Published : 29 Dec 2025, 02:51 AM
দলের আত্মপ্রকাশের বর্ষপূতির এখনও মাস দুয়েক বাকি; এর ১৬ দিন আগেই হয়ে যাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ভোট করার সেই চ্যালেঞ্জ সামলাতে গিয়ে নেওয়া এক পদক্ষেপে দলে ভাঙনের ঝাপটার মুখে পড়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটের পর কোন পথে যাবে চব্বিশের আন্দোলনের সূতিকাগারে গড়ে ওঠা দলটির রাজনীতি সেই প্রশ্ন উঠেছে জনমনে। দলের মধ্যেও এ নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছে শীর্ষ নেতৃত্ব।
নির্বাচনের আবহের মধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গণে আলোচনা তৈরি করা এ জোট নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ভালো মন্দ দুটোই দেখছেন।
আর এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এ পদক্ষেপকে ‘নির্বাচনি সমঝোতা’ হিসেবে তুলে ধরে জোট করার একটি ব্যাখ্যা হাজির করেছেন। বলেছেন, নির্বাচনি বৈতরণী পার হতে আর ‘বৃহত্তর ঐক্যের’ প্রয়োজনবোধ এবং বিচার ও আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলনে এক থাকাই জামায়াতের সঙ্গে জোটে যাওয়ার কারণ।
এ জোট গঠন নিয়ে দিন কয়েক ধরে একের পর এক নেতাদের পদত্যাগের মধ্যে সবশেষ মাহফুজ আলমের এনসিপিতে যোগ না দেওয়ার ঘোষণা বড় খবর হয়ে আলোচনায় এসেছে।
শেখ হাসিনার সরকার পতনে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব স্থানীয় এ সংগঠক ছাত্রদের প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে। তফসিল ঘোষণার দিন থেকে সাবেকের কাতারে নাম লেখানো উপদেষ্টা মাহফুজ রোববার রাতে ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি ‘এই এনসিপির’ অংশ হচ্ছেন না।
এর আগেই বিকালে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এসেছে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনি জোটে যাচ্ছে এনসিপি, যে দলটি সাড়ম্বরে আত্মপ্রকাশ করেছিল চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি।
সেই দিকে ইঙ্গিত করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের নিয়ে গঠিত নাগরিক কমিটি ও এনসিপি গঠনের সঙ্গে শুরু থেকে যুক্ত থাকা ছাত্র উপদেষ্টা মাহফুজ আর নতুন রাজনৈতিক দলটিতে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত স্পষ্ট করেন।

এর আগে একই কারণ দেখিয়ে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেন দলটির পরিচিত মুখ হয়ে ওঠা তাসনিম জারা।
শনিবার দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব জারার সরে দাঁড়ানোর ধাক্কার পরদিনই রোববার যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবিন পদত্যাগের ঘোষণা দেন। নির্বাচন না করার কথাও বলেন তিনি। আরও কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা পদত্যাগ করবেন বলেও গুঞ্জন আছে।
জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক আট দলের সঙ্গে চব্বিশের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের রাজনৈতিক দল এনসিপির ‘জোট গঠন’ বা ‘সমঝোতাকে’ কেন্দ্র করে এসব ঘটনা নির্বাচনের আগে নতুন রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দলটির ভবিষ্যত কোন পথে তা নিয়েও ভাবনার কথা অনেকে তুলে ধরেছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন আলোচনায়।
অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে এনসিপিকে ঘিরে রাজনীতিতে তারুণ্যের সম্ভাবনা দেখতে পাওয়ার যে প্রত্যাশা অনেকে করেছিলেন, তারা এই ঘটনাপ্রবাহে আশাহত হয়েছেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে দলটির বেড়ে ওঠার আগেই তার হারিয়ে যাওয়ার সুরও শুনছেন কেউ কেউ।
‘সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়’ দল পরিচালিত হচ্ছে এমন অভিযোগের মধ্যেও রাজনীতিতে ‘নতুন বন্দোবস্ত’ আনার অঙ্গীকার নিয়ে আত্মপ্রকাশ করা এনসিপি ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের দাবি করে আসছিল।
তবে শেষমেষ জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক দলের সঙ্গে নির্বাচনি জোট বাধার বিষয়টি তাদের রাজনীতিতে টিকে থাকার ভবিষ্যত নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠনের প্রক্রিয়ায় নিয়ে খোদ আপত্তি তুলেছেন দলটির ৩০ জন কেন্দ্রীয় নেতা। এর আগে আরও কয়েকজন নেতা ‘দল সঠিক পথে নেই’ এমন বক্তব্য দিয়ে পদত্যাগ করেছেন।
তবে দলের সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নিয়ে জোট গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে রোববার রাতে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম নির্বাচনের পরেও সংস্কারের পক্ষে এবং দুর্নীতির বিপক্ষে ‘লড়াই’ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের কেউ কেউ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠনের ফলে এনসিপির রাজনৈতিক আদর্শ হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা করছেন। কোনো কোনো বিশ্লেষক অবশ্য এটিকে শুধুই নির্বাচনি সমঝোতা হিসেবেই দেখতে চান।
‘বড় কিছু হারাবে এনসিপি’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ মোহাম্মদ শাহান মনে করছেন জামায়াতের সঙ্গে জোটে যাওয়া এনসিপির জন্য রাজনৈতিকভাবে সুবিধার হবে না।
তিনি বলেন, “এটাতে এনসিপির কোন লাভ হয়নি। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামী এর থেকে ভালো নির্বাচনি সহযোগী পাবে না। এবং এনসিপি বড় কিছু হারাবে।”
এ জোট গঠন দেশকে পুনরায় আদর্শিক লড়াইয়ে নিয়ে যাবে বলে তুলে ধরে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এইটা যেটা হচ্ছে খুব সোজা কথায় বলতে গেলে, এই ইলেকশনে আর আমাদের কোনো পলিসি ডিসকাশন হবে না। আমি দেশের জন্য এটা আমার প্রস্তাব, এটা আমার প্রস্তাব, কার প্রস্তাবটা ভালো, কে বেটার ওয়েতে সার্ভ করতে চায়; এই ডিসকাশনের এইখানেই শেষ।
“এখন যেটা হবে যে একটা জায়গা থেকে আরেকটা একটা জোট আরেকটা জোটকে আইডেন্টিফাই করার চেষ্টা করবে, যেটা বলা হচ্ছে যে একদল সংস্কার চায় না, একদল হচ্ছে ওই ভারতীয় আধিপত্যবাদী ঠিকঠাক মত বিচার করতে পারবে না। আরেকদলকে সেটাকে ডিফেন্ড করতে হবে। এবং সেটাকে ডিফেন্ড করতে যারা বসে থাকবে না। তারা তো একই সাথে পাল্টা অ্যাটাক করবে।”
এ পরিস্থিতি একটা সাংঘর্ষিক জায়গা তৈরি করবে বলে তুলে ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক বলেন, “পুরা ইলেকশনটা এখন এই কেন্দ্রিক হয়ে যাবে যেটা একটা বিরোধের জায়গা আবারো তৈরি করবে এবং এই কনফ্রন্টেশন হচ্ছে গিয়ে সহজে যাবে না। আমরা দেশ কীভাবে হবে, তার ইকোনমিক পলিসি কী হবে, ফরেন পলিসি কী হবে, এটা নিয়ে কোনো গঠনমূলক আলোচনার জায়গা বন্ধ হয়ে যাবে।
“আমরা আবারও সেই পুরানা আইডিওলজিক্যাল লড়াইয়ে ফিরে যাচ্ছি। এবং আমাদের আইডিওলজির যে লড়াইটা সেটা কখন ইকোনমিক কোশ্চেনে হয় না; সেটা সবসময় হচ্ছে গিয়ে সোশাল, কালচারাল, আইডেন্টিটি হয়ে যায়।”
এনসিপির জোট গঠনের অবস্থান তাদের জনপ্রিয়তা নষ্ট করবে বলেও মনে করেন তিনি।

‘জোটে যাওয়া ও দল থেকে বেরিয়ে যাওয়াও ইতিবাচক’
বিএনপি-জামায়াতের পর এনসিপি ইতোমধ্যে ‘বড় দলের তকমা’ পেয়েছে মন্তব্য করে নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বলেন, সেক্ষেত্রে জোট করলেও নিজেদের প্রতীকে ভোট করা উচিত।
তার ভাষ্য, “এনসিপি এখন বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম দল বলা যায়- তাদের ক্ষেত্রে যেটা আমার বিশ্লেষণ যে দলটা মাত্র শুরু হয়েছে, মাত্র গঠন করা হয়েছে। এই দলটা যারা গঠন করেছে তারা সবাই জুলাই বিপ্লবের নেতৃত্বে ছিল।
“তাদের নেতৃত্বে জুলাই বিপ্লব হয়েছে। তারা জোট করলেও তাদের উচিত হবে তাদের নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচন করা। কারণ তারা কিন্তু প্রতীকের জন্য অনেক ফাইট করছে, অনেক যুদ্ধ করেছে। কাজেই তাদের প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করা উচিত হবে। না হলে তাদের প্রতীক তাদের যে পরিচিতি সেটা নষ্ট হয়ে যাবে।”
এনসিপি থেকে বেরিয়ে যারা স্বতন্ত্র নির্বাচন করছে তেমন পদক্ষেপেও ইতিবাচকতা দেখছেন তিনি।

জামায়াতের সঙ্গে জোট করার বিরোধিকতায় অনেকে পদত্যাগ করেছে দল থেকে; কেউবা স্বতন্ত্র নির্বাচনেরও ঘোষণা দিয়েছে।
এই নির্বাচন বিশ্লেষক বলেন, “এখন হয়তো যারা এনসিপির এইরকম পদত্যাগী, পদত্যাগ করে চলে যাচ্ছে বা চলে গেছে তাদের হয়তো এই জিনিসটাকে জোট করাটাকে পছন্দ হয়নি তাদের। আর যেহেতু পছন্দ হয়নি এবং তারা নির্বাচনের মাঠে রাজনীতির মাঠে অনেকদিন যাবত আছে অনেকেই নির্বাচন করার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। এই যে তারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ইলেকশন করছে আমি আমার কাছে মনে হয় এটা আমি প্রশংসাই করব।
“যে তারা নিজেরা নিজেদের পরিচয়ে নির্বাচন করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে এবং বিশেষ করে এনসিপির যারা নারী নেত্রী আছে তারা। এটা নিঃসন্দেহে আমি প্রশংসা করবো।”
ভোটের আগে বরাবরই দুটি ধারায় ভাগ হয়ে যায় রাজনীতি; এবারও তাই হয়েছে বলে মনে করছেন আব্দুল আলীম। বলেন, “এখন বড় দুটো জোট হয়ে গেল মূলত। একটা বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট আর একটা জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট। এবং এটা কিন্তু একদম শেষ মুহূর্তে হলো।”
অনেকে দল নিজেদের বিলুপ্ত করে বিএনপির সঙ্গে চলে এসেছে তুলে ধরে তিনি বলেন, এরকম ঘটনার নজির আগে তেমন দেখা যায়নি।
তিনি বলেন, “ছোট ছোট পলিটিক্যাল পার্টি মার্জ হয়ে গেল বড় দলের সঙ্গে; তারা মূলত শুধু নির্বাচনে জেতার জন্যই পলিটিক্স করে এবং বড় দলকে ব্যবহার করতে চায় তার প্রমাণটা কিন্তু এবার হয়ে গেল। তারা তাদের প্রতীককে, দলের নিবন্ধন, তাদের আইডিওলজি এটাকে জনগণের কাছে নিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়ে গেছে; যে কারণে তারা এই কাজ করেছে ।”
আব্দুল আলীমের মতে, “দ্বিদলীয় ব্যবস্থার মতো, দুইটা মেজর অ্যালায়েন্স। শুরু থেকেই আসলে নরমালি দুইটা সাইডই থাকে এখানকার ইলেকশনে। তৃতীয়বা চতুর্থ আমরা সাধারণ দেখতে পাই না। মানে দুইটা গ্রুপই থাকে দুইটা অ্যালায়েন্সই থাকে এটা আমাদের নির্বাচনের কালচার ইতিহাস। এভাবে তো নতুন কোন কিছু না।
“কিছু কিছু দল নতুন করে এই যে বিলুপ্ত হয়ে গেল বা হঠাৎ করে অন্য অন্য অ্যালায়েন্সে যোগদান করলো কিছু নতুন জিনিস আমরা দেখতে পাচ্ছি।”

‘দলের মধ্যে আদর্শিক লড়াই থাকতেই পারে’
রাজনীতির বিশ্লেষক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানের মতে দলের মধ্যে আদর্শিক লড়াই থাকাটাই স্বাভাবিক।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “দলের সবার চিন্তা-চেতনাতো একরকম হবে না। এটা স্বাভাবিক। দলের কেউ মনে করেছেন আমাদের জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটে যাওয়া দরকার, আবার কেউ মনে করছেন না যাওয়া ভালো। এ নিয়ে আদর্শের লড়াই থাকতেই পারে।”
জোট গঠন হলেও এটি এনসিপির আদর্শ হারাবে না বলে তুলে ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এই অধ্যাপক বলেন, “বৃহত্তর জোটে গেলে রাজনৈতিক দলের চরিত্র পরিবর্তন নষ্ট হয় না, যদি সে আদর্শিকভাবে পরিবর্তিত না হয়। বিভিন্ন জোটে বিভিন্ন দল যেতেই পারে, আগেও গিয়েছি।
“জোটে যাওয়াটা আদর্শের বিষয় না, এটা রাজনৈতিক সুবিধা-অসুবিধা পাওয়ার বিষয়। আগের যেসব রাজনৈতিক দল জোট করেছে, তাদের আদর্শের কি পরিবর্তন হয়েছে, না হয়নি।”
আরও পড়ুন
এই এনসিপির অংশ আমি হচ্ছি না: মাহফুজ
এনসিপি ও এলডিপি জামায়াতের জোটে: শফিকুর
এবার এনসিপি ছাড়লেন তাজনূভা জাবীন
'দল ভুল পথে': ফেইসবুকে ঘোষণা দিয়ে পদত্যাগ এনসিপি নেতার
জামায়াত ‘নির্ভরযোগ্য মিত্র না’, কঠিন মূল্য ‘চুকাতে হবে’ এনসিপিকে: সামান্তা
জামায়াতের সঙ্গে জোটে 'আপত্তি' এনসিপির ৩০ কেন্দ্রীয় নেতার
আওয়ামী লীগের ভোট টানতে বিএনপি-জামায়াত ‘রীতিমত কম্পিটিশন’ করছে: নাহিদ
পদত্যাগ করেছেন উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম