Published : 10 Nov 2025, 01:39 AM
‘পেটে খেলে পিঠে সয়’—ছোটবেলা থেকেই আমরা এই প্রবাদ শুনে বড় হয়েছি। কিন্তু আজকের বাস্তবতায়, বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যেন এই প্রবাদটির উল্টো চিত্র দেখছেন। তারা ‘পেটে’ খাবার না পেলেও ‘পিঠে’ লাঠির আঘাত সইতে বাধ্য হেচ্ছেন।
দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যে আন্দোলনে নেমেছেন, সেটি শুরু হয়েছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে। তাদের তিনটি মৌলিক দাবি—সহকারী শিক্ষকদের বেতন ১০ম গ্রেডে উন্নীত করা, শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতি নিশ্চিত করা এবং চাকরির ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড প্রদান। এসব দাবি নতুন নয়; বহু বছর ধরে শিক্ষকরা ধৈর্যের সঙ্গে সেগুলো তুলে ধরেছেন, বিনিময়ে পেয়েছেন প্রতিশ্রুতি, কিন্তু দেখেননি বাস্তবায়ন।
কিন্তু গত ৮ নভেম্বর রাজধানীর শাহবাগে ঘটে যাওয়া ঘটনা সবকিছু বদলে দিয়েছে। শান্তিপূর্ণ মিছিলে হঠাৎ করেই নেমে আসে পুলিশি অভিযান—লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল, জলকামান, সাউন্ড গ্রেনেড! শতাধিক শিক্ষক আহত হন। আহত হয় শুধু তাদের শরীর নয়, আহত হয় আমাদের শিক্ষা, মানবিকতা ও সামাজিক সহাবস্থানের বোধও।
এরপর থেকেই শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে রাজপথে নেমেছেন। এবং পরের দিন ৯ নভেম্বরও একই কায়দায় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ননএমপিও শিক্ষকরাও, যারা দীর্ঘ দিন বেতন-ভাতা পান না, সরকারি সুবিধার আশায় দিন গুনছেন। যাদের হাতে শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব, তারা এখন নিজেদের ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদার জন্য লড়ছেন।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে ৬৫ হাজার ৫৬৭টি, শিক্ষক আছেন প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার। ফলে কর্মবিরতির প্রভাব পড়েছে সারাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায়। সরকার প্রধান শিক্ষকদের বেতন একধাপ বাড়ালেও সহকারী শিক্ষকরা প্রশ্ন তুলেছেন—একই প্রতিষ্ঠানে, একই দায়িত্বে থেকে বৈষম্য কেন? আন্দোলনরত সহকারী শিক্ষকদের সংগঠন ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। এর মধ্যে দাবি পূরণ না হলে তারা আরও কঠোর কর্মসূচিতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।
সরকার সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করেছিল। বৈঠকও হয়েছে দুই পক্ষের সঙ্গে, আশ্বাসও মিলেছে, কিন্তু কার্যকর সমাধান আসেনি। ফলে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে জেলা-উপজেলায়, স্থবির হয়ে পড়েছে শ্রেণিকক্ষ। শিক্ষা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সরকারের যুক্তি—সব দাবি একসঙ্গে মানা সম্ভব নয়, এতে বাজেটের ওপর চাপ পড়বে। কিন্তু শিক্ষকদের বক্তব্য স্পষ্ট—‘এটা শুধু টাকার প্রশ্ন নয়, এটা সম্মানে এবং মর্যাদার প্রশ্নও।’
শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে বলপ্রয়োগ নয়, বরং সহানুভূতি ও আলোচনার পথ খোলা রাখা—এটাই হওয়া উচিত সরকারের দায়িত্বশীল আচরণ। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও অতীতের মতো কঠোরতা দেখিয়েছে—যা অনাকাঙ্ক্ষিত ও অমানবিক।
সম্প্রতি বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরাও আন্দোলনে নেমেছিলেন। তাদের দাবি ছিল বাড়িভাতা, চিকিৎসা ও উৎসব ভাতা বৃদ্ধি এবং জাতীয়করণ। সরকার কিছু দাবি মেনে নেওয়ার পর তারা আন্দোলন স্থগিত করেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—শিক্ষকরা কেন বারবার রাজপথে নামছেন? উত্তরটি স্পষ্ট—দীর্ঘদিনের অবহেলা, প্রশাসনিক বৈষম্য, পদোন্নতির জটিলতা এবং ন্যায্য বেতন থেকে বঞ্চিত হওয়ার যন্ত্রণা।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা। পাঠদান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা পড়েছে চরম অনিশ্চয়তায়। পরীক্ষার প্রস্তুতি ব্যাহত হচ্ছে, মনোযোগ নষ্ট হচ্ছে। শিক্ষক আন্দোলনের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন নেই, কিন্তু এর সময় ও পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে সর্বত্র। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেই ছোট্ট শিশুরাই—যাদের ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব শিক্ষকদের কাঁধে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা সবেচেয়ে বেশি সমালোচিত হচ্ছে। শিক্ষকদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে পুলিশি হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষক মানে শ্রদ্ধার প্রতীক; তাদের সঙ্গে সহমর্মিতা না দেখিয়ে বলপ্রয়োগ করলে সংকট আরও গভীর হবে। এখন বড় প্রশ্ন—ক্লাসরুম ছেড়ে শিক্ষকরা কেন রাজপথে নামছেন? উত্তর সহজ নয়। শিক্ষকরা সাধারণত সংযত, দায়িত্বশীল মানুষ। তারা রাস্তায় নামেন তখনই, যখন তাদের আত্মসম্মান ক্ষতবিক্ষত হয়। এই আন্দোলনের পেছনে জমে থাকা ক্ষোভ, অবহেলা, বৈষম্য আর বঞ্চনার ইতিহাস কাজ করছে।
এই আন্দোলনের ঢেউ পৌঁছে গেছে শিক্ষার্থীদের ঘরেও। স্কুল বন্ধ, পরীক্ষা অনিশ্চিত—ফলে শিশুদের মানসিক চাপ বেড়েছে। অভিভাবকেরা দ্বিধায়—একদিকে শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি, অন্যদিকে সন্তানদের শিক্ষাজীবনের থেমে যাওয়া। এমন পরিস্থিতিতে তাই দেখা যাচ্ছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া—কেউ শিক্ষকদের পাশে, কেউ দ্রুত সমাধান চায় যেভাবেই হোক।
তবে এবারের আন্দোলনগুলোতে আছে এক নতুন দৃঢ়তা। শিক্ষক সংগঠনগুলো রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। তরুণ শিক্ষকরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সামাজিক মাধ্যমে সংহতির ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছে। এই ঐক্য সরকারকেও ভাবাচ্ছে, সমাজকেও নাড়া দিচ্ছে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের আন্দোলন প্রসঙ্গে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার বলেছেন, ‘সহকারী শিক্ষকরা ১৩তম গ্রেড থেকে এক লাফে ১০ম গ্রেডে যেতে চান, যেখানে এখন শুধু প্রধান শিক্ষকরা ১০ম গ্রেডে আছেন—এটা কতটা যৌক্তিক, তা নিজেরাই বিবেচনা করুন। আমার জানা মতে, সহকারী শিক্ষকদের এই দাবি পুরোপুরি যুক্তিসঙ্গত নয়।’
তবে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকার সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেড দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। বর্তমানে কর্মরত সহকারী শিক্ষকদের বেতন গ্রেড ১১ তম করলে বছরে অতিরিক্ত খরচ হবে প্রায় ৮৩২ কোটি টাকা। ভবিষ্যতে শূন্য ১৭ হাজারের বেশি পদে নতুন শিক্ষক নিয়োগ করা হলে অতিরিক্ত আরও ৫৫ কোটি ২০ লাখ টাকার মতো প্রয়োজন হবে।
জাতীয় বেতন স্কেলে ১০ম গ্রেডে শুরুর বেতন ১৬ হাজার টাকা। ১১তম গ্রেডে শুরুতে মূল বেতন ১২ হাজার ৫০০ টাকা, আর ১৩তম গ্রেডে একজন শিক্ষকের মূল বেতন হয় ১১ হাজার টাকা—এর সঙ্গে বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য ভাতা যুক্ত হয়।
কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে এমন মন্তব্য কোনোভাবেই সমাধানসূত্র হতে পারে না। উপদেষ্টা কিংবা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহলের উচিত শিক্ষক নেতাদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসা, তাদের উদ্বেগ ও যুক্তিগুলো শোনা, এবং বাস্তবতার আলোকে সমাধানের পথ খোঁজা। সংলাপ ছাড়া এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে তার দায় শিক্ষকদের মতো সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের ওপরও বর্তাবে।
কেউ কেউ বলছেন, পরীক্ষার আগে আন্দোলন শিক্ষার্থীদের জন্য বড় ধাক্কা; কেউ আবার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য খুঁজছেন। কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষকই বলছেন, ‘আমরা রাজনীতি করতে নামিনি, আমরা ন্যায্য প্রাপ্যের জন্য লড়ছি।’ এটা ভুলে গেলে চলবে না—শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ মানে জাতির ভবিষ্যতে বিনিয়োগ। শিক্ষকদের বঞ্চিত রাখলে যোগ্য মানুষ এই পেশা থেকে সরে যাবেন, যা দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেবে। তাই শিক্ষা খাতকে দেখতে হবে মানবসম্পদ উন্নয়নের মূল ভিত্তি হিসেবে।
শিক্ষকদের আন্দোলন আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে—শিক্ষকরা শুধু পাঠদাতা নন, তারা সমাজের ন্যায়বোধের কণ্ঠস্বর। তাদের আন্দোলন কেবল বেতন বা গ্রেডের দাবি নয়, এটি মর্যাদা ও সম্মানের প্রশ্ন। সরকারের উচিত এই আন্দোলনকে দমন না করে সংলাপ ও কাঠামোগত সংস্কারের সুযোগ হিসেবে দেখা।
আমরা মুখে শিক্ষকের মর্যাদার কথা বলি, কিন্তু বাস্তবে সেই মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হই। একজন শিক্ষক যে বেতন পান, তাতে তাঁর পরিবারের নিত্যপ্রয়োজন মেটানোই কঠিন—এ কথা আমরা জানি, তবু যেন দেখতে পাই না। সমাজে জ্ঞানদাতা এই শ্রেণি বছরের পর বছর অবহেলা ও বঞ্চনার মধ্যে বেঁচে আছেন। অন্য সরকারি কর্মকর্তা বা পেশাজীবীদের সঙ্গে তুলনা করলে বৈষম্যের ছবিটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কেউ বেশি সুবিধা পাবে, কেউ কম, আবার কেউ কোন সুযোগ সুবিধাই পাবেন না—এই অন্যায্য ব্যবস্থাই মানুষের মনে ক্ষোভ ও হতাশা জন্ম দেয়। মুখের কথায় নয়, বাস্তব পদক্ষেপেই শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা সম্ভব।
একটি জাতির উন্নয়ন নির্ভর করে তার শিক্ষাব্যবস্থার ওপর, আর শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি হলো শিক্ষক সমাজ। তাদের মর্যাদা রক্ষা করা মানে ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা রক্ষা করা। তাই সরকারের দায়িত্ব হবে আলোচনার মাধ্যমে ন্যায়সঙ্গত সমাধান বের করা, আর শিক্ষকদেরও দেখতে হবে যেন শিক্ষার্থীদের ক্ষতি সর্বনিম্ন হয়।
বলপ্রয়োগ নয়, সহানুভূতি ও যুক্তির মাধ্যমে যেকোনো আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। শিক্ষকরা অবুঝ নন—তাদের বোঝালে তারা বুঝবেন, যুক্তি মানবেন। তাই সরকারের পক্ষ থেকে এখন সবচেয়ে প্রয়োজন মানবিক ও সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি।