Published : 08 Oct 2025, 01:05 PM
জাতিরাষ্ট্রের ধারণা একসময় ছিল মুক্তির স্বপ্ন—নিজস্ব সংস্কৃতি, ভাষা, বিশ্বাস ও নিরাপত্তার ছায়াতলে মানুষ বাঁচবে, এমন ধারণার প্রকাশ। ইসরায়েলের মতো রাষ্ট্রের উত্থান দেখাচ্ছে সেই স্বপ্ন কিভাবে ভয়, আধিপত্য ও আত্মপ্রবঞ্চনায় পরিণত হতে পারে, যেখানে এককালের নির্যাতিতরা নির্যাতক রূপে আবির্ভূত হয়। ইসরায়েল হচ্ছে জাতিরাষ্ট্রের ভয়ঙ্কর পরীক্ষাগার—যে রাষ্ট্র আমাদের দেখিয়ে দিচ্ছে মানুষ জ্ঞানবিজ্ঞানে অনেক উন্নতি লাভ করলেও মনমানসিকতায় এখনও অনেকাংশে গুহাযুগের অধিবাসী। আজও ক্ষুদ্র গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষাতেই সে প্রাণপাত করে থাকে।
বেঁচে থাকার সংগ্রামে অতীতে ক্ষুদ্রগোষ্ঠীবোধ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু পরবর্তী বিকাশের জন্য তা হয়ে ওঠে একটা শৃঙ্খলও। তাই গোষ্ঠীর ঊর্ধ্বে আইনকানুন নির্ভর সমাজ গড়ে উঠেছে। আরও উন্নত হয়ে তাকে গঠন করতে হয়েছে রাষ্ট্র–যার মুখ্য উদ্দেশ্য পূর্ণাঙ্গ মানুষ হয়ে উঠবার পথ তৈরি। রাষ্ট্রের সাফল্য নির্ভর করে এই পূর্ণাঙ্গ মানুষ তৈরি করার কাজে তার ভূমিকা কত সার্থক হয়েছে তার ওপর।
অর্থাৎ কোন রাষ্ট্র কতখানি সফল তা প্রমাণ হয় কোন রাষ্ট্র এই মনুষ্যত্বের বিকাশের জন্য কতখানি সহায়ক হয়েছে তা দিয়ে। রাষ্ট্র যদি কেবল সম্পদের পাহাড়ই তৈরি করে, অথচ তার ন্যায়সঙ্গত বণ্টন নিশ্চিত না করে তবে তাকে সফল বলার কোনো কারণ নেই। আমেরিকা ও ইসরায়েল সম্পদের পাহাড় তৈরি করলেও মনুষ্যত্বের বিকাশের সূচকে ইউরোপের অনেক রাষ্ট্রের চেয়ে পিছিয়ে। ইসরায়েল যুদ্ধবাজ হিসেবে আজ পৃথিবীতে সেরা, কিন্তু বিশ্বপরিবারে বসবাসের অযোগ্য হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছে।
রাষ্ট্রসমূহের যোগ্যতা পরিমাপের নানরকম সূচক পৃথিবীতে আবিষ্কার ও তার ব্যবহার হয়ে চলেছে–যেমন জিডিপি, মানব উন্নয়ন সূচক ইত্যাদি। অর্থাৎ সব রাষ্ট্র সমান নয়, তারা বিকাশের ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ে অবস্থান করছে। আর সে পর্যায়ও একেক মাপকাঠিতে একেকরকম। যদি গুহা মানসিকতা বা গোষ্ঠী মানসিকতা দিয়ে মাপা হয় তাহলেও রাষ্ট্রগুলোর একটার শ্রেণিবিন্যাস করা যাবে। সেক্ষেত্রে ধারণা করি উন্নতির অন্যান্য মাপকাঠিতে জাতিরাষ্ট্রসমূহ পিছিয়ে পড়বে, সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে পড়বে যাদের জাতীয়তার ভিত্তি কোনো ধর্ম বা বিশ্বাস।
মানুষের ধর্ম তাকে নৈতিকতা, সহিষ্ণুতা ও আত্মসমালোচনার পথে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ইতিহাস দেখায়–যখনই ধর্মকে রাজনৈতিক প্রকল্পে রূপ দেওয়া হয়, তখনই সেটি ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। ইহুদি ধর্ম হাজার বছরের এক আধ্যাত্মিক পরম্পরা, যা মানুষ ও ঈশ্বরের সম্পর্ক, ন্যায় ও দায়িত্বের কথা বলে; কিন্তু ইহুদী ধর্ম থেকে জন্ম নেওয়া জায়নবাদ সেই বিশ্বাসকে জাতিগত আধিপত্য ও রাষ্ট্রীয় আগ্রাসনের হাতিয়ারে পরিণত করেছে। একইভাবে, হিন্দু ধর্ম ছিল এক বহুত্ববাদী ও সহনশীল জীবনদর্শন–যেখানে ভিন্নতার মধ্যেও ঐক্যের সন্ধান করা হত। বিনায়ক দামোদর সাভারকর প্রবর্তিত হিন্দুত্ববাদ সেই ঐতিহ্যকে সংকীর্ণ জাতিকেন্দ্রিক রাজনীতিতে রূপান্তর করেছে, যেখানে–অন্য ধর্মাবলম্বীকে নাগরিক নয়, শত্রু হিসেবে দেখা হয়। ধর্ম যখন মানুষকে এক করে, তখন সে মুক্তি দেয়; কিন্তু ধর্মের নামে যখন রাজনীতি মানুষকে বিভক্ত করে, তখন তা কেবল দখল আর দমন শেখায়। বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই, বাঙালি বা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ দেশের একাংশে আগুন জ্বালাচ্ছে এবং দেশজুড়ে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুকে রাখছে নিপীড়নের মধ্যে।
আধুনিক কালে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাকে ধর্মীয় জাতীয়তার একটু ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া যায় হয়তো। আরও ঊর্ধ্বে আইনভিত্তিক রাষ্ট্র যেখানে আইন অবশ্যই ধর্ম-বর্ণ-ভাষা নিরপেক্ষ। যেসব রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সমতাভিত্তিক আইনকানুনের বদলে ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ইত্যাদি পরিচয়ের প্রধান মাপকাঠি হবে তারা রাষ্ট্র হিসেবে সামরিকভাবে শক্তিশালী, অর্থনৈতিকভাবে ধনী ও সাংস্কৃতিকভাবে সর্বগ্রাসী হতে পারে, মনুষ্যত্ব বিকাশের জমিন হিসেবে ব্যর্থ প্রমাণিত হবে।
ইসরায়েল ইহুদিদের নিয়ে গঠিত একটি জাতিরাষ্ট্র। বিশ্বব্যাপী নির্যাতিত ইহুদিদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র কায়েমের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এর গোড়ায় ছিলো একটি ট্রাইবাল বা গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষার মানসিকতা যা বৈশ্বিক স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিতে কুণ্ঠা করে না। এর কারণ তাদের ভিক্টিমহুড–নির্যাতিত হতে হতে একটি স্থায়ী নির্যাতিত পরিচয় তৈরি যা নির্যাতক হওয়ার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। নির্যাতন (কু)সংস্কৃতির একটি সত্য হল তা নির্যাতিতকে একসময় নির্যাতকে রূপান্তর করতে পারে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে হলোকাস্টের শিকার ইহুদিরা তাই একদিকে গাজায় গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে নির্যাতিতের বা ভিক্টিমহুডের অভিনয় করে চলেছে। জাতিরাষ্ট্র ইসরায়েল তৈরির মাঝেই রয়েছে এই সংকটের বীজ। আরও ভয়ঙ্কর হচ্ছে এই জাতিরাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত হচ্ছে ইহুদি ধর্ম যার রাজনৈতিক নাম জায়নবাদ।
বহু জাতি, ধর্ম ও ভাষার দেশ ভারতে এর নাম হিন্দুত্ববাদ। সেখানেও একটি ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র গড়ে তোলার উদ্যোগ চরমরূপ লাভ করেছে। অভিবাসীদের রাষ্ট্র আমেরিকায় এখন তা শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টান ধর্মভিত্তিক পরিচয় যার অন্যতম প্রতিভূ ট্রাম্প। তার মানে অবশ্য এই নয় যে, জাতিরাষ্ট্রের ধারণামাত্রই খারাপ। পৃথিবীর ইতিহাসে জাতিরাষ্ট্রবোধের উল্লেখযোগ্য অবদান আছে। বিশেষ করে বিংশ শতাব্দীতে অনেকগুলো ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের স্বাধীনতা লাভে। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা তো বটেই। কিন্তু সবক্ষেত্রেই জাতিরাষ্ট্রের ধারণাটি একটি সংকটও তৈরি করেছে যার মীমাংসা হয়নি, বরং নতুন নতুন সংকট তৈরি করে চলেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকটি ছিল একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। এ ব্যাপারে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছেন, ”পূর্ববঙ্গে ভাষাকে ভিত্তি করে একটা নতুন সমাজ গড়বার সম্ভাবনা রয়েছে। ভাষা বলছে ঐক্যবদ্ধ হতে, এবং ভাষাই বলে দিচ্ছে কিভাবে তা সম্ভব হবে, শ্রেণী ও সম্প্রদায়ের বিভাজনকে ভেঙে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলে।” (বাঙালীর জাতীয়তাবাদ, পৃ. ৪৮, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ঢাকা, ২০১৫)
কিন্তু ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্রবিকাশের যে অমিত সম্ভাবনা ছিল তা দুর্ভাগ্যক্রমে অঙ্কুরেই চাপা পড়েছে বাংলা ভাষাভিত্তিক স্বাধীন বাংলাদেশে। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলায় যে বীজ রোপিত হয়েছিল তা পূর্ণ বিকাশের সুযোগ পায়নি। স্বাধীন বাংলাদেশে বাংলা ভাষাটাই বিকাশের স্বাধীনতা পেল না। বাংলা এখনও চাষাভুষা, শ্রমিক, গরিব মানুষ আর কিছু কবিলেখকের ভাষা মাত্র–উচ্চশিক্ষার, ব্যবসাবাণিজ্যের, রাষ্ট্রীয় উচ্চ কর্মকাণ্ডের ও আত্মপরিচয় তুলে ধরবার ভাষা হয়ে ওঠেনি। সমাজে উন্নতিসিঁড়ির যত উচ্চ ধাপে একজন উঠতে থাকে বাংলা ততই তার কাছে অপাংক্তেয় হয়ে উঠতে থাকে, ততই সে ইংরেজ হওয়ার কসরৎ করতে থাকে। বাংলা ভাষা তার আত্মবিকাশের মাধ্যম হয় না, হয়ে উঠতে থাকে কেবল একতারা, লুঙ্গি, ভর্তা, মাটির সানকির মত একটা স্মৃতি মাত্র। ফলে বাংলাদেশে বিদ্যমান আরো সব ভাষার দিকে নজর দেওয়ার সুযোগ হয়নি এই জাতি রাষ্ট্রটির।
অনেক প্রগতিশীল ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্রিক বোধও একসময় জাতিরাষ্ট্রের অনিবার্য সংকটের মধ্যে পড়ে যেতে পারে–কেননা বাংলাদেশে বাংলা ভাষা ছাড়া আরও অনেকগুলো ভাষা ও ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের বাস রয়েছে। সংবিধানে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অধিষ্ঠান তাই অন্য ভাষাভাষী মানুষের ও গোষ্ঠীর মনে বঞ্চনার বোধ তৈরি করে। তবে বাংলা ভাষাই তো এখানে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পায়নি, বরং কার্যত রাষ্ট্রের ভাষা হয়ে ওঠার পূর্বেই তা ভাষিক আধিপত্যের এক প্রতীক হয়ে উঠেছে। আর ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে বর্তমানে যে উত্থান দেখা যাচ্ছে যা একটি ধর্মীয় পরিচয়কে জাতিরাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে দাঁড় করাতে চেষ্টা করছে, তা সংকটকে দূর করার বদলে আরও বাড়িয়ে তুলছে। আর দেখা যাচ্ছে আক্রমণের শিকার হচ্ছে অন্য আরেক মুসলমানই, সঠিক পথে নেই বলে। পথের সঠিকতা-বেঠিকতা নির্ধারণ করছে যে, বিচারও করছে সে, আবার শাস্তিও দিচ্ছে সেই!
এই গোষ্ঠীমানসিকতার জাতীয়তাবোধ যা তৈরি করে তা হলো দেশব্যাপী বিভক্তি ও দখলের প্রবণতা। ধর্ম ও ভাষা ছাড়াও চুল-দাড়ি, নারীর পোশাক, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি যে কোনো সামান্য পার্থক্যই কিছু মানুষকে মুহূর্তে গোষ্ঠীবদ্ধ করে ফেলে ও আক্রমণাত্মক করে তোলে। একদিকে বিশ্বায়নের বদৌলতে সে সকল অপরিচিত বিদেশি পোশাক, আচরণ, ভাষাভঙ্গি, অপসংস্কৃতি ধারণ করতে থাকে, অন্যদিকে প্রতিবেশীর জীবনযাপনের সামান্য ভিন্নতাও তাকে শত্রুভাবাপন্ন ও মারমুখী করে তোলে। আক্রমণের পৈশাচিক আনন্দে তখন উন্মত্ত হয়ে উঠতে পারে কেউ কেউ।
অবশ্য পারে কেবল তখনই যখন সে নিশ্চিত হয়ে যায় রাষ্ট্রের চোখ বুঁজে থাকার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে। রাষ্ট্রে দিকনির্দেশনার কম্পাস সামান্য নড়তেই বিরাট জনদেহে বার্তা পৌঁছে যায়। ক্ষুদে গোষ্ঠীবদ্ধতা ও তাদের অসহিষ্ণুতা বাড়তে থাকে। জাতীয় সঙ্গীত কার লেখা তাও লাঠালাঠির একটা মৌলিক কারণ হয়ে উঠতে পারে যেন এর ওপরই নির্ভর করছে রাষ্ট্রের সকল উন্নতি ও জনজীবনে চালের দাম থেকে ট্র্যাফিক জ্যাম পর্যন্ত সব সমস্যার সমাধান। গালিভার’স ট্র্যাভেলসের লেখক জোনাথন সুইফট জানতেন ডিম মোটা দিক না চিকন দিক দিয়ে ভাঙতে হবে তাও একটা গৃহযুদ্ধের কারণ হয়ে উঠতে পারে। অমর্ত্য সেন তার ‘আইডেন্টি অ্যান্ড ভায়োলেন্স’ বইতে কৌতুকছলে বলেছেন, আত্মপরিচয় এমন ক্ষুদ্রত্বে গিয়েও ঠেকতে পারে যখন জুতার সাইজের নাম্বারও হয়ে উঠতে পারে কারো গোষ্ঠী পরিচয় ও গোষ্ঠী যুদ্ধের কারণ।
এক আন্তর্জাতিকতাবোধ, মানুষের বৈশ্বিক পরিচয়, বৈচিত্র্যের মাঝে প্রেম ও ঐক্যই কেবল হতে পারে নাগরিকত্বের সত্যিকার পরিচয়। ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে, লালন বলে জাতের কি রূপ দেখলাম না এই নজরে ...।’ আমাদের আন্তর্জাতিকতা আছে লালনে, রবীন্দ্রনাথে, নজরুলে... সর্বত্র। বিশ্বের আকাশ থেকে ক্ষুদ্রত্বের এই মেঘ কেটে যাবে অচিরেই আশা করি।