Published : 18 Dec 2025, 08:05 PM
‘ক্রমাগত হুমকি ও বুলিংয়ের শিকার’ হয়ে এনসিপি নেত্রী জান্নাতারা রুমী পুলিশের কাছে অভিযোগ দিয়েও কোনো সুরাহা পাননি বলে অভিযোগ করেছেন তার দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন।
তিনি বলেছেন, “তথ্য প্রমাণসহ অভিযুক্তদের ফেইসবুক আইডি, ফোন নম্বর পুলিশের কাছে দেওয়া হলেও তারা একজনের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়নি।”
সহযোদ্ধা রুমীর মরদেহ দেখতে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে এসে সাংবাদিকদের সামনে এ বিষয়ে কথা বলেন সামান্তা। বাংলাদেশে সকল জুলাই যোদ্ধার জীবন ‘হুমকির মুখে’ মন্তব্য করে–এমন পরিস্থিতিতে কী করে নির্বাচন হবে–সেই প্রশ্ন তোলেন।
সামান্তা বলেন, “ওসমান হাদির মস্তিষ্ক ভেদ করে যাওয়া বুলেট যেমন আমাদেরকে ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলেছে, রুমির ঝুলন্ত মরদেহ আমাদেরকে এই বাংলাদেশের সকল মানুষকে এবং আমরা যারা এনসিপিসহ জুলাইয়ের সম্মুখসারীর যোদ্ধা... সকলকে এই ঝুলন্ত অবস্থায় আমরা দেখতে পাচ্ছি।
“আমরা দেখেছি জুলাই ঘোষণাপত্রে জুলাইয়ের যারা সম্মুখসারীর যোদ্ধা, শহীদ পরিবার এবং যারা আহত হয়েছেন, যারা এই পুরো অভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন, তাদের নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা করা হয় নাই।”
৩০ বছর বয়সী জান্নাতারা রুমী ছিলেন এনসিপির ধানমন্ডি থানা শাখার যুগ্ম সমন্বয়কারী। তিনি নওগাঁ জেলার পত্নীতলা উপজেলার মো. জাকির হোসেনের মেয়ে।
গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করা রুমী মেডিকেল অ্যাসিসট্যান্ট হিসেবে কাজ করতেন। ঢাকার জিগাতলা পুরাতন কাঁচাবাজার রোড এলাকায় একটি ছাত্রী হোস্টেলে তিনি থাকতেন।
৯৯৯ এ খবর পেয়ে পুলিশ বৃহস্পতিবার সকালে ওই হোস্টেলের কক্ষ থেকে রুমীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে।
রুমির ঘরে ডিপ্রেশনের ওষুধ পাওয়ার কথা জানিয়ে হাজারীবাগ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শাহাদাত হোসেন বলেছেন, “তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন বলে আশপাশের লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে।"
এক্ষেত্রে দুটি বিষয় আসছে তদন্তকারীদের সামনে। রুমীর চাচাতো ভাই মেহেদী হাসান সাংবাদিকদের বলেছেন, দুবার বিয়ে হয়েছিল তার বোনের। দুই সংসারই ভেঙে গেছে। দুই সংসারে দুটি সন্তানও রয়েছে রুমীর। তারা বাবার কাছে থাকে। এসব নিয়েও তার মধ্যে হতাশা ছিল।
আবার গত ১৪ নভেম্বর আওয়ামী লীগের 'ঢাকা লকডাউন' চলাকালে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে মধ্য বয়সী এক নারী মারধরের ঘটনায় আলোচনায় আসেন রুমী। লাঠি হাতে রুমির পেটানোর দৃশ্য ফেইসবুকে ভাইরাল হওয়ার পর তার ঠিকানা, পারিবারিক পরিচয় ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
তাকে ‘হত্যা ও ধর্ষণের’ হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি তার পরিবারকেও হুমকি-ধামকি দেওয়া হচ্ছিল বলে এনসিপি নেতাদের অভিযোগ। তারা বলছেন, এসব কারণে গত কিছুদিন ধরে ‘ট্রমার মধ্যে’ ছিলেন রুমী। দলের কর্মসূচিতেও তাকে বিমর্ষ দেখা যেত।
সেই প্রসঙ্গ ধরে সামান্তা শারমিন বলেন, "রুমির প্রত্যেকটা অ্যাকাউন্টে, প্রত্যেকটা কমেন্টে এবং তার যে লাস্ট পোস্ট ছিল হাদির সুস্থতা কামনায় সেখানে পর্যন্ত তাকে বুলিং করা হয়েছে। গত ১৩ নভেম্বর রুমি ধানমন্ডি থানায় একটি জিডি দায়ের করে। সেখানে অ্যাকাউন্ট এবং ফোন নাম্বারসহ হুমকিদাতাদের লিস্ট সে উপস্থিত করে।
“আমরা আমাদের পক্ষ থেকে তদন্ত করে যে তথ্য-উপাত্ত তাদের কাছে দায়ের করছি, প্রমাণ যেগুলা হাজির করছি, সেই মোতাবেক আমরা কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখছি না।”
এনসিপির এই নেত্রী বলেন, “সবগুলো রাজনৈতিক দল নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা দেখছি আমাদের জুলাইযোদ্ধা যারা ছিলেন, যারা শহীদ পরিবার, তাদের ওপর ক্রমাগত হুমকি আসছে। এনসিপির একাধিক নেতাকর্মীর উপরে হামলা এবং হুমকি উভয়ই চলমান।

“এটা শুধু এনসিপির ব্যাপার নয়। স্পষ্ট করে বলতে চাই, এটা বাংলাদেশের নিরাপত্তার বিষয়। এখানে দিল্লি, পিন্ডি এবং নিউ ইয়র্কের আধিপত্যবাদবিরোধী যত সংগ্রামী যোদ্ধা আছে, সকলের প্রতি, সকলের জীবনের প্রতি হুমকি আছে।”
সামান্ত বলেন, “রুমির মৃত্যু আমাদেরকে ভয় দেয় না। আমরা বরং সাহসে বলিয়ান হচ্ছি। রুমি এবং হাদি আমাদের হিরো। আমরা মনে করি যে আমরা শাহাদাতকে ভয় পাই না। কিন্তু তার মানে এই নয় রাষ্ট্রের যে দুর্বলতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যে দুর্বলতা একই সাথে... এই ময়নাতদন্ত এবং পুলিশি তদন্ত কীভাবে হবে সেটার প্রতি আমরা কিন্তু সজাগ দৃষ্টি রাখব। এখানে কোনোভাবেই যাতে তথ্য গোপন করা না হয়।"
এআই ব্যবহার করে নারীদের ক্রমাগত বুলিং করা হচ্ছে এবং দেশের কিছু মানুষ সেগুলো বিশ্বাস করছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, "আমি নিজে আমার নির্বাচন নিয়ে শঙ্কিত। এখানে নারীরা যে পরিমাণ সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্পষ্ট তথ্য প্রমাণাদি থাকা সত্ত্বেও একটি আইডি, একটি একাউন্টের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
“নারী নেতৃত্বকে এখানে প্রত্যেকটা দল থেকেই সেইফটি দিতে হবে। আমরা যেটা দেখতে পাচ্ছি এই মুহূর্তে এখানে এআই এর ব্যবহার... আপনারা দেখতে পাচ্ছেন কি চরম মাত্রায় এটা অবনতি ঘটেছে। আপনারা এটাও জানেন যে বাংলাদেশের যে অর্ধশিক্ষিত বা অশিক্ষিত কিছু মানুষ আছে, যারা শিক্ষার আওতায় এখনো আসেনি কিন্তু তারা কিন্তু এই বিষয়গুলো বিশ্বাস করছেন।
“রাষ্ট্রীয়ভাবে এগুলোর যদি ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, শুধুমাত্র আমরা নির্বাচনের ডামাডোলে এগিয়ে গেলাম, কিন্তু আমরা কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের কথা বললাম না, এগুলার ব্যাপারে কোনো আলাপ তুললাম না, এটা কোনো সুষ্ঠ নির্বাচনের দিকে আমাদেরকে নিয়ে যাবে না।"
পুরনো খবর-