Published : 08 Feb 2026, 08:01 PM
প্রাচীনকাল থেকে এখন পর্যন্ত যুদ্ধ জয়ের ইতিহাস মূলত প্রযুক্তির অগ্রগতির ইতিহাস। আবার যুদ্ধও পরিবর্তন করেছে প্রযুক্তিকে। যুদ্ধপ্রযুক্তির পরিবর্তন ও একইসঙ্গে ইতিহাসের চলমানতার ধারায় ১৭৫০ সালে মানবজাতি এক নতুন যুগে প্রবেশ করে। ক্লিফটন ক্রেইসের গ্রন্থ ‘দ্য কিলিং এজ: হাউ ভায়োলেন্স মেইড দ্য মডার্ন ওয়ার্ল্ড’ উনবিংশ শতাব্দীকে চিহ্নিত করেছে বন্দুক প্রবর্তিত খুনের যুগ (Mortecene) হিসেবে। ক্রেইস ইতিহাসকে অন্য সবার থেকে ভিন্নভাবে দেখেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, “পশ্চিমে অস্ত্রের শিল্পোৎপাদন মানুষ কর্তৃক মানুষ হত্যার ক্ষেত্রে এক আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে এবং নিজ স্বার্থে বৈশ্বিক পুনর্গঠন সম্পন্ন করে। ক্ষমতা ও সম্পদ এরপর আর মেধা ও মূল্যবোধ থেকে নয়, বন্দুকের নল থেকে উৎপন্ন হতে শুরু করে।” (‘হোয়াট ওয়াজ হিস্টরি’স ডেডলিয়েস্ট এরা?’, মাইকেল লেজার-লোমাস, জ্যাকোবিন, ৩১ জানুয়ারি ২০২৬)
তবে একবিংশ শতাব্দীতে যুদ্ধ বন্দুকের নলেই আর সীমাবদ্ধ নেই। গত বিংশ শতাব্দীতে পারমাণবিক শক্তির পর সেটি এখন একবিংশ শতাব্দীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কোয়ান্টাম প্রযুক্তির ওপর ভর করছে। তবে এই আলোচনা অন্য কারণে, বর্তমান যুদ্ধের আরেক রূপ প্রকাশের উদ্দেশ্যে। সেটি যুদ্ধের প্রযুক্তিগত দিক নয়, এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। যেখানে যুদ্ধ আর গতানুতিক ভাষার যুদ্ধে সীমাবদ্ধ নেই, তা আরও ভয়ঙ্কর কিছুতে রূপান্তরিত হয়ে গেছে।
আধুনিক কালে যুদ্ধ যেন পদার্থের কোয়ান্টাম রূপ ধারণ করতে শুরু করেছে। একে এক কথায় সংজ্ঞায়িত করা যায় না, যেমন পরমাণুর কণাগুলোকে এত সহজে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। ইলেকট্রন এখন কেবল কণামাত্র নয়, তরঙ্গও। আধুনিক যুদ্ধকেও তেমনি দুই পক্ষের বাঁচা-মরার লড়াই দিয়ে বোঝা যায় না। এ যেন অন্য কিছু। বিবদমান দুই পক্ষ বা অন্তত একপক্ষ যেন এর হাতে খেলার পুতুল। বিবদমান পক্ষসমূহ প্রাণময় সত্তা, কিন্তু যুদ্ধ এক প্রাণময় রাক্ষসে পরিণত যার নাটাইয়ের সুতায় যেন মানুষের জীবন বাঁধা। মানুষের হাত থেকে জীবনযাপনের নাটাই ছুটে গিয়ে তা যুদ্ধ নামক রাক্ষসের হাতে পড়েছে। এটি হলো যুদ্ধের আধুনিক কোয়ান্টাম রূপান্তর।
যুদ্ধের যে পুরনো রূপ অর্থাৎ পরদেশ জয় বা অন্যের সম্পদ লুণ্ঠন তা বহাল আছে। তার সঙ্গে কেবল নতুন উপাদান যুক্ত হয়ে একে অনেক জটিল করে তুলেছে। পুরনো রূপ যে ঠিকঠাক আছে শুধু তা নয়, এটি এখন আগের চেয়ে আরও নগ্ন রূপে প্রকাশ পাচ্ছে। যেমন, ভেনিজুয়েলা আক্রমণ করতে গিয়ে ট্রাম্প ঘুমের মধ্যেও ‘তেল তেল তেল’ করে চেঁচিয়ে উঠেছেন। উনবিংশ শতাব্দীতে বাইবেল দিয়ে বন্দুকের নল ঢেকে রাখার চেষ্টা করা হতো। বর্তমানে হয় গণতন্ত্র বা শান্তির পর্দা দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র ঢেকে রাখা হয় কিংবা তাও আর দরকার হয় না— লুণ্ঠনকারীদের এখন বড় শক্তি লজ্জাহীনতা! এর বাইরে যুদ্ধের উল্লেখযোগ্য রূপান্তর ঘটেছে যা আগের চেয়ে অনেক ভয়ঙ্কর।
এই আধুনিক রূপান্তরের বৈশিষ্ট্যসমূহ হলো: ১. যুদ্ধে এখন দুই বা ততোধিক বিবদমান পক্ষ নেই, তার বদলে আছে একদিকে হামলাকারী ও অন্যদিকে হামলার শিকার; ২. যুদ্ধ পরিচালিত হয় যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণ ও পরিচালনাকারীদের জন্য মুনাফার স্বার্থে; ৩. আগের মতো জয়-বিজয়ের মাধ্যমে যুদ্ধের সমাপ্তি হয় না, যুদ্ধবিরতি বা শান্তিচুক্তির মাধ্যমে তা স্থগিত হয়; ৪. যুদ্ধ দীর্ঘকাল চলমান থাকে; ৫. যুদ্ধের উৎপত্তি কোনো কিছু ফয়সালার জন্য নয়, বরং জনগণের দৃষ্টিকে অন্যত্র সরিয়ে কোনো ক্ষমতাসীন শাসকের পতন ঠেকানোর লক্ষ্যে ঘটানো হয়; ৬. অনেক দেশে উগ্র জাতীয়তাবাদকে উসকে দেয়া হয় কোনো দেশ ও জাতিকে অসম যুদ্ধে ঠেলে দেয়ার জন্য। ৭. যুদ্ধে একটি জনগোষ্ঠীকে অস্ত্র পরীক্ষার টার্গেট হিসেবে ব্যবহার করা হয়; এবং ৮. যুদ্ধ শাসকদের বিনোদনে পরিণত, এমনকি মিডিয়ায় সিনেমাটিক রূপ নেয় ইত্যাদি। নিচে এ বৈশিষ্ট্যগুলো অল্পবিস্তর তুলে ধরা হচ্ছে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে বিশ্বে যত যুদ্ধ শুরু হয়েছে ও চলছে তা সবই যুদ্ধের নামে একপাক্ষিক আক্রমণ মাত্র। আর এসব আক্রমণই সম্পূর্ণ অন্যায় কারণে। ইরাক-যুক্তরাষ্ট্র, আফগানিস্তান-যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন, ইউক্রেইন-রাশিয়া যুদ্ধ কোনোটিই প্রচলিত অর্থে যুদ্ধ নয়। একদিকে আক্রমণ ও অন্যদিকে প্রতিরক্ষার চেষ্টা।
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, রাশিয়া, চীন, ভারতসহ পৃথিবীর যেসব দেশ সামরিক শিল্পে অগ্রসর, যুদ্ধ তাদের অন্যতম একটি ব্যবসা। অস্ত্রের চেয়ে দামী পণ্য আর কিছু নেই। সারা বিশ্বে যুদ্ধ পরিস্থিতি টিকিয়ে রাখতে না পারলে এই সামরিকশিল্প মুখ থুবড়ে পড়বে। এই শিল্প বহু দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। দেশে দেশে পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া বাধায়ে রাখতে হবে তাদের। অস্ত্র রপ্তানিকারকদের এই স্বার্থ না বুঝলে যুদ্ধের অর্থনীতিই বোঝা যাবে না।
বর্তমান পৃথিবীতে অনেক দেশেই অনেকগুলো যুদ্ধ চলছে—অন-অফ বা বাতি জ্বলা ও নেভার মতো করে। যুদ্ধ বন্ধ নিয়ে ওইসব দেশে নানা উদ্যোগ চলমান যা কেবল যুদ্ধবিরতি ও শান্তি চুক্তিতে শেষ হয়। কোনো এক পক্ষের ইচ্ছায় বা অনিচ্ছাসত্ত্বেও পুনরায় ওই যুদ্ধ শুরু হয় ও চলতে থাকে। ফিলিস্তিন ছাড়াও ইরাক, আফগানিস্তান, ইউক্রেইনসহ অনেক দেশ এই দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের ফাঁদে আটকা পড়ে আছে।
বিল ক্লিনটন ১৯৯৮ সালে চারদিন ধরে ইরাকে বোমা হামলা চালিয়েছিলেন প্রেমিকা মনিকা লিউনস্কির সঙ্গে তার যৌন কেলেঙ্কারি থেকে জনগণের দৃষ্টিকে অন্যত্র সরিয়ে দেয়ার জন্য। ইসরায়েলে নেতানিয়াহু যুদ্ধ বাধিয়ে রেখে জেলের অতিথি হওয়া থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রেখেছে। অদক্ষতার ফলে ট্রাম্পের জনসমর্থন কমে যাচ্ছে, ফলে তার একটার পর একটা যুদ্ধ চাই। যতক্ষণ যুক্তরাষ্ট্রকে নানারকম যুদ্ধে ডুবিয়ে রাখা যাচ্ছে, ট্রাম্পের পক্ষে সমর্থনের পারদ ততদিনই উচ্চে থাকছে। এই উত্তেজনা না থাকলে ট্রাম্পের অযোগ্যতা মার্কিন জনগণের কাছে স্পষ্ট আকারে ধরা পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে অপদার্থ প্রেসিডেন্টের সমর্থন ধরে রাখার জন্য এছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই।
পশ্চিমা ন্যাটো শক্তির প্ররোচনায় ইউক্রেইনে জাতীয়তাবাদকে উসকে দেয়া হয়েছে রাশিয়ার সঙ্গে একটা যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করার ও তা বজায় রাখার জন্য। যার খেসারত এখন পুরো জাতি দিচ্ছে। কোনো দেশে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীকেও উসকে দেয়া হয় উগ্র জাতীয়তাবাদের মাদক দিয়ে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র জাপানের দুটি শহর হিরোশিমা ও নাগাসাকিকে পারমাণবিক বোমা মেরে ধ্বংস করেছে যুদ্ধ বন্ধের জন্য নয়। পারমাণবিক বোমা হামলা মানববসতি ও মানবদেহে কী প্রতিক্রিয়া তৈরি করে তার বাস্তব নিরীক্ষার জন্য। ফিলিস্তিন হচ্ছে ইসরায়েলের নতুন নতুন উদ্ভাবিত অত্যাশ্চর্য অস্ত্রসমূহের একটা ল্যাবরেটরি। যার বিস্তারিত বিবরণ আছে অ্যান্টনি লোয়েনস্টেইনের লেখা ‘দ্য প্যালেস্টাইন ল্যাবরেটরি’ বইতে। বইটির উপশিরোনামের বাংলা করলে হয়, যেভাবে ইসরায়েল তার দখলদারিত্বের প্রযুক্তি বিশ্ববাপী রপ্তানি করছে।
যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরাক আক্রমণ সিএনএন ও বিবিসির মতো সংবাদমাধ্যমগুলো টিভি নাটক বা সিনেমার কাহিনীর মতো করে সাজিয়ে সুস্বাদু করে প্রচার করেছে। বারাক ওবামা লাদেনকে হত্যা করার চলমান দৃশ্য ভিডিওতে বসে বসে দেখেছেন ও গর্বিত হয়েছেন। তাকে হারিয়ে দেয়ার জন্য ট্রাম্প ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে অপহরণ করার ভিডিও দৃশ্য একইভাবে বসে বসে দেখেছেন ও তা উপভোগ করেছেন। তার কাছে মার্কিন এ সামরিক হামলা ছিল ‘টেলিভিশন শোয়ের মতো’। ওবামা ও ট্রাম্প কতখানি রুচিহীন হলে এসব বিচারহীন হত্যা ও অপহরণের দৃশ্য দেখে আনন্দ পেতে পারেন তা বলাই বাহুল্য।
অতএব বর্তমান পৃথিবীর যে কোনো যুদ্ধকে এসব বৈশিষ্ট্য দিয়ে বিশ্লেষণ করে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। এখন দেশে দেশে চলমান নানারকম যুদ্ধের মধ্যে এসব উপাদান কম-বেশি বিদ্যমান। এসব যুদ্ধের খেসারত দিতে হয় সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষকে। এখনকার যে কোনো যুদ্ধ ও যুদ্ধপরিস্থিতিকে তাই সরল দৃষ্টিকোণ ও নিছক দেশপ্রেমের লেন্স দিয়ে দেখার মতো ভুল আর কিছুতেই নেই। কারণ যুদ্ধ আর এখন অতীতের সরলরৈখিক রূপে নেই। এটি রূপান্তরিত হয়ে এমন এক কোয়ান্টাম রূপ ধারণ করেছে যে তা রূপকথার রাক্ষস-খোক্কসের চেয়ে সহস্রগুণ ভয়ঙ্কর। এই দেখার প্রয়োজনীয়তা এখন খুবই জরুরি।