Published : 29 Jul 2025, 04:51 PM
কমলাকান্ত রায়। রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার একজন সাধারণ মানুষ। উত্তেজিত মব তার নিজের ও প্রতিবেশীদের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দিয়েছে। বাড়িগুলো লণ্ডভণ্ড—যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকার ছোট কোনো লোকালয়।
দেশের প্রধানসারির সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী গত দু-তিন দিন তিনি রাতে ঘুমানোর সাহস করতে পারেন না। গত শনিবার ও রোববার দফায় দফায় হামলার পর এখনও কমলাকান্তের নির্ঘুম রাত কাটছে। ভয় হয় কখন বুঝি আবার মব আসে, লুটপাট হয়!
লুটের ভয়ে কমলাকান্ত এখন বাড়ির মালপত্র নিরাপদে সরিয়ে নিতে ব্যস্ত। ঘরে ছিল ১০-১২ মন ধান, সেটাও বিক্রি করে দেবেন বলে ভাবছেন। কমলাকান্তের পরিবারের দিন কাটছে অনাহারে। ভাত খাওয়ার সাহস ও শক্তি করে উঠতে পারছেন না। বাড়িতে যুদ্ধে আক্রান্ত হওয়ার আতঙ্ক। একটু পরেই যেন শত্রুপক্ষ আক্রমণ করবে। তাই ভিটেমাটি ছাড়ার প্রস্তুতি চলছে।
অথচ কমলাকান্ত কোনো অপরাধ করেননি। এই যে ভয়, এই যে নির্ঘুম রাত, এই যে নিরন্তর আতঙ্কের পরিবেশ—ক্ষমতার কোঠরে বসে এটি অনুভব করা যায় না। ক্ষমতাচক্রের সদস্যরাও এই পরিবেশের নির্মমতা আঁচ করতে পারেন না। এটি অনুভব করতে হলে কথায় বলা হয়, ‘অন্যের জুতোয় হেঁটে দেখতে হয়’। তার জন্য প্রয়োজন ক্ষমতার বলয় থেকে বেরিয়ে এই আতঙ্কের পরিবেশে যাওয়া। তাদের পাশে বসা। কিন্তু কমলাকান্তরা তো অতটা সৌভাগ্য নিয়ে জন্মাননি। তাদের জন্মই যেন আজন্ম দুঃখ কুড়ানোর। বেদনা কুড়ানোর। সহিংসতার স্মৃতি জমানো। এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যে জীবন তাদের কী বুকে হাত দিয়ে বলা যাবে, ‘এ বাংলাদেশ আমাদের সবার’।
শুধু কমলাকান্ত নন, এই নৃশংসতা যারা এখনো শিখেনি, যারা মাত্র শিশু, তাদের কথাও ভাবুন। আলদাদপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুরা, যারা স্কুলে যেতে ভয় পাচ্ছে, যাদের পরিবার রাস্তায় দিন কাটাচ্ছে, তাদের কী আশ্বাস দেবেন? কোন অভয়বাণী দিয়ে তাদের বোঝাবেন যে শিশুরা তোমরা ক্লাসে ফিরে এস! তোমাদের কোনো ভয় নেই! সবার বাংলাদেশের এই বয়ান কি তাদের আশ্বস্ত করতে পারবে? আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠরা যারা বুলেটপ্রুফ কাঁচের দেওয়ালের ওপাশ থেকে এই দৃশ্য দেখে অভ্যস্ত, আমরা কীভাবে বুঝব যে, এই ভয় কতটা শান্তিঘাতী! কতটা আতঙ্কের!
রংপুরের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য এটি নতুন কোনো অভিজ্ঞতা নয়। গত ৭ বছর ধরে ধর্ম অবমাননার একই অভিযোগ তুলে রাতের অন্ধকারে হানাদারদের মতো বারবার হামলা হয়েছে এখােন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ২০১৭ সালে রংপুরের রামনাথপুর ইউনিয়নের তিনটি গ্রামে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় বাড়িঘর, দোকানপাট ও মন্দিরে অগ্নিসংযোগ করা হয়। সন্ত্রাসীদের দেওয়া আগুনে ২৫টি ঘরবাড়ি ভস্মীভূত হয়। এর চার বছর পর, একই অজুহাতে রংপুরের ঠাকুরপাড়া গ্রামে হামলা ও লুটপাটের পর অগ্নিসংযোগ করা হয়। এই ঘটনায় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী ৩০টি হিন্দু বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর পীরগঞ্জ উপজেলার জেলেপাড়া পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
এই হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অজুহাত যেমন রহস্যজনক, তেমনি এর পর প্রকাশিত সংবাদমাধ্যমের খবরগুলো আরও রহস্যময়। কারণ এই হামলাগুলো যেন ‘নো ওয়ান কিলড জেসিকা’ গল্পের মতো। সংবাদমাধ্যমে হামলাকারীদের একটিই পরিচয়—তারা ‘একদল উচ্ছৃঙ্খল জনতা’। তাদের কোনো নাম নেই, পরিচয় নেই। তারা জনতার লোক। আর জনতা যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রতিনিধিত্ব করে, তাই তাদের জন্য যেন ‘সাত খুন মাফ’। তারা ঘরের মাচা থেকে ধান-চাল, গৃহবধূর বাক্স ভেঙে গহনা, গোয়াল থেকে গরু লুট করে নিয়ে গেলেও, সেগুলো যেন ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার’ তৈরি অবাস্তব সম্পদ। তাই লুটের সেই মালামালের অস্তিত্ব কখনো পাওয়া যায় না।
শুধু রংপুর নয়, এই দৃশ্য এখন গোটা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ও সংখ্যালঘু ঐক্য মোর্চা গত ১০ জুলাই এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জানায়, ২০২৪ সালের ৪ অগাস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত গত ১১ মাসে সারা দেশে ২,৪৪২টি সাম্প্রদায়িক হামলা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এ বছরের প্রথম ছয় মাসে, অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত, এই হামলায় ২৭ জন নিহত হয়েছেন।
এই সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসবাদ বাংলাদেশে নতুন নয়। ২০২১ সালে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এক পরিসংখ্যানে দেখায়, ২০১৩ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ৯ বছরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর ৩,৬৭৯টি হামলা হয়েছে। বর্তমান পরিসংখ্যানের সঙ্গে এই তথ্য মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, হামলার পরিমাণ বহুগুণ বেড়েছে। এই সাম্প্রদায়িক হামলা ও সহিংসতার চেয়েও ভয়ানক বিষয় হলো এই হামলা ও লুটের বৈধতা দেওয়ার যুক্তি। আগে বলা হতো, ‘এসব ভোট পাওয়ার ধান্দা’। এখন এটিকে নৈতিক বৈধতা দেওয়া হয় ‘অপপ্রচার’ বা ‘রাজনৈতিক কারণে হামলা’র অজুহাতে। আগে ফলাফল শূন্য বিচারের আশ্বাস মিললেও, এখন সেটাও যেন নেই। নতুন বয়ানের ‘সবার বাংলাদেশে’ যেহেতু সংখ্যালগিষ্ঠ বা সংখ্যালঘু এই বাইনারিকেই অস্বীকার করা হয়, সেখানে ভয় আরও জেঁকে ধরে।
দেশের অর্ধশতকের ইতিহাসে অনেক কিছু বদলেছে। বারবার কর্তৃত্ববাদ বিতাড়িত হয়ে ‘গণতন্ত্র এসেছে’, ‘ভয়ের পরিবেশ দূর হয়েছে’, ‘সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে’, ‘স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির ক্ষমতায়ন হয়েছে’, ‘দেশ পুনরায় স্বাধীন হয়েছে’, ‘মানুষ রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পেয়েছে’। কিন্তু কমলাকান্তরা কিছুই পাননি। যুগে যুগে তারা পেয়েছেন শুধু আশার বয়ান। এই বয়ান শুনলে মনে হয়, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু বা ধর্মের নামে নির্যাতন শব্দটাই যেন অপ্রাসঙ্গিক। শাসক ও ক্ষমতার কাছের মানুষেরা সবসময় এই শব্দগুলোকে জাদুঘরে পাঠাতে চান। তাদের বয়ানে মনে হয়, ‘টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া’ বা ‘সুন্দরবন থেকে বান্দরবান’—এই পরিধির মধ্যে সবাই ভয়হীন ও নির্ভীক পৃথিবীর বাসিন্দা। কিন্তু রংপুরের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলাগুলো বারবার এই সুসজ্জিত বয়ানের নগ্ন সত্য উন্মোচন করে। শাসকগোষ্ঠীর এই বয়ান যে অন্তঃসারশূন্য, তা উদাহরণস্বরূপ আমাদের সামনে তুলে ধরে।
পৃথিবীর অন্যতম ‘মেগা শহর’ ঢাকা থেকে কমলাকান্তের বাড়ির দূরত্ব তিনশ কিলোমিটারের সামান্য কিছু বেশি। এই শহর থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে কোনো মানুষ নির্যাতিত হলে তাদের জন্য সেখানে বিরাট মিছিল বের হয়। কিন্তু রংপুরের নিপীড়িত কমলাকান্তদের জন্য কোনো বড় মিছিল হয় না। যে শহরের ক্ষমতার বাবুমশায় ও তাদের দলের লোকজন প্রতিদিন ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার বিপ্লব করে চলেছে। তাদের কর্ণকুহরে কমলাকান্তদের এই চিৎকার যেন পৌঁছায় না।