বিকৃত যৌনতা, অসুস্থ মনন: কোথায় উদ্ধার?

অজয় দাশগুপ্তঅজয় দাশগুপ্ত
Published : 4 March 2020, 12:26 PM
Updated : 4 March 2020, 12:26 PM

যুবলীগ নেত্রী পাপিয়ার সাথে যারা ওঠবস করতেন সোশাল মিডিয়ায় তাদের একটা তালিকা ভেসে বেড়াচ্ছে। এই তালিকার সত্যি-মিথ্যা জানিনা। তবে তালিকা দেখে আপনি কি আসলেই চমকে গেছেন? আমি কিন্তু একটুও চমকাইনি।

বরং আমার মনে হয়েছে আরও আছেন, আরও অনেকে আছেন। তবে এ মুহূর্তে বা এখন তাদের নাম আসবে না। আসতে পারে না।  এর কারণও আমরা জানি। মাঝারি মানের প্রভাবশালীরা ধরা খেলেও, উঁচু পর্যায়ের কাউকে ধরা এত সহজ না।

তাছাড়া সরকারি আর বিরোধী দল বলে কথা। বিরোধীদের নাম প্রকাশ যতটা সহজ, সরকারিদের ততোটাই কঠিন। তার আগে বলে নেই এখনকার দুনিয়ায় কোনও কিছু বিশ্বাস করাও কঠিন বৈকি! ফটোশপসহ নানা ভেলকিবাজিতে আসল-নকল সব একাকার। কিন্তু আমাদের সমাজ বাস্তবতা কী বলে? ঘটনা মিথ্যা ভাবার কোনও কারণ আছে? বরং পাপিয়ার ঘটনা যে বিচ্ছিন্ন কিছু না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

না, আমি পাপিয়াকে নিয়ে সময় নষ্ট করবো না। আমি লিখতে চাই সমাজ ও যৌনতা নিয়ে। আপনি, আমি, আমরা- যারা মনে দেহে আবাসে অনাবাসে বাংলাদেশি, আমাদের জীবন কিভাবে বদলে গেছে, কেমন ছিল, কেমন হয়েছে- সেটা ভাবুন। আজ  অনেক কিছু বাতিল হয়ে গেছে যা এককালে ছিল জীবনের অনিবার্য অংশ। যৌনতা মানব জীবনের এক সুন্দর ও অপরিহার্য অধ্যায়। মূলত ভারতে যৌনতা ছিল শিল্প। মন্দিরের দেয়াল থেকে ভাস্কর্য বা ছবি বা গল্পে কতোভাবেই না তা এসেছে! মানুষকে জানিয়েছে কেমন ছিল সভ্যতার স্তরে স্তরে জীবনবোধ।

আমরা এখন গোধূলি বেলায়। মেঘে মেঘে প্রচুর সময় পার করেছি আমরা। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে তরুণ-তরুণী থেকে যৌবন এবং মাঝ বয়স পার করার অভিজ্ঞতা কী বলে? আমাদের সময়ে একটা উত্তেজক গল্প পাঠ করাও ছিল ভয়ের ব্যাপার। যৌথ পরিবারে একসাথে বড় হওয়া ভাই-বোনসহ নানা আত্মীয়ের ভিড়ে নিজের বলে আসলেই কিছু ছিল না। আমার বালিশ, আমার কাঁথা, আমার বিছানা বলেও কিছু ছিল না। কিন্তু শরীর তো ছেড়ে কথা বলার না। সে তার কাজ করেছে। গোঁফ গজানো তরুণ যেমন জোগাড় করে নিষিদ্ধ গল্প পড়ে নিয়েছে, তেমনি ঋতুমতী কিশোরীও জেনে নিতো কাকে বলে শরীরের টান। আমরা একদিক থেকে বঞ্চিত হলেও আরেকদিকে ছিলাম ভাগ্যবান। আমাদের আমলে হাতে হাতে মোবাইল বা ঘরে ঘরে ল্যাপটপ ছিল না যে চাপ দিলেই দুম করে হাজির হবে বিদেশের বা দেশের কোনও পর্ন ভিডিও। অস্বাভাবিক ও টাকার প্রয়োজনে করা কষ্টের যৌনদৃশ্যে আমরা নিজেদের বিকৃত কামে উত্তেজক করে তোলার সুযোগ কম পেতাম। প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরে অস্বাভাবিক কিছু অসম্ভব ছিল বলেই আমরা বিয়ে করতে চাইতাম। সত্যিকারের প্রেম না হলে একটি চুমুও ছিল নিষিদ্ধ ফল। আর যা কিছু বাকী সব তোলা থাকতো বিয়ের জন্য। আজকে যারা বিয়ে টিকছে না বা যৌথ পরিবার টিকবে না কিংবা মানুষ বিয়ে বিমুখ বলে আহাজারী করেন তারা এটা মনে রাখেন না- বাজারে দুধ সহজলভ্য হলে কেউ গরু কিনে দুধ খায় না।

আর একটা বিষয় মনে রাখা দরকার। ডিজিটাল কিংবা আধুনিকায়ন কেবল একদিকে হয় না। হাতে টাকা অবৈধ অর্থ হিসেব নিকাশহীন জোগানে পাগল মানুষ জানে না- টাকা দিয়ে কী করে! গোড়াতে মা-বাবার নামে দু একটা উপাসনালয় বা কীর্তন ওয়াজ করিয়ে ভেবে নেয় গুনাহ বা পাপ মাফ। এবার তার ভোগ ঠেকায় কে? এই যে ভোগের তৃষ্ণা, এর সীমা আজ সীমাহীন। এবং তাতে যোগ দিয়েছে দেশের অকর্মার চাঁইগুলো।

আপনি পাপিয়া তালিকায় কোনও শ্রমিক-কৃষক বা মধ্যবিত্তকে পাবেন? পাবেন না এই কারণে যে তার মাথায় কিলবিল করছে রাজ্যের সমস্যা। তার ছেলের চাকরি, মেয়ের বিয়ে, বোনের বিয়ে কিংবা ছোট ভাই মা বাবার দায়িত্বে সে পাগল। তার যৌনতা নিয়ে বিলাসের সময় নাই। যারা হাড়ভাঙা খাটুনি খাটেন তাদের পর্ন লেখাতেও জাগানো যায় না। আর এদিকে আসলে অলস কথা ও ধান্দা যাদের পেশা তারাই নেমেছে যৌনতায়। যে কারণে আমরা যেগুলোকে রেড জোন বা নিষিদ্ধ এলাকা বলে জানতাম চিনতাম সেগুলো উঠে এসেছে পাঁচতারা হোটেলের স্যুটে। বিলাসী যৌনতার দিকটা আমরা ডিজিটাল দুনিয়া থেকে লুফে নিয়েছি বটে, আমাদের বিন্দুমাত্র ধারণা নাই যারা এগুলো ফেরি করে তাদের দেশের সমাজ সংসার কতটা দৃঢ়তার উপর দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের ধারণা ভুল প্রমাণ করে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়ানদের জীবন। তাদের বেশির ভাগ মানুষই এক স্ত্রী- এক স্বামীতে তুষ্ট। আর যা কিছু ডিভোর্স বা ছেদ তার পেছনে যৌনতার দায় কম, যা আছে তার নাম মতান্তর আর ভুল বোঝাবুঝি।

যেটা মজার ব্যাপার এরা আমাদের দেশের মত ওপরে সংসার ঠিক রাখার নামে একসাথে থেকে পরকিয়া করেনা। আর কেউ স্বামী বা স্ত্রীর হাতে নিগৃহীত হলে তা মুখ বুজে সহ্য করে না। তারা মনে করেন 'একসাথে না বনলে' বিদায় নেওয়াই ভালো। আর আমরা মনে করি তারা ইচ্ছামতো পার্টনার বদলায়।

বলছিলাম বদলে যাওয়া জীবনের কথা। কি আশ্চর্য তারুণ্য যেখানে প্রেম  ভালোবাসা ভবিষ্যত  নিয়ে ব্যস্ত সেখানে ভবিষ্যতের কাণ্ডারি বা নেতা নামে পরিচিত বিগত যৌবন বা বয়সের ভারে নতজানু মানুষগুলো নাকি এসব করার জন্য পাগল হয়ে উঠেছে। আবারো বলছি, তালিকায় যেসব নাম তার সব কটা বিশ্বাসযোগ্য না। কিন্তু আমরা বলছি প্রবণতার কথা। মিথ্যে করে হলেও যখন এমন কোনও তালিকা হয়, সেখানে এমন সব নাম আসবে- মানুষ তা বিশ্বাস করে বা খায়! এই জায়গাটাই ভয়ের। যাদের নাম এসেছে মানুষ তাদের দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাবেই। এমন একজনও পেলাম না, যার নাম দেখে সবাই সমস্বরে বলবে, 'না না হতে পারে না। এটা মিথ্যা।'

তাহলে ভাবুন দেশ উদ্ধারে ব্যস্ত মানুষদের ইমেজ কী এবং কত প্রকারের।  এসব কাণ্ড  যেমন একদিনে হয়নি, তেমনি একক কারও দ্বারাও অসম্ভব। আমাদের সমাজের মূল জায়গাটাই এখন আক্রান্ত। এখানে যৌনবিকৃতি-রাজনীতি-ধর্ষণ-লুণ্ঠন সব মিলেমিশে এমন এক কদর্য চেহারা নিয়েছে, কিছুদিন পর মানুষ কারও ওপর আস্থা বা বিশ্বাস রাখতে পারবে না।

আবারো বলি সমাজ সংসার ও দেশের যোগসূত্রে যারা তাদের সাবধান থাকা প্রয়োজন। তালিকার কথা বাদ দিন। ডাল-ভাত-মাছের বাঙালি কবে থেকে এতটা শিশ্নকাতর হয়ে উঠলো? কবে থেকে তার শরীরে এত তাগিদ এলো? না, এ কেবলই টাকার বিলাস। দেশে এখন গার্লফ্রেন্ড, বয়ফ্রেন্ড থাকাটা প্রেস্টিজের ব্যাপার। বড় নামে পরিচিত সবার আছে। না থাকলে তাদের সম্মান থাকে না। এ থাকাটা এখন পৌঁছে গেছে- আরও, আরও, আরও চাই… এর শেষ সীমায়। যে কারণে ড্রাইভার কন্যা পাপিয়া  হয়ে উঠতে পারে গড মাদার। তারুণ্য এবং ভবিষ্যত বাঁচাতে এই মারাত্মক প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। আমাদের যে সমাজ বা নিয়ম তাতে আর যাই হোক আমরা উন্মুক্ত জীবন বা অবাধ মেলামেশা নিতে পারবো না। এ ব্যাপারে নৈতিকতা বোধ, ধর্ম বা জীবনযাত্রা কোনটাই  আমাদের সমর্থন করে না। তাহলে উপায় কী?

উপায় একটাই। নিয়ন্ত্রণ আর সমাজে সংস্কৃতির বিস্তার। নাই কোনও নিয়ম, নাই কোন সংগঠন। নাই কোনও রাজনীতি, নাই কোনও শিষ্টাচার। খালি টাকা বিলাস ভোগ আর উস্কানি তাহলে পাপিয়া না জন্মে অন্যকিছু জন্মাবে? ভেঙে পড়ার আগে ঠেকাতে হবে। নয়তো ছেড়ে কথা বলবে না পাপ। ছাড়বে না জীবন।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক