Published : 06 Jul 2025, 05:45 PM
সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা একান্তই জাতীয় সংসদের হলেও অভিনব এক পন্থা চলমান দেশে। ভবিষ্যতে সংবিধানে কী কী সংশোধনী আনা হতে পারে তা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। এ সরকারের অনুমোদিত দলগুলোর দিন কাটছে এ নিয়ে ব্যস্ত আলোচনায়। নানা মতের বেড়াজাল ভেদ করে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় সরকারি খরচায় চলছে এসব সভা। সম্প্রতি এই সভা আসামির সাজা মাফে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতায় পরিবর্তন আনার বিষয়ে একমত হয়েছে।
সম্প্রচারিত ভিডিওতে কয়েকটি ইসলামপন্থী দলের নেতার সংক্ষিপ্ত বক্তব্য শোনা গেছে। তাদের কথায় ফৌজদারি অপরাধের মধ্যযুগীয় মীমাংসার ধারণা ফুটে উঠেছে। তারা ‘ব্লাড মানি’ ও সমগোত্রীয় শব্দগুচ্ছও উচ্চারণ করেছেন। ফলশ্রুতিতে, রাষ্ট্রপতির সাজা মওকুফের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবারের সম্মতির প্রসঙ্গটি যুক্ত করায় ঐকমত্য হয়েছে বলে জানানো হয়। বুঝতে অসুবিধা হয় না, এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে রক্তমূল্য বা ক্ষতিপূরণ প্রথার প্রচলন। ওই সভায় মাঠের রাজনৈতিক নেতারা ছাড়াও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, বিচারপতি, আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন। তবে আধুনিক রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থা নিয়ে কাউকেই কোনো বাক্য উচ্চারণ করতে দেখা গেল না।
কেউ যদি ধাঁধা ধরে—রহিমকে করিম হত্যা করল। করিমকে আসামি করে মামলায় বাদী কে? চট করে উত্তর খুঁজে নাও পেতে পারেন।
মধ্যযুগে অপরাধে সাজার মূলে ছিল প্রতিশোধ গ্রহণ। ওই যুগে ন্যায় বলতে বুঝত—রক্তের বদলে রক্ত, চোখের বদলে চোখ। এর থেকে সম্প্রসারিত পন্থা হচ্ছে এই ক্ষতিপূরণ বা ব্লাড মানি প্রদান। এমন বিচারে সম্পদশালীরা সুবিধাভোগী অবস্থানে থাকে, আলাদা করে তা বলবার প্রয়োজন পড়ে না।
আধুনিক বিচারের চিন্তার ভিতটাই ভিন্ন। ‘আইনের শাসন’ নামক এক ধারণার ওপর এই বিচার ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে—মোটাদাগে যার লক্ষ্য সামাজিক স্থিতিশীলতা। ধারণাটির ভিতে নাগরিকের সুরক্ষায় রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি আইনের প্রতি নাগরিকের আনুগত্যের ধারণা রয়েছে। আধুনিক আদালতে অপরাধের সাজা তাই আগের মতো প্রতিশোধ নির্ভর নয়। সাজা দানে রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের দায়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সহজ ভাষায়, আইন ভাঙার অপরাধ ভুক্তভোগীর চেয়ে মূখ্য হয়ে দাঁড়ায়। তাই হত্যাকাণ্ডের মামলায় বাদী হয়ে উপস্থিত হয় সয়ং রাষ্ট্র, নিহতের স্বজন নয়।
ভুক্তভোগীর স্বজনরা এ মামলায় শুধু সহযোগী মাত্র। ঘটনাটি সমাজ ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হওয়ায় অপরাধ বিবেচনায় তা আর কারও ব্যক্তিগত বিরোধ থাকে না। সমাজে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র বিচার প্রক্রিয়া পরিচালনা করে এবং অপরাধীকে শাস্তি দেয়। সঠিকভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত থাকলে কোনো নাগরিক সে সবল হোক বা দুর্বল—ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন না।
আলোচনার কেন্দ্রে ছিল স্বেচ্ছাচারিতা প্রতিরোধের সদিচ্ছা। সাজা মওকুফে রাষ্ট্রপতি স্বেচ্ছাচারী না হতে পারেন তারই পথ খুঁজতে বসেছিলেন বোধ করি। তার অবশ্য আরও অনেক পন্থা রয়েছে। স্বেচ্ছাচারিতা রোধের কথা ভেবে যারা ব্লাড মানি বা ক্ষতিপূরণ দানকে প্রাধান্য দিচ্ছেন, তারা সমগ্র দরিদ্র-অসহায় নাগরিকদের ন্যায় বিচার পাওয়ার অধিকার হারানোর শঙ্কাটি ভেবে দেখেননি। টাকার জোরে ধনাঢ্য মানুষদের অপরাধ থেকে মুক্তির উপায় খুলে দিচ্ছেন তারা। গরিবের জন্য সাজা, ধনীদের জন্য টাকা—এই ব্যবস্থা কায়েম হবে এতে।
আগেই বলেছি, প্রতিশোধ গ্রহণের চিন্তা থেকে সরে গেছে আধুনিক বিচার ব্যবস্থা। বরং যোগ হয়েছে অপরাধীকে সংশোধন করে সমাজে পুনর্বাসন। টাকার বিনিময়ে সাজা মওকুফ এই প্রক্রিয়ার পরিপন্থি। এতে অনুতপ্ত বা সংশোধিত হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ক্ষমতাবান ও অর্থশালীদের আইনের ঊর্ধ্বে তোলার যে প্রবণতা দেশে গেঁড়ে বসেছে এই আইন তারই সমার্থক।
অপরাধীকে ক্ষমা করার অধিকারটি রাষ্ট্রপতিকে দেওয়া হয়েছে সংবিধানের ৪৯ ধারায়। যে কোনো আদালতের দেওয়া রায়ের সাজাই তিনি মওকুফের অধিকারী। সব সময় শুধু রাষ্ট্রপতির ক্ষমার ঘোষণাটি জনসম্মুখে আসে। কী কারণে, কোন প্রক্রিয়ায় এই ক্ষমা প্রদর্শন করা হলো তা আড়ালেই থেকে যায়। এতে সমাজে সন্দেহ জেগেছে রাষ্ট্রপতিরা অধিকারটির অপব্যবহার করেন কিনা। এমনকি বিগত দিনে কোনো কোনো ক্ষমা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে বিতর্কও।
ব্রিটিশ আইনবিদ এ.ভি. ডাইসি ‘আইনের শাসন’-এর তিনটি স্তম্ভের কথা বলেছেন—স্বেচ্ছাচারিতার ওপর আইনের সার্বভৌমত্ব, ধনী-গরিব সবাইকে একই আইনে বিচার এবং মৌলিক আইনে ন্যায় রক্ষায় ক্ষমতাসীনদের চাইতে বিচারিক প্রক্রিয়াকে প্রধান্য দান। আবার রাজনৈতিক বিবেচনাকে প্রাধান্য দেওয়ার বিপদ সম্পর্কে সচেতন করতে জন লকের বিখ্যাত উক্তি স্মরণ করা যেতে পারে— "Where-ever Law ends, Tyranny begins.” ফলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শন আইনসঙ্গত হলো কিনা তা যাচাইয়ের এখতিয়ার জনগণের রয়েছে। একইসঙ্গে রাষ্ট্রপতি ন্যায় বিচারের প্রক্রিয়া সমুন্নত রেখে এসব ক্ষমা করছেন কিনা তা-ও নিশ্চিত হওয়া বাঞ্ছণীয়।
জেনে রাখা ভালো, বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি কারও সাজা একক ইচ্ছায় ক্ষমা করেন না। দণ্ডপ্রাপ্তের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমার আবেদন করা হয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় মামলার নথি, রায়, বিচারকের পর্যবেক্ষণ, অপরাধীর সামাজিক, ব্যক্তিগত প্রেক্ষাপট ও প্রাসঙ্গিক তথ্য যাচাই করে দেখে। যাচাইয়ের আরও খুঁটিনাটি ধাপও রয়েছে। এরপর তারা সুপারিশসহ আবেদনটি রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠায়। এদিকে, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া আর সব কাজে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিকে কাজ করতে হয়। ফলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা করার ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের ওপরেই শেষমেশ নির্ভরশীল।
এত ধাপ পেরিয়ে যে ক্ষমার জন্য মনোনীত হলো তা দূরাচার নাকি সুবিচার নির্ভর, তা নিয়েই রয়েছে সন্দেহ। জনসম্মুখে সামগ্রিক তথ্য উপস্থাপন না করা এই সংকটের মূলে। স্বচ্ছতার সঙ্গে জনগণকে অবহিত করে সম্মতি গ্রহণের উপায় কিন্তু আছে। দেশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব ঘটে জাতীয় সংসদে। রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে সব তথ্য উপাত্তসহ তা সংসদে উপস্থাপন করা যেতে পারে। তাতে জনগণের প্রতিনিধিদের অনুমোদন যেমন মিলবে, সঙ্গে সঙ্গে অস্বচ্ছতা ও বিতর্কের অবসানও হবে।
প্রসঙ্গত বলি, আদালতের ভুল রায়ের কারণে এই ক্ষমা করা হয় না। অপরাধ করেছে এবং প্রচলিত আইনে সাজা দেওয়া হয়েছে ধরে নিয়েই ক্ষমা করা হয়। তার পেছনে বিচিত্র বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমার হেতুর ন্যায্যতা। এছাড়া শাস্তিকে আর মধ্যযুগের মতো প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসা চরিতার্থের উপায় ভাবা হয় না। বরং অপরাধীকে সংশোধন করে পুনরায় সমাজে ফিরিয়ে দেওয়ার বাসনা নিহিত রয়েছে সাজায়। আশা করা হয়, রাষ্ট্রপতির ক্ষমাপ্রাপ্ত ব্যক্তি মুক্ত হয়ে ফের অপরাধে জড়াবেন না। ফলে এ যাবত রাষ্ট্রপতির ক্ষমাপ্রাপ্তদের মধ্যে কে কে পুনরায় অপরাধে সামিল হয়েছে তা খতিয়ে দেখা যেতেই পারে।
কয়েক যুগ ধরে রাজনীতিবিদের অপরাধী তকমা দেবার চল হয়েছে। রাজনীতিবিদ মানেই খারাপ আর ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদ মানে আরো খারাপ—এমন ভাবনা সমাজে ছড়ানো হয়েছে। যেন বাকি সব দুধে ধোয়া তুলসী পাতা। জেনে রাখা ভালো, অপরাধীর সাজা মওকুফের ন্যায্যতা গুটিকতক রাজনীতিবিদের খেয়াল-খুশির ফল নয়। জ্ঞানের নানা ডিসিপ্লিনের দার্শনিক-পণ্ডিতের সামাজিক সম্পর্ক বা চুক্তি ধারণায় ভর করে উঠেছে আধুনিক রাষ্ট্রধারণা। তেমনই পণ্ডিতজনরাই সাজা মওকুফের পক্ষে ওকালতি করেছেন তাদের বয়ানে। শাস্তিকে সংশোধনের মাধ্যম হিসেবেও বিবেচনা করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, অপরাধের জন্য ব্যক্তির দায়ের চাইতে সমাজের ভূমিকার দায় বড় কিনা তা নিয়েও রয়েছে বলিষ্ঠ সব ভাবনা। তারই একটি সমাজতাত্ত্বিক অপরাধতত্ত্ব; যেখানে সামাজিক ও কাঠামোগত দুর্বলতা এবং সামাজিক নিয়ম-কানুনের অনুপস্থিতির দায়কে অপরাধের মূল ধরা হয়। তাই অপরাধ দমনে সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলোর অবসানে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়।
বিশেষ দিবসে কারাগারে ভালো আচরণের কারণে অনেক সাধারণ কয়েদিকে রাষ্ট্রপতির ক্ষমার খবর আসে। তাদের বেশিরভাগ নাম না জানা সাধারণ কয়েদি। সেসব নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য হয় না। সমালোচনার মুখে পড়ে হাতে গোনা কোনো কোনো সাজা মওকুফের ঘটনা। যেখানে অপরাধীর সঙ্গে ক্ষমতাবানের অথবা ধনীদের যোগ রয়েছে। ওই ধনী ক্ষমতাবানদের ক্ষতিপূরণ দিয়ে মুক্তির পথ করা হচ্ছে কি?
এই ঢাকা শহরে সামান্য কারণে রিকশা চালককে হত্যার কাহিনি আছে। যা হয়তো মামলার মুখই দেখেনি। অনেক ধর্ষণকাণ্ড আছে যেখানে অপরাধী শনাক্ত হয়নি। শুধু ঢাকা কেন দেশজুড়ে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া, দলবেঁধে ধর্ষণ, বাড়ি ছাড়া, দেশ ছাড়া করার ঘটনা হাতে গুনে শেষ করা যাবে না। রাষ্ট্রপতির ক্ষমা তো দূর কা বাত, আইন-আদালত থোড়াই কেয়ার করে বিত্তশালী ক্ষমতাবানদের অপরাধের বিচারিক প্রক্রিয়ার কুড়িটিও ফুটতে পারে না। বরং নজর পড়ুক ওই বিড়ালের গলার ঘণ্টা বাঁধায়।
দেশে অপরাধের শেষ নেই। জাল জালিয়াতি, খাবারে ভেজালসহ কতরকম অপরাধ প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে। মন্দির পূজামণ্ডপের পাশাপাশি মাজার ভাঙার চল যোগ হয়েছে। শুধু ব্যক্তি নয়, গোটা গোষ্ঠী ধরে সম্প্রদায় ধরে এত সব অপরাধ কোনোটাই নতুন নয়। এদেশে কোনো কোনো বিদ্বেষ চর্চা ছাড় পেয়ে আসছে। যা অনেক অপরাধের মূলে। অন্যান্য ক্ষেত্রের মতোই এসব বিষয়ে রাষ্ট্রের বিকারহীনতাও পুরোনোই। অপরাধের সমুদ্র থেকে নুড়ির মতো কয়েকটি ঘটনা বাছাই করে ‘চাঞ্চল্যকর’ অভিধা দেওয়া এদেশে রীতি। যেগুলো নিয়ে পুলিশী ব্যস্ততা দেখা যায়। আমাদের সমস্যা অপরাধকে টাইমলাইনে ফেলে ভাগ করে কোনোটির পক্ষে সাফাইয়ে কোনোটির বিপক্ষে জেহাদে নামি আমরা। এই রাজনৈতিক বিবেচনাই ন্যায় বিচারের প্রধান অন্তরায়। সার্বজনীন ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় প্রথমে সেখানেই প্রতিকার খোঁজা দরকার।
আদতে আমরা অপরাধের সাজা চাই না, চাই প্রতিপক্ষের ওপর প্রতিশোধ। মনটাই মধ্যযুগীয়। বাস্তবিকই, দেশের বিরাজমান মধ্যযুগীয় আবহে বসে আমরা কল্পনায় আঁকি আধুনিক রাষ্ট্র ধারণা। তখন রাষ্ট্রপতি কালেভদ্রে কোথায় কাকে ক্ষমা করেছেন কি করেননি তা নিয়ে ভাবনাকে বিলাসিতাই মনে হয়। আতঙ্ক জাগে তাতে যখন মধ্যযুগের রীতির প্রতি প্রীতি উঁকি দেয়।
এদেশের সংসদে বিশিষ্টজনদের মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব আনার রেওয়াজ আছে। সংসদে সংঘটিত অপরাধের তালিকা উপস্থাপনের ব্যবস্থা হোক। তাতে জবাবদিহিতাকে জোরদারে অগ্রগতি ঘটবে বলেই মনে হয়। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে যে চিন্তার উদ্রেক হয়েছে তার ভিত সংগঠিত অপরাধকে অস্বীকারের প্রবণতায়। সেখানে সংবেদনশীলতা না থাকলে বাকি সব পণ্ডশ্রম।