Published : 31 Dec 2025, 08:49 PM
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যু সংবাদ শুনে তার জানাজায় অংশ নিতে বুধবার সকালে ১৩ জন মিলে মাইক্রোবাস ভাড়া করে ঢাকায় আসেন নেত্রকোণা সদর উপজেলার আব্দুল্লাহ, সাইফুল ও মনির মিয়া।
তাদের মত বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মানুষের ভিড়ে বুধবার দুপুরে মানিক মিয়া এভিনিউ জনসমুদ্রে পরিণত হয়। বিএনপির কর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এসেছিলেন ‘প্রিয় নেত্রীর’ জানাজায় যোগ দিতে।
আগের দিন ভোর ৬টার দিকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে মারা যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ‘আপসহীন নেত্রী’ অভিধা পাওয়া এই রাজনীতিবিদ বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন ৪১ বছর।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বুধবার ছিল সাধারণ ছুটি, সেই সঙ্গে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন চলছে। রাষ্ট্রীয় মার্যাদায় খালেদা জিয়াকে দাফন করা হয়েছে জিয়া উদ্যানে, তার স্বামী প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পাশে।

এদিন বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষের ঢল নামে।
সংসদ ভবন প্রাঙ্গণের খোলা মাঠ ও রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র মানিক মিয়া এভিনিউতে জানাজার মূল স্থান হলেও মানুষের ভিড় ফার্মগেইট, কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি মোড় ছাড়িয়ে যায়।
সড়কে তিল ধরনের ঠাঁই না থাকায় বিভিন্ন ভবনের ছাদে দাঁড়িয়ে জানাজায় অংশ নেন অনেকে।
অন্যদিকে আসাদ গেইট, সোবহানবাগ থেকে মানুষের সমুদ্র চলে যায় শুক্রাবাদ ছাড়িয়ে পান্থপথের মোড় পর্যরন্ত।
জন জোয়ারের এই জানাজায় অংশ নিতে আগে ভাগেই নেত্রকোণা থেকে রওয়ানা দিয়েছিলেন আব্দুল্লাহ-মনির মিয়ারা।
বেলা ১১টায় তাদের মাইক্রোবাস ফার্মগেইট মোড়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সামনে রেখে পায়ে হেঁটে চলে যান সংসদ ভবনের খেজুর বাগান ফটকে। তখনো ফটক খোলা হয়নি সর্বসাধারনের জন্য।
কিছু সময় পর প্রবেশ পথ সবার জন্য উন্মুক্ত হলে দক্ষিণ প্লাজার সামনের খোলা ময়দানে চলে যান তারা। জানাজা শেষে জিয়া উদ্যানের পাশে উড়োজাহাজ মোড়ে কথা হয় তাদের সঙ্গে।
গত বছরে মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফেরা আব্দুল্লাহ বলেন, “আমার বয়স তিরিশ বছর, যখন থেকে বুঝতে শিখেছি তার পুরোটা সময় দেখছি খালেদা জিয়া লড়াই সংগ্রাম করেছেন, তার উপর অনেক নির্যাতন হয়েছে। এতকিছুর পরও তার মুখ থেকে কেনো খারাপ কথা শুনি নাই। এই গুণ দেখে আমি বিএনপি সমর্থন করি।
“গত বছরের জুলাইয়ের পর তো সবাই কথা বলতে পারছে। আমি পারছি, আপনি পরাতাছেন। এখন তো সুসময় ছিল তার, সু-সময়ে তিনি চলে গেলেন। হায়াত-মউত তো আর বাইন্দা রাখা যাবে না।’’
দল বেঁধে আসা ১৩ জনের কেউ বিএনপি বা দলটির কোনো অঙ্গ সংগঠনের কর্মী বা সদস্য নন। দলীয় পদ পদবীও নেই।

ঢাকায় আসতে গাড়ি ভাড়ার টাকা ১৩ জনই সমান ভাগে ভাগ করে দিয়েছেন। কারো কাছ থেকে চাঁদা বা অনুদান নেননি জানিয়ে মনির মিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি গেরস্ত (গৃহস্থ) মানুষ। আমাগো তো টাকা কম। সবাই মিলে টাকা দিয়ে গাড়ি ভাড়া দিয়েছি।’’
সকাল ৭টায় নেত্রকোণা সদর থেকে রওয়ানা দিয়ে চার ঘণ্টায় ঢাকায় পৌঁছান তারা।
এই দলের সদস্য সাইফুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দ্যাশের জন্য তার (খালেদা জিয়া) যে টান, তা বলে বুঝানো যাবে না। একজন ভালো নেত্রী ছিলেন, দ্যাশের জন্য জীবন দিয়ে দিল-তবুও বিদেশে গিয়ে থাকলেন না।
“তার একটা ভিডিও মারা যাওয়ার পর থেকে বার বার দেখি। তিনি বলেছেন, তার বিদেশে কোনো ঠিকানা নেই, দ্যাশেই সব। তার মতো কেউ (রাজনীতিবিদ) তো দ্যাশকে ভালোবাসলো না। তার জানাজায় আসতে আজকে কামাই দিলাম (কাজে যাননি)।”
সেনা জীবন থেকে ক্যাপ্টেন পদবী নিয়ে অবসরে যাওয়া দিলদার হোসেন ঢাকার শাহীনবাগে থাকেন। জানাজায় আসার কারণ জানতে চাইলে বললেন, “খালেদা জিয়া আমার চেয়ে বছর দুয়েক বড়। আমার জন্ম ১৯৪৭ সালে তার (খালেদা জিয়া) ১৯৪৫ সালে।
“আমিও সেই পথেই (মৃত্যুর পথে) যাবো। এজন্য তার জন্য দোয়া করতে আসলাম। শহীদ জিয়া দেশপ্রেমিক ছিলেন, তিনিও (খালেদা জিয়া) দেশের জন্য কাজ করেছেন রাজনীতিতে। তার জন্য দোয়া করাটা উচিত।’’

রাজধানীর কচুক্ষেত এলাকার বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত ওয়ারেন্ট অফিসার রবিউল হক জানাজা শেষে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ঢাকায় থাকি, জীবনেও তার (খালেদা জিয়া) মুখ থেকে কোনো কটু কথা শুনিনি। জীবন চলে যায়-যায়, তবু দেশের বিরুদ্ধে কোনো কাজ করেননি, যারা করেছেন তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন।
“তার মত নেত্রী অনেক লাগবে আমাদের। কিন্তু একজনই পেলাম। তিনি মারা যাওয়ায় দেশের অনেক ক্ষতি হয়ে গেল। এখন দেশের যে কী হবে?”
খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে পাবনা থেকে ঢাকায় এসেছেন তরুণ আব্দুল ওয়াহাব। খামার বাড়ি মোড়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বললেন, “খালেদা জিয়া হলেন মা-মাটি ও দেশের নেত্রী। তাকে ভালোবেসে দল করি। নিজের টাকা খরচ করে ঢাকায় আসছি সকালে। জানাজা পড়তে ঢাকায় এসেই সংসদের গেটে গেছি।
“আমি যখন যাই তখনো গেট খোলেনি। খোলার পর প্রথম যারা ঢুকেছে, আমি তাদের মধ্যে ছিলাম। আমি যুবদলের সদস্য, কোনো পদে বা কমিটিতে নাই, কোনো পদ লাগবেও না। এখন বিএনপি তার মত (খালেদা জিয়া) চললে আজীবন সর্মন দেব ।”

খালেদা জিয়ার ‘আপসহীন’ মনোভাব এবং প্রতিকূল পরিবেশেও দেশ ছেড়ে না যাওয়ার বিষয়টিকে অনেক ‘বড় ঘটনা’ হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ী জোবায়ের হোসেন।
রাজধানীর বঙ্গবাজার থেকে জানাজায় অংশ নিতে ফার্মগেইট আসার পর আর সামনে যেতে পারেননি। অন্যদের সঙ্গে কাতার বেঁধে তেজগাঁও সরকারি কালেজের সামনে দাঁড়িয়ে জানাজার নামাজ পড়েন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জোবায়ের বলেন, “আমি তো ঢাকায় থাকি। কোনো দল করি না, কাজ করি, খাই। খালেদা জিয়ার উপর কত যে অত্যাচার হইছে তা তো টিভি-মিডিয়াতে দেখছি। সে তো কারো সঙ্গে আপস করে নাই। তার মত ভালো নেত্রীর জানাজায় আসতে পারা সৌভাগ্য বলে মনে করি।”
শুধু জানাজায় অংশ নিতেই বাসা থেকে বেরিয়েছেন রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা মোহাম্মদ টিটু মুন্সি।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “বিভিন্ন অফিসে ইলেকট্রিক মাল সপ্লাইয়ের কাজ করি। সরকারি বন্ধ পাইলে সারাটা দিন বাসায় রেস্ট (বিশ্রাম) নেই।
‘‘কিন্তু খালেদা জিয়ার জানাজায় না আসলে নিজেরে বেঈমান মনে হত। তিনি দেশের জন্য কত কাজ করলেন, আর আমি ঢাকায় থাইক্কা তার জানাজায় আসুম না? এইটা হয় না।”