Published : 20 Aug 2025, 12:00 PM
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের মালয়েশিয়ায় দ্বিপাক্ষিক সফরের শেষ দিন। বিমানবন্দরে যখন দূতাবাসের কর্মকর্তা ও মালয়েশিয়ার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ড. ইউনূসকে বিদায় জানাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই ফোন আসে মালয়েশিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দাতো সেরি আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছ থেকে। তিনি প্রধান উপদেষ্টার ঘনিষ্ঠ বন্ধুও বটে। বিদায়ের মুহূর্তে ফোনে এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে বললেন, যারা বর্তমানে অনিয়মিতভাবে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন, তাদের বৈধ করার একটি সুযোগ দেওয়া হবে। বিষয়টি ইতোমধ্যে মালয়েশিয়ার মন্ত্রিসভায় উত্থাপিত হয়েছে। অনানুষ্ঠানিক আলাপে বন্ধুত্বের কূটনীতি আরেকবার জয়ী হলো।
মালয়েশিয়ায় অনিয়মিতভাবে অবস্থানকারী বাংলাদেশির সংখ্যা কেউ বলেন ৩ লাখ, কেউ বলেন ৫ লাখ। সংখ্যা যাই হোক, প্রতি বছর যদি দেড় লাখ নতুন কর্মী যায়, তবুও এই সংখ্যা নিঃসন্দেহে বেশি। এর ওপর এই কর্মীরা দীর্ঘদিন মালয়েশিয়ায় থাকার কারণে ভাষা, কাজ ও সংস্কৃতি সবই আয়ত্ত করে ফেলেছেন। বিষয়টি আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু যারা নতুন করে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার অপেক্ষায় আছেন, তাদের জন্য কী সংবাদ?
ফোনে কথা হচ্ছিল আমার পিতামহের দিকের এক আত্মীয়ের সঙ্গে। সে মালয়েশিয়া যেতে চায়। যশোর এলাকার মানুষ। সীমান্ত অনেকবার দেখেছে, এবার বিমানে উঠতে চায়। স্কুলের বারান্দা পেরিয়েছে, কিন্তু মন পড়ে আছে মালয়েশিয়ায়। উচ্চশিক্ষার খরচের তুলনায় এখনই মালয়েশিয়ায় ভালো চাকরি পাওয়া গেলে মন্দ কী? দালাল তাকে অন্তত এটাই বুঝিয়েছে। ড. ইউনূসের মালয়েশিয়া সফর তার জন্য অন্তত আনন্দের এক বার্তা। তাকে বললাম, সিকিউরিটি গার্ড এবং কেয়ার গিভার হতে পারে প্রাধান্যের ক্ষেত্র। সে কেয়ার গিভার হতে পারবে না, তবে সিকিউরিটি গার্ড হতে প্রস্তুত। পাঁচ লাখ টাকার হিসাবও সে করে ফেলেছে। তখন মনে হলো, বাজার তো খুলবে, কিন্তু যে স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশিরা মালয়েশিয়ায় যেতে চান, তা কতটা বাস্তব?
১৯৮৯ সাল থেকে নিয়মিতভাবে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী যাওয়া শুরু হয়। কিন্তু নিয়োগ প্রক্রিয়াসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের কর্মীরা শোষণ, প্রতারণা ও নানা হয়রানির শিকার হয়েছেন। এসব কারণে মালয়েশিয়া সরকার ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৯, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। মূল কারণ ছিল উচ্চ অভিবাসন ব্যয়, নিয়োগকারীদের সামর্থ্যের বাইরে অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ এবং অনিয়মিতভাবে অবস্থানকারী বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি।
এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ২০১২ সালের নভেম্বরে দুই দেশের মধ্যে ‘জিটুজি’ পদ্ধতিতে কর্মী নিয়োগের একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এই পদ্ধতিতে একজন কর্মীর অভিবাসন ব্যয় ছিল ৩৫ হাজার টাকারও কম। কিন্তু এজেন্সিগুলোর সম্পৃক্ততা না থাকায় মাত্র ১০ হাজার কর্মী মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পর স্বার্থান্বেষী মহলের হস্তক্ষেপে প্রক্রিয়াটি বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৬ সালে ‘জিটুজি প্লাস’ নামে নতুন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে মাত্র ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে কর্মী প্রেরণের দায়িত্ব দেয়। ২০১৮ সালে মালয়েশিয়ায় সরকার পরিবর্তনের পর কর্মী নিয়োগে আবার নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়।
২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বর নতুন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে ১০টি এজেন্সির পরিবর্তে ২৫টি এজেন্সি, পরে ১০০টি এজেন্সির সিন্ডিকেটে রূপ নেয়। জানা যায়, ওই সিন্ডিকেট ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ৩১ মে পর্যন্ত ৪ লাখ ৯৩ হাজার ৬৪২ জন কর্মীর ছাড়পত্র পেলেও, ১৬ হাজার ৯৭০ জন কর্মী নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হওয়ায় মালয়েশিয়া যেতে পারেননি।
“যদি বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে অমানবিক অভিবাসন ব্যবস্থাপনা আবার জয়লাভ করে, মৌলিক মানবাধিকারকে পাশ কাটিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা লাখ লাখ বাংলাদেশিকে আধুনিক দাসত্বের ঝুঁকিতে ফেলবে।” এটি ব্রিটিশ শ্রম অধিকার কর্মী অ্যান্ডি হল এবং অভিবাসন বিষয়ক গবেষক রহমানের প্রতিবেদনের অংশ। তাদের মতে, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক শ্রমিকদের শোষণ, অবৈধ মুনাফা এবং আইনের শাসনকে ক্ষুণ্ন করার সুযোগ তৈরি করে।
হয়তো তাদের এই গবেষণা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কিন্তু আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, ৭৮ হাজার টাকার যাত্রা যখন ৫ লাখ টাকায় হয়, তখন কর্মী কখনো লাভের মুখ দেখে না। তবে টাকার বিষয়টি প্রমাণ করা কঠিন। কেবল ৭৮ হাজার টাকার দালিলিক প্রমাণ থাকে, বাকি টাকা অনানুষ্ঠানিকভাবে দেওয়া হয়। তাই পূর্ববর্তী সরকারের আমলে যাদের জন্য বাজার বন্ধ হয়েছিল, তারা দায়মুক্তি পেয়ে যায়। আবার বলা হয়, অধিক সংখ্যক এজেন্সির সম্পৃক্ততায় টাকার পরিমাণ বেড়ে যায়। কারণ, হাত বদলের সময় সবাই নিজেদের মুনাফা রেখে কাজ করে।
এসব বিষয় মাথায় রেখে মালয়েশিয়া হাতে গোনা নির্দিষ্ট এজেন্সির মাধ্যমে বাজার খুলতে রাজি। যেখানে পুরোনো এজেন্সিগুলো, যারা দীর্ঘদিন বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে, তারাই প্রধান খেলোয়াড় থাকবে। তাদের সঙ্গে মালয়েশিয়ার যোগাযোগ ভালো, বাজার সম্পর্কেও তাদের স্পষ্ট ধারণা রয়েছে। তাই মালয়েশিয়া তাদেরকেই সঙ্গে রাখতে চায়। ঘুরে-ফিরে, সেই ‘থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়’। তবে এখানে কূটনীতির জয় হয়েছে, যাকে বলে ‘সেকেন্ড টায়ার ডিপ্লোমেসি’। এখানে সুশীল সমাজ, সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা তাদের মতামত প্রতিষ্ঠা করেন এবং ভালো যোগাযোগ রাখেন, যা দেশের স্বার্থে কাজ করে। অবশ্য অ্যান্ডি হল তার প্রতিবেদনে বারবার বলেছেন, পূর্বের সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে আবার কর্মী প্রেরণ শুরু হলে তা কর্মীদের প্রতি অন্যায় হবে।
এবার প্রবাসী কল্যাণ উপদেষ্টার বক্তব্যে আসি। মালয়েশিয়া যাওয়ার আগে তিনি বলেছিলেন, “যদি মালয়েশিয়া সরকার চুক্তি পরিবর্তন না করে, তাহলে আমাদের সামনে দুটি পথ খোলা রয়েছে। একটি হলো, তাদের শর্ত অনুযায়ী ২৫, ৫০ বা ১০০টি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানো। আরেকটি হলো, মালয়েশিয়া সরকারকে বলে দেওয়া যে আমরা কোনো কর্মী পাঠাব না। বাজার খুলতে তাদের শর্ত মানতে হবে।” আমাদের কূটনীতি যদি জনগণের চাহিদার কথা মাথায় রেখে হয়, তাহলে বলতেই হবে, বাজার খোলা এখন জরুরি।
কারণ বাস্তব চিত্র এখন এমন—প্রতিদিন মালয়েশিয়া বিমানবন্দর থেকে বাংলাদেশিরা ফিরে আসছেন। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, ইমিগ্রেশনের সন্দেহ, পর্যটন ভিসায় গিয়ে তারা আর ফিরবেন না। জুলাই থেকে শুরু করে তিন হাজারের বেশি বাংলাদেশি ভিসা থাকা সত্ত্বেও বিমানবন্দর থেকে ফিরেছেন। অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈধ পথ খোলা না থাকলে অবৈধ পথে যাওয়া হবেই।
অন্যদিকে, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া বা থাইল্যান্ড হয়ে যেন বাংলাদেশিরা মালয়েশিয়ায় না যেতে পারে, সেজন্য এখন তারাও আমাদের ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর। অনিয়মিতদের বৈধকরণ, স্টুডেন্ট প্লাস ভিসা বা দক্ষ কর্মীর অনুমোদন—কোনোটাই বাজার খোলার আকাঙ্ক্ষার চাপ সামলাতে পারছে না। তাই বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগের নিয়মেই দুই মাসের মধ্যে বাজার খুলবে। আর সেকেন্ড টায়ার কূটনীতিকরা কর্মী নিয়ে তাদের কারবার শুরু করবেন।
সফর শেষে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম তার ভেরিফায়েড ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন, “আমি বিশ্বাস করি, মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক শ্রদ্ধা, আস্থা ও পারস্পরিক অগ্রগতির দৃঢ় অঙ্গীকারে অটুট থাকবে। এটি শুধু দুই দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য নয়, এই অঞ্চলের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির জন্যও।”
বন্ধুরাষ্ট্র মালয়েশিয়া হয়তো কূটনীতির সঙ্গে বন্ধুত্বকেও সামনে আনবে। রাজনীতির মাঠে খেলোয়াড়দের ক্ষমতার পরিবর্তন আমরা দেখি। আনোয়ার ইব্রাহিমের আগেও যারা ছিলেন, তারাও বাংলাদেশের বন্ধু ছিলেন। বন্ধুত্বের পরিবর্তন যেমন হয়নি, তেমনি কর্মী নিয়োগ বাণিজ্যেও কোনো পরিবর্তন আসছে না। কুশীলবদের চিন্তায় ও কর্মে প্রতিটি কর্মী একেকজন আদম হয়েই থাকবেন।