Published : 06 Jun 2025, 10:48 PM
রাজবাড়ীর প্রশান্ত কুমার দাসের খামারে বড় হয়েছিল সাদা পাহাড়। ৩৮ মণ ওজনের এই গরু তিনি বিক্রি করেছেন প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টাকায়। কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার সৌদি প্রবাসী এক ব্যক্তি কোরবানির জন্য গরুটি কিনে নেন। কিন্তু প্রশান্তের আক্ষেপ খরচের অর্ধেক টাকাও পাননি তিনি। ষাঁড়টির পেছনে তার ব্যয় হয়েছিল ১২ থেকে ১৩ লাখ টাকা।
৬ জুন একটি জাতীয় দৈনিকের সঙ্গে প্রশান্ত সাদা পাহাড়ের দাম কম পাওয়া নিয়ে আক্ষেপ করে বললেন, ‘বড় ষাঁড় কেনার ক্রেতা না থাকায় তার মতো খামারিদের মাথায় হাত পড়েছে।’ ভবিষ্যতে এ ধরনের ষাঁড় পালন করবেন না বলে মনস্থির করেছেন তিনি।
রাজধানীর গাবতলী হাটের প্রিন্স মামুনের কথায় আসা যাক। এই প্রিন্স মামুন কিন্তু একটি উট। পাবনার কাশীনাথপুরে নিজস্ব খামারে এই উটটির লালনপালন করেছেন আমজাদ হোসেন। দাম হাঁকাচ্ছেন ৩০ লাখ টাকা। আলোচনায় আনতে এর নাম দিয়েছেন প্রিন্স মামুন। কিন্তু গাবতলী হাটে কোন ক্রেতা পাননি।
প্রিন্স মামুনকে নিয়ে ৫ জুন আমজাদ বলছিলেন, ‘মানুষ আসে, উট দেখে, দাম জানতে চায়; কিন্তু কেনার ইচ্ছা নিয়ে কেউ দাম বলে না।’ শেষ পর্যন্ত বিক্রি করতে পারবেন কি না— এ নিয়ে দুশ্চিন্তার বলেছিলেন খামারি। প্রিন্স মামুন বিক্রি হলো কিনা, সবশেষ খবর খুঁজে পাওয়া গেল না।
বড় পশুগুলো বিক্রি নিয়ে খামারিরা যখন বেকায়দায় তখন মাঝারি ও ছোট আকারের গরুর চাহিদা তুঙ্গে। বিশেষ করে এক থেকে দুই, আড়াই লাখ টাকা দামের গরু ঈদের আগের দিন শুক্রবারই শেষ হয়ে গিয়েছিল। ওই দিন বিকেলে টেলিভিশনে প্রচারিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায় দুপুরের আগেই গাবতলী হাট প্রায় খালি।
কিন্তু বড় গরু, ছাগল বা উট নিয়ে বিভিন্ন হাটে বসে আছেন বিক্রেতারা। কেন? গত বছর তো সংবাদমাধ্যমগুলোতে দেখা গেছে, ১০, ২০ লাখ টাকা দামের গরু, ছাগল বিক্রি হচ্ছে দেদারসে। ক্রেতা হাসিহাসি মুখ নিয়ে গর্ব করে টেলিভিশনে কিংবা ইউটিউবারদের সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। এবারে যেন এসব উধাও হয়ে গেছে।
৫ জুন সকালে গাবতলী গরুর হাট পরিদর্শন করতে এসে এই প্রশ্নের মুখোমুখি হলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। উত্তরে তিনি বললেন, ‘এখন তো সেই দুর্নীতিবাজরা নেই। দুর্নীতির টাকাও নেই। সে জন্য বড় গরুর ক্রেতা কম।’
অন্তর্বর্তী সরকারেরে এই উপদেষ্টা মোটামুটি বিতর্কের জন্ম দেওয়ার জন্য আলোচিত হলেও এই উত্তরটি মোক্ষম দিয়েছেন। তার এই বক্তব্যের লুকিয়ে আছে রাজনৈতিক অর্থনীতির চিত্র। গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য গত বছর ৫ অগাস্ট সরকার পতনের পর আগের রাজনৈতিক ব্যবস্থা আর নেই। কেমন ব্যবস্থা ছিল আগে? সরকার পরিবর্তনের অর্থনীতির হালচাল জানার জন্য গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রধান দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর শ্বেতপত্র প্রকাশ অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘চামচা পুঁজিবাদ থেকে চোরতন্ত্রে পরিণত হয়েছিল দেশ।’
ব্যাখ্যা হিসেবে দেবপ্রিয় বলেছিলেন, আইন সভা, নির্বাহী বিভাগসহ সবাই গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে চুরির অংশ হয়ে গিয়েছিল। এটাই চোরতন্ত্র। এ জন্য রাজনীতিক, ব্যবসায়ী এবং উর্দি পরা কিংবা উর্দি ছাড়া আমলারা সহযোগী হয়েছিল। অর্থাৎ তার কথার সারাংশ হলো, এমপি, মন্ত্রী, আমলা কিংবা তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে চলা বিশাল এক জনগোষ্ঠী দুর্নীতি করার সুযোগ নিয়েছিল।
এর ফলে তাদের হাতে বিপুল অর্থ পুঞ্জীভূত হয়। এই অর্থ লুকিয়ে রাখা যায়নি। নামে-বেনামে সম্পত্তি তৈরি করে তা দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে দিয়েছিল, যা পরে প্রকাশিত হয়েছে। যেমন-সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ ও ডিবি প্রধান হারুন-উর-রশিদের রিসোর্টসহ অন্যান্য সম্পত্তি।
ঈদ পার্বণে কালো টাকার মালিকরা বিপুল পরিমাণ খরচ করেছে গতবছরও। তাদের খরচের একটি অংশ যেত ওই সব বড় বড় কোরবানির পশু কেনায়। এগুলো যত না ছিল ধর্মীয় কারণে কেনা, তার চেয়ে বেশি ছিল জাহির করা। জেনজি’রা যাকে বলে শো-অফ। এবারের কোরবানির ঈদে তা নেই।
তাদের শূন্যস্থানও সহসাই পূরণ হবার নয়। যে কারণে বড় গরু-ছাগল কিংবা উটের ক্রেতা খুঁজে পাচ্ছেন না খামারিরা। শুধু অর্থনীতির কথা চিন্তা করলে, এটা হয়তো ক্ষতি। কারণ খামারিরা এসব পশুর পেছনে যে অর্থ বিনিয়োগ করেছেন তা বিক্রি না হলে কিভাবে উঠে আসবে।
কিন্তু সুশাসনের প্রশ্নে আবার চিত্রটি ইতিবাচক। যে কারণে একজন খামারি বলেছেন, বড় গরু পালনের ঝুঁকিতে আর যাবেন না তিনি। তার মানে এবার সমাজে একটি সংকেত চলে গিয়েছে। যখন দুর্নীতি করলে শাস্তিতে পড়ার ভয় থাকে না কিংবা সবাই মিলে মিশে দুর্নীতি করা হয়, তখন সার্বিকভাবে পুরো সমাজও দুর্নীতিগ্রস্ত হয়।
সমাজের কিছু মানুষ যখন দেখে টাকার প্রবাহ বাড়ছে, তখন সে ওই অর্থে মালিকদের জন্য নতুন উপযোগ তৈরি করে। বড় বড় কোরবানির পশুগুলো সেই উপযোগ। যা আমরা দেখেছি সাদিক অ্যাগ্রোর খামারে দেখেছি। এখানে আমদানি নিষিদ্ধ ব্রাহামা জাতের কোটি টাকার গরু বিক্রি হয়েছে বলে খবর বের হয়েছিল।
গরুর ক্রেতা কে তা জানতে সোশ্যাল মিডিয়াতে আগ্রহ ছিল তুঙ্গে। গেল বছরের জুনে, একটি পত্রিকার অনুসন্ধানে জানা গিয়েছিল, কোটি টাকার ওই গরুটির ক্রেতা ছিলেন একজন তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী।
এছাড়াও উচ্চবংশীয় গরু-ছাগলের হাইপও তুলেছিল সাদিক অ্যাগ্রো। ফলাফল হিসেবে অস্বাভাবিক দামে বিক্রি হয়েছে কোরবানির পশু। ক্রেতা কারা ছিল বুঝাই যাচ্ছে। এই পর্যন্ত সবই চলছিল। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে জনগণ ছিল লাইক দেওয়ার নীরব দর্শক।
কিন্তু বিপত্তি বাঁধে ১৫ লাখ টাকা দামের ছাগল নিয়ে। যে ছাগল পুরো দেশকে নাড়িয়ে দেয়। ২০২৪ সালের পবিত্র ঈদুল আজহার আগে সাদিক অ্যাগ্রো থেকে ছাগলটি কেনেন রাজস্ব বোর্ডের তৎকালীন সদস্য মতিউর রহমানের দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তান মুশফিকুর রহমান (ইফাত)।
একজন সরকারি কর্মকর্তার ছেলের এত টাকার উৎস কী এ নিয়ে হইচই পড়ে যায় দেশজুড়ে। সমালোচনার মুখে সরকারি পদ থেকে পদত্যাগ করেন মতিউর, গণ-অভ্যুত্থানের পর দুদকের মামলায় তিনি ও তার স্ত্রী লায়লা কারাগারে। যা মতিউরের ছাগলকাণ্ড হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
এদিকে, চাপের মুখে ২০২৪ সালের ৩ জুলাই সাদিক অ্যাগ্রোতে অভিযান চালায় দুদক। আমদানি-নিষিদ্ধ ব্রাহামা জাতের পাঁচটি গরু উদ্ধার করা হয়। পরে মামলা দেওয়া হয় খামরটির মালিক ও খামারমালিক সমিতির সভাপতি ইমরানের বিরুদ্ধে। গেল মার্চে গ্রেপ্তার হন তিনি।
যে ছাগল নিয়ে এত কাণ্ড সে এখন কোথায়? যতদূর জানা যায়, সাভারে সাদিক অ্যাগ্রোর আরেকটি খামারে এটি রাখা আছে।
গেল বছরগুলোর কোনো কিছুই এবারের কোরবানির পশু কেনাকে ঘিরে চোখে পড়েনি। ওই সব ক্রেতাদের বড় অংশই এখন দেশান্তরিত। যারা আছেন তারাও অনেকেই আড়ালে। দুর্নীতির সর্বগ্রাসী বিস্তার যে জবাবহীনতার সংস্কৃতি তৈরি করে তার উপসর্গই ছিল এসব।
বাংলাদেশের অর্থনীতির ৪০ থেকে ৮০ ভাগই কালো টাকা–এমনটাই বলেছিলেন প্রয়াত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত। এই অর্থকে অর্থনীতির মূল ধারায় আনতে এ পর্যন্ত ২২ বার বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। যদিও তাতে খুব যে কালো টাকা সাদা হয়েছে তা নয়।
গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সরকার বৈষম্যহীনতার কথা বলে যে বাজেট ঘোষণা করেছে সেখানেও রাখা হয়েছে এই সুবিধা। যা নিয়ে চলছে সমালোচনা। এবারে আবাসনখাতে এই সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। যদিও তা বিনা প্রশ্নে নয়। অর্থাৎ কালো টাকার মালিককে তার আয়ের উৎস দেখাতে হবে।
অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ সাদা করার সুযোগ মিলবে না। শুধুমাত্র বৈধ পথে উপার্জিত অর্থ কিন্তু সময়মতো ট্যাক্স দেয়া হয়নি সেক্ষেত্রে এই সুযোগ থাকবে। টাকার গায়ে যেহেতু কালো সাদা লেখা নেই, তাই ধারণা করা যায় এই সুযোগটিও এবার খুব একটা কেউ নেবেন না।
তবে বাজেটে এটি রেখে নিজেদের সমালোচিত করে ফেলল সরকার। যার নিন্দা জানিয়ে দুর্নীতি বিরোধী সংস্থা টিআইবি ও অর্থনীতি নিয়ে গবেষণা করা প্রতিষ্ঠান সিপিডি এই সুযোগ বাতিলের দাবি করেছে। বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে অর্থ উপদেষ্টাও এটি পুনর্বিবেচনার কথা বলছেন।
এই ধরনের সুযোগ রাখার অর্থই হচ্ছে দুর্নীতিকে উৎসাহিত করা। আর এসব দুর্নীতির ফলাফল সমাজের শেষ প্রান্তে কিভাবে গিয়ে পড়ে তা কোরবানির পশুর হাটের ছোট্ট একটি উদাহরণ থেকেই বুঝা যায়।