মেলেনি।
সে কারণে শিবিরের অতীত কর্মকাণ্ড টেনে এনে প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনগুলোর বক্তব্য, সমালোচনা আমলে নেয়নি শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের কাছে নিছক সেগুলো ‘প্রচারণা’ ও ‘মিথ্যা বয়ান’ মনে হয়েছে। এটিও শিবিরকে ভোট দিতে ভূমিকা রেখেছে বলে তাদের ভাষ্য।
ফারদিন রহমান বলেন, “শিবিরের প্যানেলের প্রতিটি প্রার্থী ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেছে। আর বাকি প্যানেলগুলোর প্রধান কাজই ছিল শিবিরের সমালোচনা করা। তারা ভোটের কাজগুলো ভালোভাবে করতে পারে নাই।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী আসাদুজ্জামান বলেন, “ছাত্রশিবিরের এই বিজয়টা আসলে আমাদের দেখায় যে ট্যাগিং কালচার, অপ্রয়োজনীয় অভিযোগ করা, মিথ্যা বয়ান কীভাবে উল্টো ফল বয়ে আনে।
“শিবির খুব অসাধারণ কিছু করেছে বা তারা আসলেই আলাদা, আমি তা মনে করি না। এখানে শিবির ষোল আনা ফায়দা নিয়েছে বিরোধীদের বিরোধিতা ও অমূলক প্রচারণা থেকে। মূলত এগুলোই শিবিরকে গত এক বছর প্রাসঙ্গিক রেখেছে, একটা ভালো ভাবমূর্তি গড়তে সহায়তা করেছে৷”

সুসংগঠিত শিবির বনাম বিভাজিত প্রতিদ্বন্দ্বী
ডাকসুতে শিক্ষার্থীরা ছাত্রদলকে বেছে না নেওয়ার ক্ষেত্রে সংগঠনটির নিজেদের মধ্যে ‘গ্রুপিং’ এর কথা তুলে ধরেন ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র বিল্লাল হোসেন।
তার ভাষ্য, “ছাত্রদলের মধ্যে অনেক গ্রুপিং। ওরা নিজেরাই নিজেদের প্রার্থীদের ভোট দিতে মানা করে। প্রচারে যায় নাই তাদের লোকরাই।”
ছাত্রদলকে পরে ‘বাইরে থেকে পোলাপান’ এনে প্রচার চালাতে হয়েছে বলেও তিনি তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
নির্বাচনের আগের রাতে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের ছয় নেতাকে স্থায়ী বহিষ্কার করার খবর আসে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সংগঠনের প্রার্থীর বিরুদ্ধে গিয়ে হল সংসদের প্রার্থী হওয়া।
বাম ধারার ছাত্রসংগঠনগুলোও ডাকসু নির্বাচন কেন্দ্র করে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি। তাদের অন্তত তিন প্যানেল নির্বাচন করেছে।
অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উদ্যোগে আত্মপ্রকাশ করা বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ-বাগছাসের নেতাদের প্যানেলের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হতে দেখা যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ডাকসু নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে মূলত ‘নেটওয়ার্ক’। সুসংগঠিত ‘নেটওয়ার্ক’। দেখা গেছে তারা (ছাত্রশিবির) ছিল সুসংগঠিত। পরিকল্পনা যথাযথ ছিল এবং তাদের কৌশল ঠিক ছিল।
“তারা অনেক আগে থেকে প্রস্তুত ছিল। তাদের প্রার্থীরা ভিতরে ভিতরে নির্ধারিত ছিল। অন্য প্যানেলগুলোতে এটা ঠিক এভাবে স্পষ্ট ছিল না। অন্য প্যানেলগুলোতে সেভাবে ছিল না। প্রার্থীরা হয়তো নির্বাচনের দুই-চার-পাঁচ দিন আগে বা ১০-১৫ দিন আগে মানে, তফসিল ঘোষণার পাঁচ-সাত দিন আগে হয়তবা জেনেছে। শেষ দিন জেনেছে, সে প্রার্থী হবে।
“কিন্তু যে প্যানেলটা বিজয়ী হয়েছে এই প্যানেলটার ক্ষেত্রে এইটা হতে পারে যে তারা লম্বা সময় ধরে, মানে জুলাই আন্দোলনের পরবর্তী সময় থেকেই এটার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল।”
সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের কাছে তারা পৌঁছতে পেরেছে এবং শিক্ষার্থীরাও পেরেছে বলে রাজনীতির এ বিশ্লেষকের ভাষ্য।
তিনি বলেন, “সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদের প্যানেলের প্রার্থীদের পাস করিয়ে আনার জন্য সর্বশক্তি ব্যবহার করেছে। এটা আপনি কয়টা প্যানেলের মধ্যে খেয়াল করেছেন? সেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর দ্বিতীয় ও তৃতীয়ত হল, যে জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে, জুলাইয়ের পরে জুলাইকে পুঁজি করা।
“অন্যরা জুলাইকে পুঁজি করতে পারছে না। এমনকি জুলাইয়ের নেতারা পারল না। উমামা (ভিপি পদের স্বতন্ত্র প্রার্থী উমামা ফাতেমা) ও অন্য যারা ছিল, তারা।
“এটা প্রমাণ করে, জুলাইকে কেন্দ্র করেই তরুণরা ছিল, কিন্তু এখন তরুণরা ভাবছে তাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে। তারা চিন্তা করছে তারা কার কাছে পৌঁছতে পারছে। আপনার যতবেশি নেটওয়ার্ক, ততবেশি সবার কাছে পৌঁছে যাওয়া। অন্যরা অল্প সময়ে এ উপকরণ পায় নাই।”

‘মন্দের ভালো শিবির’
শিবিরের অতীত কর্মকাণ্ড থেকেও শেখ হাসিনা শাসনামলের দুঃশাসন নিকট অতীতে হওয়ায় তা এখনও ‘জ্বলজ্বল’ করছে বলে মন্তব্য করেন ১৯৮৯-৯০ শিক্ষাবর্ষে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) মুশতাক হোসেন।
একই সাথে বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের ক্যাম্পাস দখলের যে রাজনীতি ছিল, তার বিপরীতে তরুণরা ‘মন্দের ভালো’ হিসেবে শিবিরকে বেছে নিয়েছেন বলে তার ভাষ্য।
রাজনীতিতে যুক্ত থাকা ডাকসুর সাবেক এই জিএস বলেন, “যারা বিভিন্ন সময় ক্ষমতায় ছিল বা ক্যাম্পাস দখল করেছে, তাদের প্রতি অনাস্থা থেকে একটা বিকল্প হিসেবে (শিবিরকে) বেছে নিয়েছে। মন্দের ভালো হিসেবে।
“এর মাধ্যমে নতুন ব্যক্তিকে তারা (শিক্ষার্থীরা) সুযোগ দিতে চায়, যারা ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা করে। অনেকে তাদের বলে, তারা সৎ মানুষ। তারা দুর্নীতি করে না। তাই তারা তাদের সুযোগ দিতে চায়, এই আমার কাছে মনে হয়।”
বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য মুশতাক বলছেন, “মুক্তিযুদ্ধে বা পাকিস্তান আমলে ধর্মের নামে বাঙালির ওপর অত্যাচার হয়েছে। নারীদের মর্যাদা হানি, এগুলো হয়েছে। কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে যে অপকর্মগুলো করেছে, নিষ্ঠুর কর্তৃত্ববাদী শাসন চালিয়েছে এবং বিশেষ করে জুলাই গণহত্যা। এটার একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ছাত্রদের মধ্যে।
“যে মুক্তিযুদ্ধ বলা মানেই শেখ হাসিনার মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধ চর্চা বলা মানেই এই পাইকারি হত্যাকাণ্ড। কাজেই এর বিপরীতে যা আছে, সেটা এদের চাইতে ভালো। এটা একটা খুবই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হয়েছে। এরা জানে যে ছাত্রশিবির স্বাধীনতাবিরোধী। তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধাচারণ করেছে। তারপরও তাদের নিকট স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে শেখ হাসিনার মুক্তিযুদ্ধের নামে এই যে অত্যাচার, নির্যাতন, অনিয়ম-লুটপাট করেছে, সেসব।”
ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের এ জয়কে ‘চাঁদাবাজি-দখলদারিত্বের জবাব’ হিসেবে দেখতে চান।
বুধবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে এক আলোচনা সভায় নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মান্না বলেন, “এই প্রজন্ম এক বছর পরে মনে করছে, এই দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতি আমরা দেখতে চাই না, এই যে মিথ্যাচার, এই যে এক বছর যেটা দেখলাম চাঁদাবাজি, দখলদারিত্বের রাজনীতি এবং ক্ষমতায় যাবার আগেই ক্ষমতায়িত হয়ে গেছে- এরকম হাবভাব করা, এই রাজনীতি দেখতে চাই না। অতএব তারা নতুন কিছু করতে চায়।”
নেপালের উদহারণ টেনে জাসদ ছাত্রলীগ থেকে দুইবার ডাকসুর ভিপি পদে জয়লাভ করা মান্না বলেন, “জেন-জি ইতিহাস রচনা করে দিয়েছে। এই জেন-জি পুরা আফ্রিকাতে, ল্যাটিন আমেরিকাতে ইতিহাস তৈরি করেছে। উগান্ডাতে জেন-জির একটা বক্তব্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। তারা বলেছে, এই অপমানজনক জীবনযাপন করতে আমরা বিরক্ত। এবারে কিছু সাহস দেখাতে চাই।
আচ্ছা মিলিয়ে দেখেন, এই গেস্টরুম কালচার, বড় ভাইদের সালাম করা, প্রোটোকল দেওয়া, ভর্তি পরীক্ষা না হলেও তারপরে ভর্তি হতে পারবে, পরীক্ষা দিতে না দেওয়া- সব দেখে অপমানিত ছাত্রসমাজ। তারা মনে করেছে, এই জীবনের মধ্যে আমরা সাহস দেখাব।”

জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে?
ডাকসু নির্বাচন জাতীয় রাজনীতিতে কোনো প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করেন মান্না।
তিনি বলেন, “আমি খুব জনপ্রিয় ছিলাম ছাত্রদের মধ্যে, কিন্তু আমার রাজনৈতিক দলে হয়নি। আমি তো ক্ষমতায় যাইনি, আমার পার্টি তো ক্ষমতায় যেতে পারেনি। অতএব ডাকসুতে জিতলেই যে তারা জাতীয় রাজনীতি বিরাট কিছু করে ফেলবে সেরকম নয়।
“কিন্তু তারপরেও মনে করে দেখেন, মাহমুদ রহমান মান্নার সেই সংগঠন ছিল না। কিন্তু এবার যারা জিতেছেন তাদের তো সংগঠন আছে। তারা সেটাকে রূপান্তর করতে পারবেন।”
ডাকসুর নতুন নেতৃত্ব যদি ‘উল্লেখযোগ্য’ অবদান রাখতে পারে তাহলে জাতীয় রাজনীতিতে এর প্রভাব পরবে বলে মনে করছেন মুশতাক হোসেন।
তার মতে, যারা বিগত সরকারের বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখে তারা ডাকসু নির্বাচনে জিতে আসে। ৯০ এর গণঅভ্যুত্থানের পর ছাত্রদল সফল হল। এরপর জাতীয় নির্বাচনে (৯৬ সালের ১২ জুন) বিএনপি হেরে গেল কিন্তু, দেখেন।
“ছাত্র ইউনিয়ন ১৯৭২ সালে জয়লাভ করেছে। ছাত্রলীগ ৮৯, ৮০, ৮১, ৬২ সালে জিতেছে। ৮২ সালে জিতেছে। জাতীয় নির্বাচনে এসব সংগঠন তেমন কোনো ‘উল্লেখযোগ্য’ মানে তারা প্রায় অবদান রাখতেই পারে নাই।
“কিন্তু যদি ডাকসু নেতৃত্ব এরকম গণভুত্থানের মত বিষয়গুলো সম্পন্ন করে। এইটা তাদের জাতীয় নির্বাচনে সুবিধা দেয় বা তাদের সাথে যারা, তারা পেতে পারে। যেমন ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের সুফল ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ পেয়েছিল ৭০ এর নির্বাচনে। আওয়ামী লীগ সেটা পেয়েছে।”
শিবিরের এই অর্জনের সুবিধা, তারা যে দলটির সহযোগী সেই জামায়াতে ইসলামী নেওয়ার চেষ্টা করবে বলে মনে করছেন তিনি।
মুশতাক বলেন, “জামায়াতে ইসলামী ছাত্রশিবিরের যে সহযোগী রাজনৈতিক সংগঠন। তারা পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। তাদের অভিজ্ঞতা আছে। কাজেই তারা এইটা চেষ্টা করবে।
“এখন তারা যদি বাড়াবাড়ি না করে, তারা যদি ধৈর্যের সাথে, সংযমের সাথে চলে, তারা অপেক্ষাকৃত কিন্তু ভালো করবে।”
তবে সেটা সাধারণ মানুষের মানসিকতার ওপর নির্ভর করবে তুলে ধরে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক চেতনা, অসাম্প্রদায়িক, উদার নৈতিক নীতি পছন্দ করে, জামায়াত এখনও সেভাবে তা প্রমাণ করতে পারেনি। সেটা প্রমাণ করার সুযোগ আসছে।
“এর আগে তারা যখন চট্টগ্রামে ছাত্র সংসদ দখল করেছে। তারা তাদের দখলদারিত্ব এবং তাদের যে, মানে সন্ত্রাসী চেহারা দেখিয়েছে। সেটা কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখনো দেখেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার বিপরীতে, তাদের ছাত্রবান্ধব শান্তিপূর্ণ চেহারা দেখায়, তাহলে তাদের জন্য ভালো হবে।”
প্রগতিশীল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ‘ঐক্যবদ্ধ’ প্যানেল না দিলে সামনের জাকসু, রাকসু ও চাকসুতে সংগঠিত শক্তি হিসেবে ছাত্রশিবির সেখানেও জয়ের ‘সেই সুবিধাটা নেওয়ার চেষ্টা করবে’ বলে মনে করেন তিনি।
তবে ডাকসুতে শিবিরের জয়ে জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব পড়বে না বলেও মনে করছেন অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান।
তার ভাষ্য, “আমার কাছে মনে হচ্ছে যে এখন মানুষ নিজের পরিকল্পনার ব্যাপারে, পছন্দের ব্যাপারে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সুতরাং সে যে সিদ্ধান্ত নেয়, নিজের নিজের সাথে আলাপ করেই নেয়। সিদ্ধান্ত নিতে অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয় না সে এখন।
“তাছাড়া আগামী নির্বাচনের আগে এই নির্বাচনের ছয়মাস হয়ে যাবে। নির্বাচনের কারণে এবং এর মধ্যে যারা নির্বাচিত হয়েছে, তারা তাদের অবস্থান জুলাই আন্দোলনের মত করে, চরিত্র না হারিয়ে কতটা ধরে রাখতে পারে, সেটার উপর নির্ভর করবে।”
তবে জেতার পর সে ‘চরিত্র ধরে রাখা কঠিন’ বলে মনে করেন তিনি।
রাষ্ট্র বিজ্ঞানের এই শিক্ষক বলেন, “জাতীয় নির্বাচনে তাদের আসলে কোনো প্রভাব পড়ে কিনা, এত সহজে বোঝা যাবে না।
“এখন মানুষের সহানুভূতি যাবে হল-যে দুর্বল অবস্থানে আছে তাদের (শিবির) দিকে। গত ১৫ বছর জামায়াত-শিবিরকে ট্যাগিং করেছে, তাকে সমস্যার মধ্যে রেখেছিল, সেটাই কিন্তু মানুষকে, অনেক লোককে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করেছে।
“এখন আবার এদের প্রতি আকর্ষণ কমে যেতে পারে। আমি বলছি না, কমেই যাবে। কমে যায়, কারণ সাধারণত বাংলাদেশের মানুষের একটা বড় স্বভাব হল, তারা সবসময় বিজয়ের পক্ষে থাকতে চায় না।”

‘মুক্তিযুদ্ধে আঘাত নয়’
মুশতাক হোসেনের মতে, জাতীয় রাজনীতিতে শিবিরের জয়ের প্রভাবের ক্ষেত্রটি নস্যাৎ হয়ে যেতে পারে, যদি মুক্তিযুদ্ধে আঘাত করে। ছাত্রসমাজও সরে যাবে।
তিনি বলেন, “ছাত্র সমাজ খুবই স্পর্শকাতর যে তারা ছাত্রশিবিরকে পছন্দ করলেও, যদি মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে তারা কোনো আঘাত দেয়, তারা কিন্তু খুবই দ্রুতই এবং পুরো ক্যাম্পাসই তাদের বিরুদ্ধে চলে যাবে। প্রমাণ হল-গণভুত্থানের পরে তারা তাই ভেবেছিল যে মুক্তিযুদ্ধকে যদি তারা অপমান করে কোনো প্রতিবাদ হবে না।
“তারা টিএসসিতে তাদের ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত নেতৃবৃন্দের ছবি টাঙ্গিয়েছিল। অতি দ্রুতই প্রতিবাদ হয়েছে এবং প্রতিবাদ যারা সংগঠিত করেছে সেসব সংগঠনের সাংগঠনিক শক্তি কিন্তু ওদের তুলনায় কম। তারপরও তাদের প্রতিবাদের দৃঢ়তা এত ছিল যে নৈতিকভাবেই শিবির দুর্বল ছিল।
“এখন যদি তারা মনে করে, তারা রায় পেয়েছে বলেই ৭১ এর বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। তাহলে গোটা ক্যাম্পাস, গোটা ছাত্রসমাজ নিমিষের মধ্যেই কিন্তু এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে। তাদের পক্ষে আর ডাকসুও চালানো সম্ভব হবে না। এটা খুবই ‘স্পর্শকাতর’ বিষয়।”
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলছেন, “রাজনীতিতে একটা প্রজন্ম গ্যাপ হয়ে গেল, সেই গ্যাপটা হল যে- একটা সময় ছিল যখন রাজনীতিটা গণতান্ত্রিক ধারার সাথে ছিল। গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক এই বিষয়টার সাথে একটা প্রগতিশীল ও রাজনৈতিক সমতা, এগুলোর সাথে যুক্ত থাকত ছাত্ররা।
“এখন আসলে আমার কাছে মনে হয় যে নতুন যে অর্থনীতির ধারা, অর্থনীতি এইটা তো আসলে মানুষকে অনেক আত্মকেন্দ্রিক করে ফেলেছে। অনেক বাণিজ্যিক করে তুলেছে। (ডাকসুতে শিবিরের জয়) এইটার কোনো প্রভাব কিনা, সেটা আমি বলতে পারব না।
“ছাত্ররা এখন যেভাবে মানে, নিজের মানে, নিজেকে কেন্দ্র করতে হবে, সামাজিক দায়িত্বের থেকে নিজের উন্নয়ন, নিজের বিকাশ- এটাকেই বেশি দেখতে চায়, এখন সেখান থেকেই হল কিনা।”
তিনি বলেন, “অসাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নটা তো বিশ্বব্যাপী একটা হুমকির মুখে পড়েছে সবকিছু মিলায়ে।”
[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আরফাতুল ইসলাম নাইম]
আরও পড়ুন: