Published : 24 Apr 2026, 01:17 PM
দীর্ঘদিন ধরে উত্তরাঞ্চলের অবহেলিত জেলা হিসেবে পরিচিত লালমনিরহাট এখন দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পরিত্যক্ত থাকা একটি বিমানবন্দরকে সচল করার স্বপ্ন এবার বাস্তবের মুখ দেখছে। ‘সরকার আসে, সরকার যায়, কিন্তু বিমানবন্দর চালু হয় না’; উত্তরাঞ্চলের মানুষের এই দীর্ঘ আক্ষেপ ঘোচানোর উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান নির্বাচিত সরকার। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি করা ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই এই প্রকল্প সামনের দিকে এগোচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিমানবাহিনী প্রধান লালমনিরহাট বিমানবন্দর পরিদর্শন করেন এবং সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য রানওয়েতে পরীক্ষামূলক বিমান ওড়ানো হয়। এরপর সেনাসদরের প্রেস ব্রিফিংয়ে স্পষ্টভাবে জানানো হয়, দেশের স্বার্থ ও ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনা করেই এই বিমানবন্দর চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম রীতা সংসদে জানিয়েছেন, লালমনিরহাট বিমানবন্দরকে অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর হিসেবে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। শুধু তাই নয়, এই বিমানবন্দর সচল করা, বুড়িমারী-ঢাকা সরাসরি ট্রেন, চার লেন সড়ক নির্মাণ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ১৮০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, এটি এখন আর কেবল মৌখিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং সরকারের একটি আনুষ্ঠানিক অঙ্গীকার।
প্রশ্ন হলো, এই উদ্যোগ কেন শুধু উন্নয়নের গল্পে সীমাবদ্ধ নেই? কেন এটি কূটনৈতিক চাপের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে? উত্তরটি ভৌগোলিক। লালমনিরহাট থেকে ভারতের শিলিগুড়ি করিডোর মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে। এই করিডোরকে অনেকে বলেন 'চিকেন নেক'। সামরিক ও কৌশলগত কারণে এই করিডোরের কাছে বিমানবন্দর সচল করার বিষয়ে ভারতের আপত্তি থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের সঙ্গে এ নিয়ে বাংলাদেশের কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা বা চুক্তি নেই। তাই দেশের স্বার্থে এই পথে এগিয়ে যাওয়াই যুক্তিসঙ্গত।
ইতিমধ্যেই ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এখানে চীনা সম্পৃক্ততা বাড়লে তা ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে। এর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ভারত ত্রিপুরার কৈলাশহর বিমানঘাঁটি সক্রিয় করার কাজ শুরু করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বলে, এ ধরনের পদক্ষেপ পারস্পরিক সন্দেহের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। তবে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সামনে এই বাস্তবতাটুকু মাথায় রেখেই এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে।
দিল্লির মূল উদ্বেগের কেন্দ্রে আসলে চীন। ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর আওতায় দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের অবকাঠামো বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরে তাদের সজাগ নজরে রয়েছে। লালমনিরহাটে চীনা প্রযুক্তি বা অর্থায়ন এলে তা কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে; এই বাস্তবতা বর্তমান সরকারকে মাথায় রাখতে হবে। তবে উদ্বেগের কারণে উন্নয়ন থেমে থাকতে পারে না। এই উদ্বেগকে সামনে রেখেই একটি বিচক্ষণ কূটনৈতিক ভারসাম্য তৈরি করার সুযোগ বাংলাদেশের সামনে রয়েছে। অর্থায়নের প্রশ্নে স্বচ্ছতা, ভারতের সঙ্গে সংলাপের দরজা খোলা রাখা এবং বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালনার বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিলে সন্দেহের মাত্রা অনেকটাই কমে আসতে পারে। শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের এমন এক বিচক্ষণ কূটনীতি সাজাতে হবে যেখানে সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হবে না, আবার উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হবে না। দশকের পর দশক অবহেলিত উত্তরাঞ্চলের মানুষের উন্নয়নের অধিকারকে ভূ-রাজনীতির বন্দী না করাটাই রাষ্ট্রের কর্তব্য।
তাহলে বর্তমান সরকারের সামনে পথটা কেমন হওয়া উচিত? প্রথমত, বিনিয়োগের উৎস নির্ধারণে স্বচ্ছতা রাখতে হবে। যে কোনো বিদেশি অংশগ্রহণ উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো একটি পক্ষের কৌশলগত আধিপত্যের আশঙ্কা না থাকে। দ্বিতীয়ত, ভারতের সঙ্গে সরাসরি কূটনৈতিক সংলাপ চালিয়ে যেতে হবে। বিমানবন্দরটি যে বেসামরিক উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত হবে, তা কেবল বিবৃতিতে নয়, নীতির কাঠামোতেও স্পষ্ট করতে হবে। তৃতীয়ত, এই বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক সংযোগের হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা থাকলে নেপাল ও ভুটানকেও শুরু থেকে আলোচনায় রাখা দরকার। তাহলে এটি দ্বিপক্ষীয় বিষয় না থেকে বহুপক্ষীয় উদ্যোগে পরিণত হবে, যা ভারতের আপত্তির যুক্তিকে দুর্বল করবে।
লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, গাইবান্ধা মিলিয়ে এই পুরো অঞ্চল বরাবরই দেশের অন্যতম অনগ্রসর এলাকা। শিল্প নেই বললেই চলে, যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল, রপ্তানির সুযোগ সংকুচিত। বিমানবন্দর চালু হলে কৃষিজাত পণ্য, হস্তশিল্প, এমনকি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কার্গো সহজে দেশে-বিদেশে পাঠানো সম্ভব হবে। হাড়িভাঙা আম আর ঐতিহ্যবাহী শতরঞ্চি আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বুড়িমারী স্থলবন্দরের যাত্রী ও ব্যবসায়িক যোগাযোগ রক্ষায় এবং চীন, ভারত, নেপাল ও ভুটানের ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারে আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা আছে এই বিমানবন্দরের। মানুষ ঢাকামুখী না হয়ে স্থানীয়ভাবেই কর্মসংস্থান পাবে। তাই বর্তমান সরকারের কাছে এই বিমানবন্দর শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়, এটি একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতিও।
পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমান সরকারের হাতে এই মুহূর্তে একটি বড় সুযোগ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার কঠিন পরিবেশে ভিত্তিটা তৈরি করে দিয়ে গেছে। সম্ভাব্যতা যাচাই হয়েছে, আন্তর্জাতিক মনোযোগও তৈরি হয়েছে। এখন দরকার শুধু সুশৃঙ্খল বাস্তবায়ন। প্রকল্পে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মানলে, বিনিয়োগের উৎসে সততা রাখলে এবং রাজনৈতিক চাপের বদলে অর্থনৈতিক যুক্তিকে সামনে রাখলে কোনোপক্ষই কার্যকর আপত্তি জানাতে পারবে না। উন্নয়নকে নিরপেক্ষতার কাঠামোয় উপস্থাপন করাটাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক দক্ষতা।
লালমনিরহাট বিমানবন্দর তাই কেবল একটি রানওয়ে নির্মাণ নয়, এটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিপক্বতার একটি পরীক্ষাও। উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করতে পারলে এই প্রকল্প উত্তরাঞ্চলকে নতুন সম্ভাবনার মুখে দাঁড় করাবে এবং পুরো দেশকে দেখাবে এক নতুন আত্মপ্রত্যয়ের পথ। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, যে সরকার উন্নয়নকে নিজের শর্তে এগিয়ে নিতে পেরেছে, ওই সরকারই মানুষের আস্থা অর্জন করেছে। বর্তমান সরকারের সামনে ওই সুযোগ আছে। প্রশ্ন শুধু একটাই, সুযোগটিকে তারা কতটা সাহস ও বিচক্ষণতার সঙ্গে কাজে লাগাবে।