Published : 17 Jun 2026, 12:15 PM
এই সময়ের সেরা ফুটবলারের ছোট্ট তালিকায়ও দুজনকে রাখতে হবে। বিশ্বকাপ অভিযানের শুরুতে সেটির প্রমাণও দিলেন কিলিয়ান এমবাপে ও আর্লিং হলান্ড। এমবাপে এখন বিশ্বকাপের অনেক অভিজ্ঞ একজন। হলান্ডের এটি বিশ্বকাপে অভিষেক। দুজনই এক বিন্দুতে মিলে গেলেন জোড়া গোলে। কিন্তু ওই যে কথায় বলে, আসল নায়কের আবির্ভাবের আগ পর্যন্ত অনেকেই নায়ক!
এই সময়ের দুই বড় তারকা যখন জ্বলে উঠলেন, আরেকজন তখন হয়তো মনে মনে ঠিক করলেন, “এখনকার সেরাদের দেখিয়ে দেওয়া যাক, সর্বকালের সেরা কে!”
অসংখ্য অর্জনে সমৃদ্ধ যার ক্যারিয়ার, রেকর্ড যার নামের প্রতিশব্দ, যিনি মাঠে নামলেই লেখা হয়ে যায় ইতিহাস আর বল পায়ে ছুটলে রচিত হয় মহাকাব্য, যার পায়ে লুটিয়ে পড়ে শ্রেষ্ঠত্ব, সেই লিওনেল মেসি আরও একবার প্রমাণ করলেন, তাকে অস্পৃশ্য উচ্চতায় রেখেই ফুটবলীয় সেরার সমীকরণ মেলাতে হবে।
বিস্ময়, জাদুকরী, অকিল্পনীয়, অভাবনীয়, ঐন্দ্রজালিক বা আরও অনেক কিছু, এসব বিশেষণ তো অসংখ্যবারই ব্যবহার করা হয়েছে তাকে নিয়ে। শব্দভাণ্ডার এখন ফুরিয়ে গেছে, কিন্তু মেসির মুগ্ধতা ছড়ানোর পথচলা আর কল্পনার সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার পালা চলছেই।
এই গোধূলি বেলাতেও তার পায়ে মধ্যগগণের তেজ। ফুরিয়ে যাওয়ার প্রহরেও নতুন পাওয়ার রোমাঞ্চ। ৩৯ ছুঁইছুঁই বয়সে বিশ্বকাপে প্রথম হ্যাটট্রিক!
ক্যানসাস সিটি স্টেডিয়ামে যখন ম্যাচ শুরুর বাঁশি বাজল, নিল আর্মস্ট্রংয়ের চাঁদে পা রাখার মতোই একটি নজির খোদাই হয়ে গেল মানব ইতিহাসে। একজন ফুটবলার ছয়টি বিশ্বকাপ খেলতে পারেন, এমন কিছু আগে দেখেনি বিশ্ব। কিন্তু মানুষের সামর্থ্যের শেষ বলে কিছু নেই, সেটিই আরও একবার দেখালেন মেসি। প্রথম ফুটবলার হিসেবে ছয়টি বিশ্বকাপ!
ফুটবল জগতের অনেক হিসাবনিকাশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এগিয়ে চলা আরও একজন আছেন। সব ঠিকঠাক থাকলে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নামবেন বুধবার। তবে ‘প্রথম’ কিছু তো সবসময়ই আলাদা। চাঁদে পা রাখা দ্বিতীয় ব্যক্তি বাজ অলড্রিনের কথা কজনের মনে থাকে!
ও হ্যাঁ, এই ম্যাচে ডাবল সেঞ্চুরিও করে ফেলেছেন মেসি। তার ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ এটি। আর্জেন্টিনার জার্সিতে দেড়শ ম্যাচও খেলতে পারেননি আর কেউ।
ছয় বিশ্বকাপ কিংবা ২০০ ম্যাচ, এসবে ফুটে ওঠে তার দীর্ঘস্থায়িত্ব। তিনি চিরন্তন। তবে তিনি সবার চেয়ে আলাদা শুধু তো দীর্ঘ পথচলা দিয়েই নয়। বরং এত লম্বা সময় ধরে শীর্ষে থেকেও। এই ম্যাচেও কেবল কিছু সংখ্যাতই সীমাবদ্ধ থাকেনি তার অর্জন।
একটির পর একটি গোলে ইতিহাসের নতুন নতুন অধ্যায় রচিত হলো তার পায়ে। সপ্তদশ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে বাঁ পায়ের গোলায় যে গোলটি করলেন, বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সে গোলের রেকর্ড হয়ে গেল তাতে।
বিশ্ব আসরে বক্সের বাইরে থেকে তার গোল হলো ৫টি। ১৯৬৬ আসর থেকে এখনও পর্যন্ত যা বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ।
পাঁচটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার স্বাদও পেয়ে গেলেন তিনি। এটি অবশ্য তার আগে করেছেন ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো।
দ্বিতীয় গোলটিতে মেসি নাম লেখালেন আরেক রোনালদোর পাশে। ১৫ গোল করে বিশ্বকাপ ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলস্কোরার ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি।
দিনটি স্মরণীয় করে রাখতে এটুকুই ছিল যথেষ্ট। কিন্তু বিশ্বকাপের সঙ্গে একটি হিসাব-নিকাশ চুকানোর তো তখনও বাকি। বিশ্বকাপে তিনি কখনও হ্যাটট্রিক করতে পারেননি!
যদিও শ্রেষ্ঠত্বের খেরোখাতায় প্রাপ্তির পাল্লা তার এতটাই ভারী যে, টুকটাক অপ্রাপ্তি চোখেই পড়ে না। তবু তার মতো একজন ফুটবলারের বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক নেই, একটু চোখে লাগার মতোই বটে। সেই অপূর্ণতাও তিনি ঘুচিয়ে দিলেন এ দিন।
সেখানেও জন্ম হলো রেকর্ড। ৩৮ বছর ৩৫৮ দিন বয়সে তিনি বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বয়সে হ্যাটট্রিক করা ফুটবলার।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ডেও তিনি স্পর্শ করলেন মিরোস্লাভ ক্লোসাকে। ৭৯তম মিনিটে উঠিয়ে না নিলেন, নতুন উচ্চতায় হয়তো পা রাখতেন এই ম্যাচেই!
তবে তাড়া তো নেই। অপেক্ষা কেবল পরের ম্যাচের।
দিনটিই ছিল রোমাঞ্চ জাগানিয়া। যেটির শুরু বিশ্বকাপের রাজপুত্র এমবাপের সৌজন্যে। সেনেগালের বিপক্ষে ম্যাচের প্রথমার্ধে অবশ্য তাকে ঠিক চেনাই যাচ্ছিল না। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে কিছু সুযোগও হাতছাড়া করেন। কিন্তু তাকে আর কতক্ষণ দমিয়ে রাখা সম্ভব!
নিউ জার্সিতে ৬৬তম মিনিটে তার গোলেই এগিয়ে যায় ফ্রান্স। দেশের ইতিহাসে গোলের নতুন চূড়ায় পা রাখলেন তিনি। পরে ব্র্যাডলি বার্কোলার গোলে বাড়ল ব্যবধান। কিন্তু ৯০ মিনিট শেষে যোগ করা সময়ে যখন একটি গোল ফিরিয়ে দিয়ে ম্যাচে উত্তেজনা ফেরাল সেনেগাল, এমবাপের আরেকটি গোল নিশ্চিত করে দিল দলের জয়। বক্সের বাইরে থেকে বুলেট গতির শটের সেই গোল দেখে ধারাভাষ্যে পিটার ড্রুরি বললেন, ‘দেয়ার ইজ আ গোল টু দা ওয়ার্ল্ড।”
এমবাপের জোড়া গোলের রেশ থাকতে থাকতেই বিশ্বমঞ্চে প্রথম পা পড়ে হলান্ডের। গত বিশ্বকাপ বাছাইয়ে তিনি পাঁচ গোল করলেও দল জায়গা করে নিতে পারেনি বিশ্ব আসরে। এবার বস্টনে ইরাকের বিপক্ষে ম্যাচটি দিয়েই তাই তার বিশ্বকাপ অভিষেক। সেখানে তার গল্পটি ‘এলাম, দেখলাম, জয় করলাম….!” প্রথমার্ধেই দুটি গোল! দলের ৪-১ গোলের জয়ে আরেকটি গোলে অবদানও ছিল তার।
এমবাপে-হলান্ডকে নিয়ে যখন উচ্ছ্বাসের জোয়ার, মেসি সেখানে বইয়ে দিলেন যেন সুনামি। সব আলো কেড়ে নিলেন তিনি চিরচেনা সেই দীপ্তিতে।
তবে গোলের এই লড়াই, সেরার সমীকরণ বা দলের অভিযান, সব ছাপিয়ে ফুটবলীয় আনন্দটুকুই যেন ছড়িয়ে পড়ল সবচেয়ে বেশি। ষষ্ঠ দিনে এসে যেন সত্যিকার অর্থে জীবন্ত হয়ে উঠল বিশ্বকাপ।
বাংলাদেশ সময় মধ্যরাত পেরিয়ে ছিল একটি ম্যাচ। আরেকটি ভোররাতে। পরেরটি সকালে। টাইমজোন ভেদে বিশ্বের নানা প্রান্ত মিলিয়ে একাকার দিন-রাত-ভোর। তবু এমবাপে-হলান্ড-মেসিরা যেন থমকে দিলেন সময়। গোটা বিশ্বকেই এক সুতোয় গেঁথে রাখলেন তারা ফুটবল রোমাঞ্চের মালায়।