১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ডাকসুর ফল: জামায়াত তো খুশিই, আওয়ামী লীগও খুশি, বিএনপির জন্য উদ্বেগ

জামায়াতের খুশি, আওয়ামী লীগের কৌশলগত তৃপ্তি আর বিএনপির জন্য এক অস্বস্তিকর সংকেত—ডাকসুর ফলাফল কি ভবিষ্যৎ ক্ষমতার সমীকরণ নতুন করে সাজিয়ে দেবে?

ডাকসুর ফল: জামায়াত তো খুশিই, আওয়ামী লীগও খুশি, বিএনপির জন্য উদ্বেগ
ডাকসুতে শিবিরের জয় নিয়ে প্রশ্ন, অভিযোগ ও বিতর্কের মাঝেই রাজনৈতিক পালাবদলের আলোচনায় দেশ।

আজিজুল পারভেজ আজিজুল পারভেজ

Published : 12 Sep 2025, 08:20 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:17 PM

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় পেয়েছে ইসলামী ছাত্র শিবির। হয়তো রাত পোহালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নিয়ে প্রায় অভিন্ন খবর পাওয়া যাবে।

মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তীকালে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছিল উজ্জ্বল ভূমিকা, সেখানে খুব বেশি দিন আগেও ছাত্রশিবিরের নির্বিঘ্নে রাজনীতি করার সুযোগই ছিল না, তাদের বিজয় বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। যদিও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা শিবিরের বিজয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’য়ের অভিযোগ তুলে প্রত্যাখ্যানও করেছেন অনেকে।

ডাকসুর দুইদিন পরই প্রগতিশীল রাজনীতি ও সংস্কৃতিচর্চার চারণভূমি হিসেবে পরিচিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্রশিবির বিজয় পেতে যাচ্ছে বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। এমনটা হলে বিস্ময়ের মাত্রা আরও বাড়বে। চরম অব্যবস্থাপনার মধ্যে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে এরই মধ্যে একজন শিক্ষকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচন শেষ হওয়ার চব্বিশ ঘন্টা পরও কর্তৃপক্ষ ফলাফল ঘোষণা করতে পারেনি।  এখানেও অধিকাংশ প্রতিদ্বন্দ্বী প্যানেল নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে অনিয়ম অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তুলে।

ঢাকা এবং ঢাকার উপকণ্ঠের দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনের ফল ও প্রবণতা, শিবিরের বিজয় এবং দেশের প্রধানতম রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের শোচনীয় পরাজয় জাতীয় রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে, সে আলোচনাই হচ্ছে এখন সর্বত্র । এই ফলাফল জাতীয় রাজনীতির অনেক হিসাব-নিকাশই পাল্টে দেবে বলে মনে করছেন কেউ কেউ। 

ইসলামী ছাত্রসংঘ থেকে জন্ম নেওয়া ইসলামী ছাত্রশিবির মুক্তিযুদ্ধোত্তর কালে নাম পরিবর্তনের যে কৌশল নিয়েছিল, তা এতদিনে এসে ফল দিয়েছে।

নবজন্মের পরও রাজনীতিতে শিবিরকে নানামুখী কৌশল অবলম্বন করতে দেখা গেছে। এর একটি ছিল, নিজেদের কর্মীদের বিভিন্ন দলে ঢুকিয়ে দেওয়া কিংবা ঢুকে যাওয়া। যেটি এক সময় ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে কমিউনিস্ট কর্মীরা করে থাকতেন। কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ থাকার কারণে প্রথম দিকে তারা কংগ্রেসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এরপর পাকিস্তান আমলে আওয়ামী লীগ ও ন্যাপের মধ্যেও অনেকে আত্মগোপন করেছিলেন।

জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর প্রকাশ্যে এসেছে যে, শিবির তাদের বিপুল সংখ্যক কর্মী বিগত দেড় দশক ছাত্রলীগের মধ্যে গুপ্ত ছিল। তাদের কেউ কেউ পদপদবিও আদায় করে নিয়েছিল। তারা নিজেদের ছাত্রলীগ প্রমাণ করার জন্য মারমুখি ভূমিকায়ও অবতীর্ণ হতো। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা আবদুল কাদের সম্প্রতি এ রকম একটি দীর্ঘ তালিকা প্রকাশ করেছেন। খোদ ডাকসুতে বিজয়ী ভিপি সাদিক কায়েম ও জিএস এস এম ফরহাদ ছাত্রলীগে গুপ্ত থেকে লীগের রাজনীতি করেছেন বলে তথ্য বেরিয়েছে নির্বাচনের আগেই। অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কর্মী ছাত্রলীগের মধ্যে আত্মগোপন করেছিল তখন। ছাত্রদলের মধ্যেও কি নেই? সেটা কি পরিমাণ? সেটা নিশ্চয়ই তারা ভাববে। শিবিরের নিজেদের দলীয় পরিচয়ে কর্মী ছিল কেবল তারা, যারা ডেডিকেটেড, ফুলটাইমার এবং দলের আর্থিক সুবিধপ্রাপ্ত। অন্য দলের মধ্যে লুকিয়ে থাকলেও শিবির মতাদর্শের কর্মী-অনুসারীরা যখনই স্বাধীনভাবে নিজের সিদ্ধান্ত প্রকাশের সুযোগ পেয়েছে তখনই নিজের আদর্শের পক্ষে ভোট দিয়ে দিয়েছে। যার ফলে এই বিপুল বিজয় সম্ভব হয়েছে।

জামায়াত তো খুশিই

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৪ বছরের ইতিহাসে এবারের আগে নির্বাচন হয়েছে ৩৭ বার। যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, বিশেষ করে বাংলাদেশের ভাষা রক্ষার আন্দোলন আর স্বাধীনতার সংগ্রামের সঙ্গে যেভাবে জড়িয়ে আছে, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে এর আগে কখনও জামায়াতে ইসলামীর কোনোই অংশীদারত্ব ছিল না। জামায়াতের দীর্ঘ সময়ের আমির গোলাম আজম যদিও অনেকদিন আগে এই ডাকসুর জিএস হয়েছিলেন, ১৯৪৮ সালে। তখন দলীয় পরিচয়ে নির্বাচন হতো না বলে তার দলীয় রাজনৈতিক পরিচয় ছিল না, তখন প্রত্যক্ষ ভোটও ছিল না নির্বাচনে। তাই ডাকসুর গৌরবের অংশীদার জামায়াতে ইসলামী কখনো ছিল না।  এই প্রথমবার, ৩৮তম ডাকসু ভোটে অংশ নিয়ে বিপুল বিজয় পেয়েছে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির।

ডাকসুতে যে বিপুল ভোট পেয়েছে শিবির তাতে জামায়াতের রাজনীতিসংশ্লিষ্টরা স্বাভাবিকভাবেই উৎফুল্ল। এত উৎফুল্ল হওয়ার উপলক্ষ জামায়াতের রাজনীতিতে কমই এসেছে, বলা যায়। এ অবস্থায় জামায়াত-শিবির কর্মীরা মনে করতেই পারেন, ডাকসুতে এই বিজয়ের ফলে জাতীয়ভাবে রাজনীতিতে যে ঢেউ তৈরি হবে, তাতে তারা বাংলাদেশেরই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার খুব কাছাকাছি চলে যাবেন। খালি নির্বাচনটা বাকি।

আওয়ামী লীগও খুশি?

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানো, বর্তমানে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগও ডাকসু নির্বাচনের ফলাফলে খুশি বলে অনেককেই মন্তব্য করতে দেখছি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস তো ডাকসুতে শিবিরের বিজয়ের কৃতিত্ব ছাত্রলীগকে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, জামায়াত-শিবির আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে ছাত্রলীগের ভোট নিয়েই বিজয়ী হয়েছে।

আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ থাকায় এই নির্বাচন দুটিতে অংশ নিতে পারেনি। অবশ্য নিষিদ্ধ না হলেও জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী এই সময়ে ছাত্রলীগ নির্বাচনের মাঠে দাঁড়াতেই পারত না। ছয় বছর আগে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায়, তখন যে ডাকসু নির্বাচন হয়েছিল সেই নির্বাচনেও ছাত্রলীগ ভিপিসহ কিছু পদ হারিয়ে ছিল। তবে যে সব পদে বিজয়ী হয়েছিল, সেগুলোতে কতটা ভোটে, আর কতটা প্রভাব খাটিয়ে পদ দখল করেছিল, তা নিয়ে তখন থেকেই প্রশ্ন রয়েছে। এরপর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে আর ডাকসু নির্বাচন হয়নি।

এবারের নির্বাচনে ‘রাজনৈতিক শত্রু’ শিবিরের বিজয় সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ কর্মীরা সত্যিই যদি খুশি হয়ে থাকেন, সেটি হয়তো এ কারণে যে, তারা সব সময় বলে থাকে আওয়ামী লীগবিহীন বাংলাদেশ স্বাধীনতাবিরোধী ও মৌলবাদী শক্তির খপ্পড়ে চলে যাবে। শিবিরের এই বিজয়ের পর তারা এখন প্রচার করবে, তাদের কথাই সত্যি হচ্ছে। বহির্বিশের যেসব শক্তি মৌলবাদী উত্থান ঠেকাতে সক্রিয়, তাদের কাছে আওয়ামী লীগ বার্তা পৌঁছাবে যে, তারা ক্ষমতা থাকাকালে মৌলবাদীদের ঠেকাতে পেরেছিল। তারা না থাকাতে বাংলাদেশে মৌলবাদের পুনরুত্থান হচ্ছে। মৌলবাদী উত্থান ঠেকাতে তাদের ফিরিয়ে আনতে হবে। ছাত্রশিবিরের এই বিজয়ে যারা দেশটা মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীতাকারীদের হাতে চলে যাচ্ছে ভেবে উদ্বিগ্ন, তাদের কাছেও আওয়ামী লীগ এখন বার্তা পৌঁছাবে স্বাধীনতার বিরোধীতাকারীদের ঠেকাতে তাদেরকেই ক্ষমতায় ফেরাতে হবে। ডাকসুতে বিজয়ের পর পাকিস্তান জামায়াতের দেওয়া অভিনন্দন বিবৃতি তাদের বক্তব্যের প্রমাণ হিসেবে কাজ করবে।

সোজা কথা শিবিরের এই বিজয়কে আওয়ামী লীগ তাদের ‘ক্ষমতার রাজনীতি’র স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা করবে। যেমন ব্যবহার করছে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি ভাঙ্গার ঘটনাকে। বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যখন হাতুড়ির আঘাত পড়ে, বঙ্গবন্ধুর ভক্তরা সেটাকে তাদের হৃদয়ের মধ্যে আঘাত হিসেবে অনুভব করেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়ায় অনেকেরই মনে হয়েছে, তারা এটাকে ‘মন্দের ভালো’ বলে ভেবে নিয়েছে। এতে তাদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ অনেক মানুষের যে সহানুভূতি ফিরে এসেছে, এটা সন্দেহাতীত সত্য। ফলে তাদের রাজনীতিতে ফিরে আসার পথ প্রশস্ত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর অমূল্য স্মৃতি হারিয়ে যাওয়ার বেদনার চেয়ে সেটাকে ‘ক্ষমতায়’ যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করা তাদের কাছে বড় ব্যাপার।

বিএনপির রাজনীতির জন্য সংকট

ডাকসু ও জাকসুর এই ফল আওয়ামী লীগ নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা তৈরির জন্য ব্যবহার করতে পারলেও বিএনপিকে বড় ধরনের সংকটে ফেলল বলে মনে হচ্ছে। কথাটা এ ভাবেও বলা যায়, বিএনপিকে তার সংকট উপলব্ধি করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে এই নির্বাচন। বিএনপি মনে করেছিল, তারা ক্ষমতায় এসেই গেছে। কিন্তু দিল্লি যে বহু দূর তা বুঝতে পারেনি। শিবিরের ভোটাররা ছাত্রলীগের মধ্যে তো বটেই, ছাত্রদলের মধ্যেও লুকিয়ে ছিল, লুকিয়ে আছে, এটা সত্য হলে প্রশ্ন উঠে, জামায়াত-শিবিরের কত লোক বিএনপির মধ্যে লুকিয়ে আছে? শুনতে পাচ্ছি, গ্রামাঞ্চলে বিএনপি থেকে বেরিয়ে আসছে জামায়াতে ইসলামী। যারা প্রকাশ্য হচ্ছে, তাদের হিসেব করা গেলেও, যাদেরকে এখনও গুপ্ত থাকার নীতিতে রাখা হয়েছে, তারা কত শতাংশ?

শুরুতে বিএনপির ছিল আওয়ামী লীগবিরোধীদের একটি প্ল্যাটফর্ম। ভারতবিরোধীও বলা যায়। স্বাধীনতার বিরোধীতাকারীরাও সেখানে ভিড় করেছিল। বিগত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকের পর ছাত্রদলের মাধ্যমে পিওর রাজনৈতিক কর্মী পেয়েছে বিএনপি। এবং বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে জনমানুষের সমর্থন পেতে সক্ষম হয়েছে। 

আদর্শিকভাবে জামায়াতের রাজনীতি আওয়ামী লীগের বিপরীতমুখি হলেও ঐতিহাসিকভাবে বিএনপির কাছাকাছি। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর সরকারের আমলে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল, জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রের’ নামে জামায়াতের রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে দেন। তাছাড়া, প্রতিকূল অবস্থায় অনেক জামায়াত কর্মী বিএনপিতে আশ্রয় নিতে পেরেছেন অনায়াসে। ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে জামায়াত ছিল বিএনপির মিত্র এবং পরে সরকারে দুটি মন্ত্রীর পদও পেয়েছিল। বিএনপিও জামায়াতকে প্রশ্রয় দিয়েছে রাজনৈতিক কৌশলের কারণে। 

জাতীয় ক্ষমতার রাজনীতিতে জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে রাজনীতি করেছে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি দুই দলই। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতার কারণে জামায়াতের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ যেখানে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মাধ্যমে, সেখানে বিএনপি এই বিচারের বিরোধিতা করে জামায়াতের সঙ্গে মিত্রতা রক্ষার চেষ্টা করেছে তখন। কিন্তু এটা তাদের জন্য এখন বুমেরাং হয়ে উঠেছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র `ওউনার’ দাবিদার আওয়ামী লীগ যখন পলাতক এবং ক্রমাগত মুক্তিযুদ্ধকে হেয় করার চেষ্টা শুরু হয় তখন বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের ‘ওউনারশিপ’ নেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু এই চেষ্টা শেষ পর্যন্ত কতটা কাজে লাগবে সময়ই বলে দেবে। 

এই অবস্থায় এখন বিএনপির মধ্যে সন্দেহ-অবিশ্বাস বেড়ে যাবে। যাদেরকে নিজের ভোটব্যাংক হিসাব করে বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে তাদের মধ্যে প্রকৃত পক্ষে নিজেদের ভোট আছে কত শতাংশ? নৌকাবিহীন নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত পৃথকভাবে নির্বাচনে অংশ নিলে এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে সেখানে ডাকসু নির্বাচনের মতো ঘটনা ঘটবে না সেটা কি বলা যায়? ডাকসুতে যদি ছাত্রলীগের ভোট ছাত্রশিবির পেয়ে থাকে, অন্তত মির্জা আব্বাসের মূল্যায়ন অনুসারে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের ভোট জামায়াতে ইসলামী পেয়ে গেলে খুব বিস্ময়ের হবে? বিশেষ করে বিগত এক বছরে মামলাবাজি, চাঁদাবাজি ও মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে বিএনপির নেতা-কর্মীরা নিজেদের যে মূর্তি দেখিয়েছেন তাতে এমনটি হয়ে গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য সেলিমা রহমান যথার্থই ডাকসু নির্বাচন বিএনপির জন্য একটি সতর্ক সংকেত বলে স্বীকার করেছেন। 

জাতীয় রাজনীতিতে ডাকসুর মতো জাকসুরও একটি ভূমিকা রয়েছে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এটাই জাতীয় নির্বাচনে নিয়ামক হয়ে উঠবে এমনটা ভাববার কোন কারণ আছে বলে মনে হয় না। কারণ এটাই যদি হতো তাহলে কমিউনিস্ট পার্টি-ন্যাপ কিংবা জাসদ কিংবা বাসদ এতদিন ধরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে থাকত না। ডাকসু নির্বাচনের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বার জিতেছে কমিউনিস্ট পার্টির সহযোগী সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন। কিন্তু তাদের অভিভাবক সংগঠন একবারও ক্ষমতার স্বাদ পায়নি। মাহমুদুর রহমান মান্নার উদাহরণটাও দেওয়া যেতে পারে। তিনি সেই কীর্তিমান ছাত্রনেতা যিনি চাকসুর জিএস এবং ডাকসুর দুই দুইবারের ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন। জাতীয় রাজনীতিতে এখন তার অবস্থান আমরা জানি। এমপি হতে গেলে নৌকা কিংবা ধানের শীষ না হলে হয় না।

জাতীয় রাজনীতিতে অনেকগুলো ফ্যাক্টর কাজ করে। তাছাড়া, কেবল জাতীয় রাজনীতিই নয়, বৈশ্বিক রাজনীতিও আমাদের জন্য বড় ফ্যাক্টর। বিশ্বরাজনীতির মোড়লরাও বসে নেই। তারা যে কলকাঠি নাড়ছেন, তা বোঝা যাচ্ছে। এ অবস্থায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য অনেক সমীকরণ মেলানোর বিষয় আছে। সময়ই বলে দেবে শেষ কথা।