Published : 02 Jul 2025, 01:51 AM
নাহিদ ইসলাম যখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বিলুপ্ত করতে চেয়েছিলেন, উমামা ফাতেমা তখন এর বিরোধিতা করে প্ল্যাটফর্মটিকে জিইয়ে রাখেন। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই সাধারণ ছাত্রদের এই প্ল্যাটফর্মকে ‘দলীয় সংগঠনে’ রূপান্তরের এবং ‘দলীয় লেজুড়বৃত্তিতে’ বাধ্য করার অভিযোগ এনে সংগঠন ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন উমামা।
অভ্যুত্থানের সাফল্য বাংলাদেশকে নতুনভাবে গড়ে তোলার যে স্বপ্ন তরুণ মনে জাগিয়েছিল, তা পূরণ করতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে জন্ম নেয় আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি–এনসিপি। কিন্তু বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এখন এনসিপির ছায়ায় পরিণত হয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠছে।
বছর পূর্ণ না হতেই চাঁদাবাজি, মামলা-বাণিজ্য, নিরীহ মানুষকে হয়রানি, দখল-বাণিজ্য, অবৈধভাবে হাটবাজার নিয়ন্ত্রণসহ নানান অভিযোগে জর্জরিত ছাত্রদের এই প্ল্যাটফর্ম।

গত বছর ১ জুলাই যখন চার দফা দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নামের প্ল্যাটফর্মটি গঠিত হয়, তখন এর সংগঠকরাও হয়ত ভাবতে পারেননি, মাত্র ৩৬ দিনের আন্দোলনে পরের মাসের ৫ অগাস্ট তারা দেড় দশকের প্রবল প্রতাপশালী শাসক শেখ হাসিনাকে হটিয়ে দিতে পারবেন। হাসিনা সরকারের পতন ঘটিয়ে নতুন সরকার প্রতিষ্ঠা করে ফেলবেন। ‘জুলাই অভ্যুত্থান’ নামে পরিচিতি পাওয়া এই আন্দোলনের সমাপ্তির দিনটিকে আন্দোলনকারীরা ৫ অগাস্ট না বলে ৩৬ জুলাই বলতে পছন্দ করেন।
সরকারি চাকরির কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের অরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসাবে ২০২৪ সালের ১ জুলাই যাত্রা শুরু করা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের একজন ছিলেন নাহিদ ইসলাম। আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর তিনি মন্ত্রী মর্যাদায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা হন। তারপর উপদেষ্টার পদ ছেড়ে নবগঠিত রাজনৈতিক দল এনসিপির আহ্ববায়কের দায়িত্ব নেন।
নতুন দল গঠনের আগেই থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ আসতে শুরু করেছিল। এ বছরের ৭ মার্চ এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এক সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, “বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন আর আগের জায়গায় নেই। সেখান থেকে একটি ছাত্র সংগঠন তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক দল তৈরি হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী বা সমন্বয়ক পরিচয়টা এখন আর এক্সিস্ট করে না।”
ওই দিনই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র উমামা ফাতেমা এর বিরোধিতা করে লিখেছিলেন, “বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন প্ল্যাটফর্মটি বিলুপ্ত করার কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অংশীদার ছাত্রদের সবাই নতুন রাজনৈতিক দল বা নতুন ছাত্র সংগঠনে যুক্ত হয়নি। অংশীদারদের আলোচনা ছাড়া প্ল্যাটফর্ম বিলুপ্ত হবে না। তাই বিভ্রান্ত না হওয়ার অনুরোধ রইল।”
বছর শেষে দেখা যাচ্ছে, শুরুতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন যে ২১ সদস্যের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক কমিটি দিয়ে পরিচালিত হত, তাদের অধিকাংশই নবগঠিত রাজনৈতিক দল এনসিপি অথবা তাদের ছাত্রসংগঠন হিসেবে পরিচিতি পাওয়া বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদে যুক্ত হয়েছেন।
আন্দোলন চলাকালে চব্বিশের জুলাই-অগাস্টে সারাদেশের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ১৫৮ জন সদস্যকে ধাপে ধাপে সমন্বয়ক ও সহ-সমন্বয়ক হিসাবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। তাদের অধিকাংশও এখন এনসিপির রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন।

কাউন্সিল ও নতুন কমিটি
গত ২৫ জুন হল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রথম কাউন্সিল। কাউন্সিলে নির্বাচনের মাধ্যমে সভাপতি হয়েছেন এনসিপির কেন্দ্রীয় পদ ছেড়ে আসা রাশিদুল ইসলাম (রিফাত রশিদ)। সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন শেখ ইনামুল হাসান (হাসান ইনাম)।
রিফাত রশিদ এই প্লাটফর্মের মূল নেতৃত্বে চলে আসায় এটি এখন এনসিপির ‘অঙ্গসংগঠনে’ পরিণত হয়েছে বলে অনেকে মন্তব্য করছেন।
এই যখন পরিস্থিতি, তখন প্রায় এক বছর ধরে শিক্ষার্থীদের এই প্ল্যাটফর্মটির মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করে আসা বাংলাদেশ ছাত্রফেডারেশনের সাবেক নেত্রী উমামা ফাতেমা নিজেই এ সংগঠনের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
ফেইসবুকে এক পোস্টে উমামা লেখেন, “…এসব দেখে আমি অত্যন্ত লজ্জিত। সেই একই স্বেচ্ছাচারিতা, স্টান্টবাজি, ভাই-ব্রাদার কোরামের খেলা। এখন বোধ করি এই প্ল্যাটফর্মের ভবিষ্যত অন্ধকার।”
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকা অনেকের অভিযোগ, অরাজনৈতিক আবহের বহুদলীয় প্ল্যাটফর্ম ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শক্তিশালী শাসনের অবসান ঘটাতে পারলেও রাজনীতির পুরোনো ধারা থেকে নিজেকে ‘রক্ষা করতে পারছে না’। জুলাই আন্দোলনের চেতনাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও সেখানে তাদের ‘মনোযোগ কম’।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে এনসিপির সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন করলে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে নতুন দলে যোগ দিয়েছি অনেক আগেই। ফলে এই প্ল্যাটফর্মের কমিটি গঠন কিংবা কর্মকাণ্ড নিয়ে মন্তব্য করা সমীচীন হবে না। আর এনসিপির কেউ সেখানে নেই। যে বা যারা গিয়েছেন, তারা এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেই গিয়েছেন। ফলে লেজুড়বৃত্তি বা ওই ধরনের কোনো বিষয় নেই।”

অভিযোগে জর্জরিত ছাত্র আন্দোলন
গত ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা, আন্দোলনের শহীদ ও আহতদের খোঁজ নেওয়া, অভ্যুত্থানের মূল চেতনা ছড়িয়ে দেওয়াসহ নানা অরাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অঞ্চলভিত্তিক কমিটি দেওয়া শুরু হয়।
আন্দোলনে সক্রিয় অনেকেই আবার কমিটির বাইরে থেকে নিজেকে সমন্বয়ক দাবি করে বিভিন্ন স্থানে ‘প্রভাব বিস্তার’ করতে শুরু করেন বলে খবর আসে।
অনেক জায়গায় কমিটির সদস্যদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। চাঁদাবাজি, মামলা, এমনকি সাধারণ মানুষকে হয়রানি অভিযোগও ওঠে।
গণঅভ্যুত্থানের তরুণ ছাত্রনেতৃত্বের উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিয়ে ৮ সেপ্টেম্বর ‘জাতীয় নাগরিক কমিটি’ গঠিত হলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অনেক সমন্বয়ক সেখানে চলে যান।
পরের মাসে (২২ অক্টোবর) ছাত্রনেতৃত্ব বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন পুনর্গঠন করে হাসনাত আব্দুল্লাহকে আহ্বায়ক, আরিফ সোহেলকে সদস্য সচিব, আব্দুল হান্নান মাসউদকে মুখ্য সংগঠক ও উমামা ফাতেমাকে মুখপাত্র মনোনীত করা হয়।
ওই কমিটির সদস্যদের মধ্যে উমামা ফাতেমা ছাড়া সবাই বর্তমানে এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে রয়েছেন। আর উমামাও সংগঠনের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ছেড়েছেন।
মূলত গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এনসিপির আত্মপ্রকাশের পর থেকেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটি নেতৃত্বশূন্য হতে থাকে। ফেব্রুয়ারির চার মাস পর ২৫ জুন কাউন্সিলে ভোটাভুটির মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠন করা হয় এবং ওই কাউন্সিলে রিফাত রশিদ ও হাসান ইনাম মূল নেতৃত্বে চলে আসেন।
জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম অংশীদার জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দীন নাসির বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ফ্যাসিবাদের পতনে আমরা সব দলমত বৈষম্যবিরোধী ব্যানারে এক হয়েছিলাম। কিন্তু এক বছরে এ ব্যানার উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার হয়েছে, যা দুঃখজনক।
“গত এক বছরে দেখলাম, এই ব্যানারকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। সারাদেশে দখল, চাঁদাবাজি, দুর্নীতির ক্ষেত্রে অনেকে এই ব্যানারকে কাজে লাগিয়েছেন, যেটা খুবই দুঃখজনক।”
তিনি বলেন, “হাসনাত ও আরিফ সোহেলের নেতৃত্বে পুনর্গঠনের পরও এই ব্যানার রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার হয়েছে। মাঝে কিছুদিন অভিভাবকশূন্য অবস্থায় এই ব্যানারের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেক হানাহানি অপকর্ম হয়েছে। এটি জুলাই অগাস্টের চেতনাকে হত্যা করার সামিল বলে মনে করি।
“যখন আমাদের প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির কর্মী পারভেজকে বৈষম্যবিরোধীদের ব্যানারের ছায়ায় থাকা কতিপয় নেতা হত্যা করল, তখন কাউকে বহিষ্কার পর্যন্ত করা হয়নি। কারণ তাদের কোনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছিল না। এগুলো দুঃখজনক।”
নতুন কমিটি নিয়ে নাসিরের ভাষ্য, “কমিটি হওয়ার পর উমামা ফাতেমার ফেইসবুক পোস্ট থেকে মনে হচ্ছে, এই ব্যানার আরও অরাজকতা বাড়াবে। জুলাই অগাস্টের চেতনাকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। অনেক আগেই এই ব্যানার বন্ধ করে দিয়ে সবার নিজ নিজ রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে ফিরে যাওয়া উচিত ছিল।”

বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে শিরোনাম
গত এক বছরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সংশ্লিষ্ট অনেকের বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার খবর এসেছে সংবাদমাধ্যমে।
>> গত এপ্রিলে ঢাকার বনানীতে প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ছাত্রদল নেতা জাহিদুল ইসলাম পারভেজ হত্যারে আসামিদের অধিকাংশই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত।
>> গত মার্চে নারায়ণগঞ্জের খানপুরে ৩০০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দুজনকে ইয়াবাসহ আটক করা হয়, যাদের একজন জেলা কমিটির সমন্বয়ক ছিলেন।
>> চলতি জুনে মাদারীপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোনের এক সমন্বয়ককে হাতুড়িপেটা করেন এনসিপির কয়েক নেতা।
>> গত ৮ মে কিশোরগঞ্জে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা কমিটি থেকে ৫৬ জন নেতা পদত্যাগ করেন। পদত্যাগীরা জেলা কমিটির আহ্বায়ক ইকরাম হোসেন ও সদস্যসচিব ফয়সাল প্রিন্সের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, মামলা–বাণিজ্য, নিরীহ মানুষকে হয়রানি, দখল–বাণিজ্য, অবৈধভাবে হাটবাজার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ করে যান।
>> এ বছর জুনেই মিরপুরে এক ব্যবসায়ীকে আটক রেখে নির্যাতন করে ব্ল্যাঙ্ক চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঢাকা মহানগরের যুগ্ম আহবায়ক সাদমান সানজিদ ও রিফাতুল হক শাওনের বিরুদ্ধে।
>> একই মাসে সংগঠনের বরিশাল জেলা কমিটির পদ স্থগিত থাকা যুগ্ম সদস্য সচিব মো. মারযুক আব্দুল্লাহসহ তিনজনের বিরুদ্ধে ডাকাতির প্রস্তুতির মামলা করে পুলিশ।
>> গত ১৮ মে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রংপুর মহানগর ও জেলা কমিটির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, নিয়োগ–বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ১৬ জন পদত্যাগ করেন।
>> ২১ মে মামলার নামে চাঁদাবাজি ও পুলিশের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দুই নেতাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে মানিকগঞ্জ সদর থানা পুলিশ। তারা হলেন– জেলার যুগ্ম সদস্য সচিব মেহেরাব খান ও আশরাফুল ইসলাম রাজু।
>> গত ১৮ মে ‘মাদক সেবন ও অসামাজিক কার্যকলাপের’ অভিযোগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির মুখপাত্র ফাতেমা খানম লিজাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। পরে অবশ্য অভিযোগ প্রমাণ না হওয়ায় তিনি পদ ফিরে পান।
>> ৯ এপ্রিল স্বজনপ্রীতি ও অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের অভিযোগ তুলে এক যোগে পদত্যাগ করেন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলা কমিটির ৪৮ জন সদস্য।
>> রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির অভিযোগ এনে বরিশালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে থাকা ছাত্র ফেডারেশনের তিন নেতা ফেডারেশনে ফিরে যান। তারা হলেন ছাত্র আন্দোলনের মহানগর কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব নাহিদ ইসলাম, যুগ্ম আহ্বায়ক জান্নাত আরা রিয়া এবং সংগঠক অনন্যা ইসলাম এশা।

হতাশা ও আত্মসমালোচনা
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নির্বাহী কমিটির সদস্য আকরাম হোসেন রাজ বলেন, “গত বছরের ৫ অগাস্টের পর সরকার গঠনে তিন দিন অনিশ্চয়তা ও পরবর্তীতে বন্যার সময় পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। তখন অনেক জায়গায় সমন্বয়ক নাম দিয়ে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়েছিল। আমরা এরপর প্রতিটি জেলায় জেলায় গিয়ে শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করা শুরু করি।
“সফরে যাওয়ার পর আমরা বুঝতে পারলাম, ৫ অগাস্টের পর কিছু মানুষ ফাঁকা মাঠে সমন্বয়ক পরিচয় ব্যবহার করে মানুষের জায়গা জমি দখল করা শুরু করেছে। যেই ছেলেটা ৫ অগাস্ট সকাল বেলায়ও ছাত্রলীগ করত, সে বিকাল বেলা মাথায় একটা পতাকা বেঁধে সমন্বয়ক হয়ে গেছে। এই লেবাসধারীরাই বেশি বিশৃঙ্খলা শুরু করেছিল। এই সমস্যাটা মাথায় রেখে আমরা প্রকৃত আন্দোলনকারীদের সামনে রেখে কমিটি দেওয়ার চেষ্টা করি। অক্টোবরের দিক থেকে আমরা সারাদেশের জেলা ও উপজেলাগুলোতে কমিটি দেওয়া শুরু করি।”
তিনি বলেন, এসব কমিটি দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল আন্দোলনকে শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসা এবং আহত ও শহীদ পরিবারের খোঁজ খবর নেওয়া।
“দুর্ভাগ্য হচ্ছে এসব কমিটির খুব কমসংখ্যক মানুষ আহতদের নিয়ে কাজ করেছে। তাদের অধিকাংশই বিবাদ, বিভেদে জড়িয়েছে। মাঠ দখলসহ প্রচলিত রাজনীতির লোকদের মতোই তারা আচরণ শুরু করেছিল।”
গত ফেব্রুয়ারিতে এনসিপি গঠন হওয়ার পর আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম আর থাকার প্রয়োজন আছে কিনা সেই প্রশ্ন রেখেছিলেন। পরে মার্চেও তিনি প্রায় অভিন্ন বক্তব্য দিলে মুখপাত্র উমামা ফাতেমা তার বিরোধিতা করেন।
নাহিদ তখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের’ বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, “আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আমাদের অনুরোধ থাকবে, এই পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি অপকর্ম করে তাহলে তারা যেন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেন।”
উমামার বর্তমান অবস্থান জানতে চাইলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আমরা ছাত্ররাজনীতির সংস্কারের আলাপ তুলেছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে কেউ এ বিষয়গুলো নিয়ে বেশি আগাতে চায়নি। যতটা না অনিচ্ছা তার চেয়ে বেশি বিশৃঙ্খলা।
“ছাত্রসংসদ নির্বাচন ও রাজনীতিতে নারীদের আরও বেশি অংশগ্রহণ নিয়ে কাজ করার সুযোগ ছিল। কিন্তু হয়নি। রাজনৈতিক দলের আর্থিক ব্যবস্থাপনা কেমন হওয়া উচিত এই ধরনের আলাপ করলে আমাদেরকে একটা রাজনৈতিক সংলাপে যেতেই হত।”
উমামা বলেন, “আমরা এগুলো নিয়ে আলাপ করছিলাম। জুলাই ডকুমেন্টেশেন নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা ছিল। মিটিংয়ে এই আলাপগুলো তোলার পর আশপাশের লোকজন অস্বস্তি দেখাচ্ছিল। ওদের মধ্যে একটা আশঙ্কা ছিল এসব আলাপে বিএনপির মত এনসিপিও টার্গেট হতে পারে। এই যে দ্বিচারিতাটা তাদের মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে, তা ব্যক্তিগতভাবে আমাকে ক্ষুব্ধ করেছে।”

কাউন্সিল ও নির্বাচন ঘিরেও বিতর্ক
গত ২৫ মার্চ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের যে কাউন্সিলে ভোটাভুটির মাধ্যমে রিফাত রশিদ সভাপতি ও হাসান ইনাম সাধারণ সম্পাদক হন, ওই নির্বাচনে ভোটার ছিলেন প্ল্যাটফর্মটির কেন্দ্রীয় কমিটির ২১ জন। তবে জেলা কমিটির লোকজনও সেখানে শর্ত সাপেক্ষে প্রার্থী হতে পেরেছিলেন।
ভোট অফলাইন ও অনলাইন পদ্ধতিতে হয়েছে। প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টের সামনে ভোট গণনা করা হয়েছে।
২১টি ভোটের মধ্যে ১৬ ভোট পেয়ে সভাপতি হন রিফাত রশিদ। সাধারণ সম্পাদক পদে ২৩ ভোটের মধ্যে ১০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন হাসান ইনাম।
সাংগঠনিক সম্পাদক পদে ২৩ ভোটের মধ্যে ১৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন মঈনুল ইসলাম। মুখপাত্র পদে ২৩ ভোটের মধ্যে ১৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন সিনথিয়া ইসলাম।
তবে এই নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়েও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনা এসেছে প্ল্যাটফর্মটির নেতাদের কাছ থেকেই।
জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির শ্রমিক উইংয়ের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ছাত্রশক্তি থেকে আসা নেতাদের একক নিয়ন্ত্রণ ছিল এখানে। অনেকে এটাকে ডামি নির্বাচনও বলছে। গণঅভ্যুত্থানের পর এই ধরনের কর্মকাণ্ড উচিত নয়। আমি যেহেতু রাজনীতিটা করতে চাই, তাই এখনও প্রকাশ্যে কিছু বলছি না।”
নাহিদ চৌধুরী নামের একজন বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলনের ফেইসবুক পেইজে মন্তব্য করেছেন, “আপনি বলতেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক প্লাটফর্ম না, আবার যদি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন করতে হয় নিজের দল ছেড়ে আসতে হবে। সব ঠিক আছে মানলাম। এখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কাউন্সিলের হান্নান মাসউদ ভোট দিল, সামান্তা শারমিন ভোট দিল, তারা ‘এনসিপি’ নামে একটি রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় নেতা। তারা কীভাবে ভোট দিচ্ছে?
“ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ছাত্র অধিকারসহ যারা যারা এই আন্দোলনের সাথে ছিল, তাদেরও ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত ছিল। আর না হলে এটা বলতে হবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এনসিপির একটি অঙ্গ সংগঠন।”
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব পালন করা এনসিপি নেতা লুৎফুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সংগঠনের নির্বাহী কমিটির সভার সিদ্ধান্তের আালোকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাহী কমিটি ছাড়াও সারাদেশের কমিটির প্রতিনিধিরা এখানে শর্ত পূরণ সাপেক্ষ প্রার্থী হতে পেরেছিলেন। নিয়ম অনুসরণ করেই ভোটাভুটির মাধ্যমে নির্বাচন সম্পন্ন করা হয়েছে।”

শ্বেতপত্র করবে নতুন কমিটি
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নতুন সভাপতি রিফাত রশিদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এনসিপি গঠন বা কেউ কোনো ছাত্র সংগঠনে ফিরে যাওয়ার আগেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলনের নেতৃত্ব নির্বাচনের রেজুলেশনটি পাস হয়েছিল। সেই রেজুলেশনের আলোকে এবার নির্বাচন হয়েছে, সেই নির্বাচনে আমি জয়ী হয়েছি। ভূতাপাপেক্ষ দায়িত্বের অংশ হিসাবে নির্বাচন কমিশন এই নির্বাচনটা আয়োজন করেছে।”
সংগঠনের অনেকের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, “যখন একটা প্ল্যাটফর্মের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থাকে না, তখন নামে বেনামে বহু জায়গা থেকে মানুষজন একে ব্যবহার করে অনেক নেতিবাচক কর্মকণ্ড করেছে। অনেকে অনেকভাবে এই সংগঠনকে কলুষিত করেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দায়বদ্ধতা ধরে রাখতে পারেনি।
“আমরা কাউন্সিলে ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছি, এখনও দায়িত্ব পাইনি। যেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব পাব, সেদিনই একটি আর্থিক স্বচ্ছতা কমিটি গঠন করব। সেই কমিটি নির্দিষ্ট কার্যদিবসের মধ্যে সারাদেশের কমিটিরগুলো বিষয়ে তদন্ত করবে। এই তদন্ত করে শ্বেতপত্র প্রকাশ হওয়ার আগ পর্যন্ত কমিটিগুলো সাংগঠনিক কাজ স্থগিত থাকবে।”