Published : 10 Mar 2026, 09:01 AM
প্রতি বছরের মতো এবারও ৮ মার্চ আড়ম্বরপূর্ণভাবে পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। বাংলাদেশেও দিনটি ঘিরে ছিল নানা আয়োজন। আমরা যারা নারী অধিকার ও নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করি, তাদের জন্য নিজেদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরা আর নীতিনির্ধারকদের সামনে প্রত্যাশার কথা জানান দেওয়ার এই এক বড় সুযোগ।
সেদিন মঞ্চ থেকে অনেক বড় বড় প্রতিশ্রুতি আর অঙ্গীকারের বাণীও শোনা যায়। মনে হয় যেন পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। কিন্তু তিক্ত অভিজ্ঞতা হলো, ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানোর সঙ্গে সঙ্গেই দিবসটির সেই উদ্দীপনায় ভাটা পড়ে। তারপর নারী দিবস শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যাবতীয় অঙ্গীকার, প্রত্যাশা পূরণের স্বপ্ন সবই অধরা হয়ে যায়।
সত্যি বলতে, আমি ব্যক্তিগতভাবে নারী দিবসকে আলাদাভাবে পালনের খুব একটা পক্ষে নই। আমার মনে হয়, সম্মান আর অধিকার তো প্রতিদিনের প্রাপ্য হওয়া উচিত। কিন্তু যখন দেখি খোদ রাজধানী ঢাকায় ৬ বছরের এক শিশুকে পাশবিক নির্যাতনের পর হত্যা করা হচ্ছে; নরসিংদীতে ১৫ বছরের এক কিশোরীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে তার জীবনপ্রদীপ—তখন মনে হয়, সমাজকে জাগিয়ে তোলার জন্য অন্তত একটা বিশেষ দিবসেরও দরকার আছে।
পরিসংখ্যানও আমাদের সেই অস্বস্তিকর সত্যের কথাই বলছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৫ সালেই দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় সাত হাজার ৬৮টি মামলা দায়ের হয়েছে। এই সংখ্যাটি কেবল মামলার। আড়ালে থেকে যাওয়া ঘটনার সংখ্যা নিশ্চয়ই আরও আতঙ্কজনক। যখন চারপাশের পরিবেশ এমন বিচারহীনতা আর সহিংসতার অন্ধকারে ডুবে থাকে, তখন নারী দিবস কেবল উৎসবে পরিণত হলে বেদনাদায়ক হয়।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) যে পরিসংখ্যান দিয়েছে, তা আমাদের সমাজের ভয়াবহ কদর্য রূপ উন্মোচন করেছে। গত এক বছরে সহিংসতা, নির্যাতন আর যৌন নিপীড়নের শিকার নারী ও শিশুর সংখ্যা দুই হাজার ৮৫১। কেবল উত্ত্যক্তকারীদের কাছে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ১৯৩ জন নারী। ধর্ষণের বীভৎসতা সইতে হয়েছে ৭৪৯ জনকে।
সবচেয়ে আঁতকে ওঠার মতো বিষয় হলো, এই নিষ্ঠুরতার বড় শিকার শিশু ও কিশোরীরা। বছরজুড়ে এক হাজার ২৪টি শিশু নানাভাবে সহিংসতা ও পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৯ শিশুকে।
যখন চোখের সামনে এমন বিভীষিকা দেখি, তখন মনে হয়—যে সমাজে একজন নারীকে আজও মানুষ হিসেবে নয়, কেবল ‘নারী’ হিসেবেই বিচার করা হয়, সেখানে নারী দিবসের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি। অন্তত ওই একটি দিন যদি আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়, যদি সমাজকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে আমরা কতটা পিছিয়ে আছি, তবে হোক না আলাদা করে একটি দিন শুধু নারীর জন্য।
নারীরা আজও নানা দিক থেকে ও নানান বঞ্চনার শিকার। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণে তাদের সুযোগ সীমিত। বাস্তবতা হচ্ছে, রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিনিয়ত নারীর ক্ষমতায়নের কথা বললেও, সেই লক্ষ্য পূরণের জন্য কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। তাই এমন এক দিনে যদি আমরা নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়নের বিষয়ে বিশেষভাবে মনোযোগ দিই, তা স্বাভাবিকভাবেই প্রয়োজনীয়।
এবারের নারী দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘Give to Gain’ অর্থাৎ পরিবর্তনের নেতৃত্ব দান। এটি পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমর্থনের শক্তিকে গুরুত্ব দেয়।
নারীর উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন রাষ্ট্র, সমাজ, প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষ উদারভাবে এগিয়ে আসে, সুযোগ সৃষ্টি করে। নারীর এগিয়ে চলা শুধুই নারীদের জন্য নয়, দেশের অগ্রগতির পথ প্রশস্ত করার জন্যও প্রয়োজনীয়।
আমাদের দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে রূঢ় বাস্তব চিত্র হলো—আমরা আজও একটি কট্টর পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বৃত্তে আটকে আছি। রাজনীতি থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি স্তরে আজও নারীকেই সবার আগে লক্ষ্যবস্তু করা হয়, যার ফলে নারী কোথাও নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারছে না। প্রকৃত অর্থে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে তাকে কেবল কর্মক্ষেত্রে শীর্ষস্থান পেলে চলবে না, নেতৃত্বের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছাতে হবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি বা নিরাপত্তার নূন্যতম পরিবেশ নিশ্চিত করার যে প্রাথমিক শর্তগুলো রয়েছে, তা থেকে আমরা এখনো যোজন যোজন দূরে। ফলে নারীর কাঙ্ক্ষিত ক্ষমতায়ন আমাদের সমাজে আজও একটি অধরা স্বপ্ন হয়ে রয়েছে।
এই বাস্তবতার প্রমাণ খুঁজতে আমাদের খুব বেশি দূরে তাকাতে হবে না। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের চিত্রটি বিশ্লেষণ করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জুলাই সনদের বিধান অনুযায়ী, সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসনের বাইরেও প্রতিটি রাজনৈতিক দলের জন্য ৩০০ আসনের অন্তত পাঁচ শতাংশে নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। সনদের এই ধারাটিতে সব রাজনৈতিক ঐকমত্য পোষণ করলেও নির্বাচনের মাঠে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সদিচ্ছা বা প্রয়োগ—উভয় ক্ষেত্রেই আমরা এক বিশাল শূন্যতা লক্ষ্য করেছি। অথচ পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে পাঁচ শতাংশ থেকে ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ৩৩ শতাংশে উন্নীত করার কথা।
জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য ৫ শতাংশ আসন সংরক্ষিত রাখতে রাজনৈতিক দলগুলো নীতিগতভাবে একমত হলেও, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তার ন্যূনতম প্রতিফলনও দেখা যায়নি। অথচ নারীর গৃহস্থালি কাজের আর্থিক মূল্য ধরা হয়, তবে জিডিপিতে নারীর অবদান নারীর অবদান আজ ৫০ শতাংশের অনেক বেশি হয়। সেই তুলনায় রাজনীতিতে মাত্র ৫ শতাংশ মনোনয়ন নিশ্চিত করাটা ক্ষমতায়ন নয়, এক ধরনের 'দয়া-দাক্ষিণ্য' হিসেবেই প্রতীয়মান হয়। কিন্তু চরম বাস্তব হলো, এই নামমাত্র লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জায়গাতেও বড় ধরনের গলদ রয়ে গেছে। মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছার অভাব এবং কাঠামোগত বাধাই নারী নেতৃত্বকে বারবার পেছনে ঠেলে দিচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে এই দৈন্যদশা আরও নগ্নভাবে ফুটে ওঠে। দেখা গেছে, জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টিরই কোনো নারী প্রার্থী ছিল না। এমনকি বিএনপিসহ বড় দলগুলোর কেউই ১০ জনের বেশি নারীকে মনোনয়ন দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। আর এই হাতেগোনা যাদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, তাদেরও সিংহভাগ এসেছেন পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে—যোগ্যতা বা রাজনৈতিক সংগ্রামের ভিত্তিতে নয়।
সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, যেসব রাজনৈতিক দল প্রকাশ্যে তাদের নেতৃত্বে ৪০ শতাংশ নারীর কথা দাবি করে, নির্বাচনের ময়দানে তারাও কোনো নারীকে মনোনয়ন দেয়নি। এতেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আমাদের রাজনৈতিক পরিসরে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে যত বাগাড়ম্বরই করা হোক না কেন, তা ছিল মূলত লোকদেখানো প্রতীকী আয়োজন। এই সীমিত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে প্রকৃত ক্ষমতায়ন অসম্ভব।
অন্যদিকে, নির্বাচনের ঠিক আগে আগে নারীকে অবমাননা করে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মহলের পক্ষ থেকে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য আসতে দেখা গেছে। এমনকি নারীকে নেতৃত্বের জায়গায় আনা যাবে না—এমন মধ্যযুগীয় দৃষ্টিভঙ্গিও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে ব্যক্ত করা হয়েছে। যখন রাজনৈতিক দলগুলোর মানসিকতা এতটাই সংকীর্ণ, তখন নারীর ক্ষমতায়নের স্বপ্ন দিনশেষে তলানিতেই থেকে যাওয়া স্বাভাবিক।
অথচ জাতীয় সংসদে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ ও জোরালো নেতৃত্ব কেবল ক্ষমতায়নের দ্বার উন্মোচিত করে না, পুরো সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে মাইলফলক হিসেবে কাজ করে। বাস্তবতা হলো, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সরাসরি নারী নেতৃত্ব ছাড়া প্রকৃত ক্ষমতায়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন কেবল একটি অধিকারের প্রশ্ন নয়, এটি সামগ্রিক উন্নয়নের মূল কেন্দ্রবিন্দু। নারীরা যখন নীতিনির্ধারণে অংশ নেন, তখন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিশুকল্যাণ, নারীশ্রম এবং সমানাধিকারের মতো মৌলিক বিষয়গুলো রাষ্ট্রীয় নীতিতে যথাযথ অগ্রাধিকার পায়। এর ফলে নারীরা তাদের অধিকার আদায়ে একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম খুঁজে পায়। নারীর ক্ষমতায়ন ও নেতৃত্বের বিকাশ শুধু যে সামাজিক ন্যায়বিচারের বিষয় তা নয়, বরং এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। প্রকৃতপক্ষে, নারীর উন্নয়নকে পাশ কাটিয়ে কোনো জাতির সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।
রাজনীতিতে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন গবেষণায় ইতিবাচক ফল দেখা গেছে। ২০২১ সালে ইউনিভার্সিটি অফ কলোরাডো বোল্ডার একটি গবেষণায় দেখিয়েছে, জাতীয় সংসদে নারীদের অংশগ্রহণ ও প্রভাব বাড়লে সংশ্লিষ্ট দেশে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। গবেষণায় দেখা গেছে যে, যেসব দেশের জাতীয় সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বেশি, সেই দেশগুলোতে শিক্ষা খাতে সরকারি ব্যয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে নারী জনপ্রতিনিধিরা স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রাথমিক শিক্ষার মতো বিষয়গুলোকে বেশি অগ্রাধিকার দেন, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের গুণগত পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ, নারী নেতৃত্ব কেবল নারীদের জন্য নয়, পুরো রাষ্ট্রের গুণগত পরিবর্তনের জন্য অপরিহার্য।
একইভাবে ২০২০ সালে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সাহারা মরুভূমির দক্ষিণাঞ্চলীয় দেশগুলোর সংসদে নারীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং শিশু মৃত্যুহার হ্রাসের এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। ২০১৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার কারটিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরাও মত দিয়েছেন যে, যেসব সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বেশি, সেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় অনেক বেশি শক্তিশালী ও কার্যকর নীতিমালা তৈরি হয়।
সুস্পষ্ট এই প্রমাণগুলো বলে দেয়, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অবস্থান সংহত করতে না পারলে নারীর ক্ষমতায়ন কেবলই একটি অলীক কল্পনা। তবে এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়—এই প্রতিনিধিত্ব কি কেবল সংখ্যাতাত্ত্বিক? যদি কোনো নারী কেবল কারও স্ত্রী কিংবা কন্যা হিসেবে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রতিনিধিত্ব করেন এবং স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে কাজ করতে না পারেন, তবে তাকে প্রকৃত ক্ষমতায়ন বলা কঠিন। প্রকৃত ক্ষমতায়ন তখনই সার্থক হবে, যখন নারী তার নিজস্ব প্রজ্ঞা ও স্বাধীন সত্তা নিয়ে নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন।