পেঁয়াজের উৎপাদন খরচ ভারতীয় চাষীদের চেয়ে আমাদের এত বেশি পড়ছে কেন? ব্যয়ের এ ব্যবধান রয়ে গেলে উৎপাদন বাড়ানোর বদলে সহজে আমদানি করে ঘাটতি পূরণের একটা প্রবণতা নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও থেকে যাবে। চাপ সৃষ্টি করবেন আমদানিকারকরাও।
Published : 10 Jun 2023, 02:53 PM
কৃষককে ভালো দাম দেওয়ার জন্য উত্তোলন মৌসুমে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রাখা হয়েছিল কৃষি মন্ত্রণালয়ের চাওয়ায়। এ অবস্থাতেও এবার রমজানে পেঁয়াজের দাম এবার উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল। তখন কি আমদানি করা পেঁয়াজও ছিল বাজারে? যে কারণেই হোক, ওই সময়ে পেঁয়াজের দাম কম থাকায় খুশি ছিল ভোক্তারা। আলুর দামও কম ছিল। কোনো একজন তখন ফেসবুকে মন্তব্য করেছিলেন যে, বাজারে পেঁয়াজ আর আলুর দামই কম। নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সবকিছুর দাম একযোগে বাড়তে থাকার সময় একটা-দুটা পণ্যের দাম কম থাকলে সেটা স্বভাবতই চোখে পড়ে। তার কারণ নিয়েও আলোচনা হয়। হয়তো রিপোর্ট হয় মিডিয়ায়।
ওই দুটি পণ্যের দাম কম থাকার কারণ হিসেবে ফলন ভালো হওয়ার কথা বলা হয়েছিল। চাহিদার চেয়ে বেশি ফলন হওয়ায় আলু রপ্তানি করা হবে বলেও তখন খবর বেরোয়। এর ফলো-আপ জানি না। ইতোমধ্যে আলুর দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। রপ্তানির উদ্যোগের খবরেই কি দাম বাড়ল? নাকি অতিরিক্ত উৎপাদনের যে খবর দেওয়া হয়েছিল, তাতে কিছু গলদ আছে?
পেঁয়াজও নাকি চাহিদার বেশি উৎপাদন হয়েছে এবার। তাতে আবার দাম পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা। সেটা দূর করতেই পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ করা হয় মার্চের মধ্যভাগে। এ অবস্থায় পণ্যটির দাম ক্রমে বাড়তে থাকে। বাড়তে বাড়তে এক মাসের ব্যবধানে দাম দ্বিগুণ, আড়াইগুণ, তিনগুণ হয়ে যায়। তাতে স্বভাবতই টনক নড়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের। ভোক্তাস্বার্থ রক্ষায় পেঁয়াজ আমদানির ওপর জোর দেন তারা। চিঠি দেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে। তবে পেঁয়াজ আমদানির সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করে ফেলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এতটা দেরি না করলে ৩০-৩৫ টাকা কেজির পেঁয়াজ ৯০-১০০ টাকা হয়ে যেতে পারতো না। এর কেজিপ্রতি দাম ৫০ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার সময়ই আমদানির আহ্বানে সাড়া দিতে পারতেন তারা।
কেজিপ্রতি পেঁয়াজের উৎপাদন ব্যয় এবার কেমন পড়েছিল, সে খবর এসেছিল সংবাদপত্রে। সে অনুযায়ী ভোক্তা পর্যায়ে ৪৫-৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হলেও কৃষকের ভালো লাভ থাকার কথা। প্রশ্ন হলো, পণ্যটির দাম বাড়তে বাড়তে ৯০-১০০ টাকা হয়ে যাওয়ার সময়টায় কত শতাংশ কৃষকের হাতে পেঁয়াজ ছিল? নাকি এতে করে বড় ব্যবসায়ীরাই লাভবান হয়েছে? কৃষকের কাছে ওই সময়ে পেঁয়াজ থাকলেও তারা ধনী কৃষক, যাদের কৃষিপণ্য ধরে রাখার ক্ষমতা আছে। ছোট ও মাঝারি কৃষকের তা নেই। আর পেঁয়াজ তো পচনশীল পণ্য। যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করলে এর একাংশ নষ্ট হয়ে যাওয়ার শংকা থাকে। আমাদের পেঁয়াজ সংরক্ষণ পদ্ধতি এখনও মানসম্মত নয়। এর ভালো ব্যবস্থা হয়নি বলে উৎপাদিত পেঁয়াজের একটা বড় অংশ আমাদের হারাতে হয়। পেঁয়াজের মতো পণ্য তো সময়ান্তরে শুকিয়েও ওজন হারায়। এজন্য চট করে বলে দেওয়া ঠিক নয় যে, চাহিদার চেয়ে বেশি পেঁয়াজ উৎপাদন করে ফেলেছি। হাতে আসা পেঁয়াজের ২৫-৩০ শতাংশ বাদ দিয়ে হিসাব করাই এক্ষেত্রে নিরাপদ।
এ কারণে সাবধানতার সঙ্গে আমদানি বজায় রাখাও ভালো। দেশে উৎপাদিত ও আমদানি করা পেঁয়াজ একযোগে বাজারে থাকলে সেটা ভোক্তার জন্য স্বস্তির। যে কোনো পণ্যের ভোক্তার সংখ্যা তো বহুগুণে বেশি। তাদের প্রত্যাশার একটা চাপ থাকে নীতিনির্ধারকদের ওপর। সময়মতো এতে সাড়া দিতে হয়। পেঁয়াজের ক্ষেত্রে এবার সেটা দেরিতে ঘটেছে বলেই মনে হয়। দাম অনেক বেড়ে যাওয়ার পর আমদানির অনুমতি দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। আর এটা ঘটেছে এমন সময়, যখন অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামে নিম্নমধ্যবিত্তের অভিযোগও তীব্র। সরকার পরিবেশিত তথ্যেই মূল্যস্ফীতি যখন ১০ স্পর্শ করতে চলেছে।
এটা সুবিধাজনক যে, পেঁয়াজের মতো পণ্য আনা যায় প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে এবং দ্রুত। ভারতেও পেঁয়াজের ভালো উৎপাদন হয়েছে এবার এবং সেখানে পণ্যটির দাম বেশ কম। বাংলাদেশ ওখান থেকে নিয়মিতভাবে পেঁয়াজ আনে বলে আমরা এক্ষেত্রে তাদের একটা রপ্তানি গন্তব্য। মাঝে এমন খবরও বেরিয়েছিল, বাংলাদেশে পেঁয়াজের ফলন ভালো হওয়ায় আমদানি বন্ধ রাখা হয়েছে বলে ভারতের পেঁয়াজ চাষীরা সংকটে। তারা ভালো দাম পাচ্ছে না। এখন আমদানি শুরু হওয়ায় ভারতে উৎপাদিত পেঁয়াজের দামের যে খবর মিলছে, তাও কিছুটা অবাক করে। একযোগে বিপুল আমদানির ক্ষেত্রে ক্রেতা অবশ্য ভালো দাম পেয়ে থাকে। আর কর-শুল্ক, পরিবহন ব্যয় ইত্যাদি মিটিয়ে একটা মুনাফা রেখেই তারা সেটা বিক্রি করে পাইকারদের কাছে। হাতবদল হয়ে এই পেঁয়াজ আসবে ভোক্তার নাগালে। তাতেও আমদানি করা পেঁয়াজের কেজিপ্রতি দাম নাকি কোনোভাবেই ৪০ টাকা ছাড়াবে না। মজার কথা, ভারত থেকে আমদানি শুরুর খবরেই দেশে দাম কমতে শুরু করে পেঁয়াজের। এমনকি কয়েক ঘণ্টায় দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার খবরও পাওয়া যায়। এতে আবার নতুন করে বোঝা গেল, পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছিল একশ্রেণির ব্যবসায়ী। তাদের অবশ্য আলাদা করে দোষ দেওয়া যাবে না। এও ঠিক, বেশি দামে যারা পেঁয়াজ মজুদ করেছিল, তারা পড়লো লোকসানে। বিচক্ষণ ব্যবসায়ীরা অবশ্য খোঁজ রাখে যে, পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার কী করতে যাচ্ছে। সুতরাং 'ড্যামেজ কন্ট্রোলের' ভাবনাও তাদের মাথায় থাকার কথা।
বাজারে এখন দু'রকম পেঁয়াজই থাকবে।দুই পেঁয়াজ বিক্রি হবে ভিন্ন দামে। রান্নায় যার যে ধরনের পেঁয়াজ পছন্দ, তিনি সে পেঁয়াজ সংগ্রহ করবেন। আমদানি করা বড় সাইজের পেঁয়াজ কাটা সুবিধাজনক বলে গৃহকর্মীরাও ওটা পছন্দ করে। রেস্তোরাঁয় এর চাহিদা বেশি। তবে দেশি পেঁয়াজ সম্ভবত সংরক্ষণের জন্য ভালো। পেঁয়াজের মতো পণ্য আবার অনেকে একবারে বেশি করে কিনে ফেলে। দাম বৃদ্ধির শঙ্কা থাকলে সেটা বেশি করে লোকে। এখন তো দাম কমে যেতে শুরু করেছে পেঁয়াজের। তাই বেশি বেশি পেঁয়াজ কিনে খাটের নিচে রেখে দেওয়ার প্রবণতা কম থাকবে। এও ঠিক, সামনে কোরবানি ঈদ। এ সময়ে পেঁয়াজের চাহিদা বাড়বে নতুন করে।
এ মৌসুমকে নাকি টার্গেট করেছিল বড় ব্যবসায়ীরা। সরকারও সম্ভবত কোরবানির সময় পেঁয়াজের বাজার স্বাভাবিক রাখতে আমদানিটা শুরু করে দিয়েছে। এটা তার মধ্যবর্তী লক্ষ্য। এখন ধাপে ধাপে আমদানি হওয়াই ভালো। যে পরিমাণ ঘাটতি রয়েছে বলে অনুমান করা যাচ্ছে, সেটা মাথায় রেখেই নিশ্চয় আমদানির অনুমতি দেবে কৃষি মন্ত্রণালয়। এদিকে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভে বড় সংকট রয়েছে। সে কারণেও রয়েসয়ে আমদানি করতে হবে। গোমাংসের দাম কেজিপ্রতি ৮০০ টাকা হয়ে যাওয়ার পর এটাও ভারত থেকে সস্তায় আমদানির কথা উঠেছিল। সীমিতভাবে গোমাংস (প্রধানত মহিষের মাংস) আমদানি তো সবসময়ই হচ্ছে। সেটা আরও বাড়ানোর কথা উঠেছিল আসলে। তবে মনে হয় না, কোরবানির আগে এ দাবি পূরণ করা হবে। এক্ষেত্রে পেঁয়াজের কথা আলাদা। এটা সর্বসাধারণের নিত্যব্যবহার্য পণ্য। সবজি বললে সবজি; মসলা বললে মসলা।
আমাদের গোটা মসলার বাজারেই কিন্তু অস্থিরতা আছে। রমজান এবং কোরবানি ঈদের আগে এটা বাড়তে দেখা যায়। মসলা উৎপাদন বাড়ানোয় আমরা জোর দিয়েছি অবশ্য; যেহেতু এর চাহিদা ক্রমে বাড়ছে। মসলা গবেষণায় একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান নিয়োজিত রয়েছে এবং তারা এর জাত উন্নয়নে মনোযোগী। মসলা উৎপাদনে সহজ শর্তে ঋণও জোগানো হয়ে থাকে। উদ্দেশ্য আমদানি কমানো এবং এ বাবদ খরচ হওয়া কষ্টার্জিত বিদেশি মুদ্রা বাঁচানো। প্রয়োজনীয় মসলার সব কিন্তু আমরা উৎপাদন করি না। সেটা সম্ভবও নয়। কোনো কোনো মসলার পুরোটাই আবার করতে হয় আমদানি। যে আদার বিরাট দাম বৃদ্ধি ইতোমধ্যে বহুল আলোচিত, তারও সিংহভাগ আমদানি করতে হয়। এ অবস্থায় পেঁয়াজসহ মসলার উৎপাদন যত বাড়ানো যায়, ততই মঙ্গল। আমাদের তো চালেরও একটা অংশ আমদানি করতে হচ্ছে। গম ও ভুট্টার সিংহভাগ। চিনির প্রায় পুরোটা। ভোজ্যতেলের সিংহভাগ। আর এসবের আমদানিতে অনেক ডলার ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। তার ওপর আছে জ্বালানিপণ্য আমদানির বিরাট চাপ। সেটা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্যও। প্রধান রফতানি খাত যে গার্মেন্টস, তারও প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও মেশিনারিজ আমদানি করতে হয়।
এ অবস্থায় পেঁয়াজসহ মসলার উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানোটা এক তাৎপর্যপূর্ণ লক্ষ্য। তবে আমাদের কৃষিজমি তো সীমিত এবং সেটাও ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে আবাসন, শিল্প প্রতিষ্ঠাসহ নানা কাজে। এ অবস্থায় কোনো লক্ষ্য অর্জনেই নিশ্চিন্তে দু’হাত বাড়িয়ে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ ঘটে না। সুনির্বাচিত আর নিয়ন্ত্রিতভাবেই এগোতে হয়। এ সীমাবদ্ধতার মধ্যে পেঁয়াজ উৎপাদনে এগিয়ে যাওয়াটা অবশ্যই আলাদাভাবে লক্ষ করার বিষয়।
পেঁয়াজ রপ্তানির এজেন্ডা আমাদের নেই বোধহয়। এটা যথেষ্ট পরিমাণে উৎপাদন করতে পারলেই হলো। পাবনাসহ কিছু জেলা পেঁয়াজ উৎপাদনের জন্য বিশেষভাবে নির্বাচিত হয়েছে। কম জমিতে ও কম সময়ে বেশি উৎপাদন হতে হবে আমাদের লক্ষ্য। এখানে পেঁয়াজের উৎপাদন খরচ ভারতীয় চাষীদের চেয়ে আমাদের এত বেশি পড়ছে কেন? ব্যয়ের এ ব্যবধান রয়ে গেলে উৎপাদন বাড়ানোর বদলে সহজে আমদানি করে ঘাটতি পূরণের একটা প্রবণতা নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও থেকে যাবে। চাপ সৃষ্টি করবেন আমদানিকারকরাও।
মসলার মধ্যে পেঁয়াজের চাহিদা কিন্তু সুবিপুল। এর সরবরাহ আর দাম নিয়ে অস্থিরতাও সৃষ্টি হয় বেশি। পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা গেলে একটা বড় দুশ্চিন্তা থেকে অন্তত রেহাই পাওয়া যায়। এ লক্ষ্য অর্জনে পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে যাওয়ার পরিমাণটাও কমিয়ে আনতে হবে। এক্ষেত্রে পেঁয়াজ উৎপাদনকারী অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতাও কিছুটা পথ দেখাবে হয়তো।