Published : 07 Nov 2025, 08:39 AM
জোহরান মামদানি নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচিত হওয়ার আঁচ আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে এসে ঠেকেছে। সাধারণ মানুষ তাকে নিয়ে বন্দনায় মেতেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে মূলধারার সংবাদমাধ্যম সর্বত্র এখনও সেই মাতামাতি চলছে।
কিন্তু মামদানি যদি বাংলাদেশের ঢাকা উত্তর বা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কোনো একটিতে নির্বাচন করতেন, তাহলে কী হতে পারত? নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক, এই ভাবনাটা ভাববার জন্য আমাদের ধরে নিতে হবে, মামদানির ভারতীয়-পাঞ্জাবি মা মীরা নায়ার এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূত উগান্ডান বাবা মাহমুদ মামদানি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শহর নিউ ইয়র্কের পরিবর্তে তাদের ছোট্ট ছেলে জোহরানকে নিয়ে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় বসবাস করতে এলেন। পরে মীরা যথারীতি চলচ্চিত্র নির্মাণ করে বিখ্যাত হলেন, মাহমুদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন। জোহরানও এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষে রাজনীতিতে যোগ দিলেন। এর মাঝে পড়তে গিয়েছিলেন আমেরিকায়। সেখানে কোনো একটা ডেটিং অ্যাপে তার পরিচয় হলো রামা দুয়াজি নামে এক নারীবাদী সিরীয়-মার্কিন চিত্রশিল্পীর সঙ্গে। তারা বিয়ে করলেন। বিয়ের পর দুজনই চলে এলেন ঢাকায়।

ঢাকায় ফিরে জোহরান মামদানি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের মতো টুকটাক আন্দোলন, পোস্টারবাজি, সেমিনারে বক্তৃতা—সব ঠিকঠাক চালিয়ে যাচ্ছেন। তারপর হঠাৎ একদিন তার মনে হলো নির্বাচন করবেন এবং ঘোষণা করে দিলেন তিনি সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছেন।
ভাবনাটা একটু কষ্টকল্পনা হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে জোহরান মামদানির জায়গাই হতো না। কারণ বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনটা বেশ জটিল, এখানে মাহমুদ মামদানি ও মীরা নায়ারের নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ নেই। তার চেয়ে বরং আমরা ধরে নিই, মাহমুদ মামদানি পুরান ঢাকার ছেলে। মীরার পদবি নায়ার নয় মার্ডি। তিনি দিনাজপুরের সাঁওতাল আদিবাসী। তারা পড়াশোনা করে, সিনেমা বানিয়ে নিজ নিজ নামে বিখ্যাত হয়েছেন এবং তাদের ছেলে জোহরান মামদানিও রাজনীতিতে কিছুটা নাম কামিয়েছেন।

তাহলে কি হতে পারত জোহরান মামদানির নির্বাচনটা? আদৌ বড় কোনো দল থেকে মনোনয়ন পেতেন তিনি? মা-বাবা ও স্ত্রীর পরিচয়ের কারণেই পেতেন না। এখানে মনোনয়ন পাওয়ার জন্য কোনো প্রাইমারিতে ভোট করতে হয় না, দলের সর্বোচ্চ নেতার ইচ্ছেই মনোনয়ন পাওয়ার জন্য যথেষ্ট এবং শেষ কথা।
জোহরান মামদানির মা মীরা ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলিম হয়েছেন, এমন কোনো তথ্য কোথাও নেই। বাবা মাহমুদ মুসলমান বটে, তবে শিয়া মুসলমান। স্ত্রী রামা 'হাতাকাটা' জামা পরেন। এই তিনটি কারণই যথেষ্ট হতো মামদানির মনোনয়ন না পাওয়ার জন্য। তারপরও যদি মামদানি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ঢাকা সিটির নির্বাচনে দাঁড়িয়ে যেতেন, তিনটির বেশি ভোট পেতেন বলে মনে হয় না। কারণ জন্মসূত্রে পুরান ঢাকার মাহমুদ মামদানি ও দিনাজপুরের মীরা মার্ডি ঢাকার ভোটার হওয়ায় তাদের ছেলেকে একটি করে ভোট দিতে পারতেন। স্ত্রী রামার তো ভোটাধিকারই থাকত না। তাহলে তৃতীয় ভোটটি মামদানি নিজেই নিজেকে দিতেন।
এটাই বাস্তবতা। তবু আমি চাই, একদিন ঢাকা শহরে শিয়া মুসলিম বাবা ও সাঁওতাল মায়ের ছেলে মেয়র হবেন।

ঢাকায় ভোট করলে যে জোহরান মামদানির তিনটির বেশি ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল না, সেই মামদানির নিউ ইয়র্ক বিজয় নিয়ে চলছে বাংলাদেশজুড়ে চলছে নর্তন-কুর্তন। কেননা, মামদানি বলেছেন, তিনি মুসলমান এবং মুসলমান বলে তার কোনো গ্লানি নেই। মামদানি কতখানি মুসলমান সেটা তিনিই ভালো জানেন, আমার জানবার দরকার নেই, সুযোগও নেই, আমি তো আর অন্তর্যামী নই। তবে প্রকাশ্য জনসভায় নিজেকে মুসলমান বলে মামদানি যে ঘোষণা দিয়েছেন, তা যে ডনাল্ড ট্রাম্পের মুসলিমবিদ্বেষী প্রচারের প্রতিবাদে, সেটা বুঝবার জন্য অন্তর্যামী হওয়া লাগে না।
এবার বরং নিউ ইয়র্ক সিটি নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের কথায় আসি। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ভোটের ফলাফল ঘোষণার পর তাৎক্ষণিকভাবে সেটি নিয়ে সংবাদ ছেপেছে। অনলাইন ছাড়িয়ে পরদিনের ছাপা পত্রিকায়ও মামদানির জয়ের খবর বেশ গুরুত্বসহকারে ছাপা হয়েছে। প্রধান পত্রিকাগুলোর বেশ কয়েকটি এ ঘটনাকে শীর্ষ সংবাদ হিসেবেও ছেপেছে। এখনও ছেপে যাচ্ছে নানান খবর। একেই বলে জনরুচির কাছে আত্মসমর্পন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের পাঠকের জন্য এ খবর কেন গুরুত্বপূর্ণ, সেটি কি সংবাদমাধ্যমগুলো ঠিকভাবে ধরতে পেরেছে? যেভাবে প্রকাশ করলে পাঠকের, মানুষের জীবনে এ ঘটনা ইতিবাচকভাবে প্রভাব ফেলতে পারত, আমাদের সংবাদমাধ্যমগুলো কি সেভাবে তুলে ধরতে পেরেছে? চলুন এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা যাক।
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতে মোটাদাগে মামদানির জয়ের খবরের সারাংশ হলো: তিনি নিউ ইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র, ভারতীয় মা-বাবার সন্তান এবং কম বয়সী। কিছু সংবাদমাধ্যম আনন্দের আতিশয্যে তাকে নিউ ইয়র্ক সিটির সর্বকনিষ্ঠ মেয়র উল্লেখ করে সংবাদ ছেপেছে, সেটি আদতে সঠিক নয়। ১৮৮৯ সালে হিউ জে গ্র্যান্ট ৩০ বছর বয়সে নিউ ইয়র্কের মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন, তিনিই এখন পর্যন্ত সর্বকনিষ্ঠ। কিছু সংবাদমাধ্যম নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি, ক্রয়ক্ষমতা ও বিভিন্ন নাগরিক সেবা নিয়ে মামদানির প্রতিশ্রুতিকে গুরুত্ব দিয়েছে। কিছু সংবাদমাধ্যম ইসলামবিদ্বেষ (ইসলামোফোবিয়া) ও ইহুদিদের বিরোধিতা সত্ত্বেও তার জয়কে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। কমবেশি সব সংবাদমাধ্যমই এলিট ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের বিরোধিতার মুখে তার জয়ের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেছে। এই বিজয় ট্রাম্প ও রিপাবলিকান পার্টির রাজনীতিতে কীভাবে প্রভাব ফেলবে সেটিও বেশ গুরুত্ব পেয়েছে। মামদানির স্ত্রী রামা দুয়াজিকে প্রচারণার সময় প্রচলিত মার্কিন ধারার মতো সঙ্গী হিসেবে পাশে দেখা যায়নি। সিএনএনের একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, এটি তারা সচেতনভাবেই করেছেন। তবে পশ্চিমা অনেক সংবাদমাধ্যমের মতো বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম রামা-মামদানি দম্পতি সম্পর্কে ফলাও করে সংবাদ ছেপেছে।
মামদানিকে নিয়ে মিডিয়াতে প্রকাশিত ওপরের সকল তথ্য প্রাসঙ্গিক। এসব নিয়ে পাঠকের আগ্রহ রয়েছে, সেটি সোশ্যাল মিডিয়া থেকে অনুমান করা যায়। কিন্তু প্রথম মুসলিম মেয়র কিংবা তার সর্বকনিষ্ঠ হওয়ার তথ্যের সরল প্রকাশ সংবাদমাধ্যমের উদ্দেশ্য ও দায়িত্ব পুরোপুরি পূরণ করে না। সংবাদমাধ্যম কীভাবে আরও ইতিবাচক ও কার্যকরভাবে এই সংবাদ তুলে ধরতে পারত সেটি বোঝার চেষ্টা করা যাক।
মামদানির মুসলিম পরিচয়
মামদানি নিউ ইয়র্ক শহরের প্রথম মুসলিম মেয়র, এটি আদতে একটি পরিসংখ্যান। ধর্মীয় ভ্রাতৃত্ববোধের জায়গা থেকে যে কোনো মুসলমানই এতে খুশি হতে পারেন। মামদানি নিজেও তার বিজয়পরবর্তী বক্তৃতায় বলেছেন যে, আমি একজন মুসলিম, একজন অভিবাসী ও একজন ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট; কিন্তু এর জন্য আমি কারও কাছে ক্ষমা চাইতে নারাজ। তিনি আসলে নিজেকে মুসলিম দাবি করে কী বলতে চেয়েছেন? তিনি কি নিজের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে গর্ব করেছেন? তিনি সেটি যে করেননি, এরই মধ্যে আমার বলা হয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধর্ম, বর্ণ, পরিচয়কে ব্যবহার করে মানুষকে আক্রমণ করার রাজনীতির পোয়াবারো চলছে। মামদানি, বার্নি স্যান্ডার্স, আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজদের সঙ্গে আরও যারা ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট ধারার রাজনীতি করেন, ওই কারণেও আক্রমণের শিকার হয়েছেন তারা। রিপাবলিকান পার্টি এমনকি নিজ দলের ডেমোক্র্যাটরাও তাদের এ নিয়ে ‘কমিউনিস্ট’ ও ‘বামপন্থী’ বলে আক্রমণ করেন। উল্লেখ্য, পুঁজিবাদী আমেরিকান সমাজে কমিউনিজম ও বামপন্থা নিয়ে ভয়ের সংস্কৃতি রয়েছে। যেসব অস্ত্রের ওপর ভয় করে সংখ্যালঘু, দুর্বল মানুষের ওপর আক্রমণ করা হয়, মামদানি চোখে চোখ রেখে ওগুলো নিয়েই কথা বলেছেন। তার বক্তব্যের অর্থ দাঁড়ায়—মুসলিম বলে, অভিবাসী বলে, কমিউনিস্ট বলে আমাদেরকে আক্রমণ করলে সেটি আমরা আর মেনে নিতে রাজি নই।
এই বক্তব্যের দুটি ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। এক, সংখ্যালঘু, দুর্বল মানুষের ঘুরে দাঁড়ানো কিংবা চোখে চোখ রেখে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলাটা ওইসব অন্যায় থেকে মুক্তির পথ হতে পারে। দুই, তিনি দুর্বল সংখ্যালঘু মানুষের অধিকার নিয়ে সরব হয়েছেন। একই বক্তব্যে তিনি নিউইয়র্কে ইসলাম বিদ্বেষের জায়গা নেই বলে যেমন অবস্থান নিয়েছেন; আবার ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধেও তার অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। অথচ এই ইহুদিদের প্রভাবশালী একটি অংশই নানাভাবে তার বিরোধিতা করেছেন। নিউ ইয়র্ক যে সমকামী মানুষের শহরও, তিনি সেটিও দৃঢ়ভাবে বলেছেন। সর্বোপরি সংখ্যালঘু, দুর্বল মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলছেন, তাদের জন্য লড়াই করার কথা বলেছেন।
মামদানির এই সাফল্য থেকে কোনো শিক্ষা নিতে হলে আমাদের ওই শিক্ষাই নেওয়া উচিত। এমন একটি সমাজের জন্য আমাদেরও লড়াই করা উচিত, যে সমাজে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসী, আহমদিয়া, শিয়া, সমকামীরাসহ সব সংখ্যালঘু যাতে সমঅধিকার নিয়ে বসবাস করতে পারেন। তাদের যেন সংখ্যাগুরুর আক্রমণের শিকার না হতে হয়। বিরোধীদের প্রতি অন্যায়ও যে গ্রহণযোগ্য নয়, মামদানির ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে অবস্থান দিয়ে ওই শিক্ষাও নেওয়া যায়। মামদানি মুসলমান, তার বয়স কম, তিনি দক্ষিণ এশীয় মা-বাবার সন্তান, সে উল্লাস আমরা করতেই পারি। কিন্তু ওই উল্লাস আসলে ক্রিকেট খেলায় কারও সেঞ্চুরি বা পাঁচ উইকেট পাওয়া উদযাপনের মতো। সে আনন্দ গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু যে অস্থির, অন্যায় সময়ে আমরা বাস করছি; সে সময়ে মানবিকতা, সহমর্মিতা, অপরের অধিকারের প্রতি সচেতন হওয়ার যে আলো জ্বালানোর কথা মামদানি বলেছেন, আমাদের কি সেদিকেই মনোযোগ দেওয়া উচিত নয়? মামদানির এসব নীতি, অবস্থানের ভেতরে যে সাবটেক্সট রয়েছে সেটি সাধারণ পাঠক নাও বুঝতে পারেন। কিন্তু এটি ব্যাখ্যা করে পাঠকের সামনে তুলে ধরা সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব। কিন্তু আমাদের সংবাদমাধ্যম সেটি করতে ব্যর্থ হয়েছে। কিছু কিছু সংবাদমাধ্যম এ ঘটনাকে নেহায়েত বিনোদনের বিষয়ে পরিণত করেছে; যেটি এই রাজনৈতিক সাফল্যের খুবই অন্যায় উপস্থাপন।
নগরসেবা নিয়ে পরিকল্পনা
এবার মামদানির নগরসেবার পরিকল্পনা থেকে কী ইতিবাচক বিষয় আমরা নিতে পারি, সেটি বোঝার চেষ্টা করা যাক। মামদানি মেয়র হলে ধনীদের ট্যাক্স বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। চার বছরের জন্য নিউ ইয়র্ক শহরের বাড়ি ভাড়া স্থির রাখার কথা বলেছেন; সাধারণত প্রতিবছর ভাড়া বাড়ে। তিনি বিনামূল্যে বাস সেবা, সার্বজনীন চাইল্ড কেয়ার, নিউ ইয়র্ক সিটি পরিচালিত নিত্যপণ্যের দোকান স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। মোটাদাগে তিনি আবাসন সমস্যার সমাধান, সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি ও সামগ্রিক ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি নিয়ে কাজ করার কথা বলেছেন। আমাদের মিডিয়ায় এসব তথ্যের খুব সরল উপস্থাপন হয়েছে।
নির্বাচনের আগে সকল সমাজের রাজনৈতিক নেতারাই নানাকিছু করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। তাদের সেসব প্রতিশ্রুতি শুনে ভোটাররা কখনো ভোট দেন, কখনো দেন না। মামদানি এমন কী ভিন্ন বলেছেন যে, ক্রমাগত ভোট দিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা নিউ ইয়র্ক শহরের মানুষেরা এত বেশি সংখ্যায় গিয়ে ভোট দিয়েছেন। খোদ প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প, রিপাবলিকান পার্টি, নিজের ডেমোক্র্যাটিক পার্টির একাংশ ও নিউ ইয়র্ক শহরের এস্টাবলিশমেন্টের বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি কীভাবে জয়লাভ করলেন? দেখুন, তার সুনির্দিষ্ট ও পরিষ্কার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রচারণার সময়ে সংবাদমাধ্যমগুলো তাকে যখনই প্রশ্ন করেছে যে, এসব করার টাকা আপনি কোথায় পাবেন? তিনি প্রতিবার প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিষ্কারভাবে তার পরিকল্পনার কথা বলেছেন। একটি উদাহরণ এখানে আলোচনা করা যাক। ধনীদের ট্যাক্স বাড়ালে অনেকে নিউ ইয়র্ক থেকে চলে যেতে পারেন, ফলে চাকরিদাতার সংখ্যা কমে যাবে। তখন নিউ ইয়র্ক সিটি আরও বিপদে পড়বে কি না, ওই প্রশ্ন তাকে একাধিকবার করা হয়। তিনি এর উত্তরে বলেন, চাইল্ড কেয়ারের খরচ অনেক ক্ষেত্রেই চাকরিদাতাদের বহন করতে হয়। কিন্তু চাইল্ড কেয়ার সার্বজনীন ও বিনামূল্যে করে দিতে পারলে চাকরিদাতাদের খরচও কমে যাবে। ফলে ট্যাক্স বাড়ালেও সেটির প্রভাব খুব বেশি পড়বে না।

মামদানি শুধুমাত্র প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি, সোশ্যাল মিডিয়ায় চটকদার ক্যাম্পেইন করেই এই নির্বাচন জেতেননি। তিনি চমৎকার বাচনভঙ্গি-উপস্থাপন এবং সোশ্যাল মিডিয়ার কার্যকর ব্যবহার করে তার পরিকল্পনাকে সহজভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছিলেন এবং সেটি তাকে নির্বাচন জিততে সহায়তা করেছে। এবার বাংলাদেশের দিকে ফেরা যাক। বিএনপি সম্প্রতি একটি প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেছে। লন্ডনে বসে দলের শীর্ষ নেতা তালিকা চূড়ান্ত করেছেন, দলের কর্মী-সমর্থকদের ন্যূনতম কোনো ভূমিকা আছে এই তালিকা প্রণয়নে? তারপরও যে তালিকা প্রকাশ করেছে, সেই প্রার্থী তালিকায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, সংস্কৃতি ইত্যাদি নিয়ে পরিকল্পনার কোনো ছাপ দেখেছেন? এমন কোনো ভারসাম্যের উপস্থিতি দেখেছেন যেটি দেখে মনে হবে যে, স্বাস্থ্য খাতে তাদের এই প্রার্থীরা, আর শিক্ষা ক্ষেত্রে তাদের এই প্রার্থীরা দক্ষভাবে কাজ করতে পারবেন। ধরে নিলাম সে পরিকল্পনার ছাপ আছে, কিংবা নেই। কিন্তু সেটি নিয়ে আমাদের সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কোনো আলাপ নেই।
মোটাদাগে তারা আলাপ করল, প্রার্থীদের ত্যাগ-তিতীক্ষা, পরিবারতান্ত্রিক মনোনয়ন, নবীন-প্রবীণ, নারী-পুরুষ ইত্যাদি বিষয়কে কেন্দ্র করে। এসব আলাপের গুরুত্ব নেই, এমন নয়। কিন্তু শুধু এসব বিষয়ের বিবেচনা দেশ চালাতে ভূমিকা রাখবে? সরকার পরিচালনায় খাতভিত্তিক পরিকল্পনা লাগবে, সেটির বিবেচনা কোথায়? অনেক বলতে পারেন, সেটি তো নির্বাচনি ইশতেহারে থাকবে। কিন্তু ওই ইশতেহার যে জনপ্রতিনিধিরা বাস্তবায়ন করবে, তাদের নিয়ে পরিকল্পনা লাগবে না? পরিকল্পনাবিহীন প্রার্থী নির্বাচন এবার বিএনপিই প্রথমবারের মতো করেছে, এমন নয়, অতীত কিংবা বর্তমানে কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনয়নেই আপনি কোনো দেশপরিচালনার জন্য সুপরিকল্পিত চিন্তার ছাপ দেখতে পাবেন না। এই যে সীমাবদ্ধতা সেটি জনগণের সামনে তুলে ধরার দায়িত্ব অনেকখানি সংবাদমাধ্যমের। সংবাদমাধ্যমে সেটি করে না, নাকি সে সক্ষমতা নেই, সেটি ভাবার বিষয়!
অলিগার্ক-বিরোধিতা

জোহরান মামদানির প্রসঙ্গে ফেরা যাক। মামদানি তার এই পুরো প্রচারণায় অলিগার্কদের (যারা অঢেল সম্পদ ও রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে কোনো সমাজের ক্ষমতার বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করেন) কঠোর সমালোচনা করেছেন, তাদের ওপর বাড়তি ট্যাক্স আরোপ করার কথা বলেছেন। ফিলিস্তিন-ইসরায়েল ইস্যুতে পরিষ্কার করে কথা বলেছেন। তিনি মুসলিম, অভিবাসী, সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট সেসব নিয়ে রাখঢাক রাখেননি, বরং দৃঢ়ভাবে সেসব পরিচয়ের কথা সামনে নিয়ে এসেছেন। তার এই অবস্থান ব্যতিক্রম, আমেরিকান রাজনীতিবিদরা এর অনেক বিষয়ে সরাসরি কথা বলা তাদের রাজনীতির জন্য বিপজ্জনক মনে করেন। যেহেতু নির্বাচন পরিচালনায় ধনীদের, বড় ব্যবসায়ীদের কাছ অর্থ নিতে হয়; আবার নিউ ইয়র্কে ব্যবসায়ীদের একটা বড় অংশ ইহুদি; অর্থের সংস্থান, সমর্থন হারানোর ভয়ে এসব বিষয়ে কেউ পরিষ্কার করে কথা বলেন না।
মামদানি ওই পথে হাঁটেননি, তিনি পরিষ্কারভাবেই মধ্যবিত্ত, দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি ধনীদের আরও ধনী করার যে ব্যবস্থা সেটি ভাঙার কথা বলেছেন। ধনী-রাজনীতিবিদদের যে ঐক্য এবং এই ঐক্যের কারণে দরিদ্ররা যে আর দরিদ্র হচ্ছে সেটি নিয়ে সরাসরি ও সুনির্দিষ্টভাবে কথা বলেছেন। চলুন, আবার বাংলাদেশের সঙ্গে মিলাই, আমাদের রাজনীতিবিদরা কী করছেন? তারা কি আদতে নিউ ইয়র্কের ধনী-রাজনীতিবিদ চক্রের অনুসারী না? আওয়ামী লীগের পতনের পর আমাদের রাজনীতিবিদরা ওই ব্যবসায়ী এস্টাবলিশমেন্টের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছেন, যে ব্যবসায়ীদের আবার আওয়ামী লীগের সঙ্গেই সুসম্পর্ক ছিল। আমাদের সংবাদমাধ্যমগুলো মামদানির রাজনীতির এই দিকটি দেখতে চায় না বা দেখতে পায় না। ফলে মামদানির বিজয়ের খবরে এসব আলোচনা নেই। অনুমান করা যায়, সংবাদমাধ্যমের দেখতে অনিচ্ছার কারণ তাদের মালিকানা হতে পারে; আর দেখতে না পাওয়ার কারণ তাদের অদক্ষতা হতে পারে।
সংবাদমাধ্যমে মামদানির নিউ ইয়র্ক জয়ের চমকপ্রদ কাভারেজ পুরোপুরি অসঙ্গতি নয়; খোদ আমেরিকাতেই এটি একটি রাজনৈতিক বাঁকপরিবর্তনের কারণ হতে পারে বলে অনেকে অনুমান করছেন। তবে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে যেভাবে বিষয়টির উপস্থাপন হয়েছে সেটি সংবাদমাধ্যমের সামাজিক দায়িত্ব পুরোপুরি পূরণ করে না। দূর প্রবাসের এই খবর মানুষ কেন পড়বে, যদি না তার বিপর্যস্ত নাগরিক জীবনে এই ঘটনার কোনো প্রভাব পড়ে। সংবাদমাধ্যম ‘মুসলিম’, ‘কনিষ্ঠ’, ‘ট্রাম্পের পরাজয়’ বলে উপস্থাপন করে ঘটনাটিকে পুরোদস্তুর উদযাপনের বিষয়ে পরিণত করেছে। কিন্তু নাগরিকদের যে এই জয় থেকে ইতিবাচক আরও অনেক কিছু নেওয়ার আছে, সেটির ব্যাখ্যা করার দায়িত্বও সংবাদমাধ্যমের ছিল। মামদানি নিউ ইয়র্কের মেয়র হয়েছেন, এ ঘটনার সরল খবরে বাংলাদেশের দরিদ্র, প্রান্তিক, বৈষম্যের শিকার মানুষের ভাগ্যের কী পরিবর্তন হবে? এই সংবাদ মানুষ কেন পড়বে? নিশ্চয়ই শুধু উদযাপনের জন্য নয়। এ ঘটনা যে বৈষম্যভিত্তিক সমাজকাঠামো ভাঙার পথে যাত্রার সূচনা হতে পারে সেটি পাঠকের সামনে তুলে ধরার কাজটিই সংবাদমাধ্যমকে করতে হতো।