Published : 24 Oct 2025, 08:28 PM
সেদিন নদীতে ছিল না কোনো লালডিঙা, মোহনায় কোনো পানসি। সমাজস্রোতের কাঠগড়ায় থমকে দাঁড়ানো এক কিশোরী সেই প্রথম বর্ষায় কী করে নদী পাড়ি দিয়েছিল? কে তুলে দিয়েছিল হাতে প্রথম দাঁড়? সে গল্পই বলছি।
আষাঢ়ের এক দমধরা বিকেল। বাংলাদেশের ছোট্ট এক মহকুমা শহর জল ভর ভর জামালপুর। রাস্তার এপারে নদী। ওপারে ঢেউটিনের বিলেতি বাংলো টাইপের এক বাড়ি। ঘটনাটি অন্তত ছয় দশক আগের, আর গল্পটি আমার নিজের। ভাবতে গেলে সুরে, লয়ে, বাতাসে, পুদিনাপাতাতে মকটেল হয়ে যায়।
বারান্দার নীল অপরাজিতার পাশেই ইজিচেয়ারে আম্মা-আব্বা নান্নুর দোকানের টোস্ট ভিজিয়ে চা পান করছেন। হঠাৎ হিমসাগর আমগাছ গা ঝাঁকি দিতেই শুরু হয়ে গেল হাওয়ার হুজ্জতি। মুহূর্তেই মনে হলো, আজ গাছ উড়াল দেবে। সবাই দৌড়ে-মৌড়ে ঘরে প্রবেশের আগেই অপরাজিতার মাচা মাড়িয়ে ঢেউটিন কড়মড়িয়ে খয়েরি মাটির উঠোনে লাফাতে লাগল ছোট ছোট শাদা তালমিছরির বল। শিলাবৃষ্টি! প্রবেশপথের বেড়া, আমগাছের বাহুতে বসা অর্কিড থিরথির করে কাঁপছে। বাঁশের বেড়া ভেঙে কানে আসল ধাঙড়বাড়ির শিশু-কিশোরদের উল্লাস। প্রবল গুমোটের পর আনন্দের গ্রাম খুলে গেছে।
সবাই শিল কুড়োতে ছুটল। ছোট ভাই শুবুকে মগ ও বাটি ধরিয়ে দিতে দ্রুত হাতে গায়ের জামা খুলতে খুলতে বলে, “আম্মা... বকুলতলায় গেলাম।” আমি দৌড়ে গিয়ে জানালার শিকের সরুতে মুখটুকু গলিয়ে যত দূর দেখা যায় তাকে দেখি। আম্মার পুরনো শাড়িকাটা আঁটোসাঁটো সবুজ জামা-পাজামা-ওড়না পরে দেখি আর সে জামার ভেতর আমার ছোট্ট হৃৎপিণ্ড জোরে জোরে শব্দ করতে থাকে। এক অব্যক্ত যন্ত্রণা ঢেকে বাতাস ভেদ করে গুলির মত ছুটে যাওয়া ভাইটিরে চিৎকার দিয়ে বলি, “শুবু..., হিল জমলেই মগ দিয়া যাইস। আমি চিনি দিয়া আইসক্রিম বানাইমু।”

আমার চোখজোড়া জীবনানন্দ দাশের ম্লান বেতফল হয়ে যায়। কদিন আগেই না পাথালিয়ার জামতলা পর্যন্ত মনতাজ ভাইয়ের সাইকেল চালিয়েছি! আর মাত্র এক সপ্তাহে কী হলো? হঠাৎ আমার গা থেকে এক থোকা কৃষ্ণচূড়া ঝরে পড়েছিল মেঝেতে, তাতেই কি আমি নারী হয়ে গেলাম? আমার পায়ে শিকল পরল! চোখ ভিজে আসে। কিন্তু সে জল ক্রিস্টাল বল হয়ে জামায় পড়ার আগেই পেছনে দাঁড়ানো এক জোড়া মানুষ তা ধরে ফেলেন। টের পাই আমার পিঠে আব্বার হাত, পাশে আম্মার ইশারা!—“তুইও যা... দৌড় দে শামীম... ফ্রক ভিজলেও কুন্তা অইতো নায়।” আর আমার সমস্ত রোগজীবাণু বাষ্প হয়ে যায়। আমি গুটিপোকা থেকে প্রজাপতি হয়ে অনুজের পেছনে পেছনে নির্বাচিত ফুলের মধু নিতে ছুট দিলাম। সীমানার বেড়া পেরিয়ে, ধাঙড়দের বাড়ি ছুঁয়ে এক দৌড়ে বকুলতলায় গিয়ে দেখি—ভাইয়া, ইকবাল, বাবুল ভাই ঘাসে গড়াচ্ছে। পুরো মাঠ বকুলের পাকা ফল আর মেঘের ক্রিস্টালে ভরে গেছে। উদোম আকাশের গা থেকে পড়ছে এক আশ্চর্য বিভা। ঘন সন্ধ্যায় জামালপুরের মাঠে জ্যোৎস্না নেমে এসেছে। আলোকিত হয়ে গেছে আমাদের গলা হাত পা। ভিজে সপসপে সবুজ ফ্রকটা জাপটে ধরছে আরও।
তাতে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। আমি বরফের ছা ধরি আর বাটিতে রাখি। কানে বাজে বেনুদার সেতার ও সারেঙ্গী। মোখলেস নিশ্চয়ই এখন তার হারমোনিয়াম নিয়ে বসেছেন? আমার বন্ধু মন্টি কী করছে? কাকাবাবু কি ওকেও বর্ষার শাদা শাদা ফল কুড়াতে দিয়েছেন? নাকি মন্টি ওদের কাঠের দোতলায় কয়েদ হয়ে তার ম্লান বেতফল চোখজোড়া খুলে বাইরে তাকিয়ে বৃষ্টি দেখছে? বৃষ্টির তোড়ে ভিজে কেঁপে কেঁপে উঠছে সামনের বাগানের সন্ধ্যামালতী, টগর? হায় রে আমাদের সদ্য প্রাপ্ত নারীত্ব! সে কী মহিমা দেয় আর কী কী হরণ করে, তা কি আমরা বুঝি? হয়তো অধিকাংশ মানুষই তা নিয়ে ভাবেন না। এমনকি তা তাদের উপলব্ধিতেও নেই।
শিল কুড়োতে কুড়োতে হাত অবশ হয়ে গেলে তিন ভাইবোন ফিরে আসতেই দেখি, চিনি রেডি। দৌড়ে শুকনো জামা পরব বলে আগে গামছার গেরোতে লম্বা চুলগুলো আটকে দেখি মুর্শিদাবাদী সিল্কের সবুজ জামাটা কিছুতেই খুলতে পারছি না। ঠিক ত্বকের মত বসে গেছে। টানাটানি করতে করতে বাথরুম থেকে ভয়ে ভয়ে বেরোই। অবাক কাণ্ড, আম্মা মৃদু হেসে নিয়ে এলেন কাঁচি। তারপর দুজন মিলে ভিজে জামা কেটে ভেতর থেকে আমাকে বের করে মুক্ত করে দিলেন। আমি এবার চট করে সেমিজ ও পাজামা খুলে শুকনো জামা পরে শিলা-আইসক্রিম বানাতে গেলাম।
সেই জলিষ্ণু জামালপুরের বকুলতলা পেরিয়ে তারপর বাংলাদেশের শতমাইলের হার্ডল লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যখন নৌযান বেয়েছি, মা ছিলেন আমার দাঁড়, বাবা বৈঠা। আজ আমি দেশ থেকে বহু দূরে, বিলেতে। পৃথিবীর এক ভিন্নরূপ খণ্ডে। সেও হয়ে গেল তিন দশকের বেশি। বাংলাদেশের শেখা বিদ্যেয় টেমসে বাইছি আমার নাও...। আজ ভাবি, সেদিন ওই সুন্দর যুগল—আম্মা আর আব্বা, আমার গা থেকে খসিয়ে দিয়েছিলেন বৈষম্যের খোসা। সে-ই ছিল আমার জীবনের প্রথম পাসপোর্ট।