Published : 09 Mar 2026, 08:19 PM
বগুড়া শহরের খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ তোফাজ্জল হোসেন। উত্তরবঙ্গের একজন আলোকিত, উদারপন্থী ও সংস্কৃতিমনস্ক এই শিক্ষাবিদ বগুড়া ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। স্যার আমাদের বাংলা পড়াতেন। আর পুরো দিন-দুনিয়ার গল্প শোনাতেন জাদুকরী কণ্ঠে, অনবদ্য নাটকীয়তায়। একবার ক্লাসে বলেছিলেন, একজন আদর্শ শিক্ষক কোথায় থাকে জানো? প্রশ্নোত্তর দিতে আমাদের অপারগতায় নিজেই বলেছিলেন, আদর্শ শিক্ষক থাকেন শিক্ষার্থীর হৃদয়ের গভীরে। পরম শ্রদ্ধা ও মমতায় সেই শিক্ষকের স্মৃতি যখন মানসপটে ভেসে ওঠে, শিক্ষার্থীর চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, আনন্দে মন ভরে যায়।
আমার শিক্ষক অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান চলে গেলেন। ৮৫ বছরের দীর্ঘ জীবনে তিনি শুধু জীবিকা অর্জন করেননি; বহু শিক্ষার্থীর জীবন গড়ে তুলেছেন, তাদের হৃদয় জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করেছেন। পেশাজীবনের শুরুতে সাংবাদিকতায়ও রেখেছেন উজ্জ্বল ছাপ। স্যারের প্রয়াণে স্বাভাবিকভাবেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী এবং গণমাধ্যম অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমেছে। অসংখ্য মানুষ স্যারের প্রতি গভীর অকৃত্রিম শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। আমাকেও শোক ছুঁয়ে গেছে, কিন্তু তবু, স্যারের কিছু স্মৃতি আমাকে নতুন করে ছুঁয়ে যাচ্ছে—সেই স্মৃতিগুলো আনন্দের, জীবন্ত এবং এখনও আমার হৃদয়ে সতেজ ও চিরসবুজ হয়ে বেঁচে আছে।
আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে ২০০৩-২০০৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলাম। কলাভবনের নিচতলায় ১০৮৮ নম্বরে আমাদের ক্লাস হতো। স্যারের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল ওরিয়েন্টেশন ক্লাসে। ঠিক মনে নেই, সেই প্রথম দিনের ক্লাসে কি হয়েছিল, নাকি অন্য কোনো ক্লাসে—কিন্তু স্যার আমাদের একটি ইংরেজি প্রবাদ ব্যাখ্যা করেছিলেন, যা আজও আমার স্মৃতিতে সতেজ। মাঝে মাঝে আমি সেটি আমার শিক্ষার্থীদেরও বলি।
স্যারের ব্যাখ্যা ছিল, একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন এবং ১২ শতকের ইংরেজি প্রবাদ ‘You can lead a horse to water, but you can't make him drink’-এর গভীর সংযোগ রয়েছে। তিনি বলেছিলেন, ঘোড়া শক্তিশালী প্রাণী, তার ঘাড় আরও শক্ত। এই প্রাণীকে কেউ জোর করে নদীর ধারে বা পানির পাত্রের কাছে নিতে পারে কিন্তু ঘোড়া যদি পানি খেতে না চায়–তাহলে সে ঘোড়াকে পানি পান করানো প্রায় অসম্ভব। শিক্ষণ প্রক্রিয়াতেও একই নিয়ম প্রযোজ্য—যদি কেউ নিজে শিখতে না চায়, নিজেকে আলোকিত করতে না চায়, তাহলে বাহ্যিক চেষ্টায় সফল হওয়া সম্ভব নয়। স্যার ব্যাখ্যা করতেন, শিক্ষার্থীকে নিজেকে আগ্রহী হতে হবে।
স্যারের কথায় ছিল এক ধরনের ঘরোয়া, আপন ভঙ্গি, যা সহজেই আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। সম্ভবত তার হাজার হাজার শিক্ষার্থী স্যারের এই আপন-আপন আচরণে স্বস্তি পেয়েছেন, আনন্দ পেয়েছেন।
আমরা বিভাগে থাকা অবস্থাতেই স্যার অবসরে গেলেন। যদিও পরে সুপার নিউমারি প্রফেসর হিসেবে স্যারকে বিভাগের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এরপর দীর্ঘদিন সপ্তাহে ২-১ দিন বিভাগে ক্লাস নিতেন। ২০১৭ সালে আমি পিআইবির একটি গবেষণা প্রকল্পে যুক্ত ছিলাম। তখন সেই গবেষণার কাজে স্যারের একটি গভীরতর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। তখন স্যার ক্লাস শেষে কলাভবনের নিচতলায় অধ্যাপক নাদির জুনাইদের কক্ষে বসতেন। আমার গবেষণার বিষয় ছিল ‘দৈনিক পাকিস্তান’ নিয়ে। পাকিস্তান প্রেস ট্রাস্ট্রের যে সংবাদপত্রটি ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতা পুড়িয়ে দিয়েছিল। তখন স্যার দৈনিকটির কর্মী ছিলেন। সাখাওয়াত স্যার খুব মজা করে জানিয়েছিলেন, তিনি নিজেও নিজের কর্মস্থল ‘দৈনিক পাকিস্তান’ পত্রিকার অফিসে আগুন দিয়েছিলেন! না স্যার শুরুতে সহিংতার জন্য নিজে আগুন দেননি। যখন তিনি দৈনিক পাকিস্তানের সামনে গিয়েছিলেন তখন এরইমধ্যেই ভবনে আগুন লাগানো হয়ে গেছে। স্যারর ভাষ্য ছিল অনেকটা এ রকম–“১৯৬৯ সালের ২৪ জানুয়ারি সন্ধ্যায় আমার ডিউটি ছিল। আমি অফিসের সামনে গিয়ে দেখি আগুন জ্বলছে। সামনে উত্তেজিত অনেক মানুষ। তারাই আগুন লাগিয়েছিল। তারাতো আমাকে চেনে না। আমাকে বললো, ভাই আপনিও একটু হাত লাগান! আমি তখন মনে মনে বলি, আমার পত্রিকা অফিস আমি পুড়িয়ে দেব (হাসির )! আমি হাত লাগালাম। আমার সামনেই পুরো অফিস দাউ দাউ করে জ্বলে গেল। আমি ওটা দেখে প্রেসক্লাবে চলে আসলাম। প্রেসক্লাসে দৈনিক পাকিস্তানের অনেকেই ছিলেন। আগুন দেওয়াতে আমরা মনে মনে বেশ খুশিই ছিলাম। আমাদের ধারণা ছিল, একদিন তো দেশ স্বাধীন হবেই। ততদিনে মানুষ বুঝে গেছে পাকিস্তানের সঙ্গে আর থাকা যাবে না। শুধু একটাই ভয় ছিল, আর্মিরা যদি জোর করে দেশ এক রেখে দেয়।”
একটা নাটকীয় বাস্তবতায় নিজের সংবাদপত্র অফিসে নিজে আগুন দেওয়ার ঘটনাটা স্যার এমন আনন্দ করে আর সরলতার সঙ্গে বলেছিলেন তা আজও মনে দাগ কেটে আছে।
শেষ দিকে স্যারের স্মৃতি কিছুটা দুর্বল হয়ে এসেছিল। এ ঘটনাটা ২০১৭ সালের, তখন আমি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আমার স্ত্রী, স্যারের সাবেক শিক্ষার্থী তাহমিনা হক দিনা, তখন বিভাগে স্যারের সহকর্মীও। দিনা স্যারকে আমার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার কথা আগেই জানিয়েছে। আমিও শিক্ষকতা শুরু করার পর স্যারের কাছ থেকে দোয়া নিয়েছি।
বিভাগের কোনো এক অনুষ্ঠানের পর, সম্ভবত নবীন বরণ বা অগ্রহায়নের কোনো অনুষ্ঠান শেষে, স্যার টিএসসির সামনে বের হলে আমি সালাম দিয়ে কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমাকে চিনতে স্যারের কষ্ট হচ্ছিল। হওয়ারই কথা। বললাম, “স্যার, আমি এখন জগন্নাথে পড়াই।” স্যার পিঠে হাত রাখলেন আর বললেন, “অহ হ্যাঁ, ওখানে আমাদের দিনার জামাইও জয়েন করেছে ওখানে। তুমি কি তাকে চেনো? আগে টিভিতে সাংবাদিকতা করত।”
আমি কষ্টে হাসি আটকে বললাম, “জ্বি, স্যার, আমি দিনার জামাইকে চিনি। সে ভালো ছেলে।” স্যারের সামান্য স্মৃতিবিভ্রম ও সরলতা একই সঙ্গে এমন আনন্দ ও বেদনা হয়ে বেজেছিল বুকে, যা কোন দিন ভুলবার নয়।
আমার ধারণা, শিক্ষকতার জীবনে বহু শিক্ষার্থীর হৃদয়ে অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান বেঁচে থাকবেন আনন্দের স্মৃতি হয়ে। ধন্যবাদ, স্যার, আমার শিক্ষাজীবনকে আনন্দদায়ক করার জন্য। কৃতজ্ঞতা, স্যার, আনন্দের স্মৃতি উপহার দেওয়ার জন্য।