Published : 26 Aug 2025, 06:45 PM
রাজনৈতিক দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সন্ত্রাসের আখড়ায় পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার।
তিনি বলেছেন, “আমরা বলছি যে, তাদের অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন বিলুপ্ত করার কথা। কারণ অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন থেকে আমাদের শিক্ষাঙ্গনগুলো- সেই সন্ত্রাসের আখড়ায় পরিণত হয়েছে এবং আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করেছে এবং এটা আমাদের বর্তমানে আরপিওতে আছে।
“এটা আমরা ২০০৭-এ অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম, আরপিওতে আছে যে- দলের গঠনতন্ত্রে অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বিধান থাকবে না। কিন্তু দলগুলো যেটা করেছে, তাদের গঠনতন্ত্র থেকে এটা বাদ দিয়েছে; কিন্তু ওই সংগঠনগুলো একই কাজ করছে ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠনের নামে। যদিও আকাঙ্ক্ষা ছিল- এই সকল প্রতিষ্ঠানগুলো, এই সকল অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলো বিলুপ্ত করা। রাজনৈতিক দলগুলোকে এগুলো করতে হবে।”
মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘প্রস্তাবিত জুলাই জাতীয় সনদ ও নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক নাগরিক সংলাপে তিনি এ মন্তব্য করেন।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “আমরা যদি দেশে গণতন্ত্র চাই, রাজনৈতিক দলের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমরা নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে বলেছি- প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দলের প্রত্যেকটা কমিটি নির্বাচিত হবে তাদের সদস্যদের ভোটে। কিন্তু এই ব্যাপারে কোনো আমরা উদ্যোগ দেখতে পাচ্ছি না।
“তারপরে আমরা বলেছি রাজনৈতিক দলের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। আর্থিক স্বচ্ছতা- রাজনৈতিক দলে কোথা থেকে অর্থকড়ি পাচ্ছে এবং কীভাবে খরচ করছে, এগুলো যেন ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে খরচ হয় এবং ব্যাংক চ্যানেলের মাধ্যমে এটা এগুলো গ্রহণ করা হয়। এরপরে কোনো উদ্যোগ দেখছি না।”
দলীয় মনোয়ন পদ্ধতিতে সংস্কার আনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা প্রস্তাব করেছি যে, ভবিষ্যতে যখন নির্বাচন হবে, তখন রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে মনোনয়ন দেবে। তাদের সদস্যরাই প্যানেল তৈরি করবে। সেই প্যানেল থেকে কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ড মনোনয়ন দেবে।
“রাজনৈতিক দলগুলোর এখন চর্চার সময় এসেছে, কিছু পরে চর্চা করতে হবে, কিছু এখন চর্চা শুরু করতে হবে।”
এসব সংস্কার প্রস্তাবের বিষয়ে জনসমর্থনর আছে মন্তব্য করে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “আমরা যে জরিপটা করেছি, আমরা ৪০টা বিষয়ে জরিপ করেছি। আমরা ঐকমত্য কমিশনের এই জাতীয় সনদ প্রণীত হওয়ার আগে- আমরা ২০১৩ সাল থেকে আমরা একটা জাতীয় সনদ প্রণয়নের প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছিলাম।
“এই নিয়ে আমরা বহু কাঠখড় পুড়িয়েছি। তো আমরা এই ঐকমত্য কমিশনের কাজকে সহায়তা করার জন্য সুজনের পক্ষ থেকে একটা সনদের খসড়া তৈরি করা হয়েছে।”
৪০টি বিষয়ে সুজনের তরফে জনমত জরিপ করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “প্রায় ১৪০০ ব্যক্তি এই জনমতে অংশ নিয়েছে এবং আপনারা দেখেছেন যে- এই অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যাপক সমর্থন আছে, যেমন- সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির পক্ষে সমর্থন আছে, তারপরে দুই কক্ষ বিশিষ্ট সংসদের পক্ষে সমর্থন আছে, প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন করার এবং ওই যে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ মুক্ত করার- এগুলোর ব্যাপারে ব্যাপক সমর্থন আছে।
“তারপরে এই যে প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় লাগাম টানা- এই ব্যাপারে সমর্থন আছে। তো এইরকম অনেকগুলো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের সংস্কারের ব্যাপারে সমর্থন আছে। নির্বাচনি সংস্কারের অগ্রাধিকারের ব্যাপারে সমর্থন আছে।”
‘তারাও দানবে পরিণত হবে’
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “আমরা সবাই যদি আমাদের করণীয় করি, তাহলে কিন্তু এগুলোর অধিকাংশ না হলেও অনেকগুলো বাস্তবায়িত হওয়ার পথ সুগম হবে। এখন আমরা মনে করি, রাজনৈতিক দলগুলো যদি এ ব্যাপারে কর্ণপাত না করে, তাহলে কিন্তু এর মাশুল তাদের দিতে হবে।
“এই যে আমাদের স্বৈরাচারী সরকার, তাদের মাশুল দিতে হয়েছে না? অবশ্য অনেক রক্তের বিনিময়ে, অনেক প্রাণের বিনিময়ে তারা বিতাড়িত হয়েছে। তো আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো যদি ডিসেন্ট দিয়ে পার হয়ে যেতে চায়, যদি বলে যে- ‘আমরা সংসদে গিয়ে করব, না হয় করব না, সেই সিদ্ধান্ত আমরা তখন নেব’। তাহলে কিন্তু এর হয়তো একটা মূল্য দিতে হতে পারে।”
তিনি বলেন, “তাদের ইতিহাস থেকে শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে, কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো, ইতিহাসের শিক্ষা হলো- কেউ ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে না। আর তাদেরকে বুঝতে হবে যে, যে পথে শেখ হাসিনা স্বৈরাচার হয়েছে, যে পদ্ধতি, প্রতিষ্ঠান এবং প্রক্রিয়া- যে আইনি কাঠামো, যেগুলোর ওপর ভিত্তি করে শেখ হাসিনা স্বৈরাচারে পরিণত হয়েছে, দানবে পরিণত হয়েছে।
“সেই পথ ধরে আমাদের যারা ক্ষমতায় যাবে, তারাও যদি আবার অগ্রসর হয়- তারাও দানবে পরিণত হবে।
এবং সেই পুরানো পথ ধরে নতুন গন্তব্যে পৌঁছা যাবে না। আমি মনে করি, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো এর থেকে শিক্ষা শিক্ষা গ্রহণ করবে।”
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বলেন, “আমাদের সাংবিধানিক কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল- মৌলিক অধিকার। এই মৌলিক অধিকার- আমরা যেই আদিম যুগে- আমরা কিন্তু মানুষ সেই স্বাধীনভাবে বাস করেছে। কিন্তু তখন হানাহানি-মারামারি হতো, সেটা থেকে উত্তরণ ঘটানোর জন্য রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়।
“এবং মানুষ তাদের অনেকগুলো অধিকার সারেন্ডার করে, কিন্তু ওই সারেন্ডার করা অধিকারগুলোতেই রাষ্ট্র সীমাবদ্ধ থাকেনি। রাষ্ট্র- সব অধিকার কুক্ষিগত করার চেষ্টা করেছে। এজন্য রুসোর কথা যে- ‘ম্যান ইজ বর্ন ফ্রি, বাট এভরিহয়্যার হি ইজ ইন চেইনস’।”
রাষ্ট্র জনগণের ক্ষমতা ক্রমাগতভাবে কুক্ষিগত করেছে মন্তব্য করে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “কারণ ক্ষমতার বৈশিষ্ট্য হল যে- ক্ষমতা যেখানে, সেটাই কুক্ষিগত হয়। আর সেটাই অপব্যবহার। রাষ্ট্র সব ক্ষমতা নিয়ে আমাদেরকে বঞ্চিত করেছে।
“একটা সাংবিধানিক কাঠামো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত- নাগরিকের এই অধিকারগুলো, স্বাধীনতাগুলো- আরো সম্প্রসারিত করা এবং শর্তহীন করা।
তিনি বলেন, “এগুলোর পাহারা দেওয়ার জন্য কতগুলো প্রতিষ্ঠান করা হয়- এই যে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান এবং ক্ষমতার ভারসাম্য সৃষ্টি করা হয়- যাতে নাগরিকের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই আমরা যেটা করার চেষ্টা করেছি- প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন করার এবং ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করার কতগুলো কাঠামোগত সংস্কার এবং কতগুলো প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করার আমরা প্রস্তাব করেছি।”
সুজনের জাতীয় কমিটির সদস্য একরাম হোসেন মূল প্রবন্ধে বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপের মধ্য দিয়ে প্রণীত জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু এর সার্থকতা নির্ভরতা করবে বাস্তবায়নের ওপর, যা নিয়ে দলগুলোর মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ ব্যাপারে চারটি বিকল্পের প্রস্তাব সামনে এসেছে।
ক. জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে জুলাই জাতীয় সনদ বা সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন প্রশ্নে গণভোট করা।
খ. আইনবিধিসংক্রান্ত প্রভাবগুলো অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা এবং সংবিধানসংক্রান্ত সংস্কার প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন আগামী জাতীয় সংসদের মাধ্যমে করা।
গ. গণজোটি বা রাষ্ট্রপতির প্রোক্লেমেশনের মাধ্যমে সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করা,
ঘ. গণপরিষদ ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন একই সঙ্গে করে প্রথমে গণপরিষদের মাধ্যমে সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করা।
তিনি বলেন, “জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা আশা করি, এ বিষয়ে দ্রুতই একটি সমাধানে পৌঁছাবে ঐকমত্য কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলো।
“আমরা মনে করি, সংস্কারের কোনোগুলো সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে, কোনোগুলো অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে, কোনোগুলো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বাস্তবায়ন করা হবে এবং এর মধ্যে কোনগুলো আশু বাস্তবায়নযোগ্য তা আলাদা করা দরকার।”
সুজনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বিচারপতি এম এ মতিনের সভাপতিত্বে সংলাপে অংশ নেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (জাতীয় ঐকমত্য) মনির হায়দার, সাবেক কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী, সাংবাদিক সোহরাব হাসান।