Published : 31 Jul 2025, 08:41 PM
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন সংগ্রামে নারীদের স্বজন হারানোর প্রসঙ্গ টেনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘ফ্যাসিবাদ’ বিরোধী আন্দোলনে তার মাও ‘এক সন্তানকে হারিয়েছেন’।
বৃহস্পতিবার বিকালে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের আয়োজিত এক আলোচনা সভায় লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি বলেন, “বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় অনেক মা তার প্রিয় সন্তান হারিয়েছেন। আমার মাও তার এক সন্তানকে (আরাফাত রহমান কোকো) হারিয়েছেন আপনাদেরই মত।”
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে মালয়েশিয়ায় মারা যান।
মুদ্রা পাচারের মামলায় ছয় বছর কারাদণ্ডের সাজাপ্রাপ্ত ছিলেন তিনি।
জরুরি অবস্থার সময় গ্রেপ্তার আরাফাত ২০০৮ সালের ১৭ জুলাই তৎকালীন সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নির্বাহী আদেশে মুক্তি পাওয়ার পর চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড গিয়েছিলেন।
তারপর তিনি ব্যাংকক থেকে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান বলে ২০১১ সালে সাংবাদিকদের জিজ্ঞাসায় জানিয়েছিলেন ঢাকায় থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত।
আরাফাত রহমান যখন মারা যান সে সময় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ছিলেন।
বিএনপি-জামায়াতসহ বেশির দল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন বর্জন করেছিল, যে নির্বানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ টানা দ্বিতীয় বারের মত ক্ষমতায় আসে।
আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে সরকারবিরোধী আন্দোলনে দমন-পীড়নের প্রসঙ্গে টেনে তারেক রহমান বলেন, “বহু স্ত্রী তার প্রিয়তম স্বামীকে হারিয়েছেন, বোন তার ভাইকে হারিয়েছেন, অনেক মা বহুভাবে নির্যাতিত-নিপীড়িত হয়েছেন। অনেক পরিবারের পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে।

“আজও শহীদ আর স্বজন হারানোর অসংখ্য মা বোনের শেষ পর্যন্ত ফ্যাসিবাদ অবসানের পর আমাদের সবার সামনে শিশু-নারী-পুরুষ-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একটি মানবিক বাংলাদেশ গঠনের সুযোগ সামনে এসেছে।
“এই যে যেই সুযোগটি এসেছে আমাদের সামনে, একে কাজে লাগিয়ে শহীদদের কাঙ্খিত বাংলাদেশ গঠনের জন্য, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আগামী দিন নারীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
গত বছরের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে চলে যান।
এরপর দেশের হাল ধরা অন্তর্বর্তী সরকার গণতান্ত্রিক উত্তরণে রাষ্ট্রসংস্কারের উদ্যোগ নেয়, যা ‘জাতীয় সনদ’ গ্রহণের মধ্য দিয়ে শেষ হবে।
এর মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়েও আলোচনা চলছে।
আগামী জাতীয় সংসদের নির্বাচনকে ‘প্রতিটি নাগরিকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, “একজন মায়ের চোখে যেমন বাংলাদেশ হওয়া দরকার তেমন একটি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে আগামী জাতীয় নির্বাচন দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
“দেশে যাতে আর কোনোভাবেই আর কোনোদিন ফ্যাসিবাদ উগ্রবাদ, চরমপন্থা মাথা চারা দিয়ে উঠতে না পারে এ ব্যাপারে বিশেষ করে নারী সমাজকে অত্যন্ত সতর্ক এবং সজাগ থাকতে হবে এবং সতর্ক এবং সজাগ থাকার জন্য আমি সমগ্র বাংলাদেশের মা-বোনদেরকে আহ্বান জানাই।”
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলনায়তনে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের উদ্যোগে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ‘ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে নারীর অবদান শীর্ষক’ এই আলোচনা সভা হয়।
আলোচনায় শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন মহিলা দলের সভানেত্রী আফরোজা আব্বাস।
অনুষ্ঠানে একটি তথ্য চিত্র প্রদর্শন করা হয় এবং পরে ‘শহীদ’ পরিবারের সদস্যদের সন্মাননা মেডেল দেয় আয়োজক কমিটি।
‘পরিবারের নারী প্রধানদের নামে হবে ফ্যামিলি কার্ড’
তারেক রহমান, “বাংলাদেশে পরিবার হিসেবে যদি আমরা চিন্তা করি, তাহলে পরিবারের সংখ্যা প্রায় চার কোটি। এর মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারগুলোর মধ্যে থেকে আমরা যেটা পরিকল্পনা করছি, সামনের দিনগুলোতে বাস্তবায়নের সুযোগ এলে, প্রথম পর্যায়ে কমপক্ষে ৫০ লক্ষ প্রান্তিক পর্যায়ে যে পরিবার আছে তাদের জন্য আমরা ফ্যামিলি কার্ড চালু করব।”
আগামী সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করলে পরিবারের নারী প্রধানের নামে এই ‘ফ্যামিলি কার্ড’ করবেন তুলে ধরে তিনি বলেন, “এর লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য হচ্ছে, প্রান্তিক পরিবারগুলোকে প্রতি মাসে রাষ্ট্রীয়ভাবে আর্থিক অথবা প্রয়োজনীয় খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হবে। আমরা আশা করছি এই ধরনের উদ্যোগে পরিবার এবং সমাজে একদিকে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ঘটবে। অপরদিকে পরিবারগুলোর সামনে ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার সুযোগও তৈরি হবে।”
‘নারী উন্নয়নে বিএনপি’
নারীদের উন্নয়নে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধান খালেদা জিয়ার নানা পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন তারেক রহমান।
তিনি বলেন, “বিএনপি বিশ্বাস করে, দেশের অর্ধেক সংখ্যক নারীকে রাষ্ট্র এবং রাজনীতির মূল ধারার বাইরে রেখে কখনোই আমরা নিরাপদ বাংলাদেশ গঠন করতে পারবো না, নিরাপদ বাংলাদেশ গঠন করা সম্ভব নয়।
“নারী শক্তিকে কর্মপরিকল্পনার বাইরে রেখে কখনোই কোনো রাষ্ট্রেই শুধু বাংলাদেশ নয় কোন রাষ্ট্রই এগিয়ে যেতে পারে না এবং সে কারণে নারী শক্তিকে প্রাধান্য দিয়ে দেশের অর্ধেক সংখ্যক নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাদের আশা আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে বিএনপি দিনের সকল কর্মপরিকল্পনা সাজিয়েছে বা গ্রহণ করছে।”
বিশ্বায়নের এই সময়ে নারীদের জন্য শিক্ষা ও চাকরিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে তিনি বলেন, “শুধু নারী পুরুষ ভেদাভেদ না করে সবাইকে শিক্ষা-দীক্ষায় কর্মদক্ষ করে গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি, যদি আমরা দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।”
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আফরোজা খান রিতা।
মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হেলেন জেরিন খানের সঞ্চালনায় সভায় রক্তব্য রাখেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান, সেলিমা রহমান, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির সহসভাপতি তানিয়া রব, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য অধ্যাপক তাজমেরী এস এ ইসলাম, তাহসিনা রুশদীর লুনা, স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক শিরিন সুলতানা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক শামীমা সুলতানা, শহীদ পরিবারের মধ্যে সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন সানজিদা ইসলাম তুলি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জনপ্রিয় টকশো উপস্থাপক হাসিনা আখতার।