Published : 02 Apr 2026, 09:34 PM
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলা বর্ষবরণের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র নাম পরিবর্তন করে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ করা হলেও জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কোর অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় এখনো তা 'মঙ্গল শোভাযাত্রা অন পহেলা বৈশাখ' শিরোনামেই অন্তর্ভুক্ত আছে।
ইউনেস্কো বলছে, নামকরণ সংক্রান্ত জাতীয় সিদ্ধান্তে তারা কোনো অবস্থান নেয় না। তবে সরকার যদি নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়, তবে ইউনেস্কোর কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা দিতে হয়।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। তারা কেউ নাম প্রকাশ করে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তারা বলেছেন, ইউনেস্কোর কাছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে নাম পরিবর্তনের কোনো আবেদন করা হয়েছে বলে তাদের জানা নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম মনে করছেন, নাম পরিবর্তন করা হলেও শোভাযাত্রার বৈশিষ্ট্যে যেহেতু কোনো পরিবর্তন হয়নি, ইউনেস্কোর স্বীকৃতির সঙ্গে নাম পরিবর্তনের বিষয়টি ‘সাংঘর্ষিক হবে না’।

এবারও শোভাযাত্রার নামকরণ ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ থাকছে বলেও জানান চারুকলার ডিন।
বর্ষবরণ শোভাযাত্রার নামকরণ নিয়ে চলমান বিতর্কের বিষয়ে জানতে চাইলে এক ই-মেইল বার্তায় ইউনেস্কোর হেড অফ অফিস অ্যান্ড রিপ্রেজেনটেটিভ সুজান ভাইজ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, “ইউনেস্কো নামকরণ সংক্রান্ত জাতীয় সিদ্ধান্তে কোনো অবস্থান নেয় না, কারণ এ ধরনের বিষয় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব এখতিয়ার ও সিদ্ধান্তের আওতাভুক্ত।”
“যদি বাংলাদেশ সরকার এই নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়, তবে ইউনেস্কোর কাছে একটি আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা দিতে হবে। ইনট্যাঞ্জিবল কালচারাল হেরিটেজ কনভেনশনের অপারেশনার ডিরেকটিভস অনুযায়ী, এ ধরনের অনুরোধ সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র করতে পারে এবং তা কমিটির অধিবেশনের অন্তত তিন মাস আগে বিবেচনার জন্য জমা দিতে হয়।”
বর্তমানে মঙ্গল শোভাযাত্রা ইউনেস্কোর Representative List of the Intangible Cultural Heritage of Humanity-তে ‘Mangal Shobhajatra on Pahela Baishakh’ নামেই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে জানান তিনি।

বিতর্কের সূত্রপাত যেভাবে
গত শতকের আশির দশকে সামরিক শাসনের অর্গল ভাঙার আহ্বানে পহেলা বৈশাখে চারুকলা থেকে যে শোভাযাত্রা বের হয়েছিল; সেটিই পরে মঙ্গল শোভাযাত্রায় রূপ নেয়। ২০১৬ সালে ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতিও পায় এ কর্মসূচি।
পহেলা বৈশাখের সকালে রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হত মঙ্গল শোভাযাত্রা। নানা সাজে বিভিন্ন বয়সী মানুষ তাতে অংশ নিতেন।
কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠী মঙ্গল শোভাযাত্রার বিরোধিতা করে আসছিল আওয়ামী লীগের সময় থেকেই। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেই বিরোধিতা আরো জোরালো হয়।
সেই প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালে চারুকলার শোভাযাত্রার নাম থেকে ‘মঙ্গল’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। নতুন নামকরণ হয় ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’।
এবারের বর্ষবরণেও দেশব্যাপী কর্মসূচি নেওয়ার কথা গত রোববার এক তথ্যবিবরণীতে জানায় সরকার, যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে ‘বর্ষবরণ শোভাযাত্রা’ করার কথা বলা হয়। শোভাযাত্রাটির কোনো নাম উল্লেখ না থাকায় মূলত বিতর্ক তৈরি হয়।

এই বিতর্ক ‘অনর্থক’ বলে মন্তব্য করেছেন বর্তমান সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “এবারও যথাযোগ্য মর্যাদায়, চিরায়ত ধারায় পহেলা বৈশাখ পালিত হবে।”
এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার মঙ্গল শোভাযাত্রার পরিবর্তে আনন্দ শোভাযাত্রা নাম দেওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না।”
এদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, "মঙ্গল আর আনন্দের মধ্যে পার্থক্যটা কী? আসলে মঙ্গল শোভাযাত্রা ও আনন্দ শোভাযাত্রার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। মঙ্গল শোভাযাত্রায় যতখানি আনন্দ আছে, একই ধরনের আনন্দ এই আনন্দ শোভাযাত্রার মধ্যেও আছে। আনন্দের কোনো পার্থক্য নেই।"
তবে আসন্ন পয়লা বৈশাখে আয়োজনটি ঠিক কোন নামে হবে, সে বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রী সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর দেননি।
তিনি বলেন, “কমিটির সব সিদ্ধান্ত তো আমি বলতে পারি না। তবে মন্ত্রী হিসেবে আমি এইটুকু বলতে চাই যে, আমাদের চিরায়ত সংস্কৃতি, ধ্যান-ধারণা ও ভাবনা থেকে আমরা ধারণ করতে চাই।”

এবারও আনন্দ শোভাযাত্রা: চারুকলার ডিন
সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারির সামনের লবিতে ঢাকের বাদ্য আর ছবি আঁকার মধ্য দিয়ে পহেলা বৈশাখ ও বাংলা নববর্ষ উদযাপনের প্রস্তুতি শুরু হয়।
এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এবারও আনন্দ শোভাযাত্রা আয়োজন করা হচ্ছে।”
নামকরণ নিয়ে বিতর্কের প্রসঙ্গে চারুকলার ডিন বলেন, "এটি গত বছরই স্পষ্ট করা হয়েছে। পহেলা বৈশাখে চারুকলা থেকে প্রথম যে শোভাযাত্রাটি হয়েছিল, তার নাম 'বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা'ই ছিল। সেটি পরে কী কারণে যেন 'মঙ্গল শোভাযাত্রা’ হয়ে যায়। আমরা কোনো কিছু পরিবর্তন করিনি। আমরা আগের ধারাবাহিকতা অব্যহত রাখছি।”
এবার আরো বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক বর্ষবরণ হবে বলেই তার ভাষ্য।
মঙ্গলবার বাংলা নববর্ষ-১৪৩৩ উদযাপনের কর্মসূচি প্রণয়নের লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে সভা হয়।
সভার পর ঢাকা বিশ্বদ্যালয়ের জনসংযোগ বিভাগ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, নববর্ষ উপলক্ষে আনন্দ শোভাযাত্রা সকাল ৯টায় চারুকলা অনুষদ থেকে শুরু হবে। রাজু ভাস্কর্য, দোয়েল চত্বর, বাংলা একাডেমি হয়ে শোভাযাত্রাটি পুনরায় চারুকলা অনুষদে এসে শেষ হবে।