Published : 19 Jul 2025, 12:23 AM
আয়তনে ছোট হলেও দেশের সব এলাকার খবর আমরা জানি না। ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার, জাত্যাভিমান, দ্বৈত দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা নব্যউদারপন্থার বাহাদুরি দিয়ে দেশের কিছু এলাকাকে 'দুর্গম', 'প্রত্যন্ত', 'অপর' এবং প্রবলভাবে আড়াল করে রাখা হয়। এইসব এলাকায় অনিয়ম, অন্যায়, দখল এবং দূষণ দৈনন্দিন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যেমন, দেশের রামসার স্বীকৃত জলাভূমি সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে প্রায়ই মেঘালয় পাহাড় থেকে আসা খনি-বর্জ্যের দূষণে মাছ মারা যায়। সীমান্তবর্তী গ্রামগুলো ধীরে ধীরে ফসলি জমিসহ বালিচাপায় পড়ে যাচ্ছে। অথচ রাষ্ট্র, গণমাধ্যম কিংবা নাগরিক প্রতিক্রিয়া প্রায় পুরোটাই নিশ্চুপ থাকে। সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে বিষ দিয়ে মাছ ধরা হয়, দেশজুড়ে নিষিদ্ধ কীটনাশক প্রকাশ্যে বিক্রি হয়—এসব ক্ষেত্রেও প্রতিরোধের ভাষা অনুপস্থিত।
বান্দরবানের পাহাড়ে রাষ্ট্রীয় আইন ও নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করে প্রতিনিয়ত পরিবেশ-অপরাধ ঘটে চলেছে এবং সেখানেও আমাদের অবস্থান নির্বিকার। উদাহরণস্বরূপ, গত মাসের ২১ জুনের একটি ঘটনা বলতে পারি, সেদিন বনবিভাগ বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার নয়াপাড়া ইউনিয়নের খৈয়াঝিরি মৌজায় ঢুংখি পাহাড়ে ম্রোদের ফলবাগান ধ্বংস করে সেখানে একাশিয়া ও ইউক্যালিপটাস গাছের চারা লাগিয়েছে। অথচ মাত্র এক মাস আগে, ১৫ মে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় একাশিয়া ও ইউক্যালিপটাস প্রজাতির বৃক্ষরোপণ নিষিদ্ধ করে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে।
নির্দেশনায় বলা হয়, সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তি পর্যায়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে এসব আগ্রাসী বা এলিয়েন প্রজাতির গাছ রোপণ করা যাবে না। এরপরও লামা বনবিভাগের অধীন মাতামুহুরী সংরক্ষিত বনাঞ্চলের আলীকদম বিটে এই ঘটনা ঘটেছে। এখানেই মেনতক ও কাইংওয়াই পাড়ার ছয়টি পরিবারের প্রায় ১২ একর ফলবাগান ধ্বংস করা হয়েছে।
প্রথমে মেনতকপাড়ার ইয়াঙবুং ম্রোর ৫ একর ফলবাগান কেটে ফেলা হয়। তারপর পর্যায়ক্রমে মেনক্রিং ম্রো, রেংতাং ম্রো, মেনসিং ম্রো এবং অংহ্লা ম্রোর ফলবাগান কেটে ফেলা হয়। একই সঙ্গে কাইংওয়াইপাড়ার দীংওয়াই ম্রোর ফলবাগানও ধ্বংস করা হয়। প্রায় ১২০০টি কলাগাছ, ৩ শতাধিক পেঁপে গাছ এবং কখেশ জাতের আমগাছ কেটে ফেলা হয়।
২৫ জুন উপজেলা প্রশাসন থেকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হলেও এখনো পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি। এমনকি মেনতকপাড়ার বাইলুম ম্রোর বাড়ির পাশের বৌদ্ধ বিহারের চারপাশেও গাছের চারা লাগানো হয়েছে। বনবিভাগের এই কার্যক্রম স্থানীয় ম্রো জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রগাঢ় আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
মাতামুহুরী সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঐতিহাসিকভাবেই ম্রো অধ্যুষিত অঞ্চল। এখানকার পাহাড়, অরণ্য, ঝিরিপথ ম্রো সভ্যতার প্রাচীন স্বাক্ষর বহন করে। ঢুংখি পাহাড়ে ফলবাগান ধ্বংস এবং নিষিদ্ধ প্রজাতির বৃক্ষরোপণ বিষয়ে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। যেসব পরিবারের ফলবাগান ধ্বংস করা হয়েছে, তাদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হোক।
একই সঙ্গে মাতামুহুরী বনাঞ্চলে বসবাসকারী ম্রোসহ অন্যান্য আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে বনবিভাগ ও রাষ্ট্রের বিদ্যমান দূরত্ব দ্রুত ঘোচাতে সংবেদনশীল ও কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। জনগোষ্ঠীর প্রাকৃতিক সম্পদনির্ভর জীবন-জীবিকা এবং লোকায়ত জ্ঞানকে গুরুত্ব দিয়ে সমন্বিত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বাস্তুতন্ত্রভিত্তিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার এখনই সময়।
বারবার এমন ঘটনাগুলোকে আড়াল করা বা গুরুত্বহীন করে তোলার মধ্য দিয়ে কেবল দূরত্ব এবং কর্তৃত্ববাদই প্রতিষ্ঠা পায়। রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত না হলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ক্রমশই আরও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে এবং সামগ্রিক প্রাণ-প্রতিবেশের ক্ষয় প্রবলতর হয়।
ঢুংখি পোকার নামে পাহাড়
ম্রো জনগণের সঙ্গে কীটপতঙ্গের রয়েছে এক অবিস্মরণীয় সম্পর্ক। ২০০৭ সালে আমি চিম্বুক পাহাড়ে ম্রো গ্রামে অবস্থান করেছিলাম। ওই সময় এপাড়া-ওপাড়া ঘুরে, এই জুম, সেই জঙ্গল ঘুরে একটি পতঙ্গ-পঞ্জিকা তৈরি করেছিলাম। একেক পোকার উপস্থিতি একেক ঋতুর বার্তা বহন করে। আর সেই ডাক শুনেই ম্রোরা তাদের জুমজীবনের নানা কাজের প্রস্তুতি নেয়।
যেমন—কুয়াইঙেন পোকা ডাকলে ম্রোরা জুমে বীজ বোনার প্রস্তুতি নেন, আর পংকু পোকা ডাকলে বুঝে নেন জুমে ধান কাটার সময় এসেছে। পতঙ্গ, পাখি, প্রাণ-প্রকৃতিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে ম্রোদের জটিল জীবনধারা। এমনকি তারা বহু স্থাননামও দিয়েছেন পশুপাখি, গাছপালা ও পোকামাকড়ের নামে।
খৈয়াঝিরি মৌজার পাশে একটি পাহাড়ের নাম ম্রোরা দিয়েছেন ‘ঢুংখি হুং’। ম্রো ভাষায় ‘হুং’ মানে পাহাড় এবং ‘ঢুংখি’ একধরনের পতঙ্গ, যা জুমের সময় পাহাড়জুড়ে বেশি দেখা যায়। ঢুংখি পোকার নামেই পাশের ছড়ার নাম ‘ঢুংখি খাল’।
বহু বছর ধরে মাতামুহুরী বনের এই পাহাড়ের প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষা করে আসছেন ম্রো জনগণ। তাদের জুমচাষের মাটির গুণাগুণ এবং যত্নই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। জুমের মাটি হাতে নিলেই তার প্রমাণ মেলে। পাশের তিনটি ছড়ার পানিপ্রবাহের দিকে তাকালেও তা স্পষ্ট বোঝা যায়। জামরাওঝিরি, খৈয়াঝিরি ও ঢুংশি ছড়াতে এখনো প্রবাহ আছে।
আর এই ঢুংখি পাহাড়েই অবস্থিত ম্রোদের দুটি প্রাচীন গ্রাম—মেনতকপাড়া এবং কাইংওয়াইপাড়া।
‘ফলবাগান ধ্বংস’ করার সমার্থক কি ‘ঝোপঝাড় পরিষ্কার’?
ঢুংখি পাহাড়ে ফলবাগান ধ্বংসের এই নিদারুণ ঘটনা ঘটলেও, তা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পেতে সময় লেগেছে। দৈনিক প্রথম আলো ২৬ জুন ‘আলীকদমে বনবিভাগের বিরুদ্ধে ম্রোদের বাগানের গাছ কেটে বনায়নের অভিযোগ’ শিরোনামে প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গ্রামবাসীরা বাগান ধ্বংসের প্রতিবাদ করলে বনবিভাগ তাদের মিথ্যা বন মামলা ও জেল-জুলুমের হুমকি দেয়।
ক্ষতিগ্রস্ত কাইংওয়াইপাড়ার দীংওয়াই ম্রো এবং মেনতকপাড়ার অংহ্লা ম্রো সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলাপে বলছিলেন, বনবিভাগের এই ধরনের আচরণ চলতে থাকলে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। নয়াপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রুমতুই ম্রোও বলেন, বনবিভাগের আচরণ ছিল সম্পূর্ণ বেআইনি।
উল্লেখ্য, নয়াপাড়া এবং কুরুকপাতা ইউনিয়ন বর্তমানে বনবিভাগের আওতাধীন সংরক্ষিত বনাঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। অভিযুক্ত রেঞ্জ কর্মকর্তা অবশ্য দাবি করেন, জায়গাটি ছিল পতিত, সেখানে কিছু কলাগাছ ও পেঁপেগাছ থাকলেও তা বাগান হিসেবে গণ্য করার মতো নয়।
এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ইয়াং বো ম্রো, রেংথাং ম্রো, দীংওয়াই ম্রো, মেনদি ম্রো, মেংক্রিং ম্রো, অংহ্লা ম্রো এবং মেনলাং ম্রো। প্রায় দুই বছর আগে চারটি পরিবার মিলে ১,৪৫০টি কলাগাছের চারা রোপণ করে এবং তা পরিচর্যা করে আসছিল। গাছগুলোতে ফল আসাও শুরু হয়েছিল।
গাছ কাটার সময় অংহ্লা ম্রো এবং মেনদি ম্রোর জুমজমির ধানচারাও বিনষ্ট হয়। অথচ লামা বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে অসত্য তথ্য দিয়ে বলেন— ‘কোনো বাগান ধ্বংস করা হয়নি, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ঝোপঝাড় পরিষ্কার করা হয়েছে মাত্র।’
তবে যদি ‘ঝোপঝাড় পরিষ্কার’ কথাটির বাস্তবতাভিত্তিক সমার্থক হয় ‘ফলবাগান ধ্বংস’, তাহলে বনবিভাগের সেই নির্দেশনাগুলো নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন তোলা জরুরি হয়ে পড়ে।
সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ঢুংখি পাহাড়ের ফলগাছগুলোর জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এছাড়াও সংবিধানের ৩১ এবং ৩২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে তার জীবন, জীবিকা বা সম্পত্তির ভোগদখল থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।
এই অনুচ্ছেদগুলোর আলোকে স্পষ্ট যে, ঢুংখি পাহাড়ে ফলবাগান ধ্বংসের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র তার সাংবিধানিক অঙ্গীকার পালনে ব্যর্থ হয়েছে।
বাইনারি আর কর্তৃত্ব থেকে বের হতে হবে
আলীকদম উপজেলা সদর থেকে মেনতকপাড়া ও কাইংওয়াইপাড়া—এই দুটি ম্রো গ্রামের দূরত্ব প্রায় ৮ কিলোমিটার। এই পাড়া দুটির কাছেই রয়েছে আরেক ম্রো গ্রাম—মেনসিং পাড়া। এই পাহাড়ে ম্রোরা চেম্মা, এরি, তরু, রাইরিক নামের জুম ধান বুনে। কিমদেং (বাংলা কলা) এবং দেংরিক (চাম্পা কলা) জাতের কলা গাছ লাগায়। পেঁপে, মরিচ, মারফা, ভুট্টা এবং বিভিন্ন শাকসবজি চাষ করে।
এই পাড়া দুটি গড়ে তুলেছিলেন মেনতক ম্রো এবং কাইংওয়াই ম্রো। তাদের উত্তরসূরি রেংথাং ম্রো, মেনদি ম্রো, ক্রোম লং ম্রো এবং মেনলাং ম্রো ঐতিহ্যবাহী জুমজমিন গড়ে তোলেন। পরে ইয়াং বোং ম্রো, ডিং ওয়াই ম্রো, মেংক্রিং ম্রো এবং অং হ্লা ম্রো দেশি প্রজাতির মিশ্র ফলবাগান গড়ে তোলেন।
এই মিশ্র ফলবাগান আসলে ঐতিহ্যগত জুমচাষেরই ধারাবাহিক উত্তরাধিকার। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামে নানা রাষ্ট্রীয় চাপ, নিয়ন্ত্রণ ও করাল নীতির ফলে জুম-আবাদ আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। সেই কারণে আদিবাসী জনগণ দেশি প্রজাতির মিশ্র ফলবাগান শুরু করতে বাধ্য হয়েছেন।
এই রূপান্তর শুধু আলীকদমে নয়—টাঙ্গাইলের মধুপুর শালবনেও দেখা গেছে। ১৯৫০ সালে সেখানে রাষ্ট্র জুমচাষ নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তীতে মিজি মৃ নামের এক মান্দি নারীর হাত ধরে সেখানে আনারস, পেঁপে, আদা, শিমুল আলু, হলুদ, কচু ইত্যাদি নিয়ে মিশ্র ফলবাগানের যাত্রা শুরু হয়।
কিন্তু মধুপুরেও রাষ্ট্র, বনবিভাগ এবং বাঙালি বলপ্রয়োগ থামায়নি। বরং বলপ্রয়োগের মাধ্যমেই শালবন দখল ও দূষিত হয়েছে। একইভাবে মৌলভীবাজারের টিলা-পাহাড়ে খাসিপুঞ্জিগুলোর মিশ্র পান-জুমও বলপ্রয়োগ ও বৈষম্য সামাল দিতে দিতে আজ ক্লান্ত ও দীর্ণ।
বৃহত্তর ময়মনসিংহের আদিবাসী অঞ্চলের মিশ্র ফলবাগান, সিলেটের খাসি পানপুঞ্জি কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রামের মিশ্র ফলবাগানের রয়েছে বহুস্তরীয় অবদান। বিশেষ করে নিরাপদ পুষ্টি নিশ্চিতকরণ এবং কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্বিন্যাসে এইসব বাগানের গুরুত্ব অপরিসীম। পাশাপাশি স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র রক্ষায়ও এগুলোর পরিবেশগত অবদান অনস্বীকার্য।
রাষ্ট্রকে আদিবাসী জনগণের এই পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। ভীতি, দমননীতি বা দূষণকে চলতে দিয়ে প্রাণ-প্রকৃতি এবং জনজীবনের অধিকার কোনোভাবেই রক্ষা করা সম্ভব নয়।
ঢুংখি পাহাড়ের ঘটনাকে কোনোভাবেই ‘অতিসাধারণ’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এই ঘটনার পেছনে যে বাইনারি চিন্তাভাবনা—যেখানে একদিকে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব, অন্যদিকে প্রান্তিকের অস্তিত্ব—তা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
মাতামুহুরী সংরক্ষিত বন যেমন বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য, তেমনি এই পাহাড়ের জনগণের প্রকৃতিনির্ভর জীবনসংস্কৃতিও রাষ্ট্রের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একাশিয়া আর ইউক্যালিপটাসগিরি কী থামবে?
আমাদের কি বান্দরবানের লামার সরই পাহাড়ের কথা মনে আছে? লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ তাদের রাবার বাগানের জন্য বারবার আগুন ও বিষ ব্যবহার করে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল সরই পাহাড়। সরই পাহাড়ের রেংয়েন ম্রো কার্বারিপাড়া, জয়চন্দ্র ত্রিপুরাপাড়া ও লাংকম ম্রো পাড়ার মানুষের খাবার ও ব্যবহারের পানির একমাত্র উৎস পাহাড়ি ঝিরিতে বিষ দেয় রাবার কোম্পানির লোকজন।
রাবার কোম্পানি প্রকৃতি চায়নি, চেয়েছে বাণিজ্যিক দখল। রাবার বাগানের নামে তারা পাহাড় ও বনভূমি দখল করেছে। এভাবেই ‘আগ্রাসী প্রজাতির বাগান’-এর নামে দেশব্যাপী পাহাড় ও বন বিনষ্ট হয়েছে। পাহাড় লণ্ডভণ্ড করে লাগানো হয়েছে সেগুন। এইসব কর্মকাণ্ডে স্পষ্ট হয়েছে—রাষ্ট্র কাঠের বাণিজ্য চায়, বন নয়।
আদিবাসীসহ গ্রামীণ বাঙালি জনগণ বহুবার রাষ্ট্রের এই আগ্রাসী প্রজাতি-নির্ভর বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। একাশিয়া ও ইউক্যালিপটাস নিষিদ্ধ করে রাষ্ট্র বহুদিন পর জনগণের বিজ্ঞান ও বিদ্রোহকে স্বীকৃতি দিয়েছে। আমরা এ কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ।
মধুপুর শালবন উপড়ে যখন একাশিয়ার বাগান গড়ে তোলা হয়, তখন মান্দি নারীরা প্রতিবাদে মুখর হন। নেত্রকোণার দুর্গাপুরের মেনকীফান্দা পাহাড়ে একাশিয়া বাগানের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন অজিত রিছিল, যিনি দেশীয় শালবন রক্ষায় জেলজুলুম সহ্য করেছিলেন।
ঢুংখি পাহাড়ে ম্রোদের ফলবাগান ধ্বংস করে আবারও নিষিদ্ধ একাশিয়া ও ইউক্যালিপটাস লাগানো হয়েছে—এটা একটি বড় অন্যায়। রাষ্ট্রকে দ্রুত ম্রো জনগণের কাছে এর জবাবদিহি করতে হবে। ঢুংখি পাহাড়ে রাষ্ট্রের অংশগ্রহণমূলক (ইনক্লুসিভ) ও পরিবেশ-সংবেদনশীল নীতি প্রতিফলিত হওয়া জরুরি।
আমরা দৃঢ়ভাবে চাই, আলীকদমের পাহাড় থেকে শুরু করে মধুপুর শালবন পর্যন্ত দেশের সর্বত্র একাশিয়া ও ইউক্যালিপটাসগিরি বন্ধ হোক।
আমাদের বিশ্বাস করতে হবে—আলীকদমের মাতামুহুরী বন দুর্গম বা প্রত্যন্ত নয়; আমরাই আমাদের বাইনারি, উত্তরাধিকার (লিগ্যাসি) ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে এই ‘দুর্গমতা’র ধারণা তৈরি ও টিকিয়ে রেখেছি। আর এই বাহাদুরি একাশিয়া ও ইউক্যালিপটাসের মতোই আমাদের সামাজিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য ‘আগ্রাসী’।
সব ধরনের আগ্রাসনকে প্রশ্ন করেই একটি নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্তির বয়ান হাজির করতে হবে।