Published : 14 Apr 2026, 08:15 AM
বাংলাদেশের রাজনীতি আজ এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। চারদিকে হতাশা জমাট বাঁধছে, কিন্তু একইসঙ্গে কোথাও একটা অদৃশ্য সম্ভাবনাও নড়েচড়ে উঠছে। কেন আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো বারবার ব্যর্থ হচ্ছে? অনেকদিন ধরে আমরা এই প্রশ্নটা এড়িয়ে গেছি, এখন তাকে আর পাশ কাটিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। এই ব্যর্থতার ভেতরেই কি কোনো নতুন সম্ভাবনার বীজ লুকিয়ে আছে?
প্রথম কথাটা অস্বস্তিকর হলেও সত্য, আমরা আসলে সবই দেখে ফেলেছি। গত কয়েক দশকের রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমরা কেবল শাসক বদলেছি, কিন্তু শাসনের অপসংস্কৃতি থেকে বের হতে পারিনি। দেশের বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের আসল চেহারা গোপন রাখতে পারেনি। শুধু প্রকাশ্য ডানপন্থী দল নয়, যারা নিজেদের ডানবিরোধী বা প্রগতিশীল বলে দাবি করে, তাদের ভেতরেও আমরা একইরকম ক্ষমতার লোভ, দখলদারের মানসিকতা আর জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন রাজনীতির চর্চা দেখি। ফলে ‘ডান’ আর ‘ডানবিরোধী’ এই বিভাজনটাই অনেক সময় ফাঁপা মনে হয়। বর্তমানে প্রধান দলগুলোর চরিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ডানবিরোধী অবস্থান মানেই তা বাম নয়, বরং তা এক ধরনের ‘সহনশীল ডান’। এদেরকে আপাতদৃষ্টিতে প্রগতিশীল মনে হলেও তাদের চর্চায় ডানের ছাপ স্পষ্ট। এই জায়গাটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ তখন রাজনীতি হয়ে দাঁড়ায় ডান দিয়ে ডানকে ঠেকানোর এক ধরনের অভিনয়, যাকে আমরা প্রগতি বলে চালিয়ে দিই। এই ছদ্মবেশ জনগণের সামনে এক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি করে, যার ফলে প্রকৃত কাঠামোগত পরিবর্তন বারবার বাধাগ্রস্ত হয়।
এই ব্যর্থতা শুধু তত্ত্বের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই, এর বাস্তব রূপ আমরা প্রতিদিন দেখি। মবের হাতে কুষ্টিয়ায় একজন পীরকে হত্যা, শাহবাগে ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের ওপর হামলা কিংবা দেশের নানা জায়গায় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় চাঁদাবাজি—এসব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো একটা বৃহত্তর রাজনৈতিক সংস্কৃতির লক্ষণ; যেখানে সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা আর বিচারহীনতা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে গেছে। জনগণ যখন দেখে আইনের শাসনের বদলে গায়ের জোর আর পেশিশক্তির দাপটই চূড়ান্ত, তখন রাষ্ট্রের প্রতি তাদের আস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকে।
আরও গভীরে তাকালে বোঝা যায়, সমস্যাটা শুধু রাস্তায় নয়, এটা কাঠামোর ভেতরে ঢুকে গেছে। প্রশাসন, দল, এমনকি বিচার প্রক্রিয়ার ভেতরেও এক ধরনের দলীয় আনুগত্যের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এখানে ন্যায়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ‘কোন পক্ষের মানুষ’ এই প্রশ্নটি। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা অপরিহার্য, কিন্তু আমরা দেখছি ক্ষমতার মোহ সেই স্বাধীনতাকে দলীয় বৃত্তে বন্দি করে ফেলেছে। ফলে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোও ধীরে ধীরে নিরপেক্ষতার জায়গা হারাচ্ছে।
এখানে কোনো একক দলকে আলাদা করে দোষ দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বিএনপি হোক কিংবা অন্য কোনো বড় দল—তাদের সীমাবদ্ধতা একই জায়গায় গিয়ে ঠেকে। তারা এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ, যেখানে ক্ষমতা মানে নিয়ন্ত্রণ, রাজনীতি মানে পৃষ্ঠপোষকতা আর জনগণ মানে ভোটের হিসাব। এই গতানুগতিক ধারায় মানুষের অধিকারের চেয়ে দলের আধিপত্য বেশি গুরুত্ব পায়, যা শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রকেই বিপন্ন করে। এই কাঠামোর ভেতরে দাঁড়িয়ে ন্যায্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক বা দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের রাজনীতি তৈরি করা প্রায় অসম্ভব।
আরও বড় সংকট হলো কল্পনার। এই দলগুলো জনগণের সামনে কোনো ভিন্ন ভবিষ্যতের স্বপ্ন হাজির করতে পারে না। তাদের রাজনীতি ঘুরপাক খায় ‘কে ক্ষমতায় যাবে’ এই প্রশ্নে; ‘কীভাবে সমাজ বদলাবে’ ওই প্রশ্নটি সেখানে অনুপস্থিত। ফলে জনগণও ধীরে ধীরে রাজনীতিকে পরিবর্তনের জায়গা হিসেবে না দেখে একটি ক্ষমতার খেলা হিসেবে দেখতে শিখেছে।
বাংলাদেশে আরেকটা বাস্তবতা হলো, এখানে প্রকৃত অর্থে বামপন্থী রাজনীতি কখনোই রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেনি। কিন্তু যেসব গুরুত্বপূর্ণ বাম দল ছিল, তাদের অনেকেই সময়ের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান ঝাপসা করে ফেলেছে। কখনো তারা এমন ভাষা ও কৌশল নিয়েছে, যা তাদের মূল অবস্থানের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক। ফলে বামপন্থা আলাদা কোনো শক্তি হিসেবে জনগণের কাছে মজবুত ভিত্তি পায়নি।
তবুও, এই শূন্যতার ভেতরেই একটা সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। রাজনীতিতে ফাঁকা জায়গা বেশিদিন খালি থাকে না, সেখানে নতুন কিছু জন্ম নেয়। কর্মসংস্থান, জীবিকা, মর্যাদা, পরিবেশ ও বৈষম্যের প্রশ্নে নতুন প্রজন্মের বামপন্থী উদ্যোগগুলো যদি সত্যিই মানুষের জীবনের বাস্তব প্রশ্নগুলোকে সামনে নিয়ে আসতে পারে তাহলে তারা ভিন্ন এক পথের ইঙ্গিত দিতে পারে। নতুন দিনের এই রাজনীতিকে হতে হবে গণমুখী এবং জনআকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল, যেখানে তাত্ত্বিক গোঁড়ামির চেয়ে মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের সংকটের সমাধানই হবে মুখ্য লক্ষ্য।
সেই রাজনীতি মবতন্ত্র, চাঁদাবাজি বা পৃষ্ঠপোষকতার হবে না। তা হতে পারে এমন এক রাজনীতি, যেখানে মানুষ শুধু ভোটার নয়, বরং রাজনৈতিক সংগঠনের অংশীদার। কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই নতুন উদ্যোগগুলো কি সত্যিই নতুন হতে পারবে?
বাস্তবতা খুবই কঠিন। বর্তমান রাজনৈতিক চিত্রটি তীব্রভাবে মেরুকৃত। একদিকে ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকার রাজনীতি, অন্যদিকে ক্ষমতায় এলে সম্ভাব্য আরও রক্ষণশীল শক্তির উত্থান। এই দুইয়ের টানাপোড়েনে দেশ আবার ওই পুরনো ফাঁদে আটকে যেতে পারে। এই বাইনারি বা দ্বি-মুখী চক্র ভাঙা সহজ নয়। কারণ এটি শুধু ক্ষমতার পালাবদল ঘটায়, সমাজ বা রাষ্ট্রের চরিত্র বদলায় না। বরং একই সংকট নতুন নামে, নতুন আকারে ফিরে আসে।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন বামপন্থী রাজনীতির সামনে যেমন বড় সুযোগ আছে, তেমনি আছে বড় দায়। শুধু সমালোচনা বা নৈতিক অবস্থান জানিয়ে থেমে গেলে চলবে না। তাদের দেখাতে হবে যে বাস্তবে ভিন্নভাবে রাজনীতি করা সম্ভব; সংগঠনের কাঠামোয়, ভাষায়, নেতৃত্বের ধরনে, এমনকি ক্ষমতার ব্যবহারেও। তাদের প্রমাণ করতে হবে রাজনীতি মানে কেবল ক্ষমতা দখল নয়, বরং সমাজকে নতুনভাবে গড়া; প্রতিপক্ষকে হারানো নয়, বরং মানুষকে শক্তিশালী করা। এই কঠিন পথে টিকে থাকতে হলে ত্যাগের মানসিকতা এবং জনগণের সঙ্গে গভীর সংহতি প্রয়োজন। কোনো শর্টকাট পথে বা কেবল গ্ল্যামার দিয়ে এই বৈপ্লবিক পরিবর্তন সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ কি সেই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত? হয়তো প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু সেই পরিবর্তন বাস্তবে আসবে কি না, তা নির্ভর করছে কে সাহস করে এই নতুন রাজনীতির রূপরেখা শুধু কাগজে নয়, বাস্তবেও দাঁড় করাতে পারে তার ওপর। কারণ শেষপর্যন্ত মানুষ তত্ত্বে নয়, অভিজ্ঞতায় বিশ্বাস করে। আর ওই অভিজ্ঞতাই ঠিক করে দেবে, বাংলাদেশ ডানের ভেতরেই ঘুরপাক খাবে, নাকি সত্যিই নতুন এক রাজনৈতিক দিগন্তের দিকে এগোবে। ইতিহাসের মোড়ে দাঁড়িয়ে এখন প্রয়োজন কেবল সাহসের সঙ্গে সত্যকে উচ্চারণ করা এবং মানুষের জন্য একটি বাসযোগ্য আগামীর নিশ্চয়তা প্রদান করা।