Published : 02 Apr 2026, 02:08 PM
কিছু কথা এতদিন বলা যায়নি। কেন বলা যায়নি? এক কথায় উত্তর দেওয়া সহজ নয়। শুধু বলব, সবার মনের মধ্যে একটা উৎকণ্ঠা ছিল। মনে হতো কিছু কথা বলা বোধ হয় ঠিক হবে না। বলতে গিয়ে কোথায় কোন বিপদ হয় এমন ভাবনাও ছিল।
এখন কি সেই উৎকণ্ঠা নেই? সেটা বলাও কঠিন; নতুন সরকার এসেছে এই তো মাত্র সেদিন। যেহেতু নতুন সরকারের মন্ত্রীরা কিছু বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন যা আগে কেউ বলত না, তাই এখন সম্ভবত এই বিষয়গুলো খোলা মনে আলোচনা করা যেতে পারে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘মব কালচার শেষ।’ নতুন সরকারকে বিশ্বাস করেই আমাদের যাত্রা শুরু করতে হবে। এই বিশ্বাস কতদিন টিকবে, সেটাও দেখার বিষয়। বিএনপির কয়েকজন মন্ত্রীকে ধন্যবাদ দিতে হয়; তারা নিজেরা এসব আলোচনা করায় আমাদের মুক্ত চিন্তা প্রকাশের আগ্রহ আরও বেড়েছে।
মুক্তিযুদ্ধই স্বাধীনতার মূল ভিত্তি
জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম) একুশের দিনে বলেছিলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধই বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল ভিত্তি। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে অন্যান্য আন্দোলন-সংগ্রামকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। স্পিকার তখন ছিলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রাজনৈতিক অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সেদিন আরও বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং চেতনার এত বেশি অপব্যবহার হয়েছে যে, এর ফলে তরুণ প্রজন্ম সঠিক ইতিহাস জানা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা কী অসীম ত্যাগ ও তিতিক্ষার মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছেন, তা আমাদের নতুন প্রজন্মের অনেকেরই অজানা। আমাদের মনে রাখতে হবে, মুক্তিযুদ্ধই এই রাষ্ট্রের জন্মের মূল ভিত্তি।”
জুলাই আন্দোলন আমাদের একটা সরকারের ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন থেকে মুক্তি দিয়েছে, আর একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রাম আমাদের দেশকে মুক্তি দিয়েছে পাকিস্তানি ভৌগোলিক দখল ও হত্যাযজ্ঞ থেকে। জুলাই আন্দোলনকারীরা আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস জানে না বলেই তারা একাত্তর ও চব্বিশকে গুলিয়ে ফেলেছিল। তারা বিভিন্ন সময় বলেছে—জুলাই হলো প্রকৃত স্বাধীনতা, জুলাই আমাদের দ্বিতীয় স্বাধীনতা এবং জুলাইয়ের মধ্য দিয়েই গড়তে হবে দ্বিতীয় রিপাবলিক। আন্দোলনকারী ছাত্রদের দোষ দিয়ে লাভ নেই, মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের জন্ম হয়নি।
প্রতিটি সরকারের সময় আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে দলীয়করণ করা হয়েছে; তাই কেউ এসব ইতিহাস পড়তে চায়নি। এ দেশের তরুণ সমাজকে মুক্তিযুদ্ধের নির্ভুল ইতিহাস জানানো হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মুক্তিযুদ্ধের অনেক ঘটনা তরুণরা জামায়াতে ইসলামীর বয়ানে শুনেছে। যেমন—চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম দাবি করেছেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আগে মুজিব বাহিনী যে গণহত্যা চালিয়েছিল, তার প্রতিক্রিয়ায় ২৫ মার্চে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নামিয়ে ক্র্যাকডাউন করা হয়েছিল।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের ‘রিসেট বাটন’ নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন তিনি একাত্তরের স্বাধীনতা রিসেটের কথা বলেছেন; যদিও তার প্রেস সেক্রেটারি তখন ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন, অধ্যাপক ইউনূস দুর্নীতি রিসেট করার কথা বলেছেন। কিন্তু তার আমরা কতটা দুর্নীতি মুক্ত হয়েছি, তা নিয়ে এখন আলোচনা হচ্ছে। তবে দুর্নীতি যতটা না রিসেট হয়েছে, তার চেয়ে বেশি মুছে ফেলা হয়েছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে। যে বাড়িটাতে বসে লেখা হয়েছিল ‘ছয় দফা’ এবং ‘সাতই মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণা’, সেই বাড়িটা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকে অবমাননা করার প্রতিবাদ করেছিলেন বিএনপির আরেকজন নেতা, অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান। তিনি তার জীবনের ওপর তীব্র ঝুঁকি নিয়ে এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন করে মুক্তিযুদ্ধের বীর যোদ্ধাদের অপমান করায় এনসিপি নেতাদের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। তাকে নতুন সংসদে নির্বাচিত করে জনগণ তার সাহস ও আদর্শকে স্বাগত জানিয়েছে। আজ আমরা জোর গলায় বলতে পারি—কেউ মুক্তিযুদ্ধকে মুছে দিতে পারবে না এবং ‘মুক্তিযুদ্ধই বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল ভিত্তি।’
রাজনীতিকরা বিদেশি ভাষা কেন আমদানি করেন?
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা করার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তা নিশ্চয়ই আমাদের মির্জা গালিব, মুন্সী প্রেমচাঁদ বা ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের সাহিত্য পড়ানোর মতো সৎ উদ্দেশ্যে ছিল না। তার উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক—আমাদের মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়া। আইয়ুব-মোনায়েম আমলে শুরু হয় বাংলা ভাষাকে ‘মুসলিমায়ন’ করার প্রকল্প। সরকারি মিডিয়াগুলোতে ক্রমান্বয়ে বাংলা শব্দ পরিবর্তন করে উর্দু, ফারসি ও আরবি শব্দ ব্যবহার শুরু হলো। ‘সংবাদ’ হয়ে গেল ‘সমাচার’, ‘অফিস’ হলো ‘দফতর’, ‘উপস্থাপনা’ হলো ‘পেশ’, ‘উড়োজাহাজ’ হলো ‘হাওয়াই জাহাজ’, ‘ভাষা’ হলো ‘জবান’, ‘আদেশ’ হলো ‘হুকুম’ ইত্যাদি। পাকিস্তানিদের এই বিদেশি শব্দ আমদানির উদ্দেশ্য কি বাংলা ভাষার সমৃদ্ধিকরণ ছিল?
মুঘল ও সুলতানি আমলে প্রশাসনিক কাজে অনেক অবাঙালি কাজ করতেন; তাদের মাধ্যমে খুব স্বাভাবিকভাবে প্রচুর ফারসি ও আরবি শব্দ বাংলা শব্দভাণ্ডারে ঢুকে পড়েছে। আমাদের সাহিত্যিকরাও বিদেশি শব্দের বিস্তর ব্যবহার করেছেন এবং এর ফলে ভাষা সমৃদ্ধ হয়েছে, অনেক বিদেশি শব্দই স্বাভাবিক বিবর্তনে বাংলা ভাষাকে মহিমান্বিত করেছে। সেগুলো আমাদের সংস্কৃতি বা ইতিহাসকে বিকৃত করার উদ্দেশ্যে আসেনি, যেভাবে চেষ্টা করা হয়েছিল পাকিস্তানি আমলে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, “বাংলাকে যদি ধারণ করতে হয়, বাংলা ভাষাকে যদি মায়ের ভাষা বলতে হয়, তাহলে ইনকিলাব জিন্দাবাদ চলবে না। এগুলোর সঙ্গে বাংলার কোনো সম্পর্ক নেই। যারা আমাদের মায়ের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল, এগুলো তাদের ভাষা।” যখন ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ এ দেশের তরুণরা উচ্চারণ করা শুরু করল, তখন অনেকেই হিমশিম খেল এর অর্থ বুঝতে। আর ‘জিন্দাবাদ’ শব্দটি পাকিস্তানিরা চলে যাওয়ার পর এ দেশে প্রায় অপ্রচলিত হয়ে গিয়েছিল।
জামায়াতে ইসলামীর ইফতারে অতিথি ছিলেন এনসিপি নেতা নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী। এক পোস্টে তিনি জানিয়েছেন কীভাবে অন্যান্য অতিথিদের সঙ্গে ‘মুসাফাহ করার চেষ্টা’ করেছেন। এভাবে অনেক বিদঘুটে শব্দ আমদানি করা হচ্ছে ভাষাকে দূষিত করার জন্য। মাওলানা মওদুদীর বইপুস্তক থেকে জামায়াতে ইসলামীর অনেক শব্দ আনতে চায়। মওদুদী তার অনেক লেখায় ‘ইনকিলাব’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন, বিশেষ করে ‘ধর্মীয় বিপ্লব’ বর্ণনায়। আশ্চর্যের কিছু নেই যখন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান তার ফেইসবুক স্ট্যাটাসে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ব্যবহার করেন। আমাদের দেশ ও ভাষার প্রতি জামায়াতের বৈরিতা ঐতিহাসিক সত্য; কিন্তু আমাদের তরুণরা সেগুলো আত্মস্থ করছে কেন? ভাষা নিয়ে ভাষাবিদরাই ভালো বলতে পারবেন। আমরা শুধু রাজনৈতিক কারণে ভিন্ন ভাষাকে এনে আমাদের ভাষাকে পর্যুদস্ত করার প্রচেষ্টাকে তুলে ধরতে চেয়েছি।
ফুল দিয়ে সম্মান: রিকশাওয়ালা বনাম সরকার প্রধান
২০২৫ সালে ১৫ অগাস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে মবের শিকার হন রিকশাচালক আজিজুর রহমান। পরে তাকে ধানমন্ডি থানা-পুলিশে সোপর্দ করা হয়। আজিজুর রহমানকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়ের একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছিল পুলিশ। আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। কাঁদতে কাঁদতে রিকশাচালক বলছিলেন, “আমি বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছি ভাই। আমি একটা ফুলের তোড়া কিনছিলাম শাহবাগ থেকে ৪০০ টাকা দিয়ে ভাই, আমার বহুত কষ্টের টাকা। আমি সারাদিনে এই টাকাটা ইনকাম করছি। আমি শুধু বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসি। আমি কোনো রাজনীতি বা দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত না ভাই।”
কিন্তু একজন গরিব রিকশাওয়ালার আর্তি এই দেশে কে শোনে? প্রিয় মানুষকে শ্রদ্ধা জানাতে যাওয়াই ছিল তার অপরাধ। ইউনূস আমলে সরকারের রীতি অনুযায়ী যারা আজিজুরের ওপর মব করেছে, তাদের কোনো শাস্তি হলো না; বরং আজিজুরকেই জেলে যেতে হলো। তার পরের দিনই পত্রিকায় খবর বের হলো—সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জন্মদিনে ফুল পাঠিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। খালেদা জিয়া তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, তাকে অধ্যাপক ইউনূস শ্রদ্ধা জানাতেই পারেন। কিন্তু একজন রিকশাওয়ালার কি অধিকার ছিল না বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুদিবসে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর? বাংলাদেশের স্বাধীনতার অগ্রদূত শেখ মুজিবের প্রতি ইউনূস সরকারের বৈরিতা এই দেশে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক