Published : 05 Feb 2026, 01:18 PM
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম সংকটকে প্রায়ই রাষ্ট্রীয় চাপ, আইন বা সেন্সরশিপের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু এই ব্যাখ্যা বাস্তবতার একাংশ মাত্র। সংবাদমাধ্যমের সংকটের গভীরে রয়েছে মালিকানা কাঠামো, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। বিশেষ করে নির্বাচন সামনে এলে এই কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো আরও প্রকাশ্য হয়ে ওঠে। তখন সংবাদ আর শুধু তথ্য নয়, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার বা বদলের হাতিয়ারে পরিণত হয়।
স্বাধীনতার আগে এবং পরেও সংবাদমাধ্যমের একটি বড় অংশ ছিল আদর্শনির্ভর। অনেক সংবাদপত্র গড়ে উঠেছিল রাজনৈতিক সচেতনতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মতপ্রকাশের আকাঙ্ক্ষা থেকে। সম্পাদক ছিলেন মূল সিদ্ধান্তকারী এবং সম্পাদকীয় নীতি নির্ধারিত হতো মতাদর্শ ও পেশাগত বিবেচনায়।
এই চিত্র ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে আশির দশক থেকে। নব্বইয়ের দশকের পর থেকে দেশে মুক্ত সংবাদমাধ্যমের যে জোয়ার তৈরি হয়েছিল, তা গত কয়েক দশকে বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এখন দু-চারটি ব্যতিক্রম ছাড়া সব সংবাদমাধ্যম চলে সম্পাদকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে, ব্যবসায়ীদের হাতে। এই ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলো সংবাদপত্র, টেলিভিশন চ্যানেল ও অনলাইনগুলোকে সরাসরি মুনাফা অর্জনের উৎস হিসেবে দেখার চেয়ে ‘প্রতিরক্ষা ঢাল’ বা ‘লবিং টুল’ হিসেবে ব্যবহার করতে বেশি আগ্রহী। যখন কোনো বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী মিডিয়ার মালিক হয়, তখন তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য থাকে নিজেদের অন্য ব্যবসাগুলোকে রাষ্ট্রীয় বা আইনি চাপ থেকে সুরক্ষা দেওয়া।
মালিকপক্ষ যখন সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে বা ব্যবসায়িক স্বার্থে কোনো বিশেষ রাজনৈতিক শক্তিকে সমর্থন দেয়, তখন সেই প্রভাব সরাসরি সংবাদমাধ্যমে দৃশ্যমান হয়। বর্তমানে দেশের প্রধান ধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তাদের সংবাদের বিষয়বস্তু, টোন এবং ট্রিটমেন্ট মূলত মালিকপক্ষের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদরাই সংবাদমাধ্যমের মালিক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। একজন সক্রিয় রাজনীতিবিদ যখন মিডিয়ার মালিক হন, তখন তার পক্ষে নিরপেক্ষ বা সমালোচনামূলক সম্পাদকীয় অবস্থান গ্রহণ করা মনস্তাত্ত্বিকভাবে প্রায় অসম্ভব। কারণ তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার এবং ব্যবসায়িক স্বার্থের বিপরীতে যায় এমন কোনো তথ্য বা সংবাদ প্রচার করা নিজের পায়ে কুড়াল মারার শামিল। এর ফলে তথ্যের যে বস্তুনিষ্ঠতা এবং ভারসাম্য থাকার কথা ছিল, তা হারিয়ে গিয়ে একপেশে প্রচারণায় পরিণত হয়।
অনেক সংবাদমাধ্যমই তাদের নীতিমালায় নিরপেক্ষতা, সত্যনিষ্ঠতা ও জনস্বার্থের কথা উল্লেখ করে। কিন্তু বাস্তবে সম্পাদকীয় নীতি আর নিউজরুমে নির্ধারিত হয় না। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় নিউজরুমের বাইরের তিনটি শক্তির ভিত্তিতে। আর তা হল মালিকের রাজনৈতিক অবস্থান, বিজ্ঞাপন ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়ার ভয়। ফলে সম্পাদকীয় নীতি একটি নৈতিক দলিল না হয়ে একটি কৌশলগত হিসাব হয়ে দাঁড়ায়। কোন খবর কতটুকু যাবে, কোন শব্দ ব্যবহার করা হবে, কোন বিষয় এড়িয়ে যাওয়া হবে সবকিছুই এই হিসাবের অংশ হয়ে ওঠে।
এই রাজনৈতিক পক্ষপাত এখন কেবল প্রথাগত সংবাদপত্রের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই, টকশো এবং নিউ মিডিয়ার কন্টেন্টেও ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। টেলিভিশন টকশোগুলোতে আমন্ত্রিত অতিথি নির্বাচন থেকে শুরু করে আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে মালিকপক্ষের অদৃশ্য হাতের ছোঁয়া স্পষ্ট। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। নির্বাচনের সময় তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা সংবাদমাধ্যমের প্রধান দায়িত্ব হলেও বাংলাদেশে অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম এখন কোনো না কোনো পক্ষের হয়ে প্রোপাগান্ডা মেশিনের মতো কাজ করছে। তারা জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোকে পাশ কাটিয়ে এমন সব তথ্য প্রচার করছে যা ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত বা বিভ্রান্ত করতে পারে। এর ফলে সাধারণ মানুষের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছানোর পথ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং গুজব বা অপপ্রচারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
সংবাদমাধ্যম যখন নিরপেক্ষ তথ্য দেওয়ার পরিবর্তে মালিকের পছন্দের দলের পক্ষে নিরন্তর প্রচারণা চালায়, তখন তা জনগণের ওপর একটি মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন ‘মতামত জরিপ’ বা বিশেষ প্রতিবেদন প্রচার করা হচ্ছে যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন এবং মালিকের রাজনৈতিক আদর্শের প্রতিফলন। এর মাধ্যমে ভোটারদের বোঝানো হচ্ছে যে একটি নির্দিষ্ট পক্ষই জিততে যাচ্ছে, যা সুইং ভোটারদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। নোয়াম চমস্কির ভাষায় একে বলা যায় কৃত্রিম সম্মতি উৎপাদন।
তার ওপর নির্বাচনি প্রচারণার সময় সাংবাদিকরা যখন মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে যান, তখন তারা মালিকের রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে প্রায়ই প্রতিহিংসার শিকার হন। এটা আগের সরকারের আমলেও বারবার আমরা দেখেছি। এমনকি ৫ অগাস্টের পরও এটা ঘটেছে। শুধু সাংবাদিক নয়, গোটা সংবাদমাধ্যমও হামলার শিকার হয়েছে। আবার অনেক সাংবাদিক মালিকের সরাসরি নির্দেশ পালনে বাধ্য হয়ে পেশাদারিত্ব বিসর্জন দিয়ে রাজনৈতিক কর্মীর মতো আচরণ করছেন। যারা নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করেন, তাদের জন্য অস্তিত্বের সংকটও তৈরি করছে। কারণ নির্বাচনের পর যদি রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়, তবে মালিকের সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিকদের ওপরও দমন-পীড়ন নেমে আসার আশঙ্কা থাকে। এই ভয় থেকেই জন্ম নিচ্ছে চরম পর্যায়ের ‘সেলফ সেন্সরশিপ’। অন্তত ৫ অগাস্টের পর সব দলের প্রধান শত্রু ‘সংবাদমাধ্যম’ নীতি দেখে সাংবাদিকরা ‘গা বাঁচিয়ে’ চলার চেষ্টা তো করবেনই।
নির্বাচনের সময় সংবাদমাধ্যমের সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষমতা হলো এজেন্ডা সেটিং। সংবাদমাধ্যম শুধু খবর দেয় না, নির্ধারণ করে দেয় কোন বিষয়গুলো নিয়ে দেশ কথা বলবে। কোন ইস্যু শিরোনামে আসবে, কোনটি দিনের পর দিন আলোচনায় থাকবে, কোনটি ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যাবে। এই সিদ্ধান্তগুলো ভোটারদের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার গঠনে বড় ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের বেসরকারি সংবাদমাধ্যম কাঠামোতে এই এজেন্ডা সেটিং প্রক্রিয়া নিরপেক্ষ থাকে না। নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে যত, কিছু নির্দিষ্ট ইস্যু ধারাবাহিকভাবে সামনে আনা হচ্ছে, যেগুলো ক্ষমতা দখলের জন্য নিরাপদ বা সুবিধাজনক। বিপরীতে, নির্বাচন ব্যবস্থার কাঠামোগত প্রশ্নগুলো আলোচনার বাইরে থেকে যাচ্ছে বা খুব সীমিতভাবে আসছে। ফলে ভোটারদের সামনে খণ্ডিত বাস্তবতা উপস্থাপিত হচ্ছে। মানুষ যে বিষয়গুলো নিয়ে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত, সেগুলো গণমাধ্যমে গুরুত্ব না পাওয়ায় ধীরে ধীরে সেগুলো রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্র থেকেও সরে গেছে। এইভাবে এজেন্ডা সেটিং ভোটারদের মনোযোগকে নিয়ন্ত্রিত পথে পরিচালিত করে এবং নির্বাচনের মূল প্রশ্নগুলো আড়ালে চলে যায়। যার বড় উদাহরণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। নির্বাচন কেন্দ্র করে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে পরিমাণ অবণতি হয়েছে, সে পরিমাণ গুরুত্ব পাচ্ছে না সংবাদমাধ্যমে। ফলে এই জায়গায় একটা ‘ব্লাইন্ড স্পট’ তৈরি হয়েছে।
এজেন্ডা সেটিং যেখানে বলে দেয় কী নিয়ে আলোচনা হবে, সেখানে ভাষা ও ফ্রেমিং ঠিক করে দেয় সেই আলোচনাকে মানুষ কীভাবে দেখবে। নির্বাচনের সময় সংবাদে ব্যবহৃত শব্দচয়ন, বাক্য গঠন ও উপস্থাপনার ভঙ্গি ভোটারদের মনস্তত্ত্বে গভীর প্রভাব ফেলে। আমরা তা দেখতেও পাচ্ছি নিয়মিত। কোনো দলের কর্মসূচি এক ক্ষেত্রে হয় ‘শান্তিপূর্ণ সমাবেশ’, অন্য ক্ষেত্রে হয় ‘শক্তি প্রদর্শন’। কোনো সহিংস ঘটনা এক দলের ক্ষেত্রে ‘সংঘর্ষ’ হিসেবে বর্ণিত হয়, আর অন্য দলের ক্ষেত্রে হয় ‘হামলা’। এই ভাষাগত পার্থক্য কেবল শব্দের বিষয় নয়, এটি দোষ-দায় নির্ধারণের সূক্ষ্ম কৌশল। ভাষা ও ফ্রেমিংয়ের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এটি পক্ষপাতকে স্বাভাবিক করে তোলে। পাঠক বা দর্শক অনেক সময় বুঝতেই পারেন না যে তার সামনে একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হচ্ছে। কারণ সংবাদটি সরাসরি প্রচারণামূলক না হয়ে ‘স্বাভাবিক’ সাংবাদিক ভাষায় উপস্থাপিত হয়। পাঠক বা দর্শকের মনের গভীরে একটা শব্দও বড় প্রভাব ফেলে। পাঠক বা দর্শক হয়তো সেটা টেরও পান না। নিয়মিত একটা দলের বিরুদ্ধে ‘নেগেটিভ’ শব্দ শুনতে শুনতে মনের অজান্তেই ‘ক্ষোভ’ জমতে থাকে। এখানে ‘রিপিটিশন’ থিওরি দারুণভাবে কাজ করে।
এই ভাষাগত ও ফ্রেমিং কৌশলের চূড়ান্ত প্রভাব গিয়ে পড়ে ভোটের সিদ্ধান্তে। ভোটার অনেক সময় ভাবেন তিনি যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, কিন্তু বাস্তবে তিনি সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন ভাষাগত ইঙ্গিত ও আবেগের প্রভাবে। যখন সংবাদমাধ্যম এক পক্ষের ভাষাকে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য করে তোলে, আর অন্য পক্ষকে সন্দেহের চোখে দেখায়, তখন নির্বাচন আর সমান মাঠে থাকে না। নির্বাচন হয়ে ওঠে বয়ান ও অনুভূতির প্রতিযোগিতা। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ী বা রাজনীতিবিদ সংবাদমাধ্যমের মালিক সাধারণ ভোটারের সঙ্গে মূলত এই ‘সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ারটাই’ করেন।
বাংলাদেশের সাংবাদিকতা পেশায় যে গভীর নৈতিক সংকট ও পেশাদারিত্বের অবক্ষয় আমরা লক্ষ্য করি, তার মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সাংবাদিকদের আর্থিক অনিরাপত্তা ও চরম নিম্ন বেতন কাঠামো। দেশের অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সংবাদকর্মীরা মাস শেষে যে পারিশ্রমিক পান, তা দিয়ে বর্তমান বাজারমূল্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একটি সম্মানজনক জীবনযাপন করা প্রায় অসম্ভব। এই চরম দারিদ্র্য বা আর্থিক টানাপোড়েন সাংবাদিকদের এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক দাসত্বের দিকে ঠেলে দেয়। একজন সাংবাদিক যখন জানেন যে তার ব্যক্তিগত নীতি বা নৈতিক আদর্শের চেয়ে মাস শেষে বেতন পাওয়াটা তার পরিবারের টিকে থাকার জন্য বেশি জরুরি, তখন তিনি নিজের অজান্তেই আপস করতে শুরু করেন। মালিকপক্ষের অন্যায় আবদার বা কোনো বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীর পক্ষে প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর নির্দেশ আসলেও, স্রেফ চাকরি হারানোর ভয়ে তারা তা মুখ বুজে মেনে নিতে বাধ্য হন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একজন সাংবাদিকের জন্য চাকরি হারানো মানে কেবল আয়ের উৎস হারানো নয় বরং এই সীমিত সুযোগের বাজারে পুনরায় কর্মসংস্থান খুঁজে পাওয়াটাও এক দুঃসাধ্য ঘটনা। এই নিরাপত্তাহীনতাকে পুঁজি করেই সংবাদমাধ্যমের মালিকরা তাদের ব্যক্তিগত, বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করে নেন। নিউজ রুমে যখন কোনো বিশেষ সংবাদকে থামিয়ে দেওয়া হয় কিংবা কোনো মিথ্যা সংবাদকে প্রচার করার জন্য চাপ দেওয়া হয়, তখন সাংবাদিকদের প্রতিবাদ করার কোনো উপায় থাকে না। তারা জানেন, মালিকের স্বার্থের বিপরীতে অবস্থান নিলে পরদিন তাদের ডেস্কে আর স্থান হবে না। ফলে আদর্শিক সাংবাদিকতা বা সত্য প্রকাশের যে ব্রত নিয়ে এই পেশায় তারা এসেছিলেন, তা ধীরে ধীরে মালিকপক্ষের সন্তুষ্টি অর্জনের এক যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় রূপান্তরিত হয়।