Published : 30 Apr 2026, 02:42 PM
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের দুই দফার ভোটগ্রহণ সফলভাবে শেষ হয়েছে। আশাতীত ভোটার উপস্থিতি সবাইকে বিস্মিত করেছে। আগামী ৪ মে ভোটগণনার পরপরই নিশ্চিত হওয়া যাবে এবারের নির্বাচনে টানা তিনবার ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেস আবার ক্ষমতায় আসবে, নাকি বিরোধী দল বিজেপির হাতে যাবে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা।
২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ১৪৮টি আসন। ২০২১ সালের নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছিল তৃণমূল কংগ্রেস; তারা পেয়েছিল ২১৫টি আসন। ৭৭টি আসন পেয়ে প্রথমবারের মতো বিজেপি বসেছিল বিরোধী দলের আসনে। কংগ্রেস ও বামদের নির্বাচনি ফলাফল ছিল শোচনীয়।
এবারের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে (২০২৬) বিজেপি তার সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছে ভালো ফলাফল পাওয়ার চেষ্টায়। বলা চলে, ভারতের কেন্দ্রে এবং অনেক রাজ্যেই বিজেপি সরকার গঠন করেছে, ফলে পশ্চিমবঙ্গে সরকার গড়তে বিজেপি মরিয়া। তাই এবার তাদের টার্গেট ছিল নির্বাচনে ভোটার তালিকা সংশোধন করে নির্বাচন ব্যবস্থাকে তৃণমূলের প্রভাব থেকে বের করে আনা। নির্বাচন কমিশন এবারের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে অভাবনীয় প্রভাব বিস্তার করে নির্বাচনকে তৃণমূলের স্থানীয় শক্তির বাইরে আনতে সমর্থ হয়। বিপুল সংখ্যক ভোটার ভোট দিয়েছে। নির্বাচনে হাঙ্গামা ও অশান্তি অতীতের চেয়ে অনেক কম হয়েছে। অভাবনীয়ভাবে দুই দফার ভোটে ৯০-৯২ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছে। এটা ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে তো বটেই, গোটা পৃথিবীর নির্বাচনের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা।
নির্বাচনের ভোট গণনা হবে আগামী ৪ মে। ফলাফলও পাওয়া যাবে ওই দিন। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে বুথফেরত সমীক্ষাগুলোতে মিলছে মিশ্র ছবি। বেশিরভাগ সমীক্ষায় বিজেপি এগিয়ে ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি, আবার কিছুতে তৃণমূল এগিয়ে। তবে প্রায় সব ক্ষেত্রেই দুই দলের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত রয়েছে। বিভিন্ন সংস্থার পূর্বাভাসে কখনও বিজেপি ১৫০-এর বেশি আসন পেতে পারে বলা হচ্ছে, আবার কিছু সমীক্ষায় তৃণমূলকেই স্পষ্টভাবে এগিয়ে রাখা হয়েছে। কংগ্রেস ও বামদের ভূমিকা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সীমিত বা শূন্যের কাছাকাছি দেখানো হয়েছে।
বুথফেরত সমীক্ষার ফল অনিশ্চিত; কেননা অতীতে বহুবার বুথফেরত সমীক্ষার ফল ভুল প্রমাণিত হয়েছে। আবার অনেক সময় এই সমীক্ষার ফলাফলের ছাপ পাওয়া গেছে নির্বাচনি ফলাফলে। তবে এবারের বুথফেরত সমীক্ষা ইঙ্গিত দিচ্ছে—বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। যদিও চূড়ান্ত ফল কী হবে, তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে নির্ধারিত গণনার দিন অবধি।
পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের কাছে ‘দিদি’ বলে পরিচিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য এবারের লড়াইটি মূলত নিজের দুর্গ রক্ষার। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে এবারের সবচাইতে বড় ইস্যু ছিল এসআইআর; ইংরেজিতে যাকে বলা হচ্ছে Special Intensive Revision। এটা আসলে ভোটার তালিকা সংশোধনের পোশাকি নাম। ভারতীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এভাবে ভোটার তালিকা সংশোধন ইস্যু এত বড় মাত্রায় কখনো নির্বাচনি বিতর্ক ডেকে আনেনি। পশ্চিমবঙ্গে যেহেতু টানা ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় আছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস এবং বলা হয় সেখানে সংখ্যালঘু মুসলমান ভোটারদের বড় অংশ তৃণমূলকেই সমর্থন করেছে, ফলে বিজেপির চ্যালেঞ্জ ছিল এই ভোটারকে কোনো না কোনোভাবে নির্বাচনি প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা—এটা তৃণমূলের অভিযোগ। বিজেপি যেহেতু কেন্দ্রীয় সরকারে, তাই নির্বাচন কমিশনকে এই কাজে শক্তভাবে মাঠে নামিয়েছে তারা—এটাও তৃণমূলের অভিযোগ। যে কারণে এসআইআর শুধু নির্বাচনি বিতর্কের বড় ইস্যু হয়েই দাঁড়ায়নি, বলা হচ্ছে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে এই কর্মকাণ্ড গোটা ভোটের ফলাফলকেই দারুণভাবে প্রভাবিত করতে পারে। কেননা, ভোটার তালিকা সংশোধনের এই প্রক্রিয়ার প্রভাব পড়েছে সংশোধিত ভোটার তালিকায় বিপুলভাবে। এসআইআরের আগে পশ্চিমবঙ্গে মোট ভোটার ছিল প্রায় ৭.৬–৭.৭ কোটি। এই প্রক্রিয়ার পরে প্রায় ৮৩–৯১ লাখ নাম বাদ পড়ে। অর্থাৎ মোট ভোটারের প্রায় ১০–১২ শতাংশ কমে যায়। সংশোধনের পর ভোটার সংখ্যা নেমে আসে আনুমানিক ৬.৪–৬.৮ কোটির মধ্যে। বহু ক্ষেত্রে পরে আপিল বা ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে কিছু নাম ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তবে সংখ্যাটা তুলনামূলকভাবে খুবই কম। একই সঙ্গে অভিযোগ উঠেছে—অনেক বৈধ ভোটারের নামও বাদ গেছে, যা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মোদ্দা কথায়, এসআইআরের ফলে পশ্চিমবঙ্গে ভোটারের সংখ্যা বিপুল হারে কমেছে, যা নির্বাচনের গণিত ও রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলেছে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গের একাধিক আমলা ও পুলিশ কর্মকর্তাকে পদ থেকে সরিয়ে নতুনদের নিয়োগ করেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন এবং সরানোদের আর কোনো নির্বাচনি কাজে রাখা হয়নি। এই পদক্ষেপকে ঘিরে কমিশনের ‘অতিরিক্ত সক্রিয়তা’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তৃণমূল কংগ্রেস। টানা ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চিঠি দিয়ে অভিযোগ করেছেন, রাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা বা মতামত না নিয়েই এই বদলি করা হয়েছে। তার দাবি, আগে এমন ক্ষেত্রে কমিশন রাজ্যের কাছ থেকে তিনজনের প্যানেল চাইত এবং সেখান থেকেই একজনকে বেছে নিত—কিন্তু এবার সেই প্রচলিত রীতি মানা হয়নি। এই ইস্যুতে নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকেও অভিযুক্ত করেছে তৃণমূল। ফলে তৃণমূলের দিক থেকে বলা হয়েছে, এবার নির্বাচনে তৃণমূলকে লড়তে হয়েছে নির্বাচন কমিশন, কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্যের বিজেপির বিরুদ্ধে।
পশ্চিমবঙ্গের এবারের নির্বাচনে ভোটার তালিকা সংশোধনের এই উদ্যোগে নাম তোলার জটিলতা, নথিপত্র যাচাইয়ের চাপ এবং অনেক ক্ষেত্রে নাম বাদ পড়ার অভিযোগ—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক অনিশ্চয়তা ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিকেই তৃণমূল কংগ্রেস তাদের নির্বাচনি প্রচারের প্রধান ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করছে। তৃণমূলের অবস্থান অনুযায়ী, এসআইআর-জনিত এই ভোগান্তিই ভোটারদের ক্ষোভ তৈরি করেছে এবং সেই ক্ষোভকেই তারা রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে চেয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রকাশ্যে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তৃণমূলের অভিযোগ, কমিশন নিরপেক্ষভাবে কাজ না করে কেন্দ্রীয় শাসকদল বিজেপির প্রভাবাধীন হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই ধারণাকে সামনে এনে তারা চেষ্টা করেছে নির্বাচন কমিশনের সব বিতর্কিত সিদ্ধান্তের দায়ও বিজেপির ওপর চাপিয়ে দিতে। তৃণমূলের কৌশলগত লক্ষ্যও এখানে স্পষ্ট ছিল—এসআইআরকে কেন্দ্রীয় ইস্যু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারলে দীর্ঘদিনের তৃণমূলের শাসনকাল নিয়ে ওঠা অভিযোগ, যেমন—প্রশাসনিক ব্যর্থতা, শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি, রেশন কেলেঙ্কারি কিংবা আরজি কর কাণ্ড সংক্রান্ত বিতর্ক—এসব ভোটের আলোচনার কেন্দ্র থেকে সরে যাবে। ফলে জনমনে ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দু হবে এসআইআর, অন্য কোনো পুরনো ইস্যু নয়। তৃণমূল সেটা সাফল্যের সঙ্গে প্রয়োগও করতে পেরেছে।
অন্যদিকে বিজেপির রাজনৈতিক হিসাব ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের চিন্তা, এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে ভুয়া ও মৃত ভোটারদের নাম বাদ পড়বে, যা শেষ পর্যন্ত তাদেরই নির্বাচনি সুবিধা দেবে। তাদের চিন্তায়, এই ধরনের ভোটারদের একটি বড় অংশ অতীতে তৃণমূলের পক্ষে ভোট দিয়েছে, ফলে তালিকা শুদ্ধ হলে সমীকরণ স্বাভাবিকভাবেই পরিবর্তিত হবে। এ ছাড়া বিজেপি আরও একটি রাজনৈতিক কৌশল নিয়েছে—‘বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা’ ভোটারদের ইস্যু তুলে ভোটার তালিকা শুদ্ধিকরণের দাবি জোরদার করা এবং এর মাধ্যমে হিন্দু ভোট একত্র করার চেষ্টা। তাদের প্রচার কৌশলে এই বিষয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বিজেপি এই কৌশল সফলভাবেই প্রয়োগ করেছে।
সব মিলিয়ে নির্বাচনি মাঠে পরিস্থিতি এমন তৈরি করা হয়েছে যে, তৃণমূল মনে করেছে এসআইআর-জনিত ক্ষোভ তাদের পক্ষে জনসমর্থন ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে; অন্যদিকে বিজেপি বিশ্বাস করেছে এই প্রক্রিয়াই ভোটার তালিকা পুনর্গঠনের মাধ্যমে তাদের জয়ের পথ সুগম করবে। ফলে দুই পক্ষই ভিন্ন ভিন্ন যুক্তিতে এসআইআরকে কেন্দ্র করেই নিজেদের নির্বাচনি কৌশল সাজিয়েছিল, যা এবারের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের অন্যতম প্রধান নির্ধারক হয়ে উঠেছে।
নির্বাচনি মাঠে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস ও বিরোধী বিজেপি—নির্বাচনের পরে দুই দলই তাদের বিজয় নিশ্চিত বলে জানিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস বুথফেরত সমীক্ষাকে অগ্রাহ্য করে অতীতের উদাহরণ টেনে আবার ক্ষমতায় আসছে বলে দাবি করেছে। অন্যদিকে বিজেপি সরকার গঠনের ঘোষণা প্রায় দিয়েই ফেলেছে। কিন্তু বাস্তবে কী ঘটতে পারে? এবারের নির্বাচনে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য যে ঘটনা—এসআইআরের কারণে মোট ভোটার কমলেও, ভোটার উপস্থিতির হার অতীতের সব রেকর্ডকে ভেঙে ফেলেছে। এই বিপুল সংখ্যক ভোটার কি ক্ষমতাসীনদের বিপক্ষে রায় দেবে? নাকি এই বিপুল সংখ্যক ভোটার তার নাগরিকত্ব বজায় রাখতে তৃণমূল কংগ্রেসকেই শেষ ভরসা হিসেবে নির্ভর করবে? এই প্রশ্নের উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে জনরায় কাকে কাছে টানবে আর কাকে প্রত্যাখ্যান করবে।
এটাই এখন প্রধান জিজ্ঞাসা—তৃণমূলের প্রত্যাবর্তন ঘটবে, নাকি হিন্দুত্ববাদের জোয়ারে ক্ষমতার মসনদে বসবে বিজেপি! এর নিশ্চিত উত্তর পেতে ৪ মে অবধি অপেক্ষা করতে হবে। তবে একথা নিশ্চিত, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনি ফলাফলের উত্তাপ বাংলাদেশকেও ছুঁয়ে যাবে বিপুলভাবে।