Published : 01 Aug 2025, 08:38 PM
একসময় মানুষ স্বপ্ন দেখেছিল—একদিন কেউ কাউকে শোষণ করবে না। মজুর ও মালিকের মধ্যে যে বৈষম্য, কৃষকের ঘামে ভেজা ধানক্ষেত আর তার পেটের ক্ষুধার যে নির্মম ব্যবধান, তা একদিন ঘোচানো হবে। পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে গরিবেরা একত্র হবে, ভেঙে ফেলবে পুঁজির পাহাড়, আর গড়ে তুলবে নতুন এক সমাজ। এই স্বপ্ন থেকেই জন্ম নিয়েছিল সমাজতান্ত্রিক ভাবনা, যার তাত্ত্বিক ভিত্তি গড়েছিলেন কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস। তাদের ঘোষণা ছিল—প্রলেতারিয়েতদের কাছে হার মানবে বুর্জোয়া।’
তারপর রক্ত, ঘাম আর বিপ্লবের গল্পে ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লব। সে সময় রাশিয়ার শ্রমিক, কৃষক ও সৈনিকেরা জারতন্ত্র উৎখাত করে বলশেভিকদের নেতৃত্বে গড়ে তোলে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এভাবেই জন্ম নেয় বিশ্বের প্রথম সফল সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র—সোভিয়েত ইউনিয়ন।
সেই আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল আরও বহু দেশে। চীন, কিউবা, ভিয়েতনাম, উত্তর কোরিয়া, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো একে একে সমাজতান্ত্রের পথ ধরল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সমাজতন্ত্র বনাম পুঁজিবাদের দ্বন্দ্ব এক নতুন মাত্রা লাভ করে। তথাকথিত স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা ঘটে। পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার নেতৃত্ব নেয় যুক্তরাষ্ট্র, আর সোভিয়েত ইউনিয়ন সমাজতান্ত্রিক বিশ্বজোটের নেতৃত্বে উঠে আসে। এই দ্বৈরথ শুধু রাজনৈতিক বা সামরিক ছিল না, ছিল আদর্শিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক। একপক্ষ বলত ব্যক্তি স্বাধীনতা, মুক্ত বাজার, উদ্ভাবন; অন্যপক্ষ বলত সাম্য, শোষণমুক্ত উৎপাদনব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় মালিকানার মধ্যে জনগণের অধিকার।
১৯৫০ থেকে ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ কোনো না কোনো সমাজতান্ত্রিক কাঠামোর অধীনে বাস করছিল। কিন্তু ইতিহাসের গতি শুধু উত্থানের নয়, পতনেরও। ১৯৮৯ সালে ভেঙে পড়ে বার্লিন প্রাচীর, আর ১৯৯১ সালে ধসে যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। একে একে পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। রাশিয়ায় ফিরে আসে পুঁজিবাদ, চীন রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বাজারনীতির পথে হাঁটতে শুরু করে, ভিয়েতনামও সংস্কারের দিকে অগ্রসর হয়, আর কিউবা পড়ে যায় একাকী বিচ্ছিন্নতার মধ্যে।
এই পতন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো নানা জটিল সমস্যায় ঘিরে ছিল। একদিকে গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের অভাব, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যবস্থায় উদ্ভাবনের ঘাটতি এবং কেন্দ্রীভূত আমলাতন্ত্রের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়ে। অনেক সমাজতান্ত্রিক দেশ একদলীয় শাসনের শিকার হয়, যেখানে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়ে দুর্নীতি ও জনগণ থেকে বিচ্ছিন্নতা জন্মায়। ব্যক্তির স্বাধীনতা, মতের বহুত্ব কিংবা সৃজনশীল উদ্ভাবনের সুযোগ সমাজতন্ত্রে সেভাবে ছিল না।
সোভিয়েত ইউনিয়নের গ্লাসনস্ত এবং পেরেস্ত্রোইকার প্রয়াসও দেরিতে আসে, ফলে এর অন্তর্নিহিত দুর্বলতাগুলো অবশেষে গোটা সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাটাকে ধ্বংস করে দেয়। এ সময়ে ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা তার ‘ইতিহাসের সমাপ্তি’ বইটি রচনা করেন, যেখানে তিনি বলেন, উদার গণতন্ত্র এবং পুঁজিবাদ ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
কিন্তু বাস্তবতা কি সত্যিই তা বলে? পুঁজিবাদ কি সফলতার অপর নাম? না কি এটি কেবল নিজের রূপ পাল্টে শোষণের নতুন নতুন উপায় তৈরি করছে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য ফিরে তাকাতে হয় তার নিজের অন্তর্গত সংকটগুলোর দিকে। উনিশ শতকের শেষভাগে ও বিশ শতকের শুরুতে পুঁজিবাদ তার নির্মম চেহারা দেখিয়েছিল। তখন শ্রমিকদের ছিল করুণতম অবস্থা—১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা কাজ, শিশু শ্রম, দুর্ঘটনায় মৃত্যু, কোনো সামাজিক নিরাপত্তা ছিল না। এই অমানবিক বাস্তবতা থেকেই জন্ম নিয়েছিল ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন, সমাজতন্ত্রের তত্ত্ব, শ্রমিক রাজনীতির জোর। পশ্চিমা দেশগুলো এই আন্দোলনগুলোর চাপে পড়ে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা (welfare state) গড়ে তোলে। ফলে একরকম বাধ্য হয়ে পুঁজিবাদ মানবিক মুখোশ পরিধান করে।
কিন্তু পুঁজিবাদ যে শুধু মানবিক হয়েছে, তা বলা ভুল। সে নিজেকে বদলেছে, কৌশলী হয়েছে, নতুন প্রযুক্তির দখল নিয়েছে, মানুষকে ভোগের মোহে বেঁধেছে। রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ও বাজারের ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে পুঁজিবাদ হয়ে উঠেছে হাইব্রিড সত্তা—যেখানে রাষ্ট্রের কর ও নিয়ন্ত্রণ আছে, আবার ব্যক্তি উদ্যোগ ও কর্পোরেট শক্তির উত্থানও রয়েছে। ২০০৮ সালে বিশ্বব্যাপী মন্দা প্রমাণ করে পুঁজিবাদের অস্থির ভিত, কিন্তু পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো তার থেকে উদ্ধার পেতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে এবং পরে আবার সেই খরচ জনগণের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়। অথচ সেই সময়েই যুক্তরাষ্ট্রে এক শতাংশ মানুষ পুরো সম্পদের ৪০ শতাংশ অধিকার করে রাখে।
এই যে অসাম্য, এই যে বৈষম্য—তা আজও বিদ্যমান। টমাস পিকেটি দেখিয়েছেন, পুঁজিবাদ স্বভাবতই ধনীকে আরও ধনী করে, আর গরিবকে ধীরে ধীরে দরিদ্র করে দেয়। সম্পদের প্রবৃদ্ধি আয় প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি হারে বাড়ে, ফলে যাদের পুঁজির মালিকানা আছে তারাই মূলত সমাজের কর্তৃত্ব ধরে রাখে। আজকের তথাকথিত ‘ফ্রি মার্কেট’ আসলে একরকম কর্পোরেট দখলের ক্ষেত্র। রাষ্ট্র ও নীতি প্রণয়ন প্রতিষ্ঠানগুলো নীতিনির্ধারণ করে কর্পোরেট লবির ইচ্ছানুযায়ী। রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হয়ে পড়েছে অর্থায়ননির্ভর, আর তথ্য ও মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করছে বৃহৎ কর্পোরেট মিডিয়া সংস্থা।
বিশ্ব রাজনীতি তাই আজ আর আদর্শে বিভক্ত নেই, বিভক্ত হয়েছে প্রভাব ও স্বার্থে। চীন সমাজতন্ত্রের ছায়ায় নিজেদের বাজার-আধিপত্যে পরিণত করেছে। তারা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও পুঁজির মিলনে এক অনন্য মডেল তৈরি করেছে, যেখানে মানবাধিকার, মতপ্রকাশ, শ্রমিক অধিকার বিলীন হলেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত। রাশিয়ায় পুতিন নেতৃত্বে একধরনের একনায়কতান্ত্রিক কর্পোরেট পুঁজিবাদ গড়ে উঠেছে। দক্ষিণ আমেরিকার সমাজতান্ত্রিক দেশের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, দুর্বল অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে তারা প্রান্তিক হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও বাম রাজনীতির যে শক্ত ভিত্তি একসময় ছিল, তা আজ প্রায় নিশ্চিহ্ন। এক সময় কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলনের নেতৃত্বে বামপন্থীরা ছিলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় অনেক বাম নেতাই পাকিস্তানবিরোধী সংগ্রামের সামনের সারিতে ছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতার পর মতাদর্শগত বিভাজন, নেতৃত্বের সংকট, মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণির বিচ্ছিন্নতা ও নতুন প্রজন্মের অভিমুখ বদলে যাওয়ার কারণে বামপন্থীরা রাজনৈতিক প্রান্তে চলে যান। সামরিক শাসনামলে তারা দমন-পীড়নের শিকার হন, পরবর্তী সময়ে সংসদীয় রাজনীতির মূলধারায় একেবারে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েন।
এই পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন ওঠে, মানুষ কি আর সাম্যের স্বপ্ন দেখবে না? শোষণমুক্ত সমাজ কি কেবলই রূপকথা হবে? আদর্শহীন এক প্রযুক্তি-নির্ভর, কর্পোরেট পরিচালিত সমাজে কি মানবিকতা টিকবে? এই প্রশ্নের জবাবে দেখা যাচ্ছে—বিশ্বে এক নতুন ধরনের ভাবনা জন্ম নিচ্ছে। সমাজতন্ত্রের পুরোনো কাঠামো হয়তো ফিরছে না, কিন্তু তার চেতনা নতুন রূপে ফিরছে।
তরুণ প্রজন্মের একাংশ পশ্চিমে যেমন বার্নি স্যান্ডার্স, জেরেমি করবিনের মতো নেতার পক্ষে সোচ্চার হয়েছে, তেমনি উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও এক বিকল্প সম্ভাবনার আলো খোঁজা হচ্ছে। যদিও এই ধারা এখনো বৃহৎ রাজনীতিকে নাড়িয়ে দিতে পারেনি, কিন্তু ভবিষ্যতের দিকে ইঙ্গিত করছে। জলবায়ু পরিবর্তন, শ্রম বাজারের অস্থিরতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আগ্রাসন, প্রযুক্তিনির্ভর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা—এসবই মানুষকে নতুন এক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
এই প্রশ্নের উত্তর এখনও অসম্পূর্ণ। পুঁজিবাদ টিকে আছে তার চতুর রূপান্তরের কারণে, আর সমাজতন্ত্র হেরেছে তার কাঠিন্য ও অনমনীয়তার জন্য। কিন্তু মানুষের আকাঙ্ক্ষা—সাম্য, নিরাপত্তা, মর্যাদা—এখনো মুছে যায়নি। বরং আধুনিক দুনিয়ায় এর বাস্তবায়ন নতুন ভাষা ও কাঠামোর মাধ্যমে ঘটতে পারে। আদর্শ কখনো মারা যায় না, শুধু তার রূপ বদলায়। ইতিহাস তাই শেষ নয়, ভবিষ্যতের পৃষ্ঠা এখনো খোলা। কে লিখবে সে পৃষ্ঠা, কোন আদর্শে লেখা হবে—সেই উত্তর আজও সময়ের অপেক্ষায়।
দুই.
বেদনা কারও প্রিয় নয়। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আমরা নিজেরাই বারবার সেই দুঃখকে ডেকে আনি, নাড়াচাড়া করি স্মৃতির গহীনে, খুঁড়ে দেখি পুরনো ক্ষত। কবিরা বলেন, এ এক ধরণের পরিশুদ্ধি, জীবনের রঙহীনতাকে গভীরতার আলোয় রাঙিয়ে তোলা। কিন্তু শুধু কবিতা নয়, আমাদের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি স্তরেই এই বেদনার ছায়া দেখা যায়। এমনকি আমরা বুঝে বা না বুঝে কখনো কখনো এমন এক যন্ত্রণার জগতে প্রবেশ করি, যেখান থেকে ফেরা সহজ নয়।
আমাদের সমাজে আজকাল একটা অসামান্য চর্চা চলে—বেদনার সংরক্ষণ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেদনা এখন 'ব্র্যান্ড' হয়েছে। কেউ নিজের মনের ক্ষত প্রকাশ করলে তাকে বলা হয় 'সাহসী', কেউ না বললে বলা হয় 'আত্মকেন্দ্রিক'। এই সমাজের প্রত্যাশা এক ধরনের পরাবাস্তব মানবিকতা—যেখানে দুর্বলতা প্রকাশ না করলেও চলবে না, আবার অতিরিক্ত প্রকাশ করলেও তা 'সীমা লঙ্ঘন'।
সমাজে এক শ্রেণির মানুষ এখন বেদনার গল্প নিয়ে ব্যবসা করছে। 'ভিক্টিম ন্যারেটিভ' তৈরি করে তারা নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করছে। আরেক দিকে, যারা সত্যিই ভেঙে পড়ে, তারা হিমশিম খায় ভাষা খুঁজতে, সহানুভূতি পেতে। আমরা যারা অন্যের কষ্টের দিকে তাকাই, তারা অনেক সময় কৌতূহলী দর্শক মাত্র—সহানুভূতিশীল না। সমাজ নামক কাঠামোটি এখন কেবলই বিধি-নিষেধের সমষ্টি নয়, এটি একটি বিচারসভা, যেখানে প্রতিটি বেদনা প্রশ্নবিদ্ধ হয়: ‘এটা কি সত্যি?’ বা, ‘ও তো নাটক করছে!’
বাংলাদেশের রাজনীতি ইতিহাসের শুরু থেকেই বেদনার বয়ান নিয়ে কাজ করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই স্মৃতি ও বেদনাকে কি আমরা শুধু শ্রদ্ধার জায়গা দিয়েছি, না কি একে ব্যবহার করেছি জনসমর্থন আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে?
আজ যে রাজনীতিকরা মানুষের কষ্টের গল্প বলেন, তারা কি সেই কষ্ট লাঘব করতে চান, নাকি কেবল সেই বেদনার ওপর দাঁড়িয়ে নিজের অবস্থান শক্ত করতে চান? রাজনীতি এখন অনেকাংশে শোকের ব্যবস্থাপক হয়ে উঠেছে—যেখানে অতীতের রক্ত, বর্তমানের কান্না এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মিলিয়ে এক ধরনের নাটক মঞ্চস্থ হয় প্রতিদিন।
রাজনীতিতে যাদের আদর্শ ছিল জনতার পাশে থাকা, তারাও এখন সুবিধাবাদী। সুবিধাবাদ রাজনীতির এক দুঃখজনক চরিত্র হয়ে উঠেছে। তারা জনগণের দুঃখকে তুলে ধরেন, আবার সেই দুঃখ নিরসনে চুপ থাকেন। এ এক ভাঙনের রাজনীতি, যেখানে হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগিয়ে তোলাই যেন নেতৃত্বের সংজ্ঞা।
অর্থনীতি যেখানে মানুষের জীবনের গঠনমূলক চালিকাশক্তি হওয়ার কথা ছিল, সেখানে আজ এটি হয়ে উঠেছে অসাম্য, বৈষম্য, আর দুর্বিষহ বেঁচে থাকার প্রতীক। এই দেশে একজন শ্রমিক সারাদিন কাজ করেও ঠিকমতো খেতে পারেন না, অথচ ধনীদের ছেলেমেয়ে বিদেশে বিলাসিতা করেন। এই বৈপরীত্য শুধু একটা সংখ্যা নয়, এটি একটি চলমান বেদনা।
অর্থনৈতিক কাঠামো আজ মনুষ্যত্ব ভুলিয়ে দিয়েছে। বেতন পায়, কিন্তু সম্মান পায় না; চাকরি পায়, কিন্তু নিশ্চয়তা পায় না; কাজ করে, কিন্তু ভবিষ্যতের গ্যারান্টি পায় না। মানুষের শ্রম আর ঘামের মূল্য যখন এক শ্রেণির মানুষ গিলে খায়, তখন এই খাঁ খাঁ সমাজে হৃদয় খুঁড়ে কেবল বেদনাই পাওয়া যায়।
শেয়ার বাজারে ধস, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংক লুটের কাহিনি—এসব যেন আজকের অর্থনীতির মুখচ্ছবি। অর্থনীতি নয়, যেন এক দীর্ঘশ্বাসের রূপকল্প। আমরা কেবল বাঁচতে পারি, কিন্তু বাঁচার মতো বাঁচতে পারি না।
ব্যক্তিজীবনের ভেতর বেদনার অনেক ভাষা আছে—প্রতারণা, পরাজয়, একাকিত্ব, শূন্যতা, আত্মীয়ের মৃত্যু, ভালোবাসার ভাঙন। আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে এই অভিধান পাঠ করেছি। কিন্তু কজন তা লিখতে পেরেছি?
বেদনার যে প্রবাহ, তা থামে না; বরং সময়ের সঙ্গে তা রূপ বদলায়। শৈশবে অভিমান, যৌবনে বিভ্রান্তি, প্রৌঢ়ত্বে অনুতাপ আর বার্ধক্যে একাকিত্ব—সব মিলিয়ে জীবন এক দীর্ঘ শোকগ্রন্থ। কিন্তু এই শোকগ্রন্থে আছে সাহসের পঙক্তি, অশ্রুর নিচে লুকানো কিছু হাসি, ক্ষতের মধ্যে খুঁজে পাওয়া পুনর্জন্ম।
নৈতিকতা এক সময় আমাদের ব্যক্তিত্বের কেন্দ্রস্থল ছিল। কিন্তু এখন তা অনেকটাই দৃষ্টিনন্দন শব্দমাত্র। দুর্নীতি, চাতুর্য, স্বার্থপরতা—সব কিছুর মাঝে নৈতিকতা যেন শুধুই স্মৃতিচিহ্ন। স্কুলে শেখানো নীতিবাক্য জীবনে প্রয়োগ করতে গেলে মানুষ কেবল পেছনে পড়ে থাকে।
নৈতিকতার অভাব সমাজে যে বেদনা সৃষ্টি করে, তা সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর। যখন একজন শিক্ষক ঘুষ নেন, একজন চিকিৎসক অবহেলা করেন, একজন সাংবাদিক সত্য বিক্রি করেন, তখন যে যন্ত্রণা জন্ম নেয়, তা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু অন্তর্গত বিশ্বাসে ধ্বস নামে। এই বিশ্বাসের পতনই সবচেয়ে গভীর বেদনার কারণ, যাকে হৃদয় খুঁড়েও সারানো যায় না।
আমরা মানুষ—সেই পরিচয়েই দুর্বলতা আমাদের গায়ে লেগে থাকে। ভালোবাসা চাই, নিরাপত্তা চাই, স্বীকৃতি চাই। এই চাহিদা অপূর্ণ থাকলে আমরা ভেঙে পড়ি। সমাজে, রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে—যেখানেই যাই না কেন, আমরা আমাদের দুর্বলতার কণ্ঠস্বর লুকাই। অথচ এই দুর্বলতা বুঝতে পারা, মেনে নেওয়া এবং অন্যের দুর্বলতার প্রতি সহনশীল হওয়াই হলো মানবিকতা।
কিন্তু এখন মানুষ আর সময় পায় না অন্যের দুর্বলতা বুঝে পাশে দাঁড়াতে। মানুষ এখন দ্রুত বিচার করে, রায় দেয়, মন্তব্য করে। ফলে দুর্বলতা একটি লজ্জাজনক দাগে পরিণত হয়, যা মানুষ লুকাতে চায়; অথচ এই লুকোনোর মধ্যেই জন্ম নেয় আরও বেদনা।
জীবনের রঙিন গল্পের নিচে বেদনার এক মোটা স্তর থাকে। কেউ হাসে, কেউ জেতে, কেউ পায়, কেউ হারায়—এই চক্রে প্রত্যেকেই কখনো না কখনো হৃদয় খুঁড়ে দেখে কোথায় গিয়ে লুকিয়ে আছে তার দুঃখ। কিন্তু দুঃখ কোনো একক ঘটনা নয়, এটি আমাদের চেতনার অঙ্গ। এটি কখনো মানুষকে ভেঙে দেয়, আবার কখনো গড়ে তোলে।
তবুও আমরা বেদনার কাছে ফিরে যাই। হয়তো সেই শুদ্ধির জন্য, হয়তো স্মৃতির জন্য, হয়তো নিজের মানবিক অস্তিত্বের প্রমাণের জন্য। কারণ মানুষ যন্ত্র নয়। মানুষ ভুল করে, ভালোবাসে, ভাঙে, গড়ে—আর প্রতিটি ধাপে হৃদয়ের ভেতর বেদনার এক বিন্দু জায়গা রেখে চলে। সেই জায়গাটুকু আমাদের সবচেয়ে সত্যিকারের অংশ—যেখানে আমরা আসল মানুষ হয়ে থাকি।
এই লেখার শিরোনাম তাই জীবনানন্দ দাশ থেকে নেওয়া: ‘কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে?’
উত্তর হয়তো এই—যে মানুষ এখনো মানুষ হয়ে থাকতে চায়, বাঁচতে চায়।