Published : 07 Oct 2025, 09:42 PM
আমাদের শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা যেন এক যুদ্ধক্ষেত্র। সেখানে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ শ্বেতরক্ত কণিকা, টি-সেল, বি-সেল আমাদের রক্ষা করতে অবিরাম ছুটে বেড়ায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পুলিশদের মধ্যে কেউ যদি নিজের শরীরকেই শত্রু মনে করে আক্রমণ করে বসে? এমনই এক রহস্যের সমাধান করেছেন তিন বিজ্ঞানী—শিমোন সাকাগুচি (জাপান), মেরি ই. ব্রাঙ্কো এবং ফ্রেড র্যামসডেল (যুক্তরাষ্ট্র)। তাদের এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্যই ২০২৫ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করার ঘোষণা করেছে সুইডেনের কারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট।
নোবেল প্রাইজ কর্তৃপক্ষ বলছে, ‘পেরিফেরাল ইমিউন টলারেন্স’ বা রোগ প্রতিরোধ করতে গিয়ে দেহের নিজস্ব অঙ্গের ক্ষতি এড়ানোর ব্যবস্থা আবিষ্কারের মাধ্যমে এই তিন বিজ্ঞানী যুগান্তকারী কাজ করেছেন।
রোগপ্রতিরোধে নিয়ন্ত্রণের রহস্য
১৯৮০-এর দশকের শুরুতে, জাপানের তরুণ ইমিউনোলজিস্ট শিমোন সাকাগুচি একটি প্রশ্ন নিয়ে গবেষণা শুরু করেন— “আমাদের ইমিউন সিস্টেম কেন নিজের শরীরের সাধারণ কোষকে আক্রমণ করে না?” এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তিনি একদিন ইঁদুরের থাইমাস গ্রন্থি (যেখানে টি-সেল তৈরি হয়) কেটে ফেলে দেন। ফলাফল ছিল ভয়াবহ—ইঁদুরগুলোর শরীরে অটোইমিউন প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। তাদের ইমিউন সিস্টেম নিজের শরীরের সাধারণ কোষ ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে শত্রু ভেবে আক্রমণ করতে থাকে। ফলে ধীরে ধীরে তাদের শরীরে নানা ধরনের জটিলতা দেখা দেয়—চামড়ায় প্রদাহ, অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ক্ষতি এবং রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খলা। শেষপর্যন্ত, এদের অনেকেরই মৃত্যু ঘটে।

তবে, আবার যখন সাকাগুচি এই ইঁদুরদের শরীরে সুস্থ ইঁদুরের পরিপক্ব টি-সেল প্রবেশ করান, তখন রোগ থেমে যায়। এ থেকেই তিনি ধারণা করেন যে, ইমিউন সিস্টেমে এমন কিছু কোষ থাকতে হবে যারা অন্য কোষগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখে।
এই শান্তিপ্রিয় ‘পুলিশ’ কোষগুলো খুঁজে পেতে সাকাগুচির লেগে যায় ১০ বছরেরও বেশি সময়। অবশেষে, ১৯৯৫ সালে তিনি আবিষ্কার করেন এই কোষগুলোর অস্তিত্ব। নাম দেন ‘রেগুলেটরি টি-সেল’ বা নিয়ন্ত্রক টি-সেল (Tregs) এবং জানান, এরা সিডি৪ এবং সিডি২৫ প্রোটিন দ্বারা চিহ্নিত হয়। রেগুলেটরি টি-সেল হলো ইমিউন সিস্টেমের একটি বিশেষ ধরনের কোষ, যারা শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার ভারসাম্য বজায় রাখে এবং অতিরিক্ত বা অপ্রয়োজনীয় ইমিউন প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। এদের প্রধান কাজ হলো ইমিউন সিস্টেমকে শান্ত রাখা, যাতে এটি শরীরের নিজস্ব কোষ বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিরুদ্ধে আক্রমণ না করে। এরাই শরীরের ‘পুলিশ’ হিসেবে কাজ করে, যারা ইমিউন সিস্টেমের অন্যান্য কোষকে নিয়ন্ত্রণে রাখে।
যুক্তরাষ্ট্রের দুই বিজ্ঞানী যেভাবে যুক্ত হলেন এই গবেষণায়
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বায়োটেক কোম্পানি সেলটেক চিরোসায়েন্সে (Celltech Chiroscience) কাজ করছিলেন মেরি ব্রাঙ্কো ও ফ্রেড র্যামসডেল। তাদের দৃষ্টি পড়ে স্কারফি (Scurfy) নামক এক অসুস্থ ইঁদুর প্রজাতির ওপর। এই পুরুষ ইঁদুরগুলো জন্ম থেকেই ত্বকের সমস্যায় ভুগত, তাদের প্লীহা ও লিম্ফ গ্রন্থি ফুলে যেত এবং মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মারা যেত। বিজ্ঞানীরা জানতেন, এটি এক্স ক্রোমোজোম-সংক্রান্ত সমস্যা। কিন্তু ব্রাঙ্কো ও র্যামসডেল জানতে চাইলেন, ঠিক কোন জিন এর জন্য দায়ী?
তারা এক্স ক্রোমোজোমের বিশ্লেষণ শুরু করেন এবং অবশেষে ২০টি সম্ভাব্য জিনের মধ্যে একটি ত্রুটিপূর্ণ জিন খুঁজে পান, যার নাম দেন ফক্সপি৩ (Foxp3)—কারণ এটি ফক্সপি (FOXP) জিন পরিবারের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
মানব শরীরেও মিলল ওই রহস্য
পরে তারা আবিষ্কার করেন, মানব শরীরে ফক্সপি৩ জিনে ত্রুটি হলে আইপিইএক্স (IPEX) নামক এক ভয়াবহ অটোইমিউন রোগ হয়, যা সাধারণত শিশুদের মধ্যে দেখা যায়। ২০০১ সালে, ব্রাঙ্কো ও র্যামসডেল নেচার জেনেটিক্স-এ একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন, যেখানে প্রথমবারের মতো বলা হয় যে স্কারফি ইঁদুর ও আইপিইএক্স রোগের পেছনে রয়েছে ফক্সপি৩ জিনের ত্রুটি।

এরপর গবেষকরা সাকাগুচির রেগুলেটরি টি-সেল-এর সঙ্গে ফক্সপি৩-এর সম্পর্ক খুঁজতে শুরু করেন। দুই বছরের মধ্যে সাকাগুচি নিজেই প্রমাণ করেন যে ফক্সপি৩ জিনই নিয়ন্ত্রণ করে রেগুলেটরি টি-সেল তৈরি হবে কি না। অর্থাৎ, এই জিনই ঠিক করে শরীরের ‘পুলিশ’ কোষ তৈরি হবে কি না এবং ইমিউন সিস্টেম কতটা নিয়ন্ত্রিত থাকবে।
নোবেল পুরস্কারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে যে, মানবদেহের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা যেভাবে প্যাথোজেন—যেমন ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা অন্যান্য অণুজীব—শনাক্ত করে, তা একটি বিস্ময়কর প্রক্রিয়া। এই অণুজীবগুলো বিভিন্ন আকার ও প্রকৃতির হয়, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এদের গঠন মানবদেহের কোষের সঙ্গে মিলে যায়। এর ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে: ইমিউন সিস্টেম কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয় কোন অণুজীবকে আক্রমণ করতে হবে এবং কোনটিকে রক্ষা করতে হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তিন বিজ্ঞানী—শিমোন সাকাগুচি, মেরি ব্রাঙ্কো ও ফ্রেড র্যামসডেল—গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাদের গবেষণায় দেখানো হয়েছে যে, রেগুলেটরি টি সেল এবং ফক্সপি৩ জিন এই প্রক্রিয়ায় মুখ্য ভূমিকা পালন করে। রেগুলেটরি টি সেল ইমিউন সিস্টেমের ‘পুলিশ’ হিসেবে কাজ করে, যারা ইমিউন প্রতিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং নিশ্চিত করে যে শরীরের নিজস্ব কোষ বা ক্ষতিহীন পদার্থ (যেমন খাদ্য বা ভ্রূণের কোষ) আক্রমণের শিকার না হয়।
এই আবিষ্কার ইমিউন সিস্টেমের ‘পেরিফেরাল ইমিউন টলারেন্স’ প্রক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করে, যার মাধ্যমে শরীর ক্ষতিকর প্যাথোজেন এবং নিজস্ব কোষের মধ্যে পার্থক্য করে। এই যুগান্তকারী গবেষণার ফলে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ২০০-এর বেশি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে। এতে রেগুলেটরি টি-সেল ব্যবহার করে টাইপ-১ ডায়াবেটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, অঙ্গ প্রতিস্থাপনের জটিলতা এবং এমনকি ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।