Published : 25 Nov 2025, 08:11 AM
“আপনারা বুকে হাত দিয়া বলতে পারবেন যে, বিএনপির কোনো লোক কি কোনো সময় গানের বিরুদ্ধে কথা বলে কি না? বিএনপির কোনো লোকজন গানবাজনার বিরুদ্ধে কোনো কথা বলে না। তো আমরা সামনে নির্বাচন। আমরা যেন একটু গানবাজনা করতে পারি, আপনেরা যেন গানবাজনা শুনতে পারেন, তার জন্য ব্যবস্থা আপনাগে করোন লাগবো না? সামনে ধীনের শীষ প্রতীকে আফরোজা খান রীতা আপার জন্য আমি আপনাদের কাছে দোয়া চাই। ভোট ভিক্ষা চাই। এর কারণ এটা যে, যদি আগামীতে এরা রাষ্ট্রক্ষমতায় না যাইতে পারে তাইলে দেশের…এমনিতনেই যে দুইশোর ওপর মাজার ভাইঙ্গা ফালাইচে আপনারা জানেন তো? দুইশোর ওপরে বাংলাদেশে মাজার ভাইঙ্গা ফালাইছে। এখন একটু বন্ধ হইছে। ক্যান বন্ধ হইছে? সামনে যে নির্বাচন। এখনও যদি মাজার ভাঙতে থাকি তাইলে তো আর ভোট পামু না। এইজন্য তারা এখন একটু জিরাইতেছে। নির্বাচন হয়ে গেলে যদি তারা ক্ষমতায় যায় আবার আমাগো বাড়িঘরসুদ্দা ভাঙ্গা শুরু করবো। খালি মাজার না। অতএব কারণে রীতা আপার জন্য আপনাদের সকলের জন্য দোয়া চাই এবং ভোট ভিক্ষা চাই, যাতে দেশের তরিতিকতপন্থি লোকেরা আমাদের গানবাজনা, আমাদের ওরশ-পার্বণ সবকিছু চালাইয়া যাইতে পারি।”
এ মাসের শুরুতে একটি গানের অনুষ্ঠানে এই কথাগুলো বলেছিলেন বাউলশিল্পী আবুল সরকার। এর ঠিক দুই সপ্তাহ পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় ধর্মীয় অবমাননার একটি মামলায়। যদিও বলা হচ্ছে, তার এই গ্রেপ্তারের পেছনে কোনো রাজনীতি নেই। বরং মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গত ৪ নভেম্বর মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার জাবরা এলাকায় খালা পাগলীর মেলায় পালাগানের আসরে আবুল সরকার ইসলাম ধর্ম ও মহান আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় ‘তৌহিদী জনতা’ তার ওপর ক্ষুব্ধ হয় এবং তাদের দাবির মুখে গত ১৯ নভেম্বর দিবাগত রাতে মাদারীপুরে একটি গানের আসর থেকে আবুল সরকারকে আটক করে মানিকগঞ্জ ডিবি পুলিশের একটি দল। পরদিন সকালে তাকে জেলা ডিবির কার্যালয়ে নেওয়া হয়। দুপুরে ঘিওর বন্দর মসজিদের ইমাম মুফতি মো. আবদুল্লাহ বাদী হয়ে আবুল সরকারকে আসামি করে ঘিওর থানায় একটি মামলা করেন। ওই মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে সন্ধ্যায় মানিকগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নেওয়া হলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গানের অনুষ্ঠানে আবুল সরকার “ইসলাম ধর্মের বিশ্বাসের অবমাননা করিয়া এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করিবার উদ্দেশ্যে কটূক্তি করে অবমাননামূলক অট্টহাসি দিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে উসকানি” দিয়েছেন।
আবুল সরকারের সহকারী শিল্পী রাজু সরকার সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, “আবুল সরকারের পালাগানের পুরো বক্তব্য প্রচার না করে একটি গোষ্ঠী তার বক্তব্য আংশিকভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করে পরিবেশ ঘোলাটে করছে। মহান আল্লাহ পাকের তিনটি সৃষ্টির মধ্যে কোনটি আগে করা হয়েছে—প্রতিপক্ষ বাউলশিল্পীকে এমন প্রশ্ন করেছিলেন আবুল সরকার। মহান আল্লাহকে নিয়ে কটূক্তি করেননি। ওই অনুষ্ঠানে মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন। ওই গোষ্ঠী ক্ষিপ্ত হয়ে আবুল সরকারের পালাগানের মন্তব্যের ভিডিওর খণ্ডিত অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করেছে।”
রাজু সরকারের বক্তব্যের সমর্থন মেলে আবুল সরকারের গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে পালা গানের রীতিনীতি নিয়ে লেখা কবি ও গবেষক সুমন রহমানের লেখাতেও। নৃতত্ত্বের এই শিক্ষক লিখছেন, “আবুল সরকার পালাগান করেছিলেন। তিনঘণ্টার এই পালার বিষয় ছিল জীব বনাম পরম। পালাগান হচ্ছে পাল্টাপাল্টি গান। দুটি চরিত্রের মধ্যে গানে গানে বিতর্ক হয়। জগতের গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিক তর্কগুলো লোকায়ত সমাজে আলোচনা করবার এটাই পাটাতন। যুগে যুগে।
“জীব বনাম পরমের এই দ্বৈতবাদী লড়াইয়ে বয়াতী আবুল সরকার জীবের পক্ষে পারফর্ম করেন। শুরুতেই তিনি ডিসক্লেইমার দিয়ে নেন। বলেন, আল্লার সাথে পাল্লা হয় না। তবু ঘটনাটা যেহেতু পালা গান, যুক্তি তাকে দিতে হবে। সেজন্য তিনি আগাম ক্ষমাও চেয়ে নেন।”
অন্যদিকে আবুল সরকারের শাস্তির দাবিতে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেছেন, তিনি আল্লাহর কোরানের বাণী বা সুরা ভুল পড়েন। তিনি সুরা শুদ্ধ উচ্চারণ করতে পারেন না। এমনকি সুরার ভুল ব্যাখ্যা করে ভক্তদের গানের মাধ্যমে তর্জমা করে থাকেন। তিনি নিজে পীর সেজে ভক্তদের ভুল পথে নিচ্ছেন।

সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বাউলদের ওপর আক্রমণের একটা ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, ‘তৌহিদী জনতা’ নামে একসঙ্গে অনেক লোক বাউলদের ধাওয়া করছেন। মারধর করছেন। লাথি মারছেন। বাউলদের একজন এই হামলাকারীদের আক্রমণ থেকে প্রাণ বাঁচাতে পানিতেও ঝাঁপ দিয়েছেন। এর মধ্যে টুপি পরা একজন লোককে এই ‘তৌহিদী জনতা’ প্রশ্ন করছে, আপনি মুসলমান না বাউল? তার মানে কি এই, মুসলমান হলে কেউ বাউল হতে পারে না আর বাউল হলে সে আর মুসলমান থাকে না?
বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতির একটি অংশ পালাগান ও বিচারগান। সংগীতের এই ধারার চর্চা করেন আবুল সরকার। বিচার গানের বিষয় প্রধানত শরিয়ত, মারিফত, নবীতত্ত্ব, আদমতত্ত্ব, রসতত্ত্ব, সৃষ্টিতত্ত্ব, নারীতত্ত্ব, যৌবনতত্ত্ব প্রভৃতি। এছাড়া নারী-পুরুষ, গুরু-শিষ্য প্রভৃতি বিষয় নিয়েও এ গানের প্রতিযোগিতা হয়।
লালন সাঁইয়ের অনেক গানেই ধর্মের অনেক বিষয়ে জটিল সব প্রশ্ন আছে। সেসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো পাণ্ডিত্য কথায় কথায় রাস্তায় নেমে যাওয়া অধিকাংশেরই নেই।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয়ভাবে লালনের স্মরণোৎসব পালিত হয়েছে, সেই সরকারের আমলেই বাউলশিল্পী আবুল সরকারকে গ্রেপ্তার করা হলো। বাউলদের ওপর আক্রমণ হলো। এই সরকারের আমলেই অসংখ্য মাজারে ভাঙচুর চালানো হয়েছে। কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। ধর্মের নামে এরকম ভয়াবহতা পৃথিবীর সবচেয়ে ‘অসভ্য’ রাষ্ট্রেও কল্পনা করা যায় না। অথচ এসব ঘটনার বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী সরকার যদি শুরু থেকেই শূন্য সহনশীল নীতি অবলম্বন করত, তাহলে এক বছরের বেশি সময় ধরে এসব ঘটতে পারত না।
আবুল সরকারের বিরুদ্ধে সমাজে দাঙ্গা সৃষ্টির অভিযোগ আনা হয়েছে। একজন শিল্পী ইচ্ছাকৃতভাবে সমাজে দাঙ্গা-হাঙ্গামা বা সহিংসতা সৃষ্টির প্ররোচনা দিয়েছেন, এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? যে বাউলরা অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনযাপনে অভ্যস্ত; যারা দীনহীন অবস্থায় চলাফেরা করেন—সমাজে দাঙ্গা সৃষ্টি করে তাদের কী লাভ? বরং শিল্প ও ধর্মকে গুলিয়ে ফেলে রাষ্ট্র যে সংগীতের একটি বিশেষ ঘরানার লোকজনের ওপর যে সহিংসতা চালানো হলো, সেটাই সন্ত্রাস। সেটাই হাঙ্গামা।
এবার একটু আবুল সরকারের ধর্মীয় অবমাননার বাইরে তার বক্তৃতার রাজনৈতিক অংশে নজর দেওয়া যাক। তিনি বিএনপির প্রশংসা করে বলেছিলেন যে, বিএনপির কোনো লোক গানের বিরুদ্ধে কথা বলে না। সুতরাং আগামী নির্বাচনে মানুষ যেন মানিকগঞ্জে বিএনপির প্রার্থী আফরোজা খান রীতাকে ভোট দেন। কারণ আবুল সরকার মনে করেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে তারা গানবাজনা করতে পারবেন। আর যদি অন্য কেউ ক্ষমতায় যায়, যারা মাজার ভেঙেছে, তারা বাউলদের বাড়িঘর ভেঙে ফেলবে। তার মানে আবুল সরকার নিজেদের নিরাপত্তার জন্যই বিএনপির জন্য ভোট চাইছেন।
প্রশ্ন হলো, বিএনপি কি সমাজের এই জনগোষ্ঠীর আবেগ, অনুভূতি ও ভীতি উপলব্ধি করছে বা করতে পারছে? মানিকগঞ্জের স্থানীয় বিএনপি কি আবুল সরকারের মুক্তির দাবি জানিয়েছে বা বাউলদের ওপর আক্রমণের প্রতিবাদ করেছে? করেনি। কারণ তারা হয়তো ভাবছে, এই ইস্যুতে ‘তৌহিদী জনতা’র বিরুদ্ধে দাঁড়ালে তাদের ভোট কমবে। অথচ বাউলদেরকে যদি সমাজের একটি প্রান্তিক গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেই গোষ্ঠীর একজন নেতৃস্থানীয় লোক তাদের প্রশংসা করার পরে যে আক্রমণের শিকার হলেন—তাতে বিএনপির মতো একটি বড় দলের ওপর যে দায়-দায়িত্ব বর্তায়, সেটির বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে বিএনপি ব্যর্থ হয়েছে, এ কথা বললে ভুল হবে না।
বিএনপি হয়তো এখানে কিছুটা বেকায়দায় আছে এই কারণে যে, তারা যদি ‘তৌহিদী জনতা’ পরিচয়দানকারীদের বিরুদ্ধে সরব হয় বা আবুল সরকারের গ্রেপ্তার ও বাউলদের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানায়, তাহলে ইসলামপন্থি দলগুলো বিএনপিকে ‘ইসলামবিরোধী’ আখ্যা দেবে—যা তাদের ভোট কমাবে। অন্যদিকে বিএনপি যে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বা হেফাজতে ইসলামের মতো কোনো ধর্মীয় দল নয়, বরং বিএনপি যে একটা মধ্যপন্থি রাজনৈতিক দল, সেটিও প্রমাণ করতে হচ্ছে। অর্থাৎ ধর্মীয় ইস্যুতে বিএনপিকে বরাবরই একটা শাঁখের করাতের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।
গত ১৫ নভেম্বর সম্প্রতি রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে খতমে নবুয়ত সংরক্ষণ কমিটির জনসভায় আহমদীয়াদের (খতমে নবুওয়তের ভাষায় কাদিয়ানিদের) রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার দাবি জানানো হয়। ওই সমাবেশে যোগ দিয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান জামায়াত ক্ষমতায় এলে কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা করবে, এটা স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন। তবে এই ইস্যুতে কিছুটা কৌশলী বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, তারা ক্ষমতায় গেলে কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণার বিষয়ে সংসদে আলোচনা হবে। আর এই দাবি আদায়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। কিন্তু তার এই বক্তব্য চলাকালীন মঞ্চের বাইরে থেকে আওয়াজ ওঠে যাতে সালাহউদ্দিন আহমদ এ বিষয়ে স্পষ্ট ঘোষণা দেন। তিনি এ বিষয়ে স্পষ্ট ঘোষণা না দিয়ে বলেছেন, “আপনারা যা শুনতে চান, সেটা আইনের ভাষা নয়।”
বাস্তবতা হলো, বিএনপি এখন ধর্মীয় তথা ইসলাম ইস্যুতে নানামুখী চাপে আছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, দলটির ওপর এই চাপ ততই বাড়তে থাকবে। রাজনৈতিক দ্বিধায় জর্জরিত বিএনপি এবং বাউলশিল্পী আবুল সরকারের গ্রেপ্তার যেন সেই বড় বাস্তবতার ছোট প্রতিচ্ছবি।