Published : 30 Apr 2026, 10:18 AM
মার্চের ১৭ দিনের টানা বৃষ্টি আর জলাবদ্ধতার ক্ষত এখনো দগদগে। হাজার হাজার হেক্টর জমির কাঁচা ধান তলিয়ে যাওয়ার পর, কৃষকরা যখন নিজেদের পকেটের টাকা খরচ করে সেচ পাম্প চালিয়ে ফসল রক্ষার শেষ চেষ্টাটুকু করছিলেন, ঠিক তখনই হাওরে মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এল নতুন বিপর্যয়।
বর্তমান পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। ভারী বৃষ্টিপাতের সঙ্গে মেঘালয়ের পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলে নদ-নদীর পানি হু হু করে বাড়ছে, যা নতুন করে প্লাবিত করছে বোরো ফসলের মাঠগুলোকে। সুনামগঞ্জ থেকে নেত্রকোনা—বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষকরা আজ অসহায়ভাবে তাকিয়ে দেখছেন তাদের ঘাম ঝরানো ফসলের জমি কীভাবে পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ হাওরাঞ্চলের কৃষকের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার মতো চরম সংকট। প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনা আর সীমান্তের ঢলের মুখে আমাদের হাওরাঞ্চলের মানুষগুলো আজ যেন একেবারেই নিয়তির হাতে বন্দি। কৃষকের চোখের সামনেই পাকা-আধাপাকা ধান পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে।
ফসলরক্ষার জন্য করা যে বাঁধগুলো হওয়ার কথা ছিল কৃষকের ভরসা, সেই সব উল্টো হাওরবাসীর মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। হাওরের এই বিরামহীন সংকটের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের দায় থাকলেও, এর চেয়ে বড় সত্য হলো অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের ভয়াবহ খেসারত। এ এক নির্মম পরিহাস যে, ত্রুটিপূর্ণ বাঁধের মাটি ধসে পড়ে প্রাকৃতিক নালা ও খালগুলো ভরাট হয়ে গেছে, ফলে পানি বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে ভেতরেই সৃষ্টি হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা। আবার সেই একই দুর্বল বাঁধ এখন নদ-নদীর উপচে পড়া পানির চাপ সামলাতে পারছে না। একদিকে জলাবদ্ধতায় ফসল ডুবে যাওয়া আর অন্যদিকে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আতঙ্ক—এই দ্বিমুখী সংকটে কৃষকের জীবন ওষ্ঠাগত।
বাস্তবতা হলো, এই বিপর্যয়ের মূলে রয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠনে রাজনৈতিক স্বজনপ্রীতি, প্রশাসনিক গাফিলতি আর দুর্নীতির পাহাড়। নিম্নমানের মাটি ব্যবহার, উচ্চতা কম রাখা এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা মূলত সাধারণ কৃষকের কপালে কুঠারাঘাত। প্রতি বছর বিপুল অর্থ বরাদ্দের পরও বাঁধ কেন টেকসই হয় না, এই প্রশ্নের জবাবদিহিতা চাওয়ার কেউ নেই। দিনশেষে, এই নড়বড়ে অবকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে লড়তে থাকা কৃষকের হাহাকার আমাদের কাঠামোর ব্যর্থতাকেই উলঙ্গ করে দেয়।

সুনামগঞ্জে এ বছর ৬০৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের নামে যা ঘটেছে, তাকে উন্নয়ন না বলে ‘লুটপাটের উৎসব’ বলাই বেশি যুক্তিযুক্ত। ৭১৮টি পিআইসি গঠন করে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) যে বিশাল কর্মযজ্ঞের খতিয়ান দিচ্ছে, সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে তার ভেতরের কদর্য রূপটি বেরিয়ে এসেছে। এটি অত্যন্ত লজ্জাজনক যে, ৩০০টি বাঁধেই দুর্নীতির আখড়া বসানো হয়েছে। যেখানে ১০০টি বাঁধের কোনো প্রয়োজনই ছিল না, আর বাকি ২০০টি পুরনো বাঁধে স্রেফ কাগজে-কলমে অতিরিক্ত বরাদ্দ দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
হাওরবাসীর চোখের জল যখন নদীর পানিতে মিশছে, তখন জেলা-উপজেলা প্রশাসন আর পাউবোর অসাধু চক্র বাঁধ নির্মাণের নাম করে অবাধে লুটপাটে মত্ত ছিল। ফসলডুবি ঠেকানোর দোহাই দিয়ে বহু বছর ধরে এই প্রকল্পগুলো আসলে কৃষকের উপকারের জন্য নয়, সিন্ডিকেটের পকেট ভারী করার জন্য সাজানো হয়ে আসছে। কৃষকের মাথার ওপর যখন ঋণের বোঝা আর পেটে ভাতের অভাব, তখন সরকারি অর্থের এই নির্লজ্জ অপচয় এবং পরিকল্পিত দুর্নীতি আমাদের প্রশাসনিক কাঠামোর নৈতিক দেউলিয়া অবস্থাকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। দিনশেষে, এই চক্রের দুর্নীতির মাশুল দিতে হচ্ছে সেই নিঃস্ব কৃষককেই, যাদের সোনালি স্বপ্ন এখন পানির নিচে।
সুনামগঞ্জের হাওরজুড়ে এখন কেবলই হাহাকার আর আশঙ্কার মেঘ। হাওর রক্ষা আন্দোলনের নেতারা সরেজমিনে বাঁধগুলো দেখে যে সতর্কবার্তা দিয়েছেন, তা রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। জেলার অন্তত ১১০টি ‘ক্লোজার’ বা বাঁধের বড় ভাঙন মুখগুলো এখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, যেকোনো মুহূর্তে বাঁধ ভেঙে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে হাজার হাজার হেক্টর ফসলের জমির সলিলসমাধি হওয়া এখন খালি সময়ের ব্যাপার। অথচ এই চরম ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলোই হতে পারত রক্ষাকবচ, যা এখন তাসের ঘরের মতো নড়বড়ে হয়ে আছে।
পাউবোর পূর্বাভাস যেন সেই আশঙ্কায় আগুনের ঘি ঢালছে। সুরমা-কুশিয়ারা থেকে শুরু করে ধনু-বৌলাইয়ের পানি যে গতিতে বাড়ছে, তাতে ২৮ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই আকস্মিক বন্যা হাওরবাসীর কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ গভীর করে দিয়েছে। সীমান্তের ওপারের পাহাড়ি ঢল আর এদেশের ভারী বর্ষণ মিলে এখন যে প্রলয়ঙ্করী রূপ নেওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে, তাতে মহাবিপর্যয় দুয়ারে দাঁড়ানো। প্রকৃতির এই রুদ্ররূপ আর প্রশাসনের নড়বড়ে অবকাঠামোর মাঝখানে পড়ে হাওরের কৃষক অসহায়। তাদের চোখের সামনেই হয়তো কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বছরের একমাত্র সম্বল পানিতে মিশে যাবে, অথচ এই আসন্ন দুর্যোগ ঠেকাতে আমাদের প্রস্তুতি যেন কেবলই কাগুজে আশ্বাসে বন্দি।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দেওয়া যতটা সহজ, মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন ততটাই অসম্ভব এক বাস্তবতা। যান্ত্রিকীকরণের কারণে গত কয়েক বছরে মৌসুমী শ্রমিকের আগমন কমেছে, অথচ সংকটের সময় পর্যাপ্ত কম্বাইন হারভেস্টার মিলছে না। যা-ও আছে, তা যন্ত্রাংশের অভাব, চড়া জ্বালানি খরচ কিংবা জলাবদ্ধতার কারণে অকেজো হয়ে পড়ে আছে। এর ওপর ধান শুকানোর আধুনিক ব্যবস্থা না থাকা এবং বজ্রপাতের মতো প্রাণঘাতী ঝুঁকি কৃষকের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। উৎপাদন খরচ দ্বিগুণ বাড়লেও বাজারে ধানের দাম না বাড়ায় কৃষকের কপালে এখন ‘উৎপাদন বাড়িয়ে লোকসান’-এর মতো এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের ছাপ। শুধু সুনামগঞ্জেই যে কয়েক হাজার কোটি টাকার ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, তার প্রভাব কেবল স্থানীয় নয়, জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতিতেও ভয়াবহ আঘাত হানবে।
এই মহাবিপর্যয় থেকে উত্তরণে এখন প্রয়োজন এক সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ। বিচ্ছিন্ন পরামর্শ না দিয়ে সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত হারভেস্টার সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং অচল যন্ত্রগুলো মেরামতের জন্য খুচরা যন্ত্রাংশ সহজলভ্য করতে হবে। একই সঙ্গে কৃষিযন্ত্রে ভর্তুকি বৃদ্ধি এবং কৃষি মৌসুমে জ্বালানি তেলের বিশেষ বরাদ্দ নিশ্চিত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত ভাড়ার লাগাম টেনে ধরা এখন সময়ের দাবি। কৃষকের পকেটে সরাসরি টাকা পৌঁছাতে দ্রুত সরকারি ধান সংগ্রহ অভিযান শুরু করে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। সর্বাগ্রে, ফসলরক্ষা বাঁধের দুর্নীতির বিচার করে সেখানে সার্বক্ষণিক নজরদারি ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে সরকারি বিনিয়োগ কেবল কাগজ-কলমে নয়, বাস্তবে কৃষকের রক্ষাকবচ হয়ে ওঠে। এসব সমস্যার কোনো জাদুকরী সমাধান না থাকলেও, রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা ও দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণই পারে হাওরের এই বিপুল সম্ভাবনাকে নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে।
দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য গৎবাঁধা আশ্বাসে কাজ হবে না; প্রয়োজন জলবায়ু সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন, বিজ্ঞানসম্মত পানি ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার একটি সমন্বিত রূপরেখা। এই পরিকল্পনাগুলোতে কেবল প্রকৌশলগত বিদ্যাবুদ্ধি নয়, প্রকৃতির স্বাভাবিক গতিপথ রক্ষা এবং কৃষকের দীর্ঘদিনের বাস্তব অভিজ্ঞতাকেও প্রাধান্য দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই চরম বাস্তবতায় অভিযোজনমূলক কৃষি ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই।
সবচেয়ে বড় সত্য হলো, আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার অগ্রভাগের এই সৈনিকদের আজ চরম অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার মুখে একা ফেলে রাখা হয়েছে। একজন কৃষক যখন তার হাড়ভাঙা খাটুনির পর প্রশাসনের দুর্বল শাসন আর দুর্নীতির বোঝা বয়ে বেড়ান, তখন তা কেবল নীতিগত ব্যর্থতা নয়, রাষ্ট্রের নৈতিক পরাজয়কেও চিহ্নিত করে। তারা দেশের মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেন, অথচ সংকটের দিনে তারাই সবচেয়ে বেশি অসহায়।
সময় আমাদের হাতে নেই বললেই চলে। ধান এখনো মাঠেই পড়ে আছে, আর পানির স্তর বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। এখন যদি দ্রুত এবং কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে আমরা ব্যর্থ হই, তবে হাওরের সেই কান্নার প্রতিধ্বনি খুব শিগগিরই দেশের প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি ডাইনিং টেবিলে গিয়ে পৌঁছাবে। হাওরকে বাঁচানো তাই এখন কেবল কৃষকের স্বার্থে নয়, গোটা জাতির ভবিষ্যতের স্বার্থেই অপরিহার্য।