এক ক্যান্সার যোদ্ধার আলো ছড়ানোর গল্প

ক্যান্সার ভয়াবহভাবে বাংলাদেশে ছড়াচ্ছে, ঢাকা ছাড়া দেশের অন্য কোথাও ক্যান্সার চিকিৎসা বা শনাক্তের তেমন সুবিধা খুবই কম। বাংলাদেশের ক্যান্সার রোগীদের ৯০ শতাংশই চিকিৎসা করার টাকা জোগাড় করতে পারে না কিংবা চিকিৎসা করাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে।

নাজমুস আহমেদ আলবাব
Published : 20 Feb 2024, 12:35 PM
Updated : 20 Feb 2024, 12:35 PM

সময়টা ২০১১ সাল, দেশের মাটিতে প্রথমবার বিশ্বকাপ আয়োজন হচ্ছে। ক্রিকেট বোর্ডের সাবেক কর্মকর্তা, ক্রিকেটার ও ক্রিকেটপ্রেমী হিসেবে এই আয়োজনটা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং আনন্দ ও গর্বের তা বলে বোঝানো যাবে না। ইচ্ছা ছিল প্রতিটা ম্যাচ গ্যালারিতে বসে দেখার, ম্যাচের সময় দর্শকরা যেমন বুনো উল্লাসে মেতে ওঠে সেটির মজা টিভি সেটের সামনে বসে একদমই পাওয়া যায় না। তবে মাঠে বসে খেলা দেখার সময় কোথায়? ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা এমন, কি আর বলব! এমনিতেই গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে যে গরম, তার ওপর তাড়াতাড়ি শিপমেন্টের জন্য চাপ সবসময়ই থাকে, অফিসের সবাই অসম্ভব ব্যস্ততার মাঝে কাটায়।

আমার তিন রত্ন নাশওয়ান, আরশিয়ান ও মাহাদিয়া এবং ওদের আম্মুকে নিয়ে একজন সুখি মানুষই বলা চলে আমাকে। সপ্তাহে ছয়দিন অফিস করে একদিন মাত্র ওদের সঙ্গে সময় কাটাতে পারি। আমার মেয়েটা তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট্ট, বয়স মাত্র ১০ বছর। এই বয়সেই আমাকে অনেক শাসন করে, যেন আমার মা। ওদের তিনজনকে আমি এখন তেমন বেশি একটা সময় দিতে পারি না। তবে তিন রত্নকে অনেক বেশি ভালোবাসি।

এর মধ্যে হঠাৎ করে শরীরটা একটু খারাপ খারাপ লাগা শুরু করেছে। এই শীতের শেষের দিকের ধুলাবালির জন্য, নাকি জ্যামের মধ্যে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত সকাল বেলার জার্নি, নাকি ফ্যাক্টরির অসহ্য গরম, নাকি অন্য কিছু— কিছুই বলা যাচ্ছে না। আর কাজের জন্য নিজের শরীরের প্রতি একটু যত্ন নেওয়া বা ডাক্তারের কাছে যাওয়া কিছুই হচ্ছে না। আমরা পুরুষ মানুষ, অল্পতে এত কাতর হলে চলে না। পরদিন শিপমেন্ট আছে, অফিসে অনেক কাজ, কিন্তু অফিসে যাওয়ার পর থেকে শরীরটা এত খারাপ লাগতে শুরু করে যা বলে বোঝানো যাবে না। কিছুক্ষণ কাজ করার পর খেয়াল করলাম আমার সারা শরীর ব্যথা, জ্বর উঠে গেছে। সেদিন দুপুরে অফিস থেকে বাসায় এসে ওষুধ খেয়ে শুয়ে পড়লাম, কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না।

আর সহ্য করতে না পেরে দুটো সাপোজিটরি নিলাম। কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হলো না। বিছানায় শুয়ে ক্লান্তিতে ওই জ্বর নিয়েই ঘুম চলে আসল। সন্ধ্যায় ঘুম থেকে ওঠার পর আরও বেশি খারাপ লাগছিল। জ্বর, শরীর ব্যথার সঙ্গে মনে হচ্ছে যে দুনিয়াটা কেমন যেন দুলছে। বাথরুমে গেলাম কোনোমতে ওয়ালটা ধরে ধরে, কাশির সঙ্গে রক্ত এল। তখনই খানিকটা ভয় পেয়ে গেলাম। দেরি না করে পরদিনই চলে গেলাম অ্যাপোলো হাসপাতালে। ডাক্তাররা বেশ কিছু পরীক্ষার পাশাপাশি ভর্তি করে নিল। পরদিন ডাক্তাররা বলল প্লাটিলেট লেভেলটা অনেক কম, ডেঙ্গু হতে পারে। শরীরের যে অবস্থা তাই আরও কিছু পরীক্ষা করতে দিল। এমনিতেই তখন শরীরটা বেশি ভালো না। তার ওপর ডাক্তাররা সামান্য জ্বরকে কি পর্যায়ে নিয়ে গেছে তাই নিয়ে ভাবছি। এক জ্বরের জন্য ৭ দিন হাসপাতালে আমার নিজের ভর্তি থাকতে হবে তা কল্পনাতেও ভাবিনি।

সাতদিন পর বাসায় এসে দেখি দুনিয়ার সব আত্মীয়-স্বজন আমাকে দেখার জন্য হাজির। আর হাসপাতালে যে কয়দিন ছিলাম সে কয়দিন কত আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব, সহকর্মী আরও কত মানুষ যে আমাকে দেখার জন্য চলে এসেছিল তার হিসেব নেই। আমার কেবিনের টেবিলে ফলের স্তূপ হয়ে গিয়েছিল যেন একটা ফলের দোকান— বেদানা আর আঙুর খাওয়ার চেয়ে ওগুলো দেখতে দেখতে অভক্তি চলে এসেছিল। আমার ডেঙ্গু হয়েছে তার জন্য সবাই এত উদ্বিগ্ন, মনে মনে খুশিই লাগছিল যে আমাকে সবাই এত ভালোবাসে। তবে আমার পরিবারের সবাই কেমন যেন ভেঙে পড়েছিল। তাদের চেহারা একদম মলিন হয়ে গিয়েছিল।

কয়েকদিন বাসায় থাকার পর সবাই আমাকে বলল যে সিঙ্গাপুর গিয়ে একটু চেকআপ করে আসার জন্য, মানে আমার বাবা আর মামা। মনে হলো এই জ্বরের জন্য সিঙ্গাপুর? আমাদের দেশে মানুষ ভালো করে চিকিৎসা পায় না, আর আমার সামান্য জ্বর হয়েছে, আমি যাব সিঙ্গাপুরে শুধুমাত্র চেকআপ করার জন্য? বাবাকে প্রচণ্ড ভয় পেতাম, তাই কিছু বলতে পারলাম না। আমার বোন আমাকে বলেছিল, ভাইয়া তুমি তো এমনিতে অসুস্থ হও না, যেহেতু হঠাৎ করে এত অসুস্থ হয়ে গেছ, তাই আর দেরি না করে একটু ভালো ডাক্তার দেখিয়ে আস। আমি হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার ১০ দিনের মাথায় সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে যাত্রা করলাম, সঙ্গে বাবা আর আমার স্ত্রী। আমি তখনও জানতাম না ঢাকার ডাক্তাররা আমার শরীরে লিউকোমিয়া নামের ব্লাড ক্যান্সারের জীবাণু খুঁজে পেয়েছে।

আমি সিঙ্গাপুরের গ্লেন ইগল হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। আমাকে হেমাটোলজি ডিপার্টমেন্টে ভর্তি রেখে পরীক্ষা করছিল, আমার মনে তখন একটু একটু করে সন্দেহ হচ্ছিল যে আমার মনে হয় বাজে কোনো রোগ হয়েছে। আশপাশে যারা আছে, তাদের সবারই ব্লাড ক্যান্সার, বেশিরভাগ লিউকোমিয়ার রোগী। আমার ডাক্তার ছিল ফ্রেডি, রিপোর্ট দেখানোর সময় ওকে জিজ্ঞাস করলাম, ডাক্তার আমার কি লিউকোমিয়া হয়েছে? ডাক্তার খুবই সহজভাবে বললো, হ্যাঁ, বন্ধু তোমার লিউকোমিয়া হয়েছে। তুমি আর আমি দুজন মিলে এই রোগটার সঙ্গে যুদ্ধ করব। তোমাকে মাত্র ৫টা কেমোথেরাপি দেব, তুমি খুব দ্রুত দেশ থেকে সবকিছু গুছিয়ে চলে এসো। ফ্রেডিকে জিজ্ঞেস করলাম, আমি কি মারা যাচ্ছি? ফ্রেডি তখন হাসতে হাসতে বলল, অবশ্যই মারা যাচ্ছো, কিন্তু এমন কোনো মানুষ নেই যে, সে মারা যাচ্ছে না। তবে তুমি এই লিউকোমিয়াতে মারা যাচ্ছো না। ফ্রেডির কথায় তেমন একটা কিছু মনে হলো না যে, আমার ক্যান্সার হয়েছে বা ক্যান্সার কতটা ভয়াবহ।

ফ্রেডি চলে যাওয়ার পর উপলদ্ধি হয়েছিল যে, আমার লিউকোমিয়া হয়েছে, তখন আমার খেয়াল হলো এজন্যই কি আমার পরিবারের সবাই এতটা ভেঙ্গে পড়েছিল? আমাকে জানতে দেয়নি। আমি যদি মারা যাই আমার ছেলেমেয়েগুলোর কি হবে? এসব ভাবতে ভাবতে আমি কেমন যেন ঘোরের মধ্যে চলে যাচ্ছিলাম আর আমার সকল অসুখ যেন তখন আমার শরীরে বিশাল এক পাহাড়ের মতো চেপে বসল। ডাক্তারের কথামতো আমি দেশে চলে এলাম সবকিছু গুছিয়ে নেওয়ার জন্য। কারণ, ৫টা কেমোথেরাপি দিতে প্রায় ৪/৫ মাস সময় লাগবে। সিঙ্গাপুর থেকে আসার সময় বাবা আমাকে একটা বিজ্ঞাপন দেখিয়েছিল, একটা মেয়ের লিউকোমিয়া হয়েছে কিন্তু অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছে না। আমি দেশে এসে সর্বপ্রথম যে কাজটা করলাম সেটা হলো, ওই যে মেয়েটি অর্থের অভাবে লিউকোমিয়ার চিকিৎসা করাতে পারছে না, তার জন্য আমি আমার যত বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন আছে সবার কাছে থেকে চিকিৎসার খরচ জোগাড় করে মেয়েটার বাবার কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করলাম।

তারপর সবার কাছে থেকে বিদায় নিলাম। যখনই কারও কাছে থেকে বিদায় নিতাম তখন আমার মাঝে একটা ভয় কাজ করত— আর হয়তো কারও সঙ্গে দেখা হবে না, আমি হয়তো আর ফিরে আসব না। সবচেয়ে কষ্ট পেয়েছিলাম মায়ের কাছে থেকে বিদায় নেওয়ার সময়। মা আসার সময় বলেছিল, ঠিক আছে বাবা। ঠিকমতো যাস। আমি খুব কষ্ট করে কান্না আটকে রেখেছিলাম, জানতাম যে আমার চোখ দিয়ে পানি পড়লে আম্মুও নিজেকে ধরে রাখতে পারবে না। এরপর আমার তিন যক্ষের ধন নাশওয়ান, আরশিয়ান ও মাহাদিয়ার কাছে থেকে বিদায় নিয়েই রওনা দিলাম সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে।

সিঙ্গাপুরে বাবা এবং স্ত্রীকে নিয়ে উঠলাম সারাঙ্গন এলাকার একটি ফ্ল্যাটে। শুধুমাত্র ডাক্তার দেখানোর সময়, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য এবং কেমোথেরাপি নেওয়ার জন্য হাসপাতালে যেতে হতো। এছাড়া বাকি সময়টুকু ফ্ল্যাটেই থাকা হতো। আমি জীবনে ভালো কিছু বন্ধু-বান্ধব পেয়েছিলাম। ওরা একে একে সবাই বাংলাদেশ থেকে ছুটে এসেছিল আমাকে দেখার জন্য।

কেমোথেরাপি দেওয়ার পর শরীরের মধ্যে অসহ্য যন্ত্রণা হতো, মনে হতো যে শরীরের প্রত্যেকটি শিরায় শিরায় আগুন জ্বলছে। খুবই ক্লান্ত লাগত। সকালে কেমোথারাপি দেওয়ার পর বাসায় এসে সারাদিন ঘুমাতাম। ওষুধগুলোর প্রভাবে আমার মেজাজও দিন দিন হারাচ্ছিলাম। সবসময় কোনো না কোনো কিছু নিয়ে আমার আর স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া লেগেই থাকত। সিঙ্গাপুরে যাওয়ার প্রথম দিকে সব ঠিক ছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে যখন ওষুধের ডোজ বাড়ছিল, আমিও মেজাজ ধরে রাখতে পারছিলাম না, বেচারির কোনো দোষ ছিল না, তর্কগুলো আমিই করতাম। আমার কখন কোনটা দরকার হয় এগুলো নিয়েই ও সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকত। আস্তে আস্তে ও কেমন যে নিষ্প্রভ হয়ে পড়ছিল, দিন দিন ওর চেহারা আর স্বাস্থ্য ভেঙ্গে যাচ্ছিল।

ছয় মাস পর ডাক্তার আমাকে বললেন, আলবাব তুমি ভালো হয়ে গেছ। তুমি পৃথিবীর অত্যন্ত ভাগ্যবান মানুষগুলোর মধ্যে একজন। আমি বললাম, তুমি আমাকে বাঁচিয়েছ ডাক্তার। আমি তোমার কাছে সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব। ফ্রেডি আবার বলল, ঈশ্বর তোমাকে মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে দিয়েছেন, নিশ্চয়ই তিনি তোমাকে নিয়ে কোনো পরিকল্পনা করেছেন। আর শোনো, দেশে গিয়ে শক্ত কোনো কাজ করবে না, গরম লাগাবে না, ঠান্ডা লাগাবে না। একদম শিশুর মতো করে নিজের যত্ন নিতে হবে তোমার। আমি বললাম পেটের তাগিদে গার্মেন্টস ব্যবসা করে খাই, ওখানে তো অনেক গরম। ফ্রেডি বলল, ওটা ছেড়ে দাও, বেঁচে আছ এটাই অনেক বড়। তারপর আমি দেশে চলে আসলাম।

সিঙ্গাপুর থেকে ৬ মাস চিকিৎসা নেওয়ার পর দেশে এসে প্রথমেই উপলব্ধি হলো যে, আমি আর আগের মতো নেই। কেননা এখনও আমি একজন ক্যান্সার রোগী। যদিও আমার শরীরে ক্যান্সারের জীবাণু নেই আর। কিন্তু কেমোথেরাপি নেওয়ার কারণে শরীরের ইমিউন সিস্টেমের অবস্থা একেবারে খারাপ। ছোট কোনো অসুখ বাঁধলেও সেটা বড় এবং জটিল আকার ধারণ করতে খুব বেশি সময় লাগবে না। আর তার চেয়ে বড় কথা, আমার অনেকদিন ঘরের চার দেয়ালের মাঝে আটকা থাকতে হবে, তেমন কোনো ভারী কাজ করা যাবে না। আমি যেহেতু গার্মেন্টসের ব্যবসা করি, আর ফ্যাক্টরির পরিবেশ অত্যন্ত গরম, তাই গার্মেন্টসে আর যাওয়া হচ্ছে না। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম যে, গার্মেন্টসটা বিক্রি করে ফেলব। আর ডাক্তারও বলেছিল যে, ভারী কাজ করা যাবে না, জীবনে যে বেঁচে ফিরতে পেরেছি এটাই অনেক।

আসার পর প্রথম বেশ কিছুদিন বাসাতেই থাকতাম। সময় বেশ ভালোই কাটছিল। আমার সকল আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধবসহ আরও অনেকেই নিয়মিত দেখা করতে আসত। অনেকের সঙ্গেই সম্পর্কটা আরও বেশি গাঢ় হয়েছিল এই সময়টাতে। প্রথম দিকে বাসায় থাকতে থাকতে হাস-ফাঁস লেগে যেত। অনেক দিন পর পর একটু একটু করে বের হতাম। ভালোই লাগত, তবে বেশিক্ষণ বাইরে থাকতাম না বা খুব বেশি দূরে যেতাম না। কারণ, আমার নিয়ম করে ওষুধ এবং খাবার খেতে হতো। আমি যখন বের হতাম তখন গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখতাম কত মানুষ শত ব্যস্ততায় দূরে ছুটে চলেছে। খুবই হতাশা লাগত আমার। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে ভাগ্যবান মনে হতো যে, আমি অনেকের থেকে অনেক বেশি ভালো আছি।

২০১২ সালে এসে আমি আমার গার্মেন্টসটা বিক্রি করে দিলাম। কারণ, সেটি চালানোর মতো শক্তি বা শারীরিক অবস্থা আমার ছিল না। প্রথম প্রথম খুবই আফসোস লাগত যে, আমি কাজটা ঠিক করিনি, একদিন হয়তো আমার টাকা-পয়সার সমস্যায় পড়তে হতে পারে। তবে কিছুদিন যাওয়ার পর শারীরিক মানসিক ও পারিবারিক অবস্থা মিলে এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল যে তখন আর কোনো কিছুই আমাকে তেমনভাবে প্রভাবিত করতে পারত না। কেমন যেন একটা কেয়ারলেস হয়ে পড়েছিলাম। শেষমেষ আমি আমার পরিবার থেকে আলাদা হয়ে পড়লাম। এই ৪৫ বছরের জীবনে আমি আমার ব্যবসা, পরিবার হারিয়ে ফেলেছি। মাথার মধ্যে শুধু একটা জিনিসই ঘুরপাক খেত, আমার তো এখন কারও জন্য করার কিছুই নেই, তাহলে আমার জীবনের মানে কী? আমার জীবনে আর করার মতো কী বাকি আছে? আমার জীবনে কোনো স্বপ্ন কি আদৌ আছে?

তারপর প্রায় এক বছর পর আমি একটি গ্রামের পথ দিয়ে হাঁটছি, আগের মতো শরীরে তেমন জোর পাই না, তবুও অসুস্থ অবস্থার থেকে অনেক ভালো আছি। আমি একজনের বাড়ি খুঁজছি, সেই মেয়েটার যার লিউকোমিয়া হয়েছিল, আমি সিঙ্গাপুরে কেমোথেরাপি নিতে যাওয়ার আগে আমার বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজন সবার কাছ থেকে ওর চিকিৎসার জন্য অর্থ জোগাড় করে দিয়েছিলাম। আমি শুনেছি সেই মেয়েটিও এখন সুস্থ। তাই ওকে দেখতে এসেছি। একজনকে জিজ্ঞসে করে ওর বাড়ি খুঁজে বের করলাম। মেয়েটির নাম ফরিদা, ওদের বাড়িতে এসে ফরিদাকে ডাকলাম, একটি মেয়ে মাথায় ঘোমটা দিয়ে ঘর থেকে বের হলো, আমি তখন বললাম, ফরিদা তুমি আমাকে চিনবে কিনা জানি না, আমি আলবাব। তখন মেয়েটা ঘোমটাটা সরিয়ে অবাক হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, আপনিই ঢাকার আলবাব স্যার? যিনি আমাকে চিকিৎসা করার জন্য টাকা দিয়েছিলেন। স্যার আজকে আমি সুস্থ, আপনি না থাকলে আমি আজকে হয়তো এই পৃথিবীতে থাকতাম না।

আমি শুধু ফরিদাকে দেখার জন্য গিয়েছিলাম, গিয়ে দেখা করব একটু খোঁজখবর নেব তারপর চলে আসব। কিন্তু আমাকে পাওয়ার পর ওরা যা শুরু করল তাকে রীতিমতো এলাহী কাণ্ড বললে ভুল হবে না। চেয়ারে বসলাম। একজন বাতাস করছে, একজন শরবত নিয়ে আসছে। মুরগি জবাই করে মোরগ-পোলাও রান্না হচ্ছে। এদিকে আশেপাশের বাড়ির সবাই চলে এসেছে আমাকে দেখার জন্য, যেই মানুষটা ফরিদাকে চিকিৎসা করার ব্যবস্থা করে দিয়েছে তাকে দেখার জন্য সবার এত আগ্রহ! একটা সময় এসে আমার অনেক অস্বস্তি লাগতে শুরু করল। আমি ফিরে আসার সময় ফরিদার হাতে কিছু টাকা দিতে চাইলাম। কিন্তু ও টাকা নিল না। আমার পায়ে ছুঁয়ে সালাম করে বলল, স্যার, আমার কিচ্ছু লাগবে না, আমার জন্য শুধু দোয়া করবেন। ফরিদাদের বাসা থেকে বের হতে হতে প্রায় রাত হয়ে গিয়েছিল।

ফরিদাদের বাসা থেকে বের হয়ে ঢাকায় ফিরতে ইচ্ছে করছিল না। ইচ্ছা করিছল কোনো একটা পুকুরের পাড়ে গিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকি। একটা পুকুর পাড়ে বসে মনের ভেতর কেমন যেন লাগছিল, সিঙ্গাপুর থেকে আসার পর জীবনের কোনো মানে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। স্বপ্ন বা ইচ্ছা— কোনোকিছুই অবশিষ্ট ছিল না। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্বপ্নটা খুঁজে পেয়েছি। আমাকে হয়তো আল্লাহ এইজন্যই মরণঘাতী ক্যান্সার থেকে বাঁচিয়ে ফিরিয়ে এনেছেন। ক্যান্সার একটি মারাত্মক মারণব্যাধি। কিন্তু সঠিক চিকিৎসা করলে ক্যান্সারও ভালো হয়ে যায়, এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ আমি নিজে এবং ফরিদা। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, আমার জীবনে যেহেতু আর কোনো কিছুই নেই। তাই আমি এখন থেকে ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসার জন্য কাজ করে যাব।

ঢাকায় এসেই কেন যেন আমার চোখের সামনে ক্যান্সার রোগীদের দেখতাম অথবা কোনো না কোনো মানুষের মুখে অমুক ক্যান্সারে আক্রান্ত, তমুক ক্যান্সারের চিকিৎসা করাতে পারছে না— এইগুলো শুনতাম। একদিন আমি চেকআপ করানোর জন্য অ্যাপোলো হাসপাতালে গিয়েছি, বের হওয়ার সময় দেখি গেটের বাইরে রাস্তার ধারে একজন বৃদ্ধা ফুটপাতে বসে কান্না করছেন। তাকে দেখে ভিক্ষুক বা অন্য কিছু মনে হচ্ছে না। দেখে ভালো ঘরের নারী মনে হচ্ছে। আমি তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম যে, মা আপনার কি হয়েছে, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি বললেন, বাবা আমার ছেলের ক্যান্সার হয়েছে, জমি জমা বিক্রি করে এখানে ওর চিকিৎসা করাতে নিয়ে এসেছিলাম, কিন্তু এখন সব টাকা শেষ, চিকিৎসা আরও বাকি। কিন্তু চিকিৎসা করানোর জন্য এত টাকা কোথায় পাব? ছেলেটা হাসপাতালে ভর্তি। ওর সামনে কান্না করলে ও তো কষ্টেই মারা যাবে। ওই মায়ের হাহাকারের মতো কথাগুলো শুনে নিজের অজান্তেই চোখে পানি চলে আসল। আমি তার কাছে থেকে যোগাযোগের জন্য সব কিছু নিয়ে এলাম। তাকে না জানিয়ে অ্যাপোলো হাসপাতালের ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করে ছেলেটার খোঁজ-খবর নিলাম— ওর কি অবস্থা, কত টাকা লাগবে, ঠিক হবার সম্ভাবনা কতটুকু, ইত্যাদি ইত্যাদি। ছেলেটির নাম ছিল মোক্তার হোসেন, আর বাড়ি কুষ্টিয়ায়।

আমি বাসায় এসে সর্বপ্রথম আমার শুভাকাঙ্ক্ষীদের ফোন করা শুরু করলাম, যে এমন একজন রোগী আছে অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি তার চিকিৎসা করার জন্য টাকার দরকার। জমিজমা বিক্রি করে নিঃস্ব অবস্থায়, এখন হাসপাতালের বিল পর্যন্ত দিতে পারছে না। আমি যাদেরই ফোন করছিলাম কেউই আমাকে খালি হাতে ফেরায়নি। আমি নিজের কিছু টাকা এবং যে টাকাটা সবাই আমাকে দিয়েছিল সেই টাকাটা মোক্তারের মায়ের হাতে তুলে দিলাম। মোক্তারকে চিকিৎসা করার যে টাকাটা তোলা হয়েছিল সেটা দিয়ে সেবারের মতো চিকিৎসা করার পর সে ভালো হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন পর তার ক্যান্সার আবার ফিরে আসে। আমরা সবাই চেষ্টা করেও সে যাত্রায় তাকে মৃত্যুর হাত থেকে উদ্ধার করে আনতে পারিনি। ওর মৃত্যুর সংবাদ যখন আমি শুনেছিলাম তখন মনে হয়েছিল যে আমার কোনো আপন ভাই বা সন্তান বা অতি ঘনিষ্ঠ স্বজনকে আমি হারিয়েছি। অনেক দিন গেছে যে আমি মোক্তারের কথা ভেবে ঠিক মতো খেতে পারতাম না।

আস্তে আস্তে করে মোক্তার, হাসিনা, সুখিসহ আরও কত যে ক্যান্সার রোগীদের পাশে থেকেছি তার হিসেব নেই। তবে সেই সময় আমার কিছু উপলব্ধি হয়েছিল। এরমধ্যে অন্যতম হচ্ছে, ক্যান্সার ভয়াবহভাবে বাংলাদেশে ছড়াচ্ছে, ঢাকা ছাড়া দেশের অন্য কোথাও ক্যান্সার চিকিৎসা বা শনাক্তের সুবিধা খুবই কম। বাংলাদেশের ক্যান্সার রোগীদের ৯০ শতাংশই চিকিৎসা করার টাকা জোগাড় করতে পারেন না কিংবা চিকিৎসা করাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। চিকিৎসা করার সময় প্রয়োজনীয় সেবা পান না বলে অনেক রোগী অকালেই মৃত্যুবরণ করেন। আর সবচেয়ে বড় যে সমস্যার মুখোমুখি তারা হন তা হচ্ছে, ঢাকায় চিকিৎসা করাতে এসে অনেকেই আত্মীয়ের বাসায় থাকেন, কিছুদিন পর আত্মীয়ের সঙ্গে মনোমালিন্য শুরু হয়, কারণ ক্যান্সারের চিকিৎসা একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। এত দিন একজন আত্মীয় একজন রোগীকে রাখতে গেলে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হন, তাতে করে সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে। আর একটি অংশ যাদের ঢাকায় কেউ নেই বা থাকলেও একজন রোগীকে স্থান দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেই, তারা হয়তো কোনো একটি বাসা ভাড়া নেন, অনেকে হোটেলে থাকেন, কেউবা হাসপাতালের বারান্দায় বা ফুটপাতে ঘুমান। তাতে দেখা যায় এমনিতেই তার চিকিৎসা খরচ নিয়ে টানাটানি তার ওপর ঢাকা নগরীতে থাকা খাওয়ার যে ব্যয়বহুল খরচ তাতে চিকিৎসা করার সামর্থ্য আর হয়ে ওঠে না।

একটা সময় আসল তখন আমি আর একা যে রোগীদের সহায়তা করতাম তাদের সবাইকে সেবা দেওয়া আমার পক্ষে খুবই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছিল। তাই যারা আমার পাশে সবসময় ছিল তাদের নিয়ে আমি একটা ফাউন্ডেশন গঠন করলাম, নাম দিলাম ‘বাংলাদেশ ক্যান্সার এইড ফাউন্ডেশন’। আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের অসহায়, অস্বচ্ছল ও সুবিধাবঞ্চিত ক্যান্সার রোগীদের সহায়তা করা। আমরা শুধুমাত্র যে টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করব তা এর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল না। আমাদের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ক্যান্সারের প্রতি মানুষের যে ভীতি, ক্যান্সার রোগ হলে কি মানুষ বাঁচে না, এই ভয়টা সচেতনতা তৈরির মাধ্যমে দূর করা এবং ক্যান্সার রোগের চিকিৎসা বাংলাদেশের প্রত্যেকটি কোণায় কোণায় পৌছে দেওয়া।

আমি তখন মোটামুটি সুস্থ। আমি নতুন একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়েছি। এর পেছনে আমার কয়েকজন বন্ধুর অবদান অনস্বীকার্য। আমার অফিস তখন ছিল বনানী কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউতে। বাংলাদেশ ক্যান্সার এইড ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ২০১৫ সালে। প্রতিষ্ঠার সময় এর সদস্য সংখ্যা ছিল ২৯ জন। ফাউন্ডেশনের কাজের জন্য আমাদের মাত্র একজন কর্মকর্তা ছিলেন, তিনিই রোগীদের সমস্ত খোঁজ খবর নিতেন এবং কার কত টাকা লাগবে চিকিৎসার জন্য কিংবা আরও কোনো সমস্যায় আছেন কিনা সেগুলো নিয়ে কাজ করতেন। তিনি অফিস করতেন আমার অফিসের একটি ডেস্কে যেখান থেকে শুরু হয়েছিল আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা। তবে এমনও সময় গেছে যে, একজন রোগীর ঢাকায় থাকার জায়গা নেই, আমি তাকে আমার বাসায় নিয়ে আসতাম। সে আমার বাসায় থেকে চিকিৎসা করিয়ে আবার গ্রামে তার বাড়িতে চলে যেত। তখন থেকে মাথায় একটা চিন্তা আসত যে, এমন কোনো কিছু কি করা যায় যেখানে গ্রামের রোগীরা এসে তার অ্যাটেনড্যান্টসহ বিনামূল্যে থাকতে পারবেন।

সে সময় আমরা যে খুব বেশি রোগীকে সহায়তা করতে পারতাম তা কিন্তু না। তবে যে সকল রোগীকে সহায়তা করতাম তাদের পুরোপুরিভাবেই সহায়তা করতাম। আর এই সহায়তার পেছনের মূল কারিগর ছিলেন ওই ২৯ জন মানুষ যারা আমাদের ফাউন্ডেশনের ট্রাস্টি মেম্বার ছিলেন। সবাই যে শুধু টাকা-পয়সা দিয়েই কেবল সাহায্য করতেন তা নয়। তাদের মাঝে অনেকে ছিলেন ডাক্তার, হাসপাতাল মালিক। তারা রোগীদের ফ্রিতে ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থা করে দিতেন অথবা তার চিকিৎসা ঠিকভাবে হচ্ছে কিনা তার তদারকি করতেন।

২০১৮ সালে গুলশান ক্লাব মাঠে, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সহযোগিতায় আমরা ‘ক্রিকেট ফর ক্যান্সার’-এর আয়োজন করি। সেখানে বাংলাদেশ জাতীয় দলের বেশিরভাগ খেলোয়ারসহ সাবেক কিংবদন্তি ক্রিকেটার অনেকেই ছিলেন।

২০১৯ সালে আমরা ফাউন্ডেশনটিকে ট্রাস্টে রূপান্তরিত করলাম। আমাদের ট্রাস্টি সংখ্যা ছিল মাত্র ১৫ জন। এর পরিবর্তিত নাম ‘বাংলাদেশ ক্যান্সার এইড ট্রাস্ট (ব্যানক্যাট)’ রাখা হয়। ট্রাস্ট গঠনের অল্প কিছুদিন পরই শুরু হলো কোভিড-১৯ মাহামারী।

কোভিডের সময় রোগীরা সবচেয়ে বড় সমস্যার পড়েছিল ঢাকা এসে থাকা নিয়ে। তখন ঢাকায় ৯০ শতাংশ আবাসিক হোটেল বন্ধ ছিল, দেশে লকডাউন চলছিল তাই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতেও সমস্যা হতো।

এমন অবস্থায় আমাদের ট্রাস্টি বোর্ডের সবাই সিদ্ধান্ত নিলাম, ক্যান্সার রোগীদের জন্য একটি আবাসন তৈরি করব। যেখানে থেকে ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের যারা ঢাকার বাইরে থেকে ঢাকায় চিকিৎসা নিতে আসেন তাদের অ্যাটেনডেন্টসহ বিনামূল্যে থাকা-খাওয়া ও হাসপাতালে যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হবে।

এ উদ্যোগে সবচেয়ে প্রথমে যিনি এগিয়ে এলেন এম.এম. ইস্পাহানি গ্রুপের সালমান ইস্পাহানি সাহেব। আরও অনেকের সহযোগিতায় গড়ে উঠল ক্যান্সারাক্রান্তদের বিনামূল্যের আবাসন ‘আলোক নিবাস’। ২০১৫ সালে যাত্রা শুরু করা আলোক নিবাস অল্প সময়ের মধ্যে বাড়তি রোগীর চাপে পড়ে যায়। সেজন্য চলতি বছরের নভেম্বরে আমরা আলোক নিবাস-দুইয়ের উদ্বোধন করেছি। মোসাব্বির মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন এবং ব্যানক্যাটের যৌথ উদ্যোগে আলোক নিবাস দুইয়েও বিনামূল্যে থাকা, খাওয়া এবং হাসপাতালে রোগী নেবার ব্যবস্থা রয়েছে।

আমি স্বপ্ন দেখি এই রকম আলোক নিবাস প্রতিটি জেলায় জেলায় হবে। রোগীদের বর্তমান আলোক নিবাসের সেবার পাশাপাশি ক্যান্সার ডিটেকশন এবং অল্প কিছু চিকিৎসার ব্যবস্থাও করবার ইচ্ছে আছে। আপনারা আমাদের পাশে থাকবেন।

লেখক: ক্যান্সার লড়াকু এবং ক্যান্সার রোগীদের জন্য গড়া আলোক নিবাসের প্রতিষ্ঠাতা

(সেন্টার ফর ক্যান্সার কেয়ার ফাউন্ডেশনের ‘এখানে থেমো না’ বইয়ে লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে)