Published : 01 Dec 2025, 08:33 PM
ইউনিসেফের প্রণয়ন করা শিশু অধিকার বিষয়ক ১০টি অগ্রাধিকারের ইশতেহারে স্বাক্ষর করেছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ দেশের ১২টি রাজনৈতিক দল।
সোমবার রাজধানীর চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহার স্বাক্ষরের এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
এখানে জামায়াতে ইসলামী, খেলাফতে মজলিসের মত ইসলামী দলগুলোর নেতাদের পাশে দাঁড়িয়ে একই ইশতেহারে স্বাক্ষর করেন সিপিবি, বাসদের মতে বামপন্থি দলের প্রতিনিধিরা। বিএনপি, এনসিপি, জাতীয় পার্টি, গণ অধিকার পরিষদের প্রতিনিধিরাও ছিলেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে এসে রাজনৈতিক নেতাদের কেউ কেউ তাদের ছোটবেলার কথা স্মরণ করেন। কয়েকজন শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহের মত বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতির কথা বলেন।
বাজেটে শিশুদের শিক্ষা ও সুরক্ষার জন্য বরাদ্দ বাড়ানোর বিষয়েও সম্মত হয়েছেন সবাই। আর এসব কথা যেন কেবল প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ না থাকে সে কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন বক্তাদের কয়েকজন।
ইউনিসেফের এই ইশতেহারের ১০ দফার মধ্যে রয়েছে- শিশু সুরক্ষায় ঘাটতি দূর করা, শিশুদের জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ তৈরি, সব শিশুর জন্য মানসম্মত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, শিশুদের জন্য জলবায়ু সহনশীল বাংলাদেশ, উন্নত পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, প্রতিটি শিশুর জন্য ভবিষ্যতের সুযোগ অবারিত করা, সব শিশু যেন জন্মনিবন্ধনের আওতায় আসে, কোনো শিশু যেন অদৃশ্য না থাকে, শিশুদের প্রয়োজন বিবেচনায় বাজেট এবং শিশু ও তরুণদের প্রতিশ্রুতির বিষয়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আব্দুল মঈন খান অনুষ্ঠানে বলেন, “আজকে আপনারা যে ১০টি যে বিষয় ম্যানিফেস্টোতে উল্লেখ করেছেন সেগুলো অর্জনের একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে সেটা হচ্ছে আমাদের যে সম্পদের সীমাবদ্ধতা। এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা সেই সম্পদের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে পারছি…
“আমরা এখনো জাতিসংঘ নির্ধারিত এমন একটি গ্রুপ এলডিসি… আমরা এলডিসির ভেতরেই আছি এখনো আমরা এখন উত্তরণ করতে পারিনি এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না পারছি আমি মনে করি না যে আমরা এই ১০টি বিষয়ে সবকিছু অর্জন করতে পারব।”
মঈন খান বলেন, “আমরা প্রতিজ্ঞা করতে চাই। আমরা আমাদের বিশ্বাস রাখতে চাই এবং আমাদের যে শিশুরা যারা কিছুদিন পরে এই জাতিকে পরিচালনা করবে আমরা তাদের উপরে আস্থা রাখতে চাই।”
জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন দলটির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদ। তিনি বলেন, “আমরা সন্তানদেরকে বড় করার জন্য ১০ দফা অঙ্গীকার করছি। কিন্তু আমাদের তার চেয়েও আমি মনে করি এর চেয়ে আরেকটা অঙ্গীকার যুক্ত হতে হবে। আমরা এখানে যেমন সময় দিচ্ছি আমাদের সন্তানদেরকেও কিন্তু সময় দিতে হবে।”
খেলাফত মজলিসের সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী মিনহাজুল আলমও শিশুকে সময় দেওয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে বলেন, “আমরা শুধু দারিদ্র্য দারিদ্র্য করছি। দারিদ্র্য অবশ্যই একটা বড় কারণ। লক্ষ্য করুন মা-বাবা দুইজন চাকরি করছে সন্তানটা মানুষ হচ্ছে কার কাছে… স্যরি অন্যভাবে নিবেন না।
“বাসার একজন কাজের মেয়ের কাছে। আমি এও জানি এই ঢাকা শহরে ধানমন্ডিতে থাকে ভদ্রলোর ভদ্রমহিলা খুব বড় চাকরি করেন আর তার ছোট্ট সুন্দর বাচ্চাটাকে নিয়ে বয়স্ক গৃহকর্মী মহিলাটা একটা সুপারমার্কেটে গিয়ে ভিক্ষা করে।”

তিনি বলেন, “দারিদ্র্য একা দায়ী নয়, আমাদের সম্পদ আকাঙ্ক্ষাও কোনো না কোনো ক্ষেত্রে আমাদেরকে আমাদের শিশুদের এই বিপদজনক জায়গায় নিয়ে যায়।”
জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রথম সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনীম জারা তার বক্তব্যের শুরুতেই নিজের চিকিৎসক জীবনে দেখা অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের বিষয়টি বলেন।
তিনি বলেন, “প্রায় এক দশক আগে আমি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডাক্তার হিসেবে কাজ করতাম এবং আমি শিশুদের দেখভাল করতাম। আমি তীব্র অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের দেখছিলাম, ঘরটি ছিল ছোট- খুব ভালোভাবে আলোকিত ছিল না। শিশুরা ছিল কেবলই হাড্ডিচর্মসার, যাদের কাঁদার মত যথেষ্ট শক্তি ছিল না। এটি ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে হৃদয়বিদারক জায়গাগুলোর একটি। আমি নিশ্চিত যে যারা সেখানে যাননি, তারা সেই ঘরের হতাশার মাত্রা বুঝতে পারবেন না।”
১০ দফা ইশতেহারের সাথে একমত পোষণ করে তিনি বলেন, “আমরা আজ প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, কিন্তু আমাদের অবশ্যই আমাদের তা বাস্তবে করতে হবে। বিশেষ করে আমাদের বাজেটকে প্রতিশ্রুতির সাথে মেলাতে হবে। আমাদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার একটা অংশ বিপুল পরিমাণে অপচয় এবং দুর্নীতিতে চলে যায়। সেই চক্রটি বন্ধ করা দরকার, যদি আমরা সত্যিই আমাদের শিশুদের জন্য একটি উন্নত বাংলাদেশ গড়তে চাই।”
বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, “আমাদের তরুণেরা একটি অধিকতর ন্যায্য বাংলাদেশের জন্য, নতুন আশা এবং সুযোগের জন্য পরিবর্তন চেয়েছে। তারা বিশেষ সুবিধা বা স্বার্থপর দাবি জানায়নি। তারা মর্যাদা চেয়েছে। তারা তাদের মৌলিক অধিকার চেয়েছে—শিক্ষা, মানসম্মত শিক্ষা, পুষ্টি, তাদের কমিউনিটিতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা। তারা চেয়েছে সুরক্ষা এবং স্থিতিশীলতা, যাতে তাদের সম্মান করা হয় বা রক্ষা করা হয় এবং তাদের কথা শোনা হয়।
“এই ইশতেহার রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে শিশুদের রাখতে পারা নিয়ে একটি প্রকৃত সংকল্পের বার্তা দেয়। রাজনৈতিক অঙ্গনের দলগুলি আজ কেবল স্বাক্ষর করতে নয়, বরং বাংলাদেশের শিশুদের কাছে প্রকাশ্যে তাদের প্রতিশ্রুতির বার্তা দিতে এসেছেন।”
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, গণফোরামের সেক্রেটারি মিজানুর রহমান, গণঅধিকার পরিষদের কার্যকরী কর্মপরিষদ সদস্য শাকিলুজ্জামান, গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিষদ সদস্য মনিরউদ্দিন পাপ্পু, বিজিএমইএর সহসভাপতি বিদ্যা অমৃতা খান, সিপিবির জেনারেল সেক্রেটারি আব্দুল্লাহ আল কাফি রতন, ন্যাশনাল কোঅর্ডিনেশন কমিটি ফর ওয়ার্কার্স এডুকেশন এর সদস্য সচিব নাইমুল হাসান জুয়েল, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতি বজলুর রশিদ ফিরোজ, নাগরিক ঐক্যের যৌথ মহাসচিব কবির হাসান, জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু ইউসুফ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য দেন ইউনিসেফের ইয়ুথ অ্যাডভোকেট এবং হ্যালো ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের শিশু সাংবাদিক গার্গী তনুশ্রী পাল। ইশতেহার উপস্থাপন করেন চার তরুণ- ফাহাদ রহমান অঝর, আনিকা বুশরা, সারিয়া চৌধুরী এবং নিয়ামুল ইসলাম।