লবিস্ট বিতর্ক: বিএনপির হিসাবের খাতা দেখবে ইসি

যুক্তরাষ্ট্রে ‘লবিস্ট নিয়োগের’ খরচ বিএনপি বার্ষিক লেনদেনে দেখিয়েছে কি না পর্যালোচনা করবে নির্বাচন কমিশন।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 1 Feb 2022, 05:35 PM
Updated : 1 Feb 2022, 05:35 PM

এজন্য দলটির অডিট রিপোর্ট যাচাই করবে সাংবিধানিক সংস্থাটি।

বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিতব্য কমিশন সভায় এ সংক্রান্ত আলোচ্যসূচি রাখা হয়েছে।

এ বিষয়ে মঙ্গলবার ইসির অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ বলেন, “বিদেশে লবিস্ট নিয়োগে ব্যয় সংক্রান্ত কিছু তথ্য উপাত্ত দিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন সচিব বরাবর পত্র দিয়েছেন। এরপরই বিষয়টি কমিশন সভায় উপস্থাপন করা হচ্ছে।

“আগে এ ধরনের কোনো তথ্য তো এখানে ছিল না; বিষয়গুলো দেখতে ইসির সিদ্ধান্ত লাগবে, আলোচনার করেই পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।”

পাঁচ বছর মেয়াদের বর্তমান ইসির এটা ৯৩তম কমিশন সভা। এ সভায় চার নির্বাচন কমিশনার উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

কে এম নূরুল হুদা নেতৃত্বাধীন ইসির মেয়াদ শেষ হচ্ছে ১৪ ফেব্রুয়ারি।

ইসির উপ সচিব মোহাম্মদ এনামুল হক স্বাক্ষরিত সভার নোটিশে পাঁচটি এজেন্ডার কথা উল্লেখ করা রয়েছে।

এরমধ্যে একটি আলোচ্যসূচি রয়েছে- ‘বিএনপির বিদেশে লবিস্ট নিয়োগ সংক্রান্ত ব্যয় বিবরণী নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা অডিট রিপোর্টে উল্লেখ না করলে এ বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া’ সংক্রান্ত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পত্রের বিষয়ে কমিশনে উপস্থাপন।

সংসদে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এ সংক্রান্ত দাবি উত্থাপনের আগেই নির্বাচন কমিশনে তিনি চিঠি পাঠিয়েছিলেন।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ মেনে নির্বাচন কমিশনের কাছে রাজনৈতিক দলগুলোকে পঞ্জিকা বছরের আর্থিক লেনদেনের তথ্য (অডিট রিপোর্ট) রেজিস্টার্ড চার্টার্ড অ্যাকাউন্টিং ফার্মের মাধ্যমে নিরীক্ষা করে প্রতি বছর জুলাইয়ের মধ্যে দিতে হয়।

সবশেষ গেল বছর অগাস্টে নির্বাচন কমিশনে ২০২০ পঞ্জিকা বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব জমা দেয় নিবন্ধিত দলগুলো। পরপর তিন বছর তা দিতে ব্যর্থ হলে নিবন্ধন বাতিলের এখতিয়ার রয়েছে ইসির। বিধানটি চালু হওয়ার পর একযুগ ধরে নিবন্ধিত অন্তত ৩৯টি দল অডিট রিপোর্ট দিয়ে আসছে।

এতে দেখা যায়, ২০২০ সালে আওয়ামী লীগের আয় হয়েছে ১০ কোটি ৩৩ লাখ ৪৩ হাজার ৫৩৩ টাকা। দলটি ব্যয় করেছে মোট ৯ কোটি ৯৪ লাখ ৪৯ হাজার ৯৩১ টাকা।

ওই বছর বিএনপির আয় হয়েছে এক কোটি ২২ লাখ ৫৩ হাজার ১৪৯ টাকা এবং ব্যয় হয়েছে এক কোটি ৭৪ লাখ ৫২ হাজার ৫১৩।

গত ১৭ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি লবিস্ট ফার্মের পেছনে বিএনপি দুই মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে তথ্য দিয়ে এ বিষয়ে তদন্ত দাবি করেন।

সংসদে কিছু নথি দেখিয়ে প্রতিমন্ত্রী নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশে বলেন, “প্রতিটি রাজনৈতিক দল বছর শেষে তাদের হিসাব-নিকাশ প্রকাশ করে। বিএনপিকে জিজ্ঞেস করতে হবে, এ টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে গেছে কি না? তা না হলে এতিমের টাকা খেয়ে যে টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। সেই টাকার ব্যবহার এখানে করা হয়েছে কি না সেই তদন্ত চাই। এটা নির্বাচন কমিশনের কাছে জানতে চাই।

“বিএনপি-জামায়াত গত পাঁচ বছরে কতগুলো লবিস্ট ফার্মে টাকা দিয়েছে তার চুক্তি, টাকা-পয়সার হিসাব আছে- এটা প্রকাশ করা হবে। কে, কোন অ্যাকাউন্টে দিয়েছেন সব কিছু আছে।”

এসব ঘটনার তদন্ত দাবি করে শাহরিয়ার বলেন, “২০১৫ সালে অ্যাকিন গর্ভমেন্ট অ্যাসোসিয়েটের সঙ্গে বিএনপির নয়াপল্টনের ঠিকানা দিয়ে তাদের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে, মাসিক ৫০ হাজার ডলারের বিনিময়ে। সেটা তিন বছর অব্যাহত ছিল। বছরে আসে প্রায় দুই মিলিয়ন ডলার। এরকম আমার কাছে ১০টি ডুকুমেন্ট রয়েছে।”

ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগই বিদেশে লবিস্ট নিয়োগের মাধ্যমে জনগণের অর্থ অপব্যয় করেছে অভিযোগ তুলে তা তদন্ত করার দাবি জানিয়েছে বিএনপি।

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের পাল্টায় ২০ জানুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, “আমরা চাই যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তদন্ত করুক। তাদেরটাও তদন্ত করুক। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই যে, আমরা বাংলাদেশ থেকে লবিস্ট নিয়োগ করেনি। তার জন্য বাংলাদেশ থেকে অর্থ কোথাও যায়নি।”

লবিস্ট নিয়োগে অর্থ পাচারের যে অভিযোগ প্রতিমন্ত্রী তুলেছেন, তাও তদন্ত করার দাবি জানিয়েছে বিএনপি। এ ব্যাপারে কেঁচো খুঁড়তে গেলে আরও বড় বড় সাপ বেরিয়ে আসবে, দাবি করেন তিনি।

দু’দলের পাল্টপাল্টি বক্তব্যের মধ্যে গত ২৭ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে বলেছেন, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চক্রান্তের অংশ হিসেবে বিএনপি বিদেশে লক্ষ লক্ষ ডলার খরচ করে লবিস্ট নিয়োগ করেছে।

“আজকে ইলেকশন সামনে নিয়ে এ লবিস্ট দিয়ে টাকা দেওয়া হচ্ছে। এ টাকার পাই পাই হিসাব আমরা আদায় করতে চাই, পাই পাই হিসেব দিতে হবে।”

এ অর্থ অবৈধ উৎস থেকে পাওয়া দাবি করে সংসদ নেতা বলেন, “লক্ষ লক্ষ ডলার তারা খরচ করেছে। কোটি কোটি ডলার খরচ করেছে। আমার প্রশ্ন, এ অর্থ কোথা থেকে তারা পেল?

“বিদেশি ফার্মকে এই যে লক্ষ লক্ষ বা কোটি কোটি ডলার যে তারা পেমেন্ট করল, এটা কোথা থেকে পেল? এ অর্থ কিভাবে বিদেশে গেল?”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক