Published : 10 Feb 2026, 07:54 PM
বাংলাদেশের বহুল প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র দেড় দিন বাকি। এই নির্বাচনে পতিত ফ্যাসিবাদী দল আওয়ামী লীগ ভোটের মাঠে নেই। বিদেশে পলাতক এই দলের নেতাদের স্লোগান ‘নো বোট নো ভোট’—অর্থাৎ নৌকা নেই, ভোটও নেই। তারা তাদের সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার জন্য প্রচার চালাচ্ছে। অন্যদিকে এবারের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে একসময়ের রাজনৈতিক মিত্র দুই দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে। এখন প্রশ্ন, এই নির্বাচনে জিতবে কারা?
অন্যান্যবারের তুলনায় এবারের নির্বাচন নানা কারণে বহুমাত্রিক। প্রথমত, এটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের প্রায় দেড় বছর পর। এবার জনরায় আসবে অভ্যুত্থান ও তার পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সার্বিক কর্মকাণ্ড দেখে। এবারের মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯ জন। পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫৪ জন এবং নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৫ জন।
এই ভোটারদের মধ্যে চার থেকে সাড়ে চার কোটি তরুণ ভোটার, যারা প্রথমবারের মতো ভোট দেবে। তাদের ভোটের কোনো ঐতিহাসিক ডেটা নেই। এছাড়া ভোটারের প্রায় অর্ধেক নারী। ফলে নারী ভোটারদের ভোট এবারের ফলাফলে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে।
জনমত জরিপ ও পূর্বাভাস
এই নির্বাচনে তাহলে কারা বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসছে? এর উত্তর ও বিশ্লেষণের আগে নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রকাশিত দুটি জনমত জরিপ বিবেচনা করা যাক। দুটি জরিপই প্রকাশিত হয়েছে ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।
জরিপ-১: আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রথম জরিপটি প্রকাশ করেছে এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট (ইএএসডি)। সাড়ে ৪১ হাজার মানুষের মতামতের ভিত্তিতে এই জরিপে বলা হয়েছে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট প্রায় ২০৮টি আসনে জয়ী হতে পারে। জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের সম্ভাব্য আসন ৪৬টি। এছাড়া জাতীয় পার্টি ৩টি, অন্যান্য দল ৪টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১৭টি আসনে জয়ী হতে পারেন।
ইএএসডির জরিপ অনুসারে, রাজনৈতিক পছন্দে বিএনপির সমর্থন সর্বোচ্চ—৬৬.৩ শতাংশ ভোটার বিএনপিকে ভোট দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। জামায়াতে ইসলামী ১১.৯ শতাংশ নিয়ে দ্বিতীয়। এনসিপি ১.৭ শতাংশ, জাতীয় পার্টি ৪ শতাংশ এবং স্বতন্ত্র ২.৬ শতাংশ। নারী ভোটারদের মধ্যে বিএনপির জনপ্রিয়তা আরও বেশি, ৭১.১ শতাংশ। বিএনপি জোটের সর্বোচ্চ সমর্থন চট্টগ্রাম (৭৬.৮%) ও সিলেটে (৭৫.৬%)। বরিশাল (১৭.৮%) ও খুলনায় (১৮.৬%) জামায়াত জোট শক্তিশালী। রংপুরে জাতীয় পার্টি ৩ শতাংশ পেয়েছে।
জরিপ-২: ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল’ অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসি (আইআইএলডি)-এর জরিপে বলা হয়েছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ৪৪.১ শতাংশ ভোট পেতে পারে, আর জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ৪৩.৯ শতাংশ। প্রজেকশন বিডি ও জাগরণ ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় এই জরিপটি করা হয়েছে।
জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, এতে অংশ নেওয়া ৯২ শতাংশ ভোটার ভোট দিতে চান। ৪.৪ শতাংশ ভোটার ভোট দিতে যাবেন না এবং ২.৫ শতাংশ এখনো সিদ্ধান্ত নেননি। ভোট পাওয়ার ক্ষেত্রে বিএনপি জোট এগিয়ে থাকলেও নিশ্চিত বিজয় হবে এমন আসনে জামায়াত জোট এগিয়ে। ১০৫টি আসনে জামায়াত জোটের নিশ্চিত জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে, অন্যদিকে বিএনপি জোটে ১০১টি। ৭৫টি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে, বাকি ১৯টিতে অন্যান্য প্রার্থী জিততে পারেন।
দুই জরিপের ভোটভাবনা
দুই জরিপের পূর্বাভাস পরস্পরবিরোধী ফলাফলের আভাস দিচ্ছে। প্রথমটি বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের নিরঙ্কুশ বিজয় দেখাচ্ছে। দ্বিতীয়টি জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটকে ক্ষমতার কাছাকাছি দেখছে। প্রথম জরিপটি ভোটের পুরনো হিসাবের ওপর নির্ভর করে তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ ২০০১ সালের নির্বাচনের ফলাফলে বিএনপির ভোটের হিস্যার সঙ্গে আওয়ামী ভোট ব্যাংকের কিছু ভোট আর বিএনপির নতুন চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ক্যারিশমা যোগ করলে বিএনপিই ক্ষমতায় আসছে—এই চিন্তা প্রক্রিয়া এখানে বিবেচ্য।
দ্বিতীয় জরিপটি পুরনো হিসাবকে অকার্যকর মনে করে। ধর্ম প্রশ্ন, জুলাই বিপ্লব, বিএনপির অতীত শাসনের স্মৃতি, চাঁদাবাজির অভিযোগ, ভারত প্রশ্নে নীরবতা, আওয়ামী রাজনীতি প্রশ্নে নমনীয়তা ইত্যাদি তরুণ ও নারী ভোটারদের বিএনপিমুখী না করে জামায়াত-এনসিপি জোটের দিকে টানবে বলে মনে করে। এই চিন্তা প্রক্রিয়ার ভর করে এই জরিপ বলছে, এবার বিএনপি বেকায়দায় পড়বে।
ভোটাররা কী বিবেচনা করবেন?
ভোটের ফলাফল তাহলে কেমন হবে? ওই বিবেচনায় আসার আগে এবার ভোটারদের ভোটভাবনার প্রবণতাগুলো বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে।
ক) এবার নির্বাচনে তুরুপের তাস হচ্ছে তরুণ ভোটাররা। তারাই পরিস্থিতি পাল্টে দিতে পারেন। মোট ভোটের প্রায় ৩০% এই নতুন ভোটাররা প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন। তারা ২০২৪-এর ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানের অংশজাত। তারা দলদাস ভোটার নন। কোনো দলের রিজার্ভ ভোটার হিসাবে তারা ভোট দেবেন না। ফলে তাদের নিজস্ব বিবেচনার ভোট এবার ভোটের পুরনো হিসাবকে পাল্টে দিতে পারে। তাদের ভোট যেদিকে যাবে তারাই নির্বাচনে ফল নিজেদের পক্ষে পাবে।
খ) নারী ভোটাররাও এবার ভোটের ফলাফলকে দারুণভাবে প্রভাবিত করবে। নারী ভোটারদের নিয়ে জামায়াতে প্রধানের কথিত বক্তব্যকে কেন্দ্র করে যে ভোটের রাজনীতি হয়েছে, তা মিডিয়ায় যেভাবে ফলাও করে বিতর্ক সামনে এনেছে তার ফলাফল হিসাবে নারী ভোটারদের সক্রিয়তা এবার ভোটের মাঠে দারুণ প্রভাব ফেলবে। নারী ভোটাররাও ব্যাপকভাবে যেদিকে ঝুঁকবে ফলাফল সেদিকেই হেলে পড়বে।
গ) ভারত প্রশ্নে, ভারতের আধিপত্যবাদের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানকে এবার ভোটারদের একটা বড় অংশ বিশেষভাবে বিবেচনায় নেবেন। ধর্ম ও প্রগতিকে রাজনীতির মাঠে যে ন্যারেটিভে এবার সামনে আনা হয়েছে ওই বয়ানের প্রভাব এবার পড়বে ভোটারদের মনে। আওয়ামী লীগ ও কথিত প্রগতিশীল রাজনৈতিক বলয় যে বিবেচনায় ধর্ম, সাম্প্রদায়িকতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে দেখেন, ওই রাজনৈতিক ন্যারেটিভ এবার অনেকটা এসেছে বিএনপির রাজনৈতিক ভাষায়। জামায়াত থেকেছে তার উল্টোদিকে। রাজনীতির এই ন্যারেটিভকেও ভোটাররা বড় করে বিবেচনায় নিয়ে এর পক্ষে ও বিপক্ষে ভোট দেবেন।
ঘ) রাজনীতির নামে কথাবাজি, চাঁদাবাজিকেও এবার বিবেচনায় নেবে ভোটাররা। রাজনীতিবিদদের দৃশ্যমান আয় ও ব্যায়ের চেহারাও প্রশ্ন তুলবে অনেক ভোটারের মনে। ফলে, ভোটের রাজনীতিতে অতীতের প্যাটার্ন এবার ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার বয়ানকে খারিজ করে সোশাল মিডিয়া এবারের নির্বাচনি ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এই প্রবণতা আমাদের ভোটের রাজনীতির অনেক হিসাব পাল্টে দিতে পারে।
ঙ) নিজেদের দল ভোটের মাঠে না থাকলেও আওয়ামী ভোটাররা এবার নির্বাচনের ফলাফলে যথেষ্ট ভূমিকা রাখবেন। দলের পক্ষ থেকে নির্বাচনে অংশ না নেবার আহবান থাকলেও আওয়ামী ভোটারদের একটা বড় অংশ ভোট দিতে যাবেন বাস্তব প্রয়োজনেই। স্থানীয়ভাবে সারভাইবাল স্ট্র্যাটেজি মেনেই তারা ভোট দেবেন। ফলে তাদের ভোট একক কোনো দল পাবে বলে মনে হয় না। বরং সংসদীয় আসন ভেদে এই ভোট তাদের অনুকূলে থাকা প্রার্থীর পক্ষে যেতে পারে। তবে তাদের বড় অংশ রাজনৈতিক চেতনার অংশ হিসাবে গণভোটে ‘না’ ভোট দিতে পারেন।
চ) টাকাকড়ি বা অর্থ এবারও ভোটে প্রভাব ফেলবে। টাকার যেহেতু কোনো নিজস্ব রাজনৈতিক চেহারা নেই বরং সেটা সর্বদলীয় অবয়বের, ফলে যে দল যত সফলভাবে, নিশ্চ্ছিদ্রভাবে, নিরাপত্তার সঙ্গে এবং সঠিক অংকে ভোটারের কাছে এটাকে নিতে পারবেন তারাই এর সুবিধা ততটা পাবেন। ভোট ব্যবস্থাপনার কাজে জড়িত সকল অংশীজনের ক্ষেত্রেও এই কথাটি প্রযোজ্য।
তাহলে হবেটা কী?
ভোট যদি সুষ্ঠুভাবে হয়, বড় কোনো ব্যতয় ছাড়াই ভোটগ্রহণ সুসম্পন্ন হয় তবে ভোটের ফলাফলে দু-রকম ঘটনাই ঘটতে পারে।
প্রথমত, নতুন ভোটার ও নারী ভোটাররা যদি ব্যাপকভাবে ইতিবাচক হয়ে বিএনপির দিকে ঝুঁকে যায় তাহলে বিএনপি ও তার জোট বড় বিজয় পাবে।
দ্বিতীয়ত, উল্টোটা ঘটলে পুরনো ভোটের হিসাব পাল্টে যাবে। নতুন ভোটার ও নারী ভোটারদের মনোভাব অনুকূলে গেলে জামায়াত জোট অতীতের সকল হিসাবকে পেছনে ফেলে চমক দেখাতে পারে।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশের ভোটের রাজনীতিতে পশ্চিমবঙ্গের সর্বশেষ বিধানসভার ফলাফলের পুনরাবৃত্তিও ঘটতে পারে। সেখানে বিরাট আওয়াজ সত্ত্বেও বিজেপি ক্ষমতাসীন তৃণমূলকে হারাতে পারেনি। তবে মোটামুটি আসন পেয়ে কংগ্রেস-সিপিএম-বামদের পেছনে ফেলে বৃহত্তম বিরোধীদল হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। জামায়াত জোট ওই ভাগ্যও বরণ করতে পারে।