Published : 28 Jun 2026, 07:49 PM
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পাওয়া মো. সাহাবুদ্দিনের এই পদে থাকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য এ টি এম আজহারুল ইসলাম।
তিনি বলেন, “এত বড় বিএনপির দল, তাকে এত পছন্দ হয় কেন? তাহলে কি কোথাও থেকে ইঙ্গিত পেয়েছেন, তাকে রাখতে হবে। আমরা জানি না। জনগণের কাছে আপনারা খোলসা করুন।”
রোববার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর এই নায়েবে আমির এসব কথা বলেন।
রংপুর থেকে নির্বাচিত এমপি আজহার বলেন, “চার মাস আপনারা একজন লোক খুঁজে পেলেন না যে সে প্রেসিডেন্ট কে হবে? আপনার ফ্যাসিস্ট সরকারের লোক পছন্দ হয়, তাকেই রাখার চেষ্টা করতেছেন। এত বড় বিএনপির দল, তাকে এত পছন্দ হয় কেন?”
সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, “ফ্যাসিস্ট যদি নির্মূল করতে চান, ফ্যাসিস্টের সবকিছুর চিহ্ন মুছে ফেলুন। প্রথম পদক্ষেপ প্রেসিডেন্টকে… আপনাদের দলের প্রেসিডেন্টকে আপনারা নিজেরা ঠিক করুন।”
জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়েও সংসদে প্রশ্ন তুলেছেন আজহারুল ইসলাম।
রংপুর-২ আসনের এই সংসদ সদস্যের দাবি, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মোহাম্মদ কামারুজ্জামান, আবদুল কাদের মোল্লা ও মীর কাসেম আলীকে ‘মিথ্যা ও অসত্য মামলা সাজিয়ে’ হত্যা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি যাদের হাত ধরে আমি আমার দলের কাজ শুরু করি, সেই দলের নেতা মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মোহাম্মদ কামারুজ্জামান, আবদুল কাদের মোল্লা, মীর কাসেম আলী; তাদের অন্যায়ভাবে মিথ্যা অসত্য মামলা সাজিয়ে জুডিশিয়াল কিলিংয়ের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে।”
এ ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে এই জামায়াত নেতা বলেন, “যারা এই কাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, আজকে আপনাদের সামনে আমি দাবি জানাতে চাই, যারা যেভাবে যতজন জড়িত আছেন, তাদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হোক। তাহলে আইনের শাসন কায়েম হবে।”
জামায়াতের আরও ছয় কেন্দ্রীয় নেতাকে ‘বিনা চিকিৎসায়’ কারাগারে হত্যা করা হয়েছে বলেও দাবি করেন এমপি আজহার।
তিনি বলেন, “শুধু জামায়াতে ইসলামীর এই পাঁচজনকেই নাটক সাজিয়ে ফাঁসির মাধ্যমে হত্যা করা হয়নি। আমাদের আরও ছয়জন কেন্দ্রীয় নেতাকে বিনা চিকিৎসায় জেলখানায় হত্যা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মুফাসসিরে কোরআন হযরত মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সাহেবও ছিলেন।”
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের কয়েকজনের বিচার করা হয় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে।
বিচারে জামায়াতের পাঁচজন নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয় সাঈদীসহ কয়েকজনকে।
আজহারুল ইসলাম নিজেও ওই মামলায় মৃত্যুদণ্ড পেয়েছিলেন; পরে আপিল বিভাগ তাকে খালাস দেয়। মুক্তির পর ২০২৬ সালে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ফিরে তিনি দলটির এক নম্বর নায়েবে আমির হন।

‘জামায়াত নিষিদ্ধ হলে শূন্যস্থান পূরণ করবে কে’
জামায়াত নিষিদ্ধ করার আলোচনা নিয়েও সংসদে প্রশ্ন তোলেন জামায়াতে ইসলামীর নেতা আজহার।
তিনি বলেন, “জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার কথা বলেছেন। আমি শুধু একটা কথা বলতেছি, নিষিদ্ধের মাধ্যমে ধরলাম আমরা নিষিদ্ধ হয়ে গেলাম, এই শূন্যস্থান পূরণ করবে কে? আপনারা কি একাই দেশ চালাবেন? আপনারা কি একদলীয় শাসন কায়েম করবেন?”
জামায়াত নিষিদ্ধের আলোচনার পেছনে আওয়ামী লীগকে ‘পুনর্বাসনের’ চেষ্টা আছে কি না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
“এটা কে পূরণ করবে? আপনারা কি আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করতে চাচ্ছেন? আমি কি মনে করি, আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করতে চাচ্ছেন।”
সুদের বিকল্পে সুকুকের প্রস্তাব
সুদভিত্তিক ঋণের বিকল্প হিসেবে ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক ‘রিটেইল সুকুক’ চালুর প্রস্তাব দেন বিরোধী দলের এই সদস্য।
তিনি বলেন, “সুদ একটি বড় পাপ। ইতিমধ্যেই শুনেছেন আপনারা। এই সুদে জর্জরিত আছে বাংলাদেশের জনগণ। বাংলাদেশ ৯২ ভাগ মুসলিম দেশ, সুদ আমরা চলতে দিতে পারি না।”
দুর্নীতিকে বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে তুলে ধরেন জামায়াত নেতা আজহার।
তিনি বলেন, “বিগত ৫৪ বছর দেখেছি, যত সুন্দর কথার ফুলঝুরি হোক না কেন, যত বড় বাজেট হোক না কেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা দুর্নীতি, দুর্নীতি এবং দুর্নীতি।”
সংসদ সদস্যদের দুর্নীতিবিরোধী শপথ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে এমপি আজহার বলেন, “আজকে ৩৪৮ জন এমপি একযোগে যদি আমরা শপথ করি, একটি টাকার দুর্নীতি আমরা করব না, তাহলে দুর্নীতি বাংলাদেশ থেকে উৎখাত হবে ইনশাআল্লাহ।”
নিজ নির্বাচনী এলাকার কথা তুলে ধরে রংপুর অঞ্চলে তিস্তা ব্যারেজ দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান তিনি। এছাড়া ঢাকায় নারী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানান জামায়াতের এই সংসদ সদস্য।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি
রাজনৈতিক সংস্কার নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন জামায়াতের এই সংসদ সদস্য।
তার অভিযোগ, নির্বাচনের আগে গণভোট ও সংবিধান সংস্কারের পক্ষে প্রচারণা চালানো হলেও সরকারে এসে তা বাস্তবায়ন করা হয়নি।
“আপনারা এমপি হওয়ার শপথটা গ্রহণ করলেন, কিন্তু সংবিধান সংস্কারের শপথটা গ্রহণ করলেন না। তখন দেখেই তো আপনাদের সম্পর্কে জনগণের মধ্যে একটা ভুল সৃষ্টি হয়েছে।”
জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হলে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হবে বলে সতর্ক করেন আজহার।
তিনি বলেন, “জনগণের ৭০ ভাগ জনগণের যে আকাঙ্ক্ষা, চাহিদা, যে দাবি; যারা দেশকে পরিবর্তন করবে, নতুনভাবে দেশ এগিয়ে যাবে, সেই আকাঙ্ক্ষা যদি আপনারা পূরণ করতে না পারেন, স্বাভাবিকভাবে দেশে রাজনৈতিক স্থিতি থাকবে না, রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হবে।”
ইতোমধ্যে গণভোটের রায় মেনে সংস্কার বাস্তবায়নের দাবিতে মাঠে নেমেছে জামায়াতে ইসলামী ও তার নেতৃত্বাধীন জোট।
সংসদের মধ্যেই সংস্কার প্রশ্নের ফয়সালা করার আহ্বান জানিয়ে দলটির নেতা আজহার বলেন, “যে বিষয়টা সংসদের মধ্যে ফয়সালা হওয়া উচিত, সেই বিষয়টা সংসদের বাইরে নিয়ে যাবেন না। দেশের জন্য, আপনাদের জন্য, কারো জন্য ভালো হবে না।”

‘জুলাই চেতনা যেন আমলা, এমপি, মন্ত্রীর কারণে নষ্ট না হয়’
জুলাই আন্দোলনের চেতনা যেন কোনো আমলা, সংসদ সদস্য বা মন্ত্রীর কারণে নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান।
প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে আলোচনাকালে লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে বিএনপির এই সংসদ সদস্য বলেন, জুলাই যোদ্ধাদের সম্মান করা শুধু ভাতা বা ঘোষণার মধ্যে সীমিত থাকলে চলবে না। প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও সেই চেতনার প্রতিফলন থাকতে হবে।
জুলাই আন্দোলনের চেতনা রক্ষার আহ্বান জানিয়ে নিজান বলেন, “যেমন আমরা একাত্তরকে বুকে লালন করতে পারিনি, ধারণ করতে পারিনি, বারবার মিথ্যা চেতনার কথা বলেছি, কোনোক্রমে এই জুলাইয়ের চেতনা যেন কোনো আমলা হোক, এমপি হোক, মন্ত্রী হোক, কারো কারণে নষ্ট না হয়।”
সংসদের বাজেট আলোচনা নিয়ে তিনি বলেন, “আমি কখনো দেখি নাই সরকারি দল, বিরোধী দল এত গঠনমূলক আলোচনা করতে।”
আন্দোলন-সংগ্রামে সহায়তা করা বুদ্ধিজীবী, মানবাধিকারকর্মী ও অ্যাকটিভিস্টদের মূল্যায়নের আহ্বানও জানান তিনি।
নিজান বলেন, “আওয়ামী বুদ্ধিজীবীরা কোথায়? আপনারা কী মনে করেন উনারা চলে গেছেন? উনারা কিন্তু উনাদের মনোজগতে এখনো সেই কথাই আছে।”
যারা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও টেলিভিশনে কথা বলেছেন, বক্তৃতা করেছেন, সেমিনারে গেছেন, তাদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বসার সুযোগ করে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
১৭ বছরের আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত নেতাকর্মীদের জন্য প্রকল্প নেওয়ার দাবিও জানান তিনি।