Published : 02 Feb 2026, 01:03 PM
ঢাকার একটি চায়ের দোকানে তিনজন মধ্যবয়সী লোক মোবাইলে একটি ভিডিও দেখছিলেন। স্ক্রিনে একজন পরিচিত রাজনৈতিক নেতা কথা বলছেন—তার কণ্ঠ, মুখের ভাব, বলার ধরন সবই হুবহু আসলের মতো। কিন্তু কথাগুলো? সেগুলো তিনি কখনো বলেননি। ভিডিওটি তৈরি হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে। দোকানের মালিক জানেন না এটা ভুয়া। ইতিমধ্যে ভিডিওটি হাজার হাজার বার শেয়ার হয়েছে।
১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, এমন ঘটনা বাড়ছে। প্রযুক্তির অপব্যবহার শুধু প্রচারণার কৌশল নয়—এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভিত্তিতে আঘাত হানছে। ১২ কোটি ৭০ লাখ ভোটার যখন ব্যালট বাক্সের সামনে দাঁড়াবেন, তখন তারা কি সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করতে পারবেন?
গত দুই মাসে সোশ্যাল মিডিয়ায় যা ঘটেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দ্য ডেইলি স্টারের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে জানুয়ারির মাঝামাঝি মাত্র এক মাসে ৯৭টি এআই জেনারেটেড বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ছড়িয়েছে। এগুলো এসেছে ৬১৫টি পর্যবেক্ষণাধীন পেইজ ও প্রোফাইল থেকে। কিছু কনটেন্ট এক রাজনৈতিক ধারার সমর্থকদের কাছ থেকে, কিছু অন্য ধারা থেকে। এটা শুধু শনাক্ত হওয়া কনটেন্টের সংখ্যা; শনাক্ত না হওয়াগুলোর হিসেব কারও কাছে নেই।
প্রতিটি কনটেন্টের উদ্দেশ্য একই, ভোটারদের মন পরিবর্তন করা। রাজনৈতিক নেতাদের মুখে ভুয়া বক্তব্য বসানো হচ্ছে, ছবি বিকৃত করা হচ্ছে, কণ্ঠস্বর নকল করে অডিও তৈরি হচ্ছে। এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো সাধারণ মানুষ প্রথম দর্শনে বুঝতে পারেন না এটা ভুয়া। ফলে বিভ্রান্তি ছড়ায় দ্রুত।
এই অপব্যবহারের শিকার হয়েছেন দেশের শীর্ষ নেতারাও। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে এক ডিপফেইক ভিডিওতে তিনি জুয়া খেলার আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন, এমনটাই দেখানো হয়েছে। তার প্রেস উইং জানিয়েছে, জুয়ার সাইটগুলো বাংলাদেশি ব্যবহারকারীদের টার্গেট করে এমন ভুয়া ভিডিও ছড়াচ্ছে, যা দেখতে সংবাদ রিপোর্টের মতো, কিন্তু আসলে জুয়ার ফাঁদ।
বিরোধী দলের এক শীর্ষ নেতাকে নিয়েও একাধিক ডিপফেইক ভিডিও তৈরি হয়েছে। একটিতে তিনি গাজা ইস্যুতে নীরব থাকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের মন রক্ষার পরামর্শ দিচ্ছেন, এমন দেখানো হয়েছে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে এমন বিষয় অত্যন্ত সংবেদনশীল। ফ্যাক্ট ওয়াচ ও ডিসমিসল্যাব এগুলোকে ডিপফেইক হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
আরও উদ্বেগজনক হলো নারী রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে এই প্রযুক্তির ব্যবহার। ২০২৪ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুল্লাহ নাহিদ নিগার ও বিউটি বেগম ডিপফেইক ভিডিওর শিকার হয়েছিলেন। নির্বাচনের দিন গাইবান্ধা-১ ও বগুড়া-২ আসনে তাদের নির্বাচন থেকে প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ডিসমিসল্যাব নিশ্চিত করেছে, এআই দিয়ে স্থির ছবিকে চলমান ভিডিওতে রূপান্তর করে কম্পিউটার জেনারেটেড কণ্ঠে ভুয়া বিবৃতি দেওয়ানো হয়েছে। দুটি ভিডিওই একই দিনে চালু হওয়া ফেইসবুক পেইজ থেকে ছড়ানো হয়, যা সমন্বিত প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দেয়। নাহিদ নিগার জিতলেও বিউটি বেগম মাত্র তিন হাজার ভোটের ব্যবধানে হেরে যান। এই ভোট কি ডিপফেইক ভিডিওর প্রভাবে হারিয়েছিলেন? প্রশ্নটি এখনো চলমান।
প্রযুক্তির এই অপব্যবহার শুধু নেতাদের ক্ষতি করছে না, ভোটারদের মনেও বিভ্রান্তি তৈরি করছে। ধারণা করা হচ্ছে, ভোটারদের পছন্দ-অপছন্দ এআই-চালিত প্রচারণায় প্রভাবিত হবে। অনেকে বুঝতেই পারবেন না যে, তারা ভুয়া তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এমন তথ্য বিশৃঙ্খলা নির্বাচন-পরবর্তী দাঙ্গার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। যখন মানুষ বিশ্বাস করবে একজন নেতা এমন কিছু বলেছেন যা আসলে তিনি বলেননি, তখন ক্ষোভ জন্মাবে। আর ক্ষোভ থেকে সহিংসতা বেশি দূরে নয়।
নির্বাচনের মাত্র নয় দিন বাকি। এই সংক্ষিপ্ত সময়ে কী করা যেতে পারে?
নির্বাচন কমিশনকে অবিলম্বে একটি ইলেকশন সাইবার সিকিউরিটি ও ডিসইনফরমেশন মনিটরিং সেল সক্রিয় করতে হবে। এই সেল নির্বাচনের দিন পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টা কাজ করবে। ফেইসবুক, ইউটিউব, টিকটক ও এক্স-এর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রেখে সন্দেহজনক কনটেন্ট দ্রুত শনাক্ত ও রিপোর্ট করতে হবে। ডিজিটাল রাইটসের গবেষণায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক কর্মকর্তাদের মেটার কাছে অনুরোধ সত্ত্বেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাড়া মেলে না। তাই সরকারি পর্যায়ে চাপ প্রয়োগ ও আইনি নোটিশ জারি করা জরুরি।
ভোটারদের সচেতনতা বাড়াতে তাৎক্ষণিক প্রচারণা চালাতে হবে। টিভি, রেডিও ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ডিপফেইক চেনার সহজ উপায় শেখাতে হবে। ঠোঁটের নড়াচড়া ও কথার মধ্যে গরমিল, অস্বাভাবিক চোখের পলক, মুখে অদ্ভুত ছায়া-আলো, ব্যাকগ্রাউন্ডে বিকৃতি—ডিপফেইকের এই লক্ষণগুলো সাধারণ মানুষকে জানাতে হবে।
সকল রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীকে তাদের অফিশিয়াল পেইজে ভেরিফায়েড ব্যাজ সংযুক্ত করতে হবে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিবৃতি শুধু ভেরিফায়েড পেইজ থেকে দেওয়ার অঙ্গীকার প্রকাশ করতে হবে। গণমাধ্যমগুলোতে দ্রুত ফ্যাক্ট চেকিং ডেস্ক স্থাপন করতে হবে। ফ্যাক্ট চেকার কদরুদ্দিন শিশির পরামর্শ দিয়েছেন, ইতিবাচক নির্বাচনি প্রচারণা ভিডিও ডিসক্লেমারসহ অনুমোদিত হতে পারে, কিন্তু নেতিবাচক/বিদ্বেষমূলক ভিডিও আইনি কাঠামোয় নিষিদ্ধ করা উচিত। মোবাইল অপারেটরদের সঙ্গে সমন্বয় করে ভাইরাল সন্দেহজনক কনটেন্ট নিয়ে এসএমএস সতর্কতা পাঠানো যেতে পারে। “সাবধান! সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুয়া ভিডিও ছড়াচ্ছে। শেয়ার করার আগে যাচাই করুন।” এরকম একটি সাধারণ বার্তা হাজার হাজার মানুষকে সতর্ক করতে পারে।
এই তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ ঝুঁকি কমাতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দরকার। নির্বাচনের পর জাতীয় ডিজিটাল সাক্ষরতা কর্মসূচি চালু করতে হবে। বাংলাদেশে ১৭ কোটি মানুষের জন্য মাত্র ৪০-৫০ জন পেশাদার ফ্যাক্ট চেকার নিতান্তই অপ্রতুল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিজিটাল ফরেনসিক ও ফ্যাক্ট চেকিং কোর্স চালু করতে হবে। সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ দরকার। প্রতি জেলায় অন্তত একটি ডিপফেইক ডিটেকশন সেন্টার স্থাপন করতে হবে। বাংলা ভাষার জন্য বিশেষ এআই ডিটেকশন টুল তৈরি করতে হবে। আইনে ডিপফেইক ও এআই জেনারেটেড কনটেন্ট প্রচারের বিষয়ে নির্দিষ্ট ধারা যুক্ত করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ২৫টি রাজ্য ইতিমধ্যে নির্বাচনে এআই নিয়ন্ত্রণে আইন করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এআই অ্যাক্টও গণতন্ত্র রক্ষায় হুমকি মোকাবিলা করেছে। বাংলাদেশেও অনুরূপ আইন জরুরি হয়ে পড়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকে বাংলায় কনটেন্ট মডারেশন টিম নিয়োগে বাধ্য করতে হবে। সার্ফশার্কের গবেষণায় দেখা গেছে, নির্বাচন সংক্রান্ত ডিপফেইক ঘটনাগুলোর ৯২ শতাংশেই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহৃত হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নৈতিক আচরণবিধি তৈরি করে এআই ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ করতে হবে। শিক্ষা পাঠ্যক্রমে ডিজিটাল নাগরিকত্ব ও মিডিয়া সাক্ষরতা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
আগামী বছরগুলোতে এআই আরও উন্নত হবে, ডিপফেইক আরও বিশ্বাসযোগ্য মনে হবে। কিন্তু প্রযুক্তি যত দ্রুত এগোচ্ছে, জনসচেতনতা ও আইন ততটা এগোচ্ছে না। বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব প্রবল সেখানে প্রযুক্তির এই অপব্যবহার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ভেতর থেকে দুর্বল করছে।
প্রযুক্তি যথাযথভাবে ব্যবহার হলে গণতন্ত্র মজবুত হয়, আর ভুল পথে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১২ ফেব্রুয়ারি শুধু নির্বাচনের তারিখ নয়, এটি বাংলাদেশের ডিজিটাল গণতন্ত্রেরও পরীক্ষার দিন। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া নির্ভর করবে সরকার, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি কোম্পানি ও সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর। সময় খুব কম, কিন্তু এখনই ব্যবস্থা না নিলে ক্ষতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ একবার বিশ্বাস হারালে তা ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব।