এক অসাধারণ শিক্ষক ও শিক্ষা-উদ্যোক্তার স্মৃতি

তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কেমন চলছে– কচিকাঁচা, হাইস্কুল, ইকবাল সিদ্দিকী কলেজ, মাদ্রাসা, নয়নপুর? স্বপ্নদ্রষ্টার মৃত্যুর পর এদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন চলে তেমন?

রাখাল রাহারাখাল রাহা
Published : 4 March 2024, 12:17 PM
Updated : 4 March 2024, 12:17 PM

২০১৫ সালের ২০ মার্চ প্রিন্সিপাল ইকবাল সিদ্দিকীর সঙ্গে আমার সরাসরি পরিচয়। পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা ও পুস্তক প্রকাশনা বিষয়ে ‘সম্পাদনা’-এর ১২তম কর্মশালায় তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। সেদিনের কর্মশালায় তার সঙ্গে তোলা ছবি তিনি ফেইসবুকে শেয়ার করেছিলেন। ২০২২ সালের ২০ মার্চ তারিখেও তিনি সেই ছবিটা পুনরায় শেয়ার করে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ২০২৩-এর ২০ মার্চের ক’দিন আগেই তিনি চির-অপরিচয়ের দেশে চলে গেলেন!

সরাসরি পরিচয়ের আগে ফেইসবুক-সূত্রে তাকে এবং তার শিক্ষাউদ্যোগ সম্পর্কে আমি জানতাম। তিনিও আমার শিক্ষা, সাহিত্য, সম্পাদনাসহ নানাবিধ কর্মকাণ্ড ও বিচিত্র লেখালেখি বিষয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে খুবই ইতিবাচক মতামত দিতেন। আবার সমালোচনা যখন করতেন, সেগুলোও খুব বস্তুনিষ্ঠভাবে করতেন।

একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে। মতিঝিলের শাপলা চত্বরের ঘটনা নিয়ে নানাবিধ অতিরঞ্জনে ফেইসবুকে একবার কয়েকটি প্রশ্ন রেখেছিলাম: লক্ষ মানুষের উপর গোলাগুলিতে এক হাজার মানুষ নিহত হলে আহত হয় কত হাজার মানুষ? সেই আহত মানুষগুলো কোথায়? তারা কোন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিলেন, কত ব্যাগ রক্ত লেগেছিল? ইত্যাদি। অনেকেই অনেক এলোমেলো উত্তর করেছিলেন। কিন্তু তিনি যে উত্তরটা করলেন, “১ জন মানুষ নিহত হলেও মানবতা নিহত হয়।”

এরপর থেকে যত দিন গেছে ততই আমাদের যোগাযোগ শুধু নয়, কাজের সম্পর্কও বেড়েছিল। অনেকদিন তার ওখানে যাওয়ার ইচ্ছে করতাম। তিনিও বলতেন আসতে। একদিন তার কলেজের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে গেস্ট হওয়ার অনুরোধ করলেন। গাড়ি পাঠালেন। গেলাম। তারপর আরও একদিন, সম্ভবত বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। এরপর আরও একদিন ‘তিন ভুবনের শিক্ষা: জাপান-নেদারল্যান্ডস-বাংলাদেশ’ বইটা নিয়ে আলোচনা উপলক্ষ্যে। এরপর অনেকবারই। অনুষ্ঠান হলেই বলতেন, আপনি আসেন, না হলে গেস্ট ঠিক করে দেন। তিনিও আমার কোনো আয়োজনে মনে হলেই চলে আসতেন, বাসাতেও।

একদিন বললেন, আপনি যখন যেখানে যাবেন, আমাকে বলবেন, আমিও আপনার সঙ্গে যাব। বললাম, আপনার রুটিনের ব্যাঘাত হবে না? বললেন, তেমন বড় রকমের ক্ষতি যদি না হয়, ম্যানেজ করা গেলে যাব।

সেই থেকে আমি সম্পাদনার কর্মশালা নিয়ে বা বিভিন্ন স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার নানা কর্মসূচিতে দেশের বিভিন্ন জেলায় গ্রাম-শহরে যখন-যেখানে যেতাম, তিনিও ছিলেন আমার সঙ্গী।

একবার বগুড়া বা যশোরে মাদ্রাসার অনুষ্ঠান শেষে ফেরার পথে বললেন, তিনি একটা মাদ্রাসাও করবেন। বললাম, আপনার প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে এটা খুব একটা যায় না। তাছাড়া এ বিষয়ে আপনার অভিজ্ঞতাও নেই। তিনি বললেন, কিন্তু সমাজের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশের মাঝে আমরা মাদ্রাসা ছাড়া পৌঁছাতে পারব না।

তার যুক্তিটা ছিল অকাট্য। এবং দেখলাম খুব শীঘ্রই তিনি সেটারও উদ্যোগ নিয়ে ফেললেন।

২০২০ সালের মার্চ মাসের শেষের দিকে ঢাকাতে যখন করোনা লকডাউন শুরু হলো, সকল হোটেল-রেস্তোরা, এমনকি ফুটপাতের দোকানও বন্ধ হয়ে গেল, রাস্তার মানুষ শুধু নয়, খেটে খাওয়া অসংখ্য মানুষ খাবারের অভাবে একেবারে অসহায় হয়ে পড়ল, তার কয়েকদিনের মাথায়ই রাষ্ট্রচিন্তা থেকে আমরা ঝুঁকি নিয়েও দুপুরে রান্না করা খাবার বিতরণ শুরু করি। দেশ-বিদেশের বহু মানুষ তখন আমাদের সেই উদ্যোগে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসেন। প্রিন্সিপাল ইকবাল সিদ্দিকীও নানা সময়ে সহযোগিতা করেন।

প্রথম লকডাউনের কিছুদিন পরেই ২০২০-এর এপ্রিল মাসের শেষের দিকে যখন রোজা শুরু হবে, তখন আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম সেহেরি হিসাবে মধ্যরাতে খাবার বিতরণ করব। সে-সময়ই ইকবাল সিদ্দিকী ভাই সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনিও তার প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন ইফতারি বিতরণ করবেন। এবং তিনি তা বাস্তবায়ন শুরু করলেন।

রাজেন্দ্রপুর ক্যান্টনমেন্টের একেবারে সামনে স্বাস্থ্যবিধি মানার বহু ঝামেলা সামাল দিয়ে সেসময় ওই আয়োজন করা কত কঠিন ছিল, তা এখন অনেকের পক্ষেই বোঝা সম্ভব নয়। প্রথমে সবাই নিরাপদ দূরত্বে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে ইফতারি গ্রহণ করতেন।

এমন ছবি দেখে একদিন তাকে বললাম, মানুষকে এভাবে দাঁড় করিয়ে রেখে ইফতারি দেওয়াটা কেমন যেন দেখায়। সবার বসার জন্য চেয়ারের ব্যবস্থা করা যায় না? তিনি বললেন, তিন-চারশ চেয়ার! এত চেয়ার কীভাবে ম্যানেজ হবে? বললাম, এখন তো ডেকোরেটরের দোকানগুলো সব বন্ধ। পাঁচজনকে বললে হয়তো একজন সহজ শর্তে চেয়ার দিতে রাজি হবে। তিনি কীভাবে ম্যানেজ করলেন জানি না, দেখলাম কয়েক দিনের মধ্যেই সবাই ইফতারির জন্য সারিবদ্ধভাবে বসে আছেন।

করোনা চলে গেছে। আমাদের কার্যক্রম থেমে গেছে। কিন্তু তিনি থামান নাই। তার আয়োজনের পরিধি বছর বছর বেড়েই চলেছে। প্রতিবছর রোজা এলেই তার শেয়ার করা কিছু ছবি দেখতাম। অভাবী মানুষ চেয়ারে বসে আছেন ইফতারির জন্য। কোনো হুড়োহুড়ি নেই, হাঙ্গামা নেই, লাইনে দাঁড়ানো নেই, না পাওয়ার বিড়ম্বনা নেই, অপমান-হতমান নেই, ধমক খাওয়া আর ছবি তোলার অবমাননা নেই – নির্দিষ্ট সময়ে নিজ নিজ ইফতারি নিজ হাতে নিয়ে যার যার গন্তব্যে চলে যাচ্ছেন। প্রতিটি বক্সে আছে পর্যাপ্ত সবজি-খিচুড়ি, কয়েকটা খেজুর, একটু শশা আর একটা ডিম। আমার মনে হতো বাংলাদেশে রমজানের সবচেয়ে সুন্দর ছবি ছিল সেগুলো।

একবার বললেন, শিক্ষার্থীদের নিয়ে নতুন কি প্রোগ্রাম করা যায় বলেন তো? বললাম, চাঁদ-তারা দেখার প্রোগ্রাম করেন। বললেন, কী রকম? বললাম, পূর্ণিমা রাতে টেলিস্কোপ নিয়ে ছাদে একটা প্রোগ্রাম করেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলেন। বললেন, আপনি ব্যবস্থা করে দেন, টাকা নিয়ে ভাববেন না। ভাবলাম, এই সেরেছে, বলার সময় তো এত ভাবিনি! পরে বুয়েটের কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ করে ঠিক পরের পূর্ণিমাতেই দুদিনের একটা প্রোগ্রামের আয়োজন হলো। শেষ হলে বললাম, কেমন হয়েছে প্রোগ্রাম, বাচ্চারা খুশী? বললেন, কি দেখছে না দেখছে তার চেয়ে রাত্রিবেলা স্কুলের ছাদে সবাই মিলে টেলিস্কোপে তাকাচ্ছে এটাই তো ওদের কাছে মহা আনন্দের ব্যাপার!

মৃত্যুর কিছুদিন আগে থেকেই তাকে যেন একটু অস্থির লাগত। একবার নারায়ণগঞ্জের একটি স্কুলে একজন লেখক হিসাবে আলোচনা করতে যাওয়ায় তাকে আর জানাইনি। পরে তিনি ছবি দেখে বললেন, আমাকে বাদ দিয়েই গেলেন? বললাম, বাদ দিইনি। বুঝতে পারিনি এমন ঘরোয়া অনুষ্ঠানে আপনার কথা তাদের কেমন করে বলব।

এর কয়েক মাস পরেই নারায়ণগঞ্জের আরেকটি স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণে আমার যাওয়ার কথা শুনে তিনিও পৃথকভাবে দর্শক-শ্রোতা হিসাবে সেখানে যাবেন বললেন এবং গেলেন। যাওয়ার পর আমি স্কুল-কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দিলাম এবং তিনিও অতিথি হয়ে আমার সঙ্গে সারাদিন থাকলেন। ফেরার পথে একত্রে তার গাড়িতে করে আসার সময় হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, এমনিতে আছেন কেমন?

প্রশ্নটা ঠিক প্রশ্ন মনে হলো না। মনে হচ্ছিল তিনি আমাকে পড়ার চেষ্টা করছেন। বললাম, আসলে আমাদের সারাজীবন বোধহয় উজানই বাইতে হয়। বাবা-মায়ের পরিবারেও, বিয়ে হলে সংসারেও। বাবা-মায়ের পরিবারে উজান বাওয়া অনেকটা সহজ, কিন্তু সংসারে বেশ কঠিন এবং এতে অনেক এনার্জি যায়। কিন্তু সন্তান বড় হলে যদি সেখানেও উজান বাইতে হয়, তখন বোধহয় এনার্জিতে আর কুলায় না, ক্লান্ত লাগে।

তিনি সেদিন আর কোনো কথাই বললেন না। কয়েক সপ্তাহ পরই নভেম্বরের মাঝামাঝি ময়মনসিংহে একটা স্কুল উদ্বোধনের আমন্ত্রণ ছিল। বললাম, চলেন। বললেন, আগের দিন রাতে রাঙামাটি থেকে ফিরব, তবু আপনি বললে তো যেতেই হবে। ঠিক হলো আমি রাজেন্দ্রপুর তার স্কুলে দুপুরের দিকে পৌঁছাবএবং তারপর একত্রে যাব। সেদিন তিনি আমাকে তার বাসায় নিয়ে গেলেন। বললেন, আপনার জন্য একটা ঘর তৈরি করেছি, চলেন দেখবেন। বলে ছাদে নিয়ে গেলেন। দেখলাম চারপাশের ছাদবাগানের মাঝে দুটো বিছানা, বাথরুম, কিচেনসহ সুন্দর একটা রুম। বললেন, ভালো না লাগলেবা লেখালেখির দরকার হলে এখানে এসে থাকবেন।

গত বছর জানুয়ারির মাঝামাঝি আমার ছোট ভাইয়ের একটা আর্ট এক্সিবিশনের পোস্টার তার মেসেঞ্জারে রেখেছিলাম। ভাবিনি আসবেন। ঠিকই এসেছিলেন রাজেন্দ্রপুর থেকে দীর্ঘ জ্যাম ঠেলে গুলশানের এজ গ্যালারিতে। তাকে দেখে একটু চমকে গেলাম। বললাম, ওজন কি কমিয়েছেন, না কমে গেছে? বললেন, কমিয়েছি, এগারো কেজি। বললাম, হুট করে এতটা ওজন কমানো কি ঠিক হলো? আপনি তো খুব বেশি ওভারওয়েট ছিলেন না। এনার্জি কম লাগে না? বললেন, তা একটু লাগে। কিন্তু ঠিক আছি।

মনের মধ্যে বেশ খটকা লাগল। কয়েকদিন পরই জানলাম তার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে ভর্তি আছেন। ফোন করে অন্যদের কাছে খবর নিলাম, মেসেজ করে তার থেকে উত্তরও পেলাম। কিন্তু কি এক ঝামেলায় যেন হাসপাতালে যেতে পারিনি। ক’দিন পরই রিলিজ নিয়ে আবার ভর্তি হতে হবে এমন প্রস্তুতির মেডিকেশন নিয়ে বাসায় চলে গেলেন। যখন ফোন করে জানলাম চলে গেছেন, বললাম, আপনার সঙ্গে হাসপাতালে দেখা করতে পারিনি। বললেন, সমস্যা কোথায়, এসেই দেখা করতে হবে কেন? আপনার শুভকামনা কি ছিল না?

একদিন বললেন, ঢাকার উত্তরায় আসবেন ডায়াগনসিসে। মনে হচ্ছিল দেখা করা উচিত। গেলাম। অনেকদিন থেকে বলছিলেন তার স্কুলের শিক্ষকদের মানের উন্নয়নের জন্য কিছু করতে। একবার এক গণিত প্রশিক্ষকের কথা বলেছিলাম, কিন্তু দুপক্ষের সময়ে না মেলায় সেটা হয়নি। সেদিন বললেন, আপনিই করুন। আপনি যে বলেন, বাংলা শেখানোর কথা, বাংলা না শেখার কারণেই বাচ্চারা অঙ্ক, বিজ্ঞান, সমাজ, ধর্ম কিছুই পারে না, তো সেটাই শেখান। বললাম, আপনি একটু সেরে উঠুন, তারপর শুরু করি। বললেন, আমার সেরে ওঠার সঙ্গে সম্পর্ক কী? বললাম, ঠিক আছে, আমি জানাব। কিন্তু আপনার অন্তত ব্যাংকক গিয়ে ট্রিটমেন্টটা করতে পারলে ভালো হতো। খরচ হয়তো বাংলাদেশের চেয়ে খুব বেশি হবে না। ভারতেও যেতে পারেন, কিন্তু সেখানে যাওয়া অনেক হাঙ্গামা।

তিনি রাজিও হলেন। কিন্তু ঠিক সিরিয়াস মনে হলো না।

মাঝে মাঝে কথা হচ্ছিল। বললাম, ফেব্রুয়ারির ২৫ তারিখ আসছি আপনার স্কুলে শিক্ষকদের মান উন্নয়ন বিষয়ে প্ল্যান শেয়ার করতে। তিনি বললেন, একটা পিকনিক হতে পারে ২৫ তারিখে, যদি হয় তবে পরের শনিবার। আমি বললাম, তাহলে আমরা সবাই পিকনিকে আসি। তিনি বললেন, চলে আসেন। বললাম, চাঁদা? বললেন, চাঁদা আমি দিয়ে দেব।

সেই শনিবার আশুলিয়ার ফ্যান্টাসি কিংডমে তার সঙ্গে আমরা পুরো পরিবার সারাদিন কাটালাম, খেলাম, ঘুরলাম। এখনও চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই, আমরা ছেলেমেয়ে নিয়ে এ-রাইড থেকে ও-রাইড ঘুরছি, আর তিনি একটা ছায়া জায়গায় পাথরে বসে আমাদের দিকে হাসি-হাসি মুখ নিয়ে তাকিয়ে আছেন।

পিকনিক শেষ করে আমরা আমাদের মতো ফিরে এলাম। পরের শনিবার ৪ঠা মার্চ আমার তার স্কুলে যাওয়ার কথা। সাজাচ্ছিলাম প্ল্যানটা। ৩ তারিখেই জানলাম, তার আবারও হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, আবারও হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে, সিসিইউতে আছেন। ৪ তারিখ দুপুরের পর যখন গেলাম, দেখলাম অক্সিজেন চলছে, তিনি যেন হাঁপাচ্ছেন। এসি রুম, কিন্তু সবগুলো এসি নষ্ট। একটা ঘরে ২৫-৩০ জন রোগী। অ্যাটেন্ডেন্ট, সিস্টার মিলিয়ে প্রায় ৫০-৬০ জন মানুষ। শুধু একপাশের দুটো জানালা খোলা, ঠিক খোলা নয় কাচ ভাঙা! এটুকু অক্সিজেনে সুস্থ মানুষেরই অসুস্থ হওয়ার কথা। অথচ এটুকুই এই মহা উন্নয়নী রাষ্ট্রের হৃদরোগের সর্বোচ্চ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে নাগরিকের জন্য বরাদ্দ!

হাতটা ধরলাম। একটু ম্যাসাজ করলাম, যেন কিছুটা আরাম পাচ্ছিলেন। কিন্তু ভীড়ের কারণে বের হয়ে আসতে হলো। বাইরে তার স্কুল-কলেজের শিক্ষক-কর্মকর্তা, আত্মীয়-স্বজন। সবার সঙ্গে এটা-সেটা আলাপ। সন্ধ্যার আগে জানা গেল লাইফ সাপোর্টে এবং তার পরপরই তিনি সব সাপোর্টের বাইরে চলে গেলেন।

অ্যাম্বুলেন্সের পেছনে অন্য গাড়িতে করে সবার সঙ্গে রাজেন্দ্রপুর ইকবাল সিদ্দিকী স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে যখন পৌঁছালাম তখন রাত প্রায় সাড়ে দশটা। মাঠভর্তি মানুষ, মাঝে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স, কাচের জানালা দিয়ে তার মুখখানি দেখা যাচ্ছে। পাশেই স্কুল-বিল্ডিংয়ের সিঁড়ির পাশে তার দেখিয়ে দেওয়া স্থানে কবর খনন চলছে। একা-একা এদিক-ওদিক হাঁটছি। এর-ওর কথা শুনছি। শুনতে শুনতেই বুঝলাম, আমার কাজের এতটা সমর্থক যিনি, আমার পরিবারের এতটা মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী যেই জন, তিনি কি দুঃসহ মানসিক-পারিবারিক যন্ত্রণা বহন করে হাসিমুখে চলেছেন-ফিরেছেন, আর এতগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কল্যাণমূলক কাজ করে গেছেন, আর সেটা জানতে আমার তার মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলো! একসঙ্গে চলে-ফিরেও আমরা মানুষকে এত কম জানি?!

মধ্যরাতে কোনো এক শিক্ষক এসে খাওয়ার কথা বললেন। ছাত্রদের মেসে বসে একটু খেলাম। তারপর একজন আমাকে শোবার ঘর দেখাতে নিয়ে গেলেন। সেই ছ-তলার ছাদের ঘরখানি। বললেন, ভয় করবে না তো? কোনো প্রয়োজন হলে ফোন করবেন।

ঘরে ঢুকে ভাবলাম, এভাবেও কোনো নিজের ঘরে থাকা হয়, যে-ঘরে হয়তো আর কখনো থাকা হবে না। তখন নীচে কবর খোঁড়ার জন্য সিঁড়ির কংক্রিট ভাঙার প্রচণ্ড শব্দ হচ্ছে, জানালার ওপাশে শালবন, ফাল্গুনের শীতল বাতাস – আর ওপাশের রাস্তায় মাঝে মাঝে গাড়ির ছুটে যাওয়া। আয়নাটার সামনে এমনিতেই খানিক দাঁড়িয়ে থাকলাম। এরপর বিছানায় গেলাম।

ঘুম আমার চিরসাথী –জানি কখন ঘুমিয়ে পড়ব, জেগেও উঠব আশা করি। কিন্তু নীচে কংক্রিট ভেঙে যে ঘর আর বিছানা নির্মাণ চলছে, সেখানে যিনি ঘুমাবেন, তিনি তো আর জাগবেন না!

তার মৃত্যুর আজ এক বছর হয়ে গেল! তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কেমন চলছে – কচিকাঁচা, হাইস্কুল, ইকবাল সিদ্দিকী কলেজ, মাদ্রাসা, নয়নপুর? স্বপ্নদ্রষ্টার মৃত্যুর পর এদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন চলে তেমন? জানি না। তার আত্মার শান্তি কামনা।