Published : 12 Apr 2026, 11:01 AM
ইরানের চলচ্চিত্রকে বুঝতে হলে কেবল পর্দার গল্প দেখলেই চলে না; বুঝতে হয় রাষ্ট্র, সমাজ এবং মানুষের জটিল সম্পর্ক। কারণ, এই দেশের সিনেমা সবসময়ই কঠোর নিয়ন্ত্রণ, মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা এবং শিল্পীর ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রশ্নের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধপরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক চাপ একসঙ্গে ইরানের বাস্তবতাকে নাড়িয়ে দেয়, তখন প্রশ্ন জাগে এই পরিস্থিতি কি আগামীতে ইরানের চলচ্চিত্রকে আরও সংকুচিত করবে, নাকি সংকটের মধ্যেই জন্ম নেবে নতুন সৃজনশীলতা?
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরান সরকার চলচ্চিত্রকে একটি নির্দিষ্ট নিয়মের আওতায় নিয়ে আসে। এর ফলে সিনেমায় কী দেখানো যাবে আর কী যাবে না, ওই বিষয়ে কঠোর নিয়ন্ত্রণ শুরু হয়। অনেক নির্মাতা বাধ্য হয়ে নিয়ম মেনে কাজ করেছেন, আবার কেউ কেউ এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই নিজের মতো করে প্রতিবাদের পথ খুঁজে নিয়েছেন।
জাফর পানাহি ওই প্রতিবাদী নির্মাতাদের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী কণ্ঠ। তার চলচ্চিত্রে সাধারণ মানুষের জীবন, নারীদের সীমাবদ্ধতা এবং সমাজের বৈষম্য অত্যন্ত সহজ কিন্তু গভীরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এই কারণে তিনি সরকারি শাস্তির সম্মুখীন হয়েছেন, এমনকি দীর্ঘ সময় তার চলচ্চিত্র নির্মাণের ওপর নিষেধাজ্ঞাও ছিল। তবুও তিনি থেমে যাননি। সীমাবদ্ধতার মধ্যেই খুঁজে নিয়েছেন কাজের বিকল্প পথ। এখানেই ইরানি চলচ্চিত্রের মূল শক্তি স্পষ্ট হয়; নিয়ন্ত্রণ যতই কঠোর হোক, সৃজনশীলতা শেষপর্যন্ত নিজের পথ করে নেয়।
তবে সাম্প্রতিক বাস্তবতা এই আলোচনাকে নতুন দিকে নিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের দমন-পীড়নের পর নির্মাতা পানাহির দেশে ফিরে আসা কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি গভীর রাজনৈতিক ও মানবিক অবস্থান। যখন যুদ্ধ চলমান, ঠিক ওই সময়েই তিনি ফিরে এসেছেন নিজের মানুষের কাছে। আরও আশ্চর্যের বিষয়, যে সরকার একসময় তাকে নিষিদ্ধ করেছিল, তারাই এবার তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তুলে নিয়েছে। আর সাধারণ মানুষ তাকে সংবর্ধনা দিয়ে বরণ করে নিয়েছে। এই অভিজ্ঞতা বলে দেয়, শিল্প যদি মানুষের কণ্ঠস্বর বহন করে, তবে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের ধরন পরিবর্তন হলেও হতে পারে।
এই ঘটনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য সামনে চলে আসে, রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পর্ক কখনোই সরল বা একরৈখিক নয়। সংকটের সময়ে একটি জাতি নিজের ভেতরের বিভাজন ভুলে আবারও এক হয়ে দাঁড়াতে পারে। জাফর পানাহির প্রতি মানুষের যে স্বীকৃতি ও সমর্থন, তা ওই ঐক্যেরই প্রতিফলন। এখানেই ইরানের আসল শক্তি লুকিয়ে আছে। কারণ জাফর পানাহি একা নন; ইরানে তার মতো আরও অনেক মানুষ আছেন, যারা স্বাধীনতা, সাহস ও দৃঢ়তার নতুন অর্থ তৈরি করছেন। এই মানুষগুলোর মধ্যেই ইরানের ভবিষ্যৎ জয়ের সম্ভাবনা নিহিত।
পানাহির মতো নির্মাতারা প্রমাণ করেছেন, স্বাধীনতা, সাহস এবং মানুষের গল্প বলার ইচ্ছাই শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্রকে মুক্ত রাখে। এই বাস্তবতা ইরানের চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। এতদিন ইরানি চলচ্চিত্রে যে কথাগুলো সরাসরি বলা সম্ভব হয়নি, সেগুলো তারা প্রতীক, নীরবতা আর প্রতিদিনের জীবনের ছোট ছোট ঘটনার মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। কিন্তু যুদ্ধ পরবর্তী বাস্তবতায় এই ভাষা আরও গভীর এবং সরাসরি হতে পারে।
প্রথমত, চলচ্চিত্রে দেশপ্রেম এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা আরও স্পষ্টভাবে উঠে আসবে। যেটা রাষ্ট্রীয় প্রচারণার অর্থে নয়; মানুষের বেঁচে থাকা, টিকে থাকা এবং একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর গল্প হিসেবে প্রকাশ পাবে।
দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গুরুত্ব বৃদ্ধি পাবে। যুদ্ধ, অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা নির্মাতাদের ব্যক্তিগত গল্প বলার দিকে আরও বেশি আগ্রহী করে তুলবে। এর ফলে ইরানের চলচ্চিত্র আরও গভীর, অন্তর্মুখী এবং মানবিক হয়ে উঠতে পারে।
তৃতীয়ত, সেন্সরশিপের নীতিমালা বদলানোর সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। যখন রাষ্ট্র বুঝতে শুরু করে যে শিল্প তার বিরুদ্ধে নয়, বরং মানুষের কথা বলার একটি মাধ্যম, তখন নিয়ন্ত্রণ কিছুটা শিথিল হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। জাফর পানাহির প্রতি রাষ্ট্রের মনোভাবের পরিবর্তন ওই সম্ভাবনারই একটি সংকেত।
মোহাম্মদ রাসুলফ ও মোহসেন মাখমালবাফের মতো চলচ্চিত্র নির্মাতারা, যারা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, তাদের কাজও এখন নতুনভাবে মূল্যায়নের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। নির্বাসনের অভিজ্ঞতা ও দেশের ভেতরের বাস্তবতা একত্র হয়ে ভবিষ্যতের চলচ্চিত্রে হয়তো নতুন দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটাবে।
একইভাবে, গোলশিফতেহ ফারাহানির মতো অনেক অভিনয়শিল্পী আছেন যারা ইরানে নিষিদ্ধ হয়ে বিদেশে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। কিন্তু তাদের শিল্পচর্চা দেশের সীমানায় আটকে থাকেনি। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে দেশের ভেতর ও বাইরে থাকা শিল্পী ও নির্মাতাদের মধ্যে নতুন এক ধরনের যোগাযোগ তৈরি হতে পারে। ফলে ইরানি চলচ্চিত্র আরও ব্যাপকভাবে আন্তর্জাতিক পরিসরে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
ইতিহাস আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সংকটের সময় শিল্প সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কারণ তখন মানুষের গল্প বলার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি হয়। ইরানের চলচ্চিত্রও এর ব্যতিক্রম নয়। সেন্সরশিপ, দমন-পীড়ন ও নির্বাসনের মাঝেও তা থেমে যায়নি; উল্টো প্রতিবারই সিনেমার গল্পে নতুন ভাষা খুঁজে বের করেছে।
এই পরিপ্রেক্ষিতে জাফর পানাহির দেশে ফেরাটাকে প্রতীকী হিসেবে দেখা যেতে পারে। এই ঘটনা বোঝায় যে, একজন শিল্পীর সঙ্গে তার সরকারের দ্বন্দ্ব থাকতে পারে, কিন্তু তার দেশের মানুষের সঙ্গে নয়। এই উপলব্ধিই ভবিষ্যতের ইরানি চলচ্চিত্রকে নতুন পথ দেখাবে।
এখানে ইতালির বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘সিনেমা প্যারাডিসো’র একটি দৃশ্যের কথা মনে পড়ে। সেখানে দেখা যায়, গ্রামের এক ধর্মযাজক চলচ্চিত্রের সব চুম্বনের দৃশ্য সেন্সর করে দিতেন, কারণ সেগুলোকে তিনি অনৈতিক মনে করতেন। কিন্তু প্রোজেকশনিস্ট আলফ্রেদো ওই কেটে দেওয়া দৃশ্যগুলো ফেলে না দিয়ে যত্ন করে জমিয়ে রেখেছিলেন। মৃত্যুর আগে তিনি সেগুলো একত্র করে গল্পের নায়ক টোটোর জন্য রেখে যান।
চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যে টোটো যখন ওই সেন্সর করা অংশগুলো একসঙ্গে দেখেন, তখন পর্দায় একের পর এক প্রেমের মুহূর্ত ফিরে আসে। এটি শুধু আবেগঘন কোনো দৃশ্য নয়; এর ভেতরে রয়েছে এক নীরব কিন্তু গভীর প্রতিবাদ। যেন বলা হচ্ছে শিল্পকে সাময়িকভাবে থামানো যায়, কিন্তু তাকে মুছে ফেলা যায় না।
তেমনি ইরানের চলচ্চিত্রের বর্তমান বাস্তবতাও অনেকটা সেইরকম। যতই নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হোক বা গল্পকে আটকে রাখা হোক, একসময় তা ফিরে আসবেই এবং আরও শক্তিশালী হয়ে।
ইরান কেন শেষ পর্যন্ত জিতে যায়, তার একটি উত্তর পাওয়া যায় পানাহির মধ্যেই। কারণ শুধু তিনি নন, ইরানে আরও অনেক নির্মাতা আছেন যারা সাহস, স্বাধীনতা এবং দৃঢ়তাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছেন। তারা শুধু নিজেকে নয়, দেশের মানুষের কণ্ঠস্বরকেও চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্রতিফলিত করছেন। এই প্রজন্মের সৃজনশীলতা এবং দৃষ্টিভঙ্গিই ইরানি চলচ্চিত্রকে সংকটের মাঝে টিকিয়ে রাখছে এবং নতুন সম্ভাবনার পথ খুলে দিচ্ছে।
শেষপর্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থাকে: যুদ্ধের পর ইরানের চলচ্চিত্র কি আরও স্বাধীন হতে পারবে?
এর উত্তর এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, যে দেশে পানাহির মতো নির্মাতারা আছেন, যে দেশে সংকটের মাঝেও মানুষ শিল্পীকে আপন করে নেয়, ওই দেশের চলচ্চিত্র থেমে থাকে না। জাফর পানাহির দেশে ফেরার ঘটনা তাই শুধু একটি ব্যক্তিগত পদক্ষেপ নয়; এটি ইরানি চলচ্চিত্রের ভবিষ্যতের জন্য নতুন আশা ও নতুন শক্তির পথ। সংকট যতই গভীর হোক, শিল্প তার আলো হারায় না—এই দৃঢ়তাই ইরানি চলচ্চিত্রের প্রকৃত শক্তি।
হয়তো সামনে যে সময় আসছে, সেখানে ইরানের চলচ্চিত্র আরও সাহসী হবে, আরও সত্য হবে এবং সবচেয়ে বড় কথা মানুষের আরও কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। কারণ শেষপর্যন্ত শিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মানুষের গল্প বলা। আর ওই গল্প কোনো সেন্সরশিপ, কোনো যুদ্ধ বা কোনো ভয় কখনোই সম্পূর্ণভাবে থামাতে পারে না।