Published : 31 Jan 2026, 07:33 PM
নিজের ব্যবহৃত গাড়ির ট্যাক্স দিতে গিয়ে ‘সার্ভার না থাকার’ ভোগান্তি তুলে ধরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান বলেছেন, বিগত সরকারের তথ্য-প্রযুক্তি জীবনকে আরও ‘কঠিন’ করেছে।
তার অভিযোগ, বিগত সময়ে আইসিটি খাতে ‘লাগামহীন দুর্নীতির’ কারণে এর সুফল মানুষ ভোগ করতে পারেনি।
শনিবার রাজধানীর বনানী ক্লাবে আইসিটি খাতে বিএনপির পরিকল্পনা তুলে ধরতে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখছিলেন দলের এই নেতা।
আইসিটি ব্যবহারের কাজ বাংলাদেশে বিএনপি সরকার প্রথম শুরু করেছিল তুলে ধরে সাবেক মন্ত্রী মঈন খান বলেন, “তখন বেগম খালেদা জিয়া একটি মন্ত্রণালয় (আইসিটি মন্ত্রণালয়) সৃষ্টি করেছিলেন এবং সে মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব দিয়েছিলেন বাংলাদেশকে আধুনিকায়নের জন্য।”
তিনি বলেন, “কিন্তু আমাদের যে প্রথম চেষ্টা সেটা কেন পুরোপুরি অর্জিত হয়নি? আমি আজকে থেকে তিন-চারদিন আগে নিজের একটি উদাহরণ দিচ্ছি। আমাদের একটি গাড়ির যে ট্যাক্স দিতে হয়, সেটা দেবার প্রক্রিয়াটা আধুনিক করা হয়েছে। এটা এখন ম্যানুয়ালি না দিয়ে, এটা আপনার কম্পিউটার আইসিটি টেকনোলজির মাধ্যমে আদায় করা হয়। এই ট্যাক্স ব্যাংকে দিতে গিয়ে যখন চেষ্টা করা হলো তারা বলল যে, ‘এটা আমরা করতে পারছি না। সার্ভারে সমস্যা হচ্ছে।’
“সার্ভারে কি সমস্যা হচ্ছে? কোনো নম্বরের সঙ্গে কোনো নম্বর মিলছে না…তারপরে সেটা নিয়ে একদিন যায়, দুইদিন যায়, তিনদিন যায়, এর মধ্যে ট্যাক্স দেবার যে শেষ দিন ছিল সেই শেষ দিনটি পার হয়ে গিয়েছে। তো পুরো কাজটি করতে সাত দিন লেগেছে এবং যে পরিমাণ হয়রানি হয়েছে সাতটি অফিসে দৌড়াদৌড়ি করতে হয়েছে।”
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্দেশ্য মানুষের জীবনযাপন সহজ করে তোলা, এ কথা মনে করিয়ে দিয়ে বিএনপির এই নেতা বলেন, “আমরা যদি (জীবনযাপন) সহজ করে তোলার পরিবর্তে কঠিন করে তুলি, তাহলে আইসিটির প্রবর্তন করে কি লাভ হবে?”
মঈন খান বলেন, “আমরা বিগত ১৫ বছরে দেখেছি আইসিটি নামে আসলে টেকনোলজির কোনো উদ্ভাবন হয়নি। টেকনোলজির কোনো প্রয়োগ হয়নি। এখানে হয়েছে দুর্নীতি, সীমাহীন দুর্নীতি। আপনারা হয়তো অনেকে জানেন না। নতুন প্রজন্ম জানে না।”
গাজীপুরের কালিয়াকৈরে আইসিটি নগরী করার জন্য জমি অধিগ্রহণ ও ৩০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেও তার ফলাফল যে শূন্য সে কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আইসিটির নামে দুর্নীতি হয়েও যদি মানুষের সেবা সঠিকভাবে দিতে পারতো তাহলেও আমি বুঝতাম যে কিছু অর্জন হয়েছে। আমরা চাচ্ছি সবাইকে ইন্টারনেট সুবিধা দেওয়া। কারণ আমরা বিশ্বাস করি মানুষের জীবনযাপন প্রক্রিয়াকে সহজ করাটাই হচ্ছে মূল উদ্দেশ্য। সেই উদ্দেশ্য যদি সাধিত না হয় তাহলে তো আমি আইসিটি করলাম কি না করলাম তাতে তো কিছু এসে যায় না।”
“আমি মনে করি এই যে দুর্বৃত্তায়নের হাত থেকে আইসিটিকে যদি আমরা রক্ষা না করি, এই প্রযুক্তি যদি মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করতে না পারি তাহলে কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমরা দায়ী থাকব।”
এত টাকা গেল কোথায়?
সভায় বিএনপির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান এপোলো তথ্য দিয়ে দেখান যে এই খাতে বিগত বছরগুলোতে হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও খাতটি জিডিপিতে তেমন কোনো অবদান রাখছে না। বরাদ্দের টাকা কোথায় গেল তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, “আইসিটি সেক্টরে কিন্তু বাজেট কম ছিল না কখনো। ২০১৯-২০ সালে প্রায় ১২০০ কোটি টাকা বাজেট ছিল। সবচেয়ে বেশি বাজেট ছিল এই খাতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে, ২৮০০ কোটি টাকা।
“আওয়ামী লীগ কিন্তু ৫ অগাস্ট চলে গেছে। এই টাকাটার ৯৫ শতাংশ ব্যয় হয়েছে কিন্তু এই অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। আপনারা কে কী পরিবর্তন দেখেছেন আমি জানি না, আমি কিন্তু দৃশ্যমান কোন পরিবর্তন দেখিনি।”
তিনি বলেন, “২০২৫-২৬ অর্থবছরে আইসিটির বাজেট ২১০০ কোটি টাকা কীভাবে ব্যয় হচ্ছে আমরা তাও জানি না। আমরা এতো যে এখানে বাজেট বরাদ্দ করছি, তো ফলাফল কী আসছে। জিডিপিতে এই খাতের অবদান দশমিক ২৪ শতাংশ। বেসরকারি খাত ধরলে এটা ৪ শতাংশের কাছাকাছি যায়। বেসরকারি খাত কিন্তু কোনো সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়াই এটা দিচ্ছে।”
ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, “আমরা এমন একটা ইকোসিস্টেম তৈরি করতে চাই যেটা কখনো ভেঙে যাবে না, যেটা ঘুষ দেওয়ার ওপর নির্ভর করবে না। যেটা বাতিল প্রজেক্টে সরকারি অনুদান দিতে বলবে না।
“অনেক অ্যাপ তৈরি হয়েছে, টাকা খরচ করা হয়েছে বিগত সরকারের আমলে। কিন্তু সেগুলো নষ্ট হয়ে গেছে, কারণ ইকোসিস্টেম তৈরি হয়নি।”
ইকোসিস্টেম কীভাবে তৈরি করবে বিএনপি সে পরিকল্পনা তুলে ধরেন দলের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক।
তিনি বলেন, “আমাদের কানেক্টিভিটিটাকে আমরা প্রথম প্রয়োরিটি দিচ্ছি। এরপর সাইবার সিকিউরিটি। এরপর ক্লাউড, ডেটাসেন্টারসহ ডিজিটাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার।”
তিনি ৯৫ শতাংশ মানুষকে হাইস্পিড ইন্টারনেটের আওতায় আনার পরিকল্পনার কথা বলেন। শহর ও গ্রামাঞ্চলের কয়েকটি জনসমাগম স্থলে ফ্রি ইন্টারনেট দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও বলেন তিনি। সেমিকন্ডাক্টরসহ অ্যাডভান্সড হার্ডওয়্যার এর যেন একটা ল্যাব তৈরি করা যায় সেই চেষ্টাও করার কথা বলেছেন তিনি।
‘আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে আইসিটি সেক্টরের ভূমিকা ও করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভাটির আয়োজন করে জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরাম।
সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন।