Published : 10 Sep 2025, 07:12 AM
World Suicide Prevention Day– সরল বাংলা করলে হয় ‘বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস’। কিন্তু যদি এই দিবসটিকে বাংলা ‘বিশ্ব জীবন রক্ষার দিবস’ বলতে চাই আমি, খুব ভুল হয়ে যাবে?
ভুল হলেও ব্যক্তিগতভাবে আমি বাংলাটা এই রকমই করতে চাই। প্রতিবছর ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে এই দিবসটি পালিত হয়। এর মূল লক্ষ্য হলো মানুষকে জীবনের প্রতি অনুপ্রাণিত করা, সংকটে থাকা মানুষদের পাশে দাঁড়ানো এবং মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব তুলে ধরা। বাংলাদেশেও এই দিবসটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কারণ আমাদের সমাজে মানসিক কষ্ট, হতাশা কিংবা গভীর দুঃখ নিয়ে খোলাখুলি কথা বলার সংস্কৃতি এখনো তৈরি হয়নি। ফলে অসংখ্য মানুষ একা হয়ে পড়েন, কারও সঙ্গে ভাগ করতে না পেরে চরম সংকটের মুখে পড়েন।
বাংলাদেশ একটি তরুণসমৃদ্ধ দেশ। মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশই তরুণ। তাদের অনেকেই শিক্ষা, কর্মসংস্থান, পারিবারিক চাপ, সামাজিক প্রত্যাশা এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কজনিত সমস্যায় জর্জরিত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমরা তাদের মানসিক সংকটকে প্রায়ই উপেক্ষা করি। এই অবহেলা অনেক সময় তাদের জীবনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। তাই এই দিবসে আমাদের ভাবতে হবে-কীভাবে আমরা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলব, কীভাবে মানুষকে একা না রেখে পাশে দাঁড়াতে পারব এবং কীভাবে সমাজে সহমর্মিতার পরিবেশ তৈরি করতে পারব।
বাংলাদেশের বাস্তবতা
বিভিন্ন গবেষণা বলছে, দেশে প্রতি পাঁচজনের একজন কোনো না কোনোভাবে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সম্মুখীন। শহর থেকে গ্রাম, সব জায়গাতেই এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। তবে বড় সমস্যা হলো সচেতনতার অভাব। আমাদের সমাজে শারীরিক অসুখকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও মানসিক অসুস্থতাকে অবহেলা করা হয়।
যেমন, কারও মাথাব্যথা হলে আমরা তাকে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাই। কিন্তু যদি সে দীর্ঘদিন ধরে অস্বাভাবিকভাবে চুপচাপ থাকে, কারও সঙ্গে কথা না বলে, একা থাকতে চায়, অথবা সবকিছুতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, তাহলে সেটিকে আমরা গুরুত্ব দিই না। অনেক সময় একে ‘নাটক’ বা ‘দুর্বলতা’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। অথচ এগুলোই মানসিক সংকটের লক্ষণ।
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম আজ সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে। উচ্চশিক্ষার প্রতিযোগিতা, চাকরির অনিশ্চয়তা, পারিবারিক প্রত্যাশা, আর্থিক চাপ, সম্পর্ক ভাঙন সবকিছু মিলিয়ে তারা ভেতরে ভেতরে ক্লান্ত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘তুলনা সংস্কৃতি’ যেখানে সবাই শুধু সাফল্য দেখায়, ব্যর্থতা লুকায়। ফলে তরুণরা নিজেদেরকে অন্যদের থেকে পিছিয়ে মনে করে আরও হতাশ হয়ে পড়ে। তখন অনেকেই চরম পদক্ষেপ নিয়ে ফেলে।
কেন মানুষ চরম পদক্ষেপ নেয়? মানুষ যখন অনুভব করে– তার কষ্ট বোঝার মতো কেউ নেই, সে পরিবারের কাছে বোঝা, তার জীবনের কোনো মানে বা মূল্য নেই, অথবা তার সমস্যার সমাধান নেই।
তখন তার মনে চরম সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা জন্ম নেয়। এটি সাধারণত একদিনে হয় না। বরং দীর্ঘদিন ধরে মানসিক যন্ত্রণা, অবহেলা এবং আশাহীনতার কারণে এমন প্রবণতা তৈরি হয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চরম সংকটে থাকা মানুষ আসলে মরতে চায় না। তারা শুধু তাদের কষ্ট থেকে মুক্তি চায়। যদি তারা সময়মতো সঠিক সহায়তা পেতেন, তবে অনেক জীবন বেঁচে যেত।
পরিবারের ভূমিকা
বাংলাদেশি সংস্কৃতিতে পরিবার হলো মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেক পরিবার মানসিক সমস্যাকে গুরুত্ব দেয় না। সন্তান যদি হতাশা বা ভয় প্রকাশ করে, তখন অনেক বাবা-মা বলেন, ‘এসব দুর্বলতা দেখিও না’ বা ‘ছোট ছোট ব্যাপারে ভেঙে পড়লে হবে না’। মা-বাবা জানেন না, এই কথাগুলো সন্তানের কষ্ট আরও বাড়িয়ে দেয়।
পরিবারের দায়িত্ব হলো, সন্তানের আচরণে পরিবর্তন খেয়াল করা, তার একাকিত্ব বা অস্বাভাবিক নীরবতাকে গুরুত্ব দেওয়া, তাকে উপদেশ না দিয়ে মনোযোগ দিয়ে শোনা, বিচার না করে সহমর্মিতা দেখানো এবং প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাওয়া।
একজন প্রিয়জন যদি অনুভব করে, তার কষ্টকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তবে তার ভেতরের আশাহীনতা অনেকটাই কমে যায়।
তরুণদের ভাঙন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব
বাংলাদেশে ১৫-৩৫ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে মানসিক সংকট সবচেয়ে বেশি। পরীক্ষার চাপ, ক্যারিয়ারের অনিশ্চয়তা, প্রেম-ভালোবাসার ভাঙন, সামাজিক তুলনা এবং বেকারত্ব–সব মিলিয়ে তারা ভীষণ চাপের মধ্যে থাকে।
কিন্তু দুঃখজনক হলো, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা নেই। স্কুল-কলেজে পেশাদার কাউন্সেলর নেই বললেই চলে। অথচ, একজন শিক্ষার্থী যদি স্কুলে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহজভাবে কাউন্সেলরের কাছে যেতে পারে, তবে সে তার দুঃখ-হতাশা ভাগ করে নিতে পারবে। এতে বড় বিপদ এড়ানো সম্ভব হবে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যদি মানসিক স্বাস্থ্য ক্লাস, কর্মশালা ও পরামর্শ সেবা চালু করা হয়, তবে শিক্ষার্থীরা সংকট মোকাবিলা করতে শিখবে
কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ
শুধু তরুণরা নয়, কর্মজীবী মানুষও মানসিক সংকটে ভোগেন। অফিসের দীর্ঘ সময়, কম বেতন, চাকরির অনিশ্চয়তা, পারিবারিক দায়িত্ব এবং শহুরে জীবনের ভোগান্তি—সব মিলিয়ে তাদের ভেতরে ভেতরে মানসিক ক্লান্তি জমতে থাকে।
বেশিরভাগ অফিসে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো নীতি নেই। কর্মীরা যদি অবসাদ বা হতাশার কথা বলেন, তা প্রায়শই গুরুত্ব পায় না। অথচ সুস্থ কর্মপরিবেশ তৈরি করলে কর্মীদের মানসিক চাপ কমে, কাজের উৎপাদনশীলতাও বাড়ে।
সামাজিক কলঙ্ক
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সামাজিক স্টিগমা বা কলঙ্ক। আমাদের সমাজ এখনো মনে করে, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগলে মানুষ তাকে ‘দুর্বল’ ভাববে । অনেকেই মনে করেন, মন খারাপ বা হতাশা মানেই বিশ্বাসে ঘাটতি বা চরিত্রের দুর্বলতা।
ফলে মানুষ সাহায্য চাইতে দ্বিধা করে। তারা মনে করে, যদি কেউ জানতে পারে তবে সমাজে হাস্যকর বা অসম্মানজনক পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে। এই ভয় তাদের আরও একা করে দেয়।
মনে রাখা দরকার, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা শরীরের অসুখের মতোই স্বাভাবিক। যেমন ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের জন্য ডাক্তার দেখানো লজ্জার কিছু নয়, তেমনি বিষণ্ণতা বা মানসিক চাপে বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়াও স্বাভাবিক।
করণীয়
বাংলাদেশে জীবন রক্ষার আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে হলে কয়েকটি উদ্যোগ নেওয়া জরুরি:
সচেতনতা বৃদ্ধি: গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত আলোচনা করতে হবে।
কাউন্সেলিং সেবা: প্রতিটি স্কুল, কলেজ ও কর্মক্ষেত্রে পেশাদার কাউন্সেলর নিয়োগ দিতে হবে।
পরিবারকে শিক্ষিত করা: মা-বাবা ও পরিবারের সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
সহজ সাহায্যের ব্যবস্থা: হেল্পলাইন, অনলাইন সাপোর্ট গ্রুপ ও কমিউনিটি সেন্টার বাড়াতে হবে।
স্টিগমা দূরীকরণ: ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক, জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বদের মাধ্যমে ইতিবাচক বার্তা ছড়াতে হবে।
যুব প্রোগ্রাম: তরুণদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য ক্লাব, সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন ও পিয়ার সাপোর্ট গ্রুপ চালু করতে হবে।
গবেষণা: দেশের বাস্তবতা অনুযায়ী মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আরও গবেষণা করতে হবে।
আমরা কীভাবে সাহায্য করতে পারি? কারও আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন দেখলে গুরুত্ব দিন, সে যদি কষ্টের কথা বলে, মনোযোগ দিয়ে শুনুন, ‘তুমি দুর্বল’ বলার বদলে বলুন,‘আমি তোমার পাশে আছি’, তাকে একা ফেলে দেবেন না, প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যান।
একটি কথা মনে রাখতে হবে—একটি হাসি, একটি সহমর্মিতামূলক কথা, বা সামান্য সময় নিয়ে কারও গল্প শোনা—এসবই অনেক সময় একটি জীবনকে বাঁচিয়ে দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি হয়েছে। অনেক দেশে স্কুল-কলেজে নিয়মিত কাউন্সেলিং ক্লাস চালু আছে। অফিসে মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালন করা হয়। অনলাইন হেল্পলাইন ২৪ ঘণ্টা চালু থাকে।
বাংলাদেশেও এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে সহজলভ্য মানসিক স্বাস্থ্য সেবা চালু করলে অনেক মানুষ উপকৃত হবেন।
সমাধান আছে সহমর্মিতায়
জীবন অমূল্য। কোনো সংকটই এত বড় নয় যে তার সমাধান নেই। কিন্তু মানুষ যখন একা হয়ে যায়, তখনই চরম সিদ্ধান্ত নেয়। তাই আমাদের দায়িত্ব হলো চারপাশের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেওয়া, পাশে দাঁড়ানো, এবং সহমর্মিতা দেখানো।
আজকের দিনে আমাদের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার হওয়া উচিত— কেউ যেন নীরবে কষ্টে ডুবে না থাকে, প্রত্যেকে যেন জীবনের আলোয় ফেরার সুযোগ পায়।
চলুন, আমরা সবাই মিলে জীবন বাঁচানোর আন্দোলনে অংশ নিই। কারণ প্রতিটি জীবনই মূল্যবান, প্রতিটি জীবনই আশার আলোয় ভরপুর।