Published : 05 Apr 2026, 07:28 PM
দেড় বছর বাংলাদেশ কী করবে কী করবে না, কী বলবে কী বলবে না—এসব নিয়ে ছিল মহা বিপদের মুখে। হঠাৎ জানা গিয়েছিল রিসেট বাটন সেট করা হয়ে গেছে; ওই বাটন সবকিছু মুছে দিতে নাকি যথেষ্ট। যাই হোক, সে বাটনে কাজ হয়নি। বাঙালি আবার পায়ে পায়ে ফিরছে, ফিরতে চাইছে নিজের শিকড়ে।
কিন্তু মুশকিল হলো আমরা সে জাতি, যারা এক পা এগোলে দুই পা পিছাই। সরকারে তরফে বলা হয়েছিল মঙ্গলে তাদের আপত্তি নেই। এখন শুনছি ‘মঙ্গলের’ মতো ‘আনন্দ’ও বাদ পড়েছে, বর্ষবরণে চারুকলা থেকে হবে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। মঙ্গলের প্রতি রাগ বা বিদ্বেষের কারণগুলো শুনেছিলাম; কিন্তু আনন্দের প্রতি বিরাগের কারণ এখনো জানা হয়নি। এইভাবে চলতে থাকলে হয়তো বৈশাখও তোপের মুখে পড়বে। থাকবে না বৈশাখের অস্তিত্ব। সে দুর্ভাবনা কখনো সার্থকতার মুখ না দেখুক।

বাংলা নববর্ষের জাতীয় উৎসবে পরিণত হওয়া খুব বেশি দিনের কথা নয়। ছেলেবেলায় চৈত্র সংক্রান্তি ছিল অনেক পদে রান্না ব্যঞ্জনের এক দিন। মা-মাসিরা, বাবা বা অন্য অভিভাবকরা বাজার করে আসার পরপরই রন্ধনে ঝাঁপিয়ে পড়তেন তারা। চৈত্র নিদাঘ গরমের মাস। এই ব্যঞ্জনের মূল পদগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যাবে কেন এর প্রচলন। যত তিতা, যত শাক, যত তরকারি—তার বেশির ভাগই মূলত গরম থেকে রক্ষা পাওয়ার সহায়ক। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল বাংলার মাটি ও ঐতিহ্য থেকে আহরিত শিবের গাজন, মুখোশের নাচ। আমরা দেখতাম বহুরূপীরা এসব সাজে সেজে সন্ধ্যার পর বাড়ির উঠোনে উঠোনে নেচে বেড়াতেন। ঢাক-ঢোল আর বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে তাদের নাচ ছিল উৎসবের প্রস্তুতি। ওই দিন হালখাতা লেখার প্রচলন ছিল দোকানে দোকানে। দোকানিরা জিলিপি, বাতাসা, রসগোল্লার মতো মিষ্টি মজুত রাখতেন। যথাসম্ভব কাউকে ফিরাতেন না তারা।
এখন সময় পাল্টে গেছে। চাইলেও আর আগের মতো সে সব নিয়ে মেতে ওঠা যাবে না। তা ছাড়া সেই গাজন বা নাচের শরীরেও এসেছে পরিবর্তন। সেটা মানার পরও বিস্ময় মানি, কী কারণে হঠাৎ করে আমিষ ইলিশ দখল করে নিল বৈশাখের মূল জায়গা? পান্তা ভাত আর ইলিশ সহযোগে বৈশাখ পালনের আজ যে সমারোহ, তার সঙ্গে অতীত বা ঐতিহ্যের কোনো মিল নেই। আমরা চিরকাল হুজুগে জাতি। যখন যেটা মাথায় ঢোকে, সেটা নিয়েই মেতে উঠি আমরা। পান্তা-ইলিশ এখন এমন এক জায়গায় পৌঁছে গিয়েছে, এটি না হলে নাকি পহেলা বৈশাখই হয় না। সবচেয়ে মজার ব্যাপার, এই পান্তা-ইলিশ এখন দেশের বড় বড় হোটেল থেকে মেলার অনিবার্য অংশ। তার দাম, তার চাহিদা, তার সামাজিক স্ট্যাটাস এখন আকাশছোঁয়া। আমি বিষয়টা নিয়ে বলছি এই কারণে—আজকের বাংলাদেশে যা কিছু ঘটছে বা ঘটে চলেছে, তার সবটাই প্রায় হুজুগ।

চোখ মেলে দেখুন, বাংলাদেশের নারীরা কী আগের মতো আছেন? একাত্তরে যে দেশের জন্ম, যে দেশের নারীরা খোলা চুলে কাঁধে বন্দুক নিয়ে স্বাধীনতার সংগ্রাম করেছিল, আজ তাদের কী চেহারা? চিরকাল জেনে আসা মায়ার দেশ, মমতার সমাজে নারীরা ভবনের ভেতর থেকে আইনের সঙ্গে যুদ্ধ করে; লড়াই করে এ দেশের নিয়মিত বাহিনীর সঙ্গে। চিরকাল যে আলো আমাদের পথ দেখিয়েছে, আমাদের সাম্য ও মৈত্রীর বাণী শুনিয়ে মহান করেছে, এরা তাকে বিতর্কিত করে ফেলছে। এ দেশের পানি-হাওয়া কিংবা সংস্কৃতি—কিছুতেই তাদের বিশ্বাস নেই। নেই বলেই এরা আমাদের জাতীয় পতাকা, গান, ভাস্কর্য সবকিছু ভেঙে তছনছ করে দিতে চায়। যদি তাই হয় বা হতে থাকে, তাহলে কিভাবে পহেলা বৈশাখ নিরাপদ থাকবে দেশে?
পুরুষদের অন্তর আর বাইরে চলছে নিত্য দ্বন্দ্বের এক আশ্চর্য খেলা। তারা ভেতরে ভোগী, বাইরে সুশীল। সামাজিক মাধ্যমের কীটরা খুব ভালো ভাবে জানে তারা এখানে কী করে। আজ দেশে যে পুরুষতন্ত্র দাপটের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়, সমাজ শাসন করে, তাদের ভেতর বাঙালিয়ানা নেই বললেই চলে। হিল্লি-দিল্লি ঘুরে বেড়ানো এদের সঙ্গে বাঙালিয়ানার সম্পর্ক এখন শূন্যের কোটায়। একদিন সকালে নতুন পাঞ্জাবি পরে ঘুরলেই বাঙালি হওয়া যায় না—তাও একবেলার জন্য। সকালের রোদ তেতে উঠতেই আমাদের আরেক চেহারা। সন্ধ্যা গড়াতে পানাহারে মত্ত আরেক বাঙালি জাতি আমরা। এই জাতি কী করে পহেলা বৈশাখের পতাকা বহন করবে?
যে কারণে আজকের সমাজে মঙ্গল শোভাযাত্রা পড়েছে চরম বিপাকে। কে না জানে বাংলাদেশে সবসময় খারাপ মানুষ ছিল এবং থাকবে। দুনিয়ার কোনো দেশে তা নেই? উন্নত, আধুনিক, চরম উৎকর্ষে পৌঁছে যাওয়া সমাজেও খারাপ মানুষ আছে। আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রায় ঢুকে পড়া বদ মানুষেরা কোন পেশার, কোন শ্রেণির বা কাদের ইন্ধনে এরা এসব করে, তা কম-বেশি সবাই জানে। কিন্তু ঠেকানো যায় না। কারণ আমাদের ভেতরেই আছে তারা; এরা আমাদের ভেতর দিয়েই ঢুকে পড়ে। ধরা পড়লেও তাই বিচার হয় না; বিচার হলেও শাস্তি মেলে না। যাদের ওপর আমাদের গভীর বিশ্বাস, যারা মুক্তিযুদ্ধ ও চেতনার ধারক, তাদের আমলেও এরা নিরাপদ। এই ফাঁদে পড়া সমাজে মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন তোপের মুখে। ভাবখানা এমন যেন নারীরা এই শোভাযাত্রা ছাড়া আর সব জায়গায় চরম নিরাপদে আছেন। বাসে-ট্রেনে, ঘরে-বাইরে অনিরাপদ নারীদের দিকে খেয়াল না রেখে কেবল শোভাযাত্রার ওপর এত আক্রোশের কারণ আসলে ভিন্ন।
যেভাবেই হোক, এতে এখন মুখোশের ওপর নিষেধাজ্ঞা চলছে। মুখ ও মুখোশের সমাজে মুখোশ পরা মানুষ যে আসলে কারা, সেটাই বোঝা দায়। ধরে নিলাম এটা সাময়িক। কিন্তু এভাবে চললে আর কী কী বিষয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে, সেটা কী ভেবেছি আমরা? মূল ক্রোধ বা রাগের জায়গাটা কিন্তু পহেলা বৈশাখ। কারণ এটি বাংলাদেশ ও বাঙালির শক্তির উৎস। সে শক্তি কিভাবে কাজ করে সেটি আমরা আগে দেখেছি। এর প্রাণ যে সংস্কৃতি, সেটাই অন্ধ মানুষদের রাগের কারণ। তারা আমাদের শিকড়ের সংস্কৃতিকে ভয় পায়। তারা জানে এই শক্তি একবার জাগলে তাকে ঠেকানো যায় না এবং সেটাই এই জাতির মুক্তির উৎস।
পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশের জাতীয় উৎসব কি শুধু একদিন হৈচৈ করার জন্য? এক বেলা আনন্দ-ফূর্তি করে বাড়ি চলে গেলেই এই উৎসব আমাদের পথ দেখাবে? নাকি আমাদের উচিত এর দেখভাল করা? এক সময় এই জাতির কাছে পহেলা বৈশাখ ছিল শক্তি ও সাহসের। সেই সাহস বাঙালিকে মুক্ত করেছিল; পাকিস্তানের মতো দানবের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল। সেই জাতি আজ কৃশ, আজ দোদুল্যমান। আজ তার ভেতরে-বাইরে দুশমন। তার চিন্তা-চেতনায় মাথায় ঢুকে আছে বিদেশি ভূত, পরজাতির সংস্কৃতি। মূলত বাংলাদেশ ও বাঙালিকে পেছনে টেনে রাখার চক্রান্তমুক্ত পহেলা বৈশাখ না পেলে একদিন এর শক্তিহীন-বলহীন উদযাপনে মগ্ন জাতিকে দেখে করুণা করার বিকল্প থাকবে না।
পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষ আমাদের সেই শক্তির আধার যা চিরকালের। তাকে যেন হারিয়ে যেতে না দেই।
আরও খবর-
'মঙ্গলের' পর 'আনন্দ'ও বাদ, বর্ষবরণে হবে 'বৈশাখী শোভাযাত্রা'
ইউনেস্কোর স্বীকৃতিতে এখনো 'মঙ্গল শোভাযাত্রা
মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন 'প্রয়োজন ছিল না': সংস্কৃতিমন্ত্রী