শামসুর রাহমান, আহমদ ছফা আর অসাধু লেখক সমাজ

"আমাদের অসাধু লেখক সমাজের 'ভার্জিনিটি' এবং 'পার্সোনালিটি' দুটোই খোয়া গেছে। শামসুর রাহমান এবং আহমদ ছফার মত বুদ্ধিজীবীর অভাবে সেই সত্যটাও আঙ্গুল দিয়ে দেখাবার কেউ নাই। আমাদের বাতিঘরগুলোও অন্ধকারে।" আহমদ ছফার মৃত্যুদিনে তার স্মরণে লিখেছেন আনিসুর রহমান।

আনিসুর রহমানআনিসুর রহমান
Published : 28 July 2022, 03:37 PM
Updated : 29 July 2022, 10:45 AM

পশ্চিমা দুনিয়ায় রাজনীতি, ব্যবসা আর কূটনীতি থেকে শুরু করে বিনোদন জগতের পরিচিত মুখগুলো ঝোপ বুঝে কোপ মারার মতো করে টুইট করেন বা রিটুইট করেন অর্থাৎ টুইটারে বাণী ছাড়েন। আমাদের দেশে টুইটার অতটা জনসম্পৃক্ততা বা জনপ্রিয়তা না পেলেও ফেইসবুক ঘরের খবর বাইরে আনতে বা বাইরের খবর ঘরে পৌঁছাতে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়ে গেছে। এর ভালো খারাপ বিশ্লেষণ এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। পশ্চিমা দুনিয়ার টুইটের মতো আমাদের দেশেও ফেইসবুকে ‘স্ট্যাটাস-পাল্টা স্ট্যাটাস’ পর্ব চলছে। কারো কারো দিনমান গুজার এ ফেইসবুকেই। কেউ কেউ বয়ান ছাড়েন ওহী নাজিল করার মতো ভঙ্গিমা করে। চলুক। মন্দ কী?

যার যার জায়গা থেকে কারো কারো দর্শনিকসুলভ গভীর ভাবনার উদ্রেককারী কথাও থাকে। সম্প্রতি আমাদের এক বয়োজ্যেষ্ঠ বুদ্ধিজীবী ফেইসবুকে একটি বয়ান দিয়েছেন। বয়ানটা দেখে আমিও কিছুটা ভাবনায় পড়ে গেছি। আদতে হচ্ছেটা কী! উনি যদি বয়ানটা খোলাসা করে একটু বিশ্লেষণ করে দিকনির্দেশনামূলক একটা প্রবন্ধ বা নিবন্ধ লিখতেন তাহলে আমাকে এতটা ভাবনায় পড়তে হতো না। সবাই কেন যেন সংক্ষেপে দায়সারা গোছের কিছু একটা বলে বা করে পার পেতে চান কিংবা চমক দিতে চান।

এই বিষয়ে আরো কথা বলার আগে বুদ্ধিজীবীর সেই বয়ানটায় একটু চোখ বুলিয়ে নেয়া যাক:

আমাদের দেশের কবি-সাহিত্যিক, শিল্পী-সাংবাদিক, আমলা ও বুদ্ধিজীবীরা ভালো কিছু না লিখেই, সমাজের জন্যে ভালো কোনো কাজ না করেই 'বড় কিছু' হতে চায়। ‘আমি কী হনুরে' ভাব দেখিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করা যায় -- কিন্তু মানুষের মন জয় করা যায় না রে পাগল।

এখন এই ভয় দেখানোর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ফেইসবুক কিভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে সেই বিষয়ে কিঞ্চিৎ একটু ধারণা দিয়ে লেখার মূল প্রসঙ্গ অবতারণা করবো।

আমার এক বন্ধু চুক্তিভিত্তিক রাজনৈতিক নিয়োগে বছর কয়েক আগে নতুন আমলা হয়েছেন। উনার পদায়ন ঢাকার বাইরের কোনো এক জেলাসদরে। উনার পদমর্যাদা জেলাপ্রশাসকের দুই এক ধাপ নিম্নপর্যায়ে। উনি সারাক্ষণ জেলাপ্রশাসকের ভয়ে তটস্থ থাকেন, যাবতীয় ফাইল যেহেতু জেলাপ্রশাসকের মাধ্যম হয়ে উপরের দিকে যায়। সব ফাইল জেলাপ্রশাসক বসের কাছে আটকে থাকে। কী আর করবেন আমার ওই বন্ধু কবি-আমলা? আমার ওই বন্ধু কবিতা উৎসব এবং বইমেলা উপলক্ষে ঢাকায় এসেছেন। উনি বয়োজ্যেষ্ঠ দুই একজন সচিব-কবি-লেখকের সঙ্গে কিছু ছবি ওঠাবেন, সেলফি তুলবেন তারপর ফেইসবুকে পোস্ট দিবেন। একপর্যায়ে ওগুলো বাঁধাই করে অফিস রুমে ঝুলিয়ে রাখবেন। আমি ভেবেছি কথাগুলো এমনি এমনি বলছেন, কেবল বলার জন্যে। ঠিক ঠিক উনি তা-ই করলেন। ছবিগুলো ঢাকার নীলক্ষেত স্টুডিও থেকে ছাপিয়ে বাঁধাই করে ওগুলো সঙ্গে নিয়ে তারপর তিনি কর্মস্থলে ফিরলেন। এরপর উনি মোটামুটি ঝামেলা এড়িয়ে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। ফর্মুলাটা মন্দ কীসে?

আরেকটা ভয় তাড়ানো বা ভয় দেখানোর নমুনা দেখাই। কেউ কেউ এমনকি অনেক নামি দামি মানুষ, বিশেষ করে তদবিরবাজি করে যাদের দিন আর রাত চলে তারা ক্ষমতার কেন্দ্রের বা পরিকেন্দ্রের মানুষদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা দেখানোর জন্যে নানা হাইপ্রোফাইল পদমর্যাদার মানুষদের নাম ও পদবীসহ ছবি ফেইসবুকে পোস্ট করেন- কোন মন্ত্রী তাকে কী বলেছিল, কোন সচিবের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল, কোন উপাচার্য তাকে চা খাইয়েছিল, কোন পাতিনেতা তার বই কিনেছিল, কোন মডেল তার দিকে তাকিয়েছিল– এইসব স্ট্যাটাস আর ছবি ফেইসবুকে ছাপিয়ে থাকেন।

তবে সবকিছু ছাপিয়ে গিয়েছিল করোনা পরীক্ষার কলঙ্কের নায়ক মোহাম্মদ সাহেদের তেলেসমাতি, ফেইসবুকে বড় বড় মানুষের সঙ্গে নিজের ছবি দিয়ে পাপিয়ার ওয়েস্টিন হোটেল কেলেঙ্কারির ক্ষেত্র তৈরীর গল্প।

এসব ছবি আর প্রোফাইল নিজের ফেইসবুকে দিয়ে আসলে কেউ কেউ একটা বার্তা দিতে চান সাধারণ মানুষদের, বিশেষ করে বাকি যারা নানা পদে আছেন তাদের উদ্দেশে। অর্থাৎ উনাদের পাত্তা দিবেন, উনাদের সুপারিশ, আবদার বা তদবিরকে পাত্তা দিবেন। এই বার্তাটা উনারা দিতে চান। অতএব উনাদের খাতির করবেন কিন্তু।

২৮ জুলাই আহমদ ছফার মৃত্যুবার্ষিকী। ২২ বছর আগে তিনি প্রয়াত হন। তার সময়ে ফেইসবুকের রাজত্ব জাঁকিয়ে বসেনি। আর এই পাত্তা দেওয়া, না দেওয়া কিংবা ভয় দেখানো বা ভয়ে থাকার আবহ আহমদ ছফাকে ঘিরে কেমন ছিল সেই বিষয়ে একটু আলোকপাত করতে চাই।

আহমদ ছফাকে দূর থেকে অনেকবার দেখেছি। কোনোদিন সরাসরি কথা বলার সুযোগ হয়নি বা সাহস করিনি। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তার লেখাজোকা পড়ে, তার সম্পর্কে কিঞ্চিৎ জেনে বিশেষ করে হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে উনার বাহাস পড়ে তাকে নিয়ে একটু ভয় ঢুকে গিয়েছিল আমার ভেতরে। উনার সঙ্গে কথা বললে, উনি না জানি কোন কথা জিজ্ঞেস করে বসবেন বা বেফাঁস কোনো কথা যদি আমাকে বলে বসেন, এই ভয় আমাকে পেয়ে বসেছিল। পরে তিনি একটি লেখায় তার বেফাঁস লেখাজোকার জন্য তরুণদের কাছে ভুল স্বীকার করেছিলেন। এরপর আহমদ ছফার লেখাজোকা যতই পড়ি, তার সম্পর্কে যতই জানি, আমি এক সংবেদনশীল মানবিক আহমদ ছফার দেখা পাই। ততদিনে তিনি আর এই ধরাধামে নাই।

তবে এই ভয়ের ব্যাপারটা একদিকে আসলেই অনাদিকাল থেকে তরুণদের এবং বুড়োদের একটা দ্বন্দ্বের সমীকরণও ক্ষেত্রবিশেষে। এখানে বলে নিই, তারুণ্য মানে কিন্তু বয়সে কম তা না, আবার বয়স বেশি বলেই কেউ বুড়ো, ব্যাপারটা তাও না। তারুণ্য মানে উদ্যম আর ইতিবাচক সৎ কর্মস্পৃহা। এর বিপরীত হলেই তা বার্ধক্য, সে বয়সে যতই তরুণ হোক। আহমদ ছফার সময়ে তরুণ এবং বয়োজ্যেষ্ঠ প্রজন্মের সম্পর্কের একটা চিত্র তুলে ধরতে একটা বিষয় উল্লেখ করতে চাই। ১৯৮৯ সালে আহমদ ছফাকে নিয়ে শামসুর রাহমান দৈনিক পত্রিকায় একটি লেখা লিখেছিলেন। ওই সময়ে শামসুর রাহমানের বয়স ষাট আর আহমদ ছফার বয়স ছিচল্লিশ। ওই সময়টাকে বোঝার জন্যে লেখাটির অংশবিশেষ এখানে তুলে ধরতে চাই:

'আহমদ ছফা, বলা নেই কওয়া নেই, গোড়াতেই আমাকে আক্রমণ করে বসলেন। তাঁর বাক্যবাণে জর্জরিত আমি কোনো জবাব খুঁজে পেলাম না। তাঁর কথা শুনে আমার খারাপ লাগার কথা, কিন্তু কী আশ্চর্য তাঁকে আমার ভালো লাগলো। ইনি পিছন থেকে পিঠে ঠোকর মারেন না, মুখোমুখি বসেই হামলা করেন। অনেকের অভ্যাস হলো পিছন-কামড়ানো, তিনি সেই বদভ্যাস থেকে মুক্ত ছিলেন বলেই তাঁকে আমার ভালো লেগেছিল। যা বলার তা তিনি মুখের উপরেই বলতে পারেন নির্দ্বিধায়। এ ধরনের আচরণ অধিকাংশ ব্যক্তির পক্ষে বরদাশত করা মুশকিল। আমার ভালো লাগে তাঁর মতামতের সততার জন্য। আমাদের লেখক সমাজে বৌদ্ধিক অসাধুতা এতই প্রকট যে এর মধ্যে কারো কারো বৌদ্ধিক সততা, তাঁর ঠোঁট-কাটা হওয়া সত্ত্বেও প্রশংসনীয় ও শ্রদ্ধেয়।'

এখন আমাদের সামনে আহমদ ছফার মতো বৌদ্ধিক সাধু তারুণ্যও যেমন নাই, সেই সঙ্গে নাই তারুণ্যের তেজকে ধারণ করার মতো শামসুর রাহমানের কাছাকাছি কেউ। বয়োজ্যেষ্ঠরা যেমন ধড়িবাজি থেকে মুক্ত না, অন্যদিকে তরুণরাও ঝুঁকে পড়েছে ছলাকলার ফর্মুলার দিকে। আহারে, আমাদের চারপাশের লেখক সমাজ। সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানের পদপদবীকে মনে করে জমিদারি বা পৌত্রিক সম্পত্তি। এসব নিয়ে কারো নাম উল্লেখ করে কাউকে বড় বা ছোট করতে চাই না।

আজ থেকে তিন দশকের অধিক কাল আগে ১৯৮৯ সালে বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে শামসুর রাহমানের পর্যবেক্ষণ ছিল এতটা রাখঢাকহীন। আজকের অবস্থা আরো করুণ, বাইরে সবার ফিটফাট ভেতরে সকলের সদরঘাট।

আহমদ ছফা তার বৌদ্ধিক সাধুতা ধারণ করে তার পাশের তারুণ্যকে কিভাবে দেখতেন তার কয়েকটি দৃষ্টান্ত দেয়া যেতে পারে। তিনি তরুণ বা বয়স্ক কারো সঙ্কট বা সমস্যায় যেমন ঝাঁপিয়ে পড়তেন আবার তাদের সম্ভাবনাকেও আবিষ্কার করতেন। আবিষ্কার করেই ক্ষান্ত থাকতেন না। তার যথার্থ পরিচর্যা, পথনির্দেশ করতেন বা যত্ন নিতেন, উৎসাহ দিতেন নিজের সর্বশক্তি দিয়ে। তার উদাহরণ যেমন এস এম সুলতান আছেন, অন্যদিকে হুমায়ুন আহমেদ, তারেক মাসুদ, ক্যাথেরিন মাসুদ, সলিমুল্লাহ খান, হোসেন জিল্লুর রহমান এরকম অসংখ্য নাম পাওয়া যাবে।

এখন শুরু হয়েছে ল্যাং মারা চর্চা, কে কারে ল্যাং মেরে উপরে উঠতে পারে। আর এই ল্যাং মারার সংস্কৃতিতে লেখালেখিতে নবাগতরা চরম ভুক্তভোগী। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করতে চাই আমার প্রথম বই প্রকাশের ক্ষেত্রে আমি ভাগ্যক্রমে এই ‘ল্যাং মারা’ বাস্তবতা থেকে রেহাই পেয়েছিলাম। প্রথম বই প্রকাশে অগ্রণী সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিলেন অগ্রজ কবি মুহাম্মদ সামাদ এবং কবি আসলাম সানী। এখন সেই বাস্তবতা প্রায় শূন্যের কোঠায়। এখন বয়োজ্যেষ্ঠদের যেমন থাকে নানা স্বার্থ ধান্দা আর বয়োকনিষ্ঠরাও এখন উল্টো রথযাত্রী। আগেভাগে অন্যকিছু, অবস্থা কোথাও পাকাপাকি করে সেই পাকাপাকি পদপদবী আর অবস্থানের প্রভাব খাঁটিয়ে লেখালেখিতে জাল ফেলেন। প্রায় সব্বাই কতই না স্মার্ট, চিন্তা ও চেতনায়। পুরাই একটা স্মার্ট প্রজন্ম। আহমদ ছফা বেঁচে নাই বলে এখনকার বুড়োরাও যেমন, ঠিক তেমনই চ্যাংড়া প্রজন্মের বৌদ্ধিক অসাধু লেখকরাও পার পেয়ে গেল তার ধারালো কথার আক্রমণ থেকে।

একবার কথা প্রসঙ্গে বাংলা একাডেমির সাবেক এক প্রভাশালী পরিচালক এবং কবিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “আপনারা আহমদ ছফার মতো একজন শক্তিশালী লেখককে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার দিলেন না কেন?”

তিনি বললেন, “শুনো, ওনাকে পুরস্কার দেয়া সহজ ব্যাপার ছিল না। উনি বাংলা একাডেমির গেইট দিয়ে ঢুকতেন অনেকটা কথার ঝাল ছাড়তে ছাড়তে। একাডেমিতে ঢুকে রুমে গিয়ে গিয়ে বলতেন, এই আপনি এটা কী লিখেছেন, এটা কিছু হলো? আর বন্ধু স্থানীয় হলে বলতেন, এই তুই কী লিখেছিস? উনি লেখালেখির সব খবর রাখতেন আর সেসব লেখায় ভুল বা অসত্য কোনো কথা পেলে হামলা করে বসতেন। পুরস্কারের জন্যে, তার নাম প্রস্তাব করার মতো কেউ ছিল না, তার পক্ষে কথা বলার মতো সাহসী তেমন কেউ ছিল না।”

এখন ভাবি উনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার না নিয়ে বড় বাঁচা বেঁচে গেছেন। একবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে আমার শিক্ষক কবি অনুবাদক কাজল বন্দোপাধ্যায় একবার বাংলা একাডেমির পুরস্কার কমিটির সভাপতি ছিলেন। আমি উনাকে ফোন করেছি। আমাদের আলাপ মূলত তার সম্পাদিত পত্রিকা 'একবিংশ' (নন্দনতত্ত্ব ও সাহিত্যের এই পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রয়াত অধ্যাপক খোন্দকার আশরাফ হোসেন) এবং দেশবিদেশের লেখালেখির খবরখবর নিয়ে। ফোনটা ওপাশ থেকে বাসার অন্য কেউ একজন ধরেছেন, আমি বুঝতে পারিনি। “স্যার তো বাসায় নেই”। আমি বলেছি, “ঠিক আছে, জরুরি কিছু না, আমার নমস্কার দিয়েন ওনাকে। আমি পরে ফোন করবো।”

পরে স্যার বাসায় ফিরে নিজেই ফোন করেছেন। স্যার জানালেন, “আমি তো এখন কাউকে ফোন করি না, কারো ফোন ধরতেও ভয় পাই।” আমি বলি, “ভয় কিসের, স্যার?” স্যার জানালেন, নানাজনের বইয়ে তার বাসা ভরে গেছে। এতো বই কোথা থেকে পেলেন জিজ্ঞাসা করায় উনি বললেন, “পুরস্কারের লোভ সব। শুরু হয়ে গেছে উৎপাত।”

স্যারের ভয়টা আমি কল্পনা করতে পেরেছিলাম। কেননা ভয়ের সংস্কৃতিটি এমন পর্যায়ে চলে গেছে, একজন বুদ্ধিজীবীও নিজে পুরস্কার দাবি করে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিতে পারেন, সময়টা আমাদের এমনই। বাকি আর কী থাকে পুরস্কার পাবার জন্যে?

কাজল স্যার এর কথা থেকে বুঝলাম, এখন আমরা ‘উৎপাত লেখক সমাজের কাল’ পার করছি। আর এই উৎপাতে উৎপাতগোষ্ঠীর ভয় থাকে ’না পাবার’, ভয় থাকে ’পেয়ে হারাবার’। ’লোভে পাপ পাপে মৃত্যু’ প্রবাদটার মর্মার্থ টের পাওয়া যায় কিছুটা এখানে। আমাদের অসাধু লেখক সমাজের ভয় নিরন্তর। এদের উঠতে ভয়, বসতে ভয়, চলতে ভয়, মুখ খুলতে ভয়, কলম ধরতে ভয়। শামসুর রাহমান এবং আহমদ ছফার এসব কোনো ভয় ছিল না। এসব উৎপাত লেখকদের যত যোগ্যতা তেলামিতে আর চামচামিতে। এতে যে দারুণ লাভের যোগ। এদের কপাল ভালো, শামসুর রাহমানের কথার প্রতিধ্বনি করে বলি, আহমদ ছফার মুখোমুখি কথার হামলা থেকে আজকের অসাধু ধুরন্দর লেখক সমাজ রেহাই পেয়ে গেল।

একটা গল্প দিয়ে লেখাটার ইতি টানতে চাই। জাপানি এক স্কুলপড়ুয়া মেয়ে বাংলাদেশের মেয়েদের 'ভার্জিনিটি' (সতীত্ব) নিয়ে রক্ষণশীল সমাজের মেয়েদের প্রতি দমনমূলক দৃষ্টিভঙ্গির সূত্র টেনে ওদের দেশে সফররত আমাদের কবি দিলদার হোসেনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তুমি কি জানো একটি মেয়ে যেমন 'ভার্জিনিটি' হারায়, একটা ছেলেও কিন্তু একটা কিছু হারায়, বলো তো সেটা কী?” এর উত্তরটাও মেয়েটিই দিয়েছিল। ছেলেরা হারায় 'পার্সোনালিটি' (ব্যক্তিত্ব)! আমাদের অসাধু লেখক সমাজের 'ভার্জিনিটি' এবং 'পার্সোনালিটি' দুটোই খোয়া গেছে। শামসুর রাহমান এবং আহমদ ছফার মতো বুদ্ধিজীবীর অভাবে সেই সত্যটাও আঙ্গুল দিয়ে দেখাবার কেউ নাই। আমাদের বাতিঘরগুলোও অন্ধকারে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক