Published : 12 Apr 2026, 03:58 PM
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর বিএনপি এহসানুল হক মিলনকে শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যে তার মন্ত্রীত্বের মেয়াদ দুই মাস পূর্ণ হবে। এই দুই মাসে মন্ত্রীর অধিকাংশ কথাবার্তা পরীক্ষায় নকলকেন্দ্রিক। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, রাস্তাঘাটে শিশুদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময় তিনি ‘আর নকল চলবে না’ বলে হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন—সেসব ভিডিও এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। মন্ত্রীকে নিয়ে তুমুল হাসাহাসি চলছে।
মন্ত্রীর প্রায় সকল বক্তব্যে কোনো না কোনোভাবে নকলকে টেনে আনার প্রবণতা শুরুতে কিছুদিন নেওয়া গেলেও এখন সেটি আর নেওয়া যাচ্ছে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বিএনপি সরকারের এই বহুল চর্চিত মন্ত্রী যেন দুই দশক আগেই পড়ে আছেন।
একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এই শতকের গোড়ার দিকে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরীক্ষাকেন্দ্রে নকল করা ছিল রীতিমতো ডালভাতের মতো। নকল করতে গিয়ে লুকোছাপারও কোনো দরকার ছিল না। বাড়ির কেউ এসএসসি পরীক্ষার্থী থাকলে, তার জন্য পরিবারের দুই-তিনজন সদস্য স্ট্যান্ডবাই থাকতেন, যাদের কাজ হতো নকল সরবরাহ করা অথবা কেন্দ্রে ঢুকে খাতায় লিখে দেওয়া।
মনে আছে, দোতলা বা তার ওপরের তলায় পরীক্ষার সিট পড়লে বাড়ি থেকে লোকজন মই নিয়ে যেত, যাতে আরামে নকল সরবরাহ করা যায়। কোনো কোনো কেন্দ্রের বাইরে মই ভাড়া দেওয়ার ব্যবসা জমজমাট হয়ে উঠত।
২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করল। সে সময় বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন ওসমান ফারুক, এহসানুল হক মিলন ছিলেন শিক্ষাপ্রতিমন্ত্রী। পরীক্ষায় নকল বন্ধে মিলন তখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। নকল বন্ধে তিনি ছিলেন কঠোর; পরীক্ষাচলাকালীন রীতিমতো হেলিকপ্টারে চড়ে দেশের নানা জায়গায় দৌড়ে বেড়াতেন। পরীক্ষা কেন্দ্রকে প্রশাসনের জবাবদিহির আওতায় আনতে পেরেছিলেন তিনি। এসবের ফলও আমরা দেখেছি—মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় নকলের প্রবণতা কমে এসেছিল, মিলন প্রশংসিত হয়েছিলেন।
কিন্তু এসব আড়াই দশক আগের কথা। এর মধ্যে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা অনেক পাল্টে গেছে। শুধু দেশে নয়, গত এক দশকে বিশ্বব্যাপী শিক্ষায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ডিজিটাল শিক্ষা বড় জায়গা দখল করেছে, শ্রেণিকক্ষের ধরন পাল্টেছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স শিক্ষার আশীর্বাদ ও অভিশাপ—উভয় হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছে।
আড়াই দশক আগে বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণীতে ভর্তির হার ছিল ৭৮ শতাংশ। এখন কোনো কোনো বছর সেই হার ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। যারা একটু দেরিতে স্কুল শুরু করে, তারাও ভর্তি হয়—তাই মাঝেমধ্যে হার শতভাগ অতিক্রম করে। অতীতের চেয়ে পাশের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, ডিভিশনের পরিবর্তে জিপিএ চালু হয়েছে, লাখ লাখ শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হচ্ছে।
১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় যে দেশে সাক্ষরতার হার ছিল ১৬ শতাংশ, সেটি এখন ৭৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এহসানুল হক মিলন যখন আগেরবার মন্ত্রী ছিলেন, তখন ৮০ শতাংশ মেয়ে স্কুলে ভর্তি হতো; এখন সেই হার ছেলেদের সমান, কোথাও কোথাও তারও বেশি। তখন দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪০ শতাংশের কাছাকাছি। বিটিভিতে ‘নাল পিরান’ নামে নাটক হতো, যেখানে ভুখা ও মঙ্গায় আক্রান্ত মানুষের জীবনচিত্র উঠে আসত। ২০২৪-এ দারিদ্র্যের হার ১৭ শতাংশে নেমে এসেছিল। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সেটি আবার ২৫ শতাংশে উঠে গেছে বলে কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
শুধু নকল নয়, আরও যেসব বিষয়ে মন্ত্রী মনোযোগ দিচ্ছেন—যেমন পরীক্ষা যারা নিচ্ছে, পরীক্ষার হলের ভেতরের পরিবেশ, কেন্দ্রে সিসিটিভি বসানো, পরীক্ষার হলে বসে ঘাড় ঘোরানো যাবে কি না—এসবের কোনোটিই বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রের জন্য জরুরি আলাপ নয়। কয়টি ক্লাসরুমে সিসিটিভি লাগাবেন তিনি? সেসব নিরীক্ষা করবে কারা? কী লাভ হবে এসব ফুটেজ দেখে? অপরাধ প্রবণতা কমানোর দিকে নজর না দিয়ে অপরাধী ধরার প্রকল্পে খুব বেশি লাভ হয় না।
একটি খবরে দেখলাম, শিশুদের মাথার চুল নিয়েও কথা হচ্ছে। চুলের ছাঁট কেমন হবে, সে বিষয়ে নাকি গাইডলাইনও দেওয়া হবে। ছোট ছোট শিশুদের মাথাভর্তি চুলের চেয়ে সুন্দর আর কী আছে? শিশুদের মাথার চুল বাটি ছাঁট দিয়ে রাখার সঙ্গে পড়ালেখার আদৌ কোনো সম্পর্ক আছে? পশ্চিমা বিশ্বে ঘুরলে দেখতে পাই, শিশুদের মাথাভর্তি চুল। কোনো কোনো শিশু জন্মের পর দশ-বারো বছর পার হলেও চুল কাটেনি।
শিক্ষামন্ত্রীর জানা প্রয়োজন, বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রের সমস্যাগুলো গত দুই দশকে পাল্টে গেছে। নকল এখন আর প্রধান সমস্যা নয়, শ্রেণিকক্ষেরও সংকট নেই। এমন খুব কম স্কুল আছে, যাদের বড় পাকা ভবন নেই। স্কুলে যাওয়ার রাস্তা নেই—এমন এলাকা এখন বিরল।
বরং শিক্ষার মূল সমস্যা হলো—মানসম্মত শিক্ষার অভাব।
শ্রেণিকক্ষে যারা পড়ান, তাদের যোগ্যতার ঘাটতি রয়েছে। যাদের যোগ্যতা আছে, তাদের প্রশিক্ষণ নেই। যাদের দুটোই আছে, তাদের পড়ানোর আগ্রহ নেই। অনেকেই বাধ্য হয়ে শেষ ভরসাস্থল হিসেবে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন।
অধিকাংশ শিক্ষক দলীয় রাজনীতিতে জড়িত। গোটা শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন এক বিশৃঙ্খলতা ও অনিয়ম চেপে বসেছে যে, রাজনীতি না করলে শিক্ষক হিসেবে টিকে থাকাও মুশকিল হয়ে পড়ে। ফলে শ্রেণিকক্ষের চেয়ে শ্রেণিকক্ষের বাইরেই শিক্ষকদের মনোযোগ বেশি থাকে; ফলে কর্মঘণ্টা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পাঠ্যক্রমের (কারিকুলাম) কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। যে কারিকুলাম আছে, সেটি কীভাবে পড়ানো হবে, তার পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই। যারা প্রশিক্ষণ পেয়েছেন, তারা সেসব মানতে রাজি নন। প্রকৃত শিক্ষাবিদদের পরিবর্তে রাজনীতিবিদরা শিক্ষার নীতি নির্ধারণ করেন। অধিকাংশ শিক্ষক টিউশনি, কোচিং সেন্টার, গাইডবই লেখায় ব্যস্ত।
অঙ্ক, বিজ্ঞান বা ইংরেজির মতো বিষয় পড়ানোর মতো দক্ষ শিক্ষকের অভাব রয়েছে। যার প্রতিফলন আমরা দেখি—উচ্চমাধ্যমিক পাশ করা শিক্ষার্থী টানা ১২টি শ্রেণি পড়াশোনা করেও ইংরেজিতে একটি শুদ্ধ বাক্য বলতে বা লিখতে পারে না। অথচ উন্নত দেশগুলোতে সপ্তম বা অষ্টম শ্রেণি পাশ করা শিশুরা তিন থেকে চারটি ভাষায় অনর্গল পড়তে ও লিখতে পারে। তারা পারলে বাংলাদেশের শিশুরা কেন পারে না—সেটি অনুসন্ধান করা জরুরি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থাও তথৈবচ। দলীয় লেজুড়বৃত্তির প্রমাণ না থাকলে ভিসি-প্রোভিসি হওয়া যায় না। মাত্র পৌনে দুই মাসের মাথায় শিক্ষামন্ত্রী নিজেও একই কাজ করেছেন। প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের পছন্দমতো ভিসি নিয়োগ করেছেন। চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে ৭৩-এর অধ্যাদেশ অমান্য করেছেন। গণঅভ্যুত্থানের পর ইউনূস সরকারও একইভাবে নিয়োগ দিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারেরও একই প্রবণতা ছিল। তাহলে পরিবর্তনটা কোথায় হলো?
ডিজিটাল পদ্ধতি পৃথিবীতে শিক্ষার ধারণাকে প্রভাবিত করছে। অথচ বাংলাদেশ এখনো তার ধারেকাছে যেতে পারেনি। শ্রেণিকক্ষগুলো আধুনিক নয়।
এই যে এতগুলো বড় সমস্যা—মন্ত্রীকে এসব নিয়ে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে না। তিনি কি জানেন যে, এসব জায়গায় হাত দিতে গেলে কত বাধার সামনে পড়বেন তিনি? একটি দেশে আট রকমের শিক্ষা ব্যবস্থা। অধিকাংশ মাদ্রাসায় কারিকুলাম মানা হয় না। জীবনমুখী শিক্ষার সঙ্গে কারিকুলামের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে পারবে তার মন্ত্রণালয়? কারিকুলাম ঠিক করতে পারবেন? কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় প্রভাব বাদ দিয়ে প্রকৃত একাডেমিশিয়ানকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিতে পারবেন?
সম্ভবত পারবেন না বলেই নকলের মতো বহুল কথিত বিষয়কে আলোচনার টপিক হিসেবে বেছে নিয়েছেন। শিক্ষামন্ত্রীর জানা উচিত যে, এসব দিয়ে খুব বেশিদিন চালানো যাবে না। ঠিক-ভুল, দরকার-অদরকারের তফাৎ মানুষ এখন সহজেই ধরতে পারে।