জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের গেজেট এলো ৫ বছর পর 

হাই কোর্ট জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী এই ধর্মভিত্তিক দলটিকে নির্বাচনের ‘অযোগ্য’ ঘোষণা করার পাঁচ বছর পর নিবন্ধন বাতিলের প্রজ্ঞাপন জারি করেছে নির্বাচন কমিশন।

মঈনুল হক চৌধুরীবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 29 Oct 2018, 03:03 PM
Updated : 29 Oct 2018, 03:08 PM

নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলছেন, পূর্ণাঙ্গ রায় পেতে দেরি হওয়াই তাদের এই দীর্ঘ বিলম্বের কারণ। 

সোমবার সন্ধ্যায় গেজেট প্রকাশের পর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, দশম সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালের অগাস্টে আদালতের রায়ে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করা হয়।

“কিন্তু হাই কোর্টের রায়ের পর এ বিষয়ে উচ্চ আদালতে আপিল চলছিল বলে প্রজ্ঞাপন করা যায়নি। এখন সব কিছু শেষ, রায়ের কপি আমরা পেয়েছি। সব কিছু পর্যালোচনা করে নিবন্ধন বাতিল সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হল।”

ইসি সচিব স্বাক্ষরিত ওই গেজেটে বলা হয়, আদালত জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করায় আরপিও অনুযায়ী দলটির নিবন্ধন বাতিল করা হল।

নির্বাচন কমিশন কবে পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পেয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য দেননি ইসি কর্মকর্তারা। তবে নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, ২০১৩ সালে আদালত যখন রায় দিয়েছিল, নিবন্ধন বাতিলের গেজেট তখন থেকে কার্যকর ধরা হবে।

বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক দলগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনে নির্বাচন কমিশন।

সে সময় ৩৮টি দলের সঙ্গে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী জামায়াতে ইসলামীও নিবন্ধিত হয়। আইন অনুযায়ী শুধু নিবন্ধিত দলগুলোই বিগত নির্বাচনে অংশ নিতে দেয়া হয়।

জামায়াতকে নিবন্ধন দেয়ার সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে তরিকত ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরী, জাকের পার্টির মহাসচিব মুন্সি আবদুল লতিফ, সম্মিলিত ইসলামী জোটের প্রেসিডেন্ট মাওলানা জিয়াউল হাসানসহ ২৫ জন ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে একটি রিট আবেদন করে।

তাতে বলা হয়, গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ অনুসারে শর্ত পূরণ না হওয়ায় জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিক দল হিসাবে নিবন্ধন পেতে পারে না।

ওই রিটের প্রেক্ষিতে জারি করা রুলের ওপর শুনানি শেষে হাই কোর্ট ২০১৩ সালের ১ অগাস্ট জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে। ফলে বিএনপির জোট শরিক এই দলটির নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পথও বন্ধ হয়ে যায়।

আদালতে নিবন্ধন অবৈধ ঘোষিত হওয়ায় জামায়াত দশম সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ বিবেচিত হয়নি। পাশাপাশি স্থানীয় সরকারের কোনো নির্বাচনেও দলীয়ভাবে অংশ নিতে পারেননি জামায়াত নেতারা।

এরপর সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী ২০১৭ সালের মার্চে জামায়াতের জন্য বরাদ্দ মার্কা দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে গেজেট জারি করে নির্বাচন কমিশন।  

বর্তমানে নির্বাচন কমিশনে ৩৯টি নিবন্ধিত দল রয়েছে। আর সংসদ নির্বাচনের জন্য সংরক্ষিত প্রতীক রয়েছে ৬৪টি।

এক নজরে জামায়াতে ইসলামী

জামায়াতে ইসলামীর সূচনা হয় উপমহাদেশের বিতর্কিত ধর্মীয় রাজনীতিক আবুল আলা মওদুদীর নেতৃত্বে ১৯৪১ সালের ২৬ অগাস্ট, তখন এর নাম ছিল জামায়াতে ইসলামী হিন্দ।

পাকিস্তানের স্বাধীনতার পর মুসলিম পারিবারিক আইনের বিরোধিতা করায় ১৯৬৪ সালে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হলেও পরে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলন যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখন ১১ দফাসহ বিভিন্ন দাবির বিরোধিতা করে জামায়াত। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সহায়তা করতে রাজাকার, আলবদর, আলশামস্ নামে বিভিন্ন দল গঠন করে জামায়াত ও এর তখনকার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘ।

সে সময় তারা সারা দেশে ব্যাপক হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাটের মতো যুদ্ধাপরাধ ঘটায়। আদালতে ঘোষিত যুদ্ধাপরাধ মামলার বিভিন্ন রায়ে বিষয়গুলো উঠে আসে।

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা, উস্কানি, হত্যাকাণ্ডে সায় ও সহযোগিতা দেয়ার দায়ে জামায়াতে ইসলামীর তখনকার আমির গোলাম আযমকে টানা ৯০ বছর অথবা আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া যুদ্ধাপরাধের দায়ে দলটির পাঁচ শীর্ষ নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

একাত্তরের ভূমিকার জন্য জামায়াতে ইসলামীকে ‘ক্রিমিনাল দল’ আখ্যায়িত করে একটি রায়ে বলা হয়, দেশের কোনো সংস্থার শীর্ষ পদে স্বাধীনতাবিরোধীদের থাকা উচিত নয়।

১৯৭১ সালের পর স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকায় জামায়াতও এর আওতায় পড়ে। বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর জিয়াউর রহমানের সরকার আবার জামায়াতকে রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ করে দেয়। সেই সুযোগে গোলাম আযম ১৯৭৯ সালে দেশে ফিরে দলের আমিরের দায়িত্ব নেন।

সামরিক শাসক এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে জামায়াত ১৮টি আসন পায় এবং সরকার গঠনে বিএনপিকে সমর্থন দেয়। এরপর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আসন কমে তিনটি হলেও ২০০১ সালের নির্বাচনে জামায়াত পায় ১৭ আসন। চারদলীয় জোট সরকারের মন্ত্রিসভাতেও জায়গা পান জামায়াতের শীর্ষ দুই নেতা।

একাত্তরে ন্যক্কারজনক ভূমিকার পরও খালেদা জিয়ার চার দলীয় জোট সরকারের সময়ে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দেওয়াকে লাখো শহীদের প্রতি ‘চপেটাঘাত’ হিসেবে বর্ণনা করা হয় যুদ্ধাপরাধের এক মামলার রায়ে।

সর্বশেষ ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে দুটি আসন পায় জামায়াতে ইসলামী। এরপর তারা আর ভোট করতে পারেনি।