Published : 03 Aug 2025, 06:58 PM
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। সম্প্রতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যকার সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রতিনিয়ত হয়ে চলেছে। ২০২৫ সালে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো দেখায় যে, শিক্ষাঙ্গনে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার ভয়াবহ অবনতি ঘটেছে। শিক্ষকের ওপর শিক্ষার্থীদের হামলা, শিক্ষার্থীর ওপর শিক্ষকের নির্যাতন—এই দ্বিমুখী প্রবণতা আমাদের শিক্ষা-সংস্কৃতির ভিতকে বারবার প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত এক ঘটনায় শিক্ষক ও সাংবাদিকদের ওপর হামলা করে কয়েকজন শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ১২ জন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়। ক্যাম্পাসে নিন্দার ঝড় ওঠে, তবু এ ধরনের ঘটনা দেশে ক্রমাগত ঘটেই চলেছে।
সাম্প্রতিক নানা ঘটনার প্রেক্ষিতে শিক্ষকরা এখন শিক্ষার্থীদের পরামর্শ বা নির্দেশনা দিতেই ভয় পাচ্ছেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। শিক্ষকরা অনেকক্ষেত্রেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এটি ভীতি শুধু উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ নয়, প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় সবখানেই ছড়িয়ে পড়েছে। পরীক্ষার হলে দায়িত্ব পালনের সময়ও শিক্ষকরা আতঙ্কে থাকেন, কারণ কখনো কখনো শিক্ষার্থী বা অভিভাবকদের অযৌক্তিক অভিযোগের মুখোমুখি হতে হয় তাদের।
শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সময় গুরুত্বপূর্ণ বা সমসাময়িক বিষয় এড়িয়ে যাচ্ছেন, কারণ খুব নিরীহ মন্তব্যও কখনো ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে শিক্ষকদের সম্মানহানি হয়, এমনকি প্রশাসনিক জটিলতায় পড়তে হয়। এই ভয় ও অনিশ্চয়তার মাঝে একজন শিক্ষক কীভাবে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পাঠদান করবেন?
আমাদের সমাজে বাবা-মায়ের পরে শিক্ষকের স্থান—এই বিশ্বাসেই আমরা বড় হয়েছি। কিন্তু আজ শিক্ষকের অপমান ও লাঞ্ছনা যেন সাধারণ ঘটনা। এটি শুধু শিক্ষকের মর্যাদাই নয়, পুরো শিক্ষাব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকতা, সহনশীলতা ও নম্রতা কমছে। একইভাবে, কিছু শিক্ষকের আচরণও প্রশ্নের মুখে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রীর সঙ্গে আপত্তিকর আচরণের অভিযোগ ওঠে, যার জন্য তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এ ঘটনায় ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়ায়, শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হয়। কেউ প্রতিবাদ করে, কেউ সামাজিক মাধ্যমে হাস্যরস করে। এটি শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, সমাজের দায়িত্বশীলতার ঘাটতির প্রমাণ।
শিক্ষক হওয়ার যোগ্য নন, এমন লোকজনকে নিয়োগ দেওয়ার মতো ঘটনাও এই পরিস্থিতির জন্য কম দায়ী নয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষক নিয়োগে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সংসদ সদস্যের সুপারিশসহ এক প্রার্থীর প্রবেশপত্র ‘ভুলবশত’ সামাজিক যোগাযোগ প্রকাশ করে দিয়েছেন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন খান। ২ জুলাই রাত সাড়ে ১২টার দিকে উপ-উপাচার্যের ফেইসবুক স্টোরিতে প্রবেশপত্রটি প্রকাশিত হয়। পরে তা দ্রুত মুছে ফেললেও প্রবেশপত্রে সুপারিশকারীর নাম দেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। অথচ বলা হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগে কড়াকড়ি করা হচ্ছে।
পঞ্চগড়, গাজীপুর ও কোটালীপাড়ার স্কুল ও মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের ওপর শিক্ষকের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোথাও শিক্ষার্থীকে ক্লাসে অপমান করা হয়, কোথাও আবার লাঠিপেটাও করা হয়। এসব ঘটনা শিক্ষার্থীদের মনে ভয় ও ক্ষোভ তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতে আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এরকম পরিস্থিতি শিক্ষার পরিবেশকে আরও অস্থির করে তুলছে। পুরো শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার ভিত্তিতে গড়ে ওঠার কথা, কিন্তু এমনসব ঘটনা তা ভেঙে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত।
একদিকে শিক্ষকরা যেমন নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে রয়েছেন, অন্যদিকে শিক্ষার্থীরাও তাদের অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে গভীর সংশয়ে ভুগছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত দুর্বলতা যেমন, পর্যাপ্ত সিসিটিভি ক্যামেরার অনুপস্থিতি, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের অভাব, প্রয়োজনীয় শৃঙ্খলা রক্ষা বা দায়িত্বশীল ছাত্র উপদেষ্টা ও মানসিক পরামর্শ সেবার ঘাটতি রয়েছে, যা এই সমস্যাকে আরও গভীর করে তুলছে।
কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর প্রতিবাদ হলেও, তার সুষ্ঠু সমাধান হয় না। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সংঘাত ও বিশৃঙ্খলার কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। যেখানে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জনের পরিবেশ থাকার কথা, সেখানে ভয় ও অনিশ্চয়তা রাজত্ব করছে।
এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় অনেক শিক্ষকই মস্তিষ্ক শোষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তারা নিজেদের বিশ্বাস, ধ্যান-ধারণা, এবং মতবাদগুলো শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেন—যেন সেটাই একমাত্র সত্য এবং শিক্ষার্থীদের নিজের মতো করে ভাবার কোনো সুযোগই নেই।
ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীদের এমন পরিবেশে বড় হতে হয়, যেখানে স্বাধীনভাবে চিন্তা করা নয় বরং যা শেখানো হয়েছে তা-ই নিঃশর্তভাবে মেনে নেওয়া বাধ্যতামূলক—তখন তাদের চিন্তা-ভাবনার পরিসর সংকুচিত হয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ, অনেক শিক্ষার্থীই নিজেদের শেখা বা জানা বিষয়ে ভিন্নমত সহ্য করতে পারে না। তারা কোনো আলোচনা বা যুক্তির মুখোমুখি হলে সহজেই প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। এমনকি এই ধারণাটাও মেনে নিতে চায় না যে, তাদের জ্ঞান বা বিশ্বাস ভুল হতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও এই সংকটের প্রতিফলন স্পষ্ট। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে রাজনৈতিক মতাদর্শ বা দৃষ্টিভঙ্গির অমিল থেকেই সৃষ্টি হচ্ছে দূরত্ব, অবিশ্বাস এবং বিদ্বেষ। মুক্ত চিন্তার পরিবেশ যেখানে তৈরি হওয়ার কথা, সেখানে এখনো মতের অমিল মানেই বয়কট, হেয় প্রতিপন্ন করা বা দলবদ্ধভাবে আক্রমণ চালানো—এই চর্চা নতুন কিছু নয়।
এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে শিক্ষকদের নিজেদের ভূমিকা পুনর্বিবেচনা করতে হবে। তারা কি শিক্ষার্থীদের সত্যিকারের শিক্ষা দিচ্ছেন, নাকি নিজেদের চিন্তা চাপিয়ে দিচ্ছেন? শিক্ষার্থীদেরও প্রশ্ন তোলার সাহস গড়ে তুলতে হবে। যেখানে প্রশ্ন করার অধিকার নেই, সেখানে সত্য বলার সাহস জাগাতে হবে।
সমাজে এখনো অনেক শিক্ষক আছেন, যারা আমাদের অনুপ্রেরণা। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ঘটনায় শিক্ষক মেহরিন চৌধুরী ও মাসুকা বেগম নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে শিক্ষকতার আদর্শ প্রমাণ করেছেন। তারা দেখিয়েছেন, শিক্ষক শুধু পেশাদার নন, তিনি দেশ ও শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়বদ্ধ একজন পথপ্রদর্শক।
এই ধরনের শিক্ষকরা আমাদের মনে করিয়ে দেন, শিক্ষকতা কেবল একটি চাকরি নয়—এটি একটি আদর্শ, একটি ব্রত। একজন প্রকৃত শিক্ষকের শুধু নিজের কথা ভাবলে চলে না। তার কাজ হচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ এবং মানবিকতা শেখানো।
অন্যদিকে, পরিবার ও অভিভাবকদেরও এই পরিবর্তনের অংশ হতে হবে। বর্তমান সময়ে অনেক শিক্ষার্থীই শিক্ষকদের প্রাপ্য সম্মান দেখায় না। অনেক অভিভাবকও সন্তানের আচরণ সম্পর্কে উদাসীন। বরং উল্টো শিক্ষকের প্রতিই অভিযোগ তুলে বসেন। অনেকেই বলেন, “আগে এমন ছিল না, এখন আর ওই দিন নেই যে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের কথা শুনবে। এখন শিক্ষার্থী হলো ক্লায়েন্ট।”
শিক্ষার্থী হলো শিক্ষকের ‘ক্লায়েন্ট’—এমন মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষক—উভয়েরই সম্মান ও মর্যাদা আছে। সমাজে মূল্যবোধ ধরে রাখতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা জরুরি।
শিক্ষকদের দায়িত্বশীল হতে হবে, আর অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও নাগরিক হিসেবে আমাদের শিক্ষকদের সম্মান রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। শিক্ষার্থীদের প্রতি অমানবিক আচরণ যেমন অগ্রহণযোগ্য, তেমনি শিক্ষকের প্রতি অবমাননা বা হুমকিও কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না।
এই সংকটের সমাধান পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে সম্ভব। শিক্ষক হবেন শিক্ষার্থীদের চিন্তার পথপ্রদর্শক, আর শিক্ষার্থীরা হবেন শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায় তাদের অনুসারী। তবেই গড়ে উঠবে একটি আলোকিত, মানবিক ও মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজ।