Published : 21 Jan 2026, 09:41 PM
আমার শৈশব আর কৈশোর কেটেছে ফুটবল ও ক্রিকেটের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। শীতকালে ক্রিকেট, বছরের বাকি সময় ফুটবল—এটাই ছিল রুটিন। তখন থেকেই মনে হতো, ক্রিকেট যেন একটু ‘ভদ্রলোকের খেলা’। টেলিভিশনে খেলোয়াড়, দর্শক বা ধারাভাষ্যকারদের দেখে নয় বরং নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই এই ধারণা গড়ে উঠেছিল। আমাদের মফস্বলের হোম-অ্যাওয়ে ক্রিকেট ম্যাচে কখনো মারামারির পরিস্থিতি দেখিনি।
ক্রিকেটে সরাসরি শারীরিক সংঘর্ষের সুযোগ খুব কম, কিন্তু ফুটবলে তা প্রায় নিয়মিত ঘটনা। ট্যাকলের চাপে ফাউলের বাঁশি বাজার আগেই দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ত। শক্তিশালী কোনো নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ না থাকায় অনেক ম্যাচই শেষ হতো হাতাহাতিতে, যার রেশ মাঠ ছাড়িয়ে পাড়ায় পাড়ায় পৌঁছে যেত। প্রতিবেশী হলে তো কথাই নেই, মাঠের গোলযোগ বাড়ির উঠোনে এসে তর্ক-বিতর্কে রূপ নিত।
আমার সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়। এসব খবর বাবার কানে গেলেই প্রশ্ন আসত, ‘তুই মানুষের সঙ্গে মারামারি করিস কেন? তুই নিজেও তো একটা পক্ষ!’ এরপরের পর্বটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ফলে যাই ঘটুক না কেন, চেষ্টা থাকত যেন বাইরের কোনো হট্টগোল বাড়ির সীমানায় না পৌঁছায়। এটাই ছিল আমাদের পারিবারিক শিক্ষা। তাই খেলাকে কেন্দ্র করে ঝগড়া হলেও কয়েক দিনের মধ্যে আবার সবাই মিলেমিশে যেতাম। আশপাশের অনেক পরিবারের সন্তানদের অভিজ্ঞতাও ছিল প্রায় অভিন্ন।
তবে সবাই যে এমন ‘আত্মসংযমের পরিবেশে’ বড় হয়েছে তা নয়। আমাদের এলাকায় কিছু পাড়া ছিল যেখানে একজনের ঝগড়া মানেই পুরো পাড়ার সম্মিলিত অভিযান। দোষ যারই হোক, দলবদ্ধ হওয়াই ছিল মূলনীতি। এই মানসিকতা এখনো অনেকের মধ্যে রয়ে গেছে। সম্প্রতি দেশের একটি জেলায় আন্তঃপ্রতিবেশী সংঘর্ষ যেন এক ধরনের ‘শিল্পে’ পরিণত হয়েছে—পাড়াভিত্তিক আলাদা রঙের জার্সি পর্যন্ত দেখা যায়, যাতে নিজেদের লোককে ভুল করে কেউ না পেটায়। ব্যাপারটা হাস্যকর মনে হলেও এর ভেতরে একটি গভীর সামাজিক ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে।
ফেলানী হত্যাকাণ্ড, একটি ট্র্যাজেডির একাধিক স্তর
৭ জানুয়ারি ২০১১। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর-দিনহাটা সীমান্তের খিতাবেরকুঠি এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে নিহত হন কিশোরী ফেলানী খাতুন। তার নিথর দেহ কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলে থাকার ছবি আজও আমাদের হৃদয়ে গভীর ক্ষত হয়ে রয়েছে।
এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে একজন নিরস্ত্র শিশুর মৃত্যু মর্মান্তিক এবং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। প্রাণঘাতী শক্তির পরিবর্তে আইনগতভাবে আটক করার সুযোগ ছিল কি না—এ প্রশ্ন মানবাধিকার ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার আলোচনায় স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্ব পায়।
তবে এই ট্র্যাজেডির পেছনে আরও কয়েকটি স্তর রয়েছে, যেগুলো উপেক্ষা করলে পুরো চিত্র অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
প্রথমত, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা দুই দেশেরই দায়িত্ব। একটি শিশু কীভাবে নিজের দেশের সীমান্ত পেরিয়ে এত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পৌঁছাল, এ প্রশ্ন আমাদের নিজেদের নিরাপত্তা ও নজরদারির কার্যকারিতা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে।
দ্বিতীয়ত, দারিদ্র্য, পারিবারিক সংকট বা জীবিকার তাগিদে অনেক সময় মানুষ এমন ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়, যা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে কেউ নিত না।
সবশেষে, রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হলো নাগরিকদের এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা যাতে বেঁচে থাকার প্রয়োজনে কাউকে কাঁটাতারের পথে হাঁটতে না হয়।
তাই ফেলানীর মৃত্যু নিয়ে আলোচনায় বিএসএফের ভূমিকার পাশাপাশি বিজিবির দায় এবং আমাদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতাগুলোকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি। একতরফা দোষারোপ নয়, বরং ভারসাম্যপূর্ণ ও মানবিক বিশ্লেষণই সম্ভবত অর্থবহ সমাধানের পথ দেখাতে পারে।
সীমান্ত, রাজনীতি এবং অদৃশ্য চরিত্র
ইনকিলাব মঞ্চের নেতা ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডের প্রধান সন্দেহভাজন ফয়সাল করিম মাসুদ নাকি ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট হয়ে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়েছে। এ অভিযোগ প্রথম দিন থেকেই তার অনুসারীদের মুখে শোনা যাচ্ছে। এরপর থেকে রাজনীতির মাইক্রোফোন যেন এক সুরে বাঁধা, ‘যত দোষ, সব ভারতের’।
বক্তৃতা, পোস্ট ও বিবৃতিতে সীমান্ত যেন একমুখী দরজা—একপাশে পাহারা, অন্যপাশে অলৌকিক ফাঁক। ‘চিকেন নেক’ থেকে ‘সেভেন সিস্টার্স’ ভৌগোলিক মানচিত্র ঘুরে আসে বারবার, কিন্তু নিজেদের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি এই বর্ণনায় প্রায় অদৃশ্য চরিত্র। যেন গল্পে পাহারাদার আছে, কিন্তু কোনো প্রশ্ন নেই; দায়িত্ব আছে, কিন্তু কোনো দায় নেই।
এই একমুখী দৃষ্টিভঙ্গি রাজনীতিতে জনপ্রিয়, কারণ এতে হিসাব সহজ হয়। জটিল বাস্তবতার জায়গায় একটি স্পষ্ট ‘ওপারের দোষী’ পাওয়া যায়। এতে বক্তব্য জোরালো হয়, স্লোগান সংক্ষিপ্ত হয়, আর সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার বাড়ে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় এই সরলীকরণ খুব একটা কার্যকর নয়।
বাস্তবতা হলো, একটি আন্তর্জাতিক সীমান্ত কোনো ব্যক্তির একার চেষ্টায় পেরোনো সম্ভব হয় না। সেখানে নজরদারি, প্রটোকল ও নিয়মিত টহল থাকে। যদি কেউ সত্যিই পালিয়ে যেতে পারে, তবে প্রশ্ন শুধু ‘কে ওপার থেকে ঢুকতে দিল?’ নয়, বরং ‘কে এপার থেকে যেতে দিল?’—এ দুই প্রশ্নের মাঝেই প্রকৃত দায়ের রেখা টানা হয়।
আরেকটি দিক আলোচনাতেই আসে কম। সীমান্ত শুধু নিরাপত্তার বিষয় নয়, এটি প্রশাসনিক ও বিচারিক ধারাবাহিকতারও অংশ। কোনো অপরাধের পর অভিযুক্ত কীভাবে নজরদারির বাইরে চলে যায়—তা কেবল সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, গোয়েন্দা বিভাগ ও বিচারিক ব্যবস্থার সমন্বয়ের প্রশ্নও।
তবু রাজনৈতিক বয়ানে ‘সমন্বয়’ শব্দটি খুব জনপ্রিয় নয়। সেখানে সমন্বয়ের জায়গা নেয় সংঘাত এবং দায়িত্বের জায়গা নেয় ‘দোষারোপ’। ফলে সীমান্ত হয়ে ওঠে একটি প্রতীক, যেখানে বাস্তব প্রশাসনিক ব্যর্থতার চেয়ে কল্পিত ভূ-রাজনৈতিক নাটক বড় হয়ে ওঠে।
সমালোচনা করতেই হলে তা কেবল ওপারের দিকে ছুড়ে দিলে চলবে না। আয়না দুই দিকেই ধরতে হবে। কারণ সীমান্ত যেমন দুই দেশের, তেমনি দায়িত্বও স্বাভাবিকভাবেই দুই পাশের।
পারিবারিক মূল্যবোধ থেকে জাতীয় মূল্যবোধ
একটি দেশের জাতীয় মানসিকতা কোনো সংবিধানের পাতায় একদিনে লেখা হয় না। এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে কোটি কোটি ঘরের ভেতরে, পরিবারের কথাবার্তায়, পাড়া-মহল্লার আচরণে, স্কুলের মাঠে এবং সমাজের ছোট ছোট প্রতিক্রিয়ায়। শৈশবের সেই মাঠে যেমন দেখেছি, যেখানে আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখানো হয় সেখানে ঝগড়া থামে; আর যেখানে ‘আমরা বনাম তারা’ মানসিকতা উসকে দেওয়া হয়, সেখানে সংঘর্ষ দল বেঁধে ছড়িয়ে পড়ে।
এই ছোট ছোট অভ্যাসই বড় হয়ে রাষ্ট্রীয় আচরণে রূপ নেয়। আমরা যদি ঘরে শিখি, সমস্যা মানেই বাইরের কারও দোষ, তাহলে বড় হয়ে রাষ্ট্রীয় সংকটেও ওই একই সূত্র খুঁজি—দোষটা কার ঘাড়ে ঠেলে দেওয়া যায়!
ফেলানীর মৃত্যু নিয়ে আলোচনায় এই প্রবণতা স্পষ্ট। বিএসএফের গুলির প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ এবং মানবিক দিক থেকে গভীর আলোচনার দাবি রাখে। কিন্তু ওই আলোচনায় নিজেদের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সামাজিক নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রসঙ্গ চাপা পড়ে গেলে পুরো চিত্র অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
একইভাবে, ফয়সালের পলায়নের অভিযোগে যখন আঙুল শুধু বাইরের দিকে ওঠে, তখন দেশের ভেতরের আইনশৃঙ্খলা, তদন্তের গতি, বিচারিক প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা এবং বিজিবির ভূমিকার প্রশ্ন নীরবে এড়িয়ে যাওয়া হয়। এতে সমস্যার সমাধান হয় না, শুধু সমস্যার ঠিকানা বদলায়।
এখানেই জাতীয় মূল্যবোধের প্রশ্ন সামনে আসে। আমরা কি এমন সংস্কৃতি গড়ে তুলছি যেখানে দায় মানেই অন্যের, আর দায়িত্ব মানেই কারও না? নাকি আমরা এমন সংস্কৃতি চাই যেখানে ভুল হলে প্রথম প্রশ্ন আসে, “আমাদের কোথায় ঘাটতি ছিল?”
কারণ একটি সমাজের শক্তি শুধু তার স্লোগানে নয়, তার আত্মসমালোচনার সক্ষমতায়ও মাপা হয়। অন্যকে দোষারোপ করা সহজ; নিজের দিকে আয়না ধরা কঠিন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকতে হলে এই কঠিন কাজটাই শিখতে হবে।
প্রশ্নটা তাই শুধু ফেলানী বা ফয়সালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্নটা আমাদের সবার দিকে, আমরা কি এমন সমাজ গড়তে পারছি যেখানে কোনো শিশু বেঁচে থাকার আশায় সীমান্তের কাঁটাতারকে শেষ ভরসা মনে করে না? আর কোনো অপরাধী আইনের মুখোমুখি হওয়ার আগেই ভূগোলের আড়ালে হারিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায় না?
সমাধানের শুরু হয়তো তখনই, যখন আমরা দোষের মানচিত্রে আঙুল রাখার আগে নিজের ঘরের দরজায় একবার থামি এবং দেখি, আয়নায় ঠিক কী প্রতিফলিত হচ্ছে।