Published : 27 Feb 2026, 09:48 PM
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং নৈতিকতার মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে ধরেছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামের হাসপাতাল পরিদর্শনের খবর ছড়িয়ে পড়তেই আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হঠাৎ ২৩ জন ‘রোগী’ ভর্তি হন এবং পরিদর্শন শেষ হওয়ামাত্রই দ্রুত হাসপাতাল ত্যাগ করেন।
অনেকে এই ঘটনাকে সামান্য রাজনৈতিক ‘ম্যানেজমেন্ট’ বলে উড়িয়ে দিতে চাইবেন। কিন্তু বাস্তবে এ ঘটনা রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো গুরুতর। হাসপাতাল এমন এক স্থান যেখানে কৃত্রিম উপস্থিতি নয়, শুধু প্রকৃত অসুস্থতার ভিত্তিতেই ভর্তি হওয়া উচিত।
যদি সত্যিই সংসদ সদস্যের সফরকে ঘিরে হাসপাতালকে ‘ব্যস্ত ও সেবামুখর’ দেখানোর জন্য ব্যান্ডেজ-মোড়ানো মানুষদের হঠাৎ ভর্তি করানো হয়ে থাকে, তাহলে এটি শুধু অনৈতিক নয়, জনগণের সঙ্গে সরাসরি প্রতারণা। জনগণের টাকায় চলা প্রতিষ্ঠানে ভুয়া চিত্র তৈরি করা মানে জনগণের বিশ্বাসের সঙ্গে ছলচাতুরি করা। এটি প্রশাসনিক সততা, চিকিৎসা নীতি এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য চরম লজ্জাকর।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আগে থেকে ভর্তি প্রকৃত রোগীদের অভিযোগ যে, তাদেরকে নির্ধারিত শয্যা থেকে সরিয়ে এই নতুন ‘রোগীদের’ জায়গা দেওয়া হয়েছিল। এই অভিযোগের সামান্যতম অংশও যদি সত্য হয়, তবে তা মানবিকতার চরম অবক্ষয়ের প্রমাণ। অসুস্থ মানুষকে শয্যা থেকে তাড়িয়ে রাজনৈতিক প্রদর্শনীর জন্য কৃত্রিম ভিড় তৈরি করার চেয়ে নিষ্ঠুর আর কী হতে পারে?
রাজনীতিতে প্রদর্শনবাদ নতুন কিছু নয়। অতীতে বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, কোনো উচ্চপর্যায়ের সফরের আগে রাস্তাঘাটে তড়িঘড়ি করে রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়, অসম্পূর্ণ কাজকে সাময়িকভাবে ঢেকে রাখা হয়, এমনকি কখনো কখনো দরিদ্র মানুষদের সাময়িকভাবে আড়ালে সরিয়ে রাখা হয়। কিন্তু হাসপাতালের মতো সংবেদনশীল স্থানে এমন নাটক মঞ্চস্থ করা অন্য সকল কিছুকে ছাড়িয়ে গেছে। কারণ এখানে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য ও মর্যাদা।
এ ধরনের প্রবণতাকে যদি দলীয় বা প্রশাসনিকভাবে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তবে তা রাষ্ট্রের জন্য ভয়াবহ সংকেত। কারণ, তখন এটি কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো অনিয়ম থাকে না, বরং একটি নেতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। দীর্ঘ সময় পর যখন কোনো দল গণতন্ত্র ও ন্যায়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসে, তখন জনগণের প্রত্যাশা কেবল উন্নয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তারা সুশাসন ও আইনের শাসনের প্রতিফলন দেখতে চায়। প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার এই দূরত্ব যত বাড়বে, গণতন্ত্র ততটাই দুর্বল হবে।
এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি যদি ক্ষমতাসীন হয়ে এমন কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেয়, তবে তা হবে রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী। আজকের জনগণ অনেক বেশি সচেতন; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের সক্রিয়তায় কোনো অনিয়মই এখন আর আড়ালে থাকে না। বিশেষ করে হাসপাতালের মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে ‘কৃত্রিম রোগী’ সাজানোর খবর যখন ছড়িয়ে পড়ে, তখন জনমনে এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, যদি একটি সাধারণ পরিদর্শনকেও অভিনয়ের মাধ্যমে সাজাতে হয়, তবে স্বাস্থ্যখাতের প্রকৃত অবস্থা কতটা ভঙ্গুর? এ ধরনের লোকদেখানো সংস্কৃতি সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতাকে শুরুতেই বড় সংকটের মুখে ফেলে দেয়।
রাজনৈতিক দলগুলোর একটি বড় ভুল হলো সাময়িকভাবে সাজানো চিত্র দেখিয়ে জনসমর্থন ধরে রাখার চেষ্টা করা। কিন্তু ইতিহাস বলে, জনগণ শেষপর্যন্ত বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই তাদের রায় দেয়। স্বাস্থ্যখাতে যদি চিকিৎসক বা ওষুধের প্রকৃত সংকট থাকে, তবে ‘কৃত্রিম ভিড়’ তৈরি করে ওই ব্যর্থতা ঢাকা সম্ভব নয়। বরং এ ধরনের সাজানো নাটক উল্টো বার্তাই দেয় যে, সমস্যা এতটাই প্রকট যে তা লুকোতে এখন নাটকের আশ্রয় নিতে হচ্ছে।
প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ভূমিকা এখানে সমানভাবে উদ্বেগজনক। একজন সংসদ সদস্যের সফরকে কেন্দ্র করে যদি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়, তবে তা প্রশাসনের নিরপেক্ষতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। অন্যদিকে, যদি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কেবল ‘ঊর্ধ্বতনকে খুশি’ করার জন্য নিজ উদ্যোগে এমন সাজানো নাটক করে থাকে, তবে তা এক চরম অসুস্থ প্রশাসনিক সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ। উভয় ক্ষেত্রেই একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া প্রয়োজন, জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে কোনো ধরনের ‘আইওয়াশ’ বা সাজানো দৃশ্য গ্রহণযোগ্য নয়।
বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের কথা বলে আসছে। এখন ক্ষমতায় এসে যদি এমন প্রশাসনিক বিচ্যুতিকে উপেক্ষা বা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে তাদের ওই নৈতিক অবস্থান চরমভাবে দুর্বল হবে। বিরোধী দলে থাকাকালে যেসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার দেখা যায়, ক্ষমতায় এসে হুবহু একই আচরণ করলে জনগণের চোখে আর কোনো পার্থক্য থাকে না। তখন মানুষ কেবল রাজনৈতিক দলের পরিচয় নয়, তাদের বাস্তব আচরণ দিয়েই শাসনের বিচার করে।
রাজনৈতিকভাবে এই ঘটনার প্রভাব সুদূরপ্রসারী ও প্রতীকী। এতে ক্ষমতাকে তোষণ করার প্রবণতা, বাস্তবতা আড়াল করার চেষ্টা এবং প্রশাসনিক নৈতিকতার চরম ঘাটতি প্রতিফলিত হয়। বিরোধী দলগুলো একে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে ঠিকই, তবে তার চেয়েও আশঙ্কাজনক হলো সাধারণ মানুষের ‘নীরব প্রতিক্রিয়া’। মানুষ হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে রাজপথে নামবে না, কিন্তু প্রশাসনের এই কৃত্রিমতা ও অভিনয়ের কথা তারা দীর্ঘকাল মনে রাখবে, এই সম্মিলিত স্মৃতি ভোটের বাক্সে বা জনসমর্থনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।
বিএনপির উচিত দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। এতে দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, বরং আস্থা বাড়বে, মানুষ বিশ্বাস স্থাপন করবে যে সরকার অনিয়ম বরদাস্ত করে না।
গণতান্ত্রিক রাজনীতির সৌন্দর্য হলো আত্মসমালোচনা ও সংশোধনের সাহস। আনোয়ারার এ ঘটনাকে যদি সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তাহলে এটাই ইতিবাচক মোড় নিতে পারে। অন্যথায় এটি ধীরে ধীরে বৃহত্তর অবিশ্বাসে রূপ নেবে। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। জনগণের আস্থাই কোনো সরকারের একমাত্র ভিত্তি। বিএনপি যদি দীর্ঘমেয়াদি রাজনীতি করতে চায়, তাহলে হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডে ২৩ জন সাজানো রোগী দেখানোর মতো অনিয়মের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে।
স্বাস্থ্য খাত ইতিমধ্যে নানা সংকটে জর্জরিত। গ্রামীণ হাসপাতালগুলোতে জনবলের অভাব, সরঞ্জামের ঘাটতি, অবকাঠামোগত দুর্বলতা দীর্ঘদিনের সমস্যা। এসব বাস্তব সমস্যার সমাধান না করে কাগুজে সাফল্য দেখানোর চেষ্টা করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। জনগণ অভিনয় চায় না, চায় বাস্তব সেবা। তারা চায় হাসপাতাল সত্যিকারের রোগীতে ভর্তির সুযোগ থাকুক এবং তারা যথাযথ চিকিৎসা পাক। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের উচিত বাস্তব পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করা, কৃত্রিমভাবে সাজানো দৃশ্য উপভোগ করা নয়। এখনই সময় কঠোর আত্মসমালোচনার এবং শুদ্ধতার পথে ফেরার। মনে রাখা প্রয়োজন, রাজনৈতিক মঞ্চে যে চাতুর্যপূর্ণ নাটক আজ মঞ্চস্থ হচ্ছে, গণ-অসন্তোষের মুখে তার পর্দা নামতে খুব বেশি সময় লাগে না।